হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১২

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১২

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১২
1.03K
0

১১ পর্বের লিংক

পর্ব-১২

আমি হতাশ হয়ে পড়লাম। বিল্যাই মিঞা যে হারে বাজে বকতে শুরু করেছে, তাতে আমার পক্ষে তার সাথে কথা চালিয়ে যাওয়া বা তার কথা শুনে যাওয়া সম্ভব হবে না। এ বিষয়টা তাকে বুঝিয়ে বলা দরকার। না হলে আমি ক্ষেপে যেতে পারি।

আমি বললাম, ‘বিল্যাই মিঞা তুমি একটু থামো।’

সে বুদ্ধিমান মানুষ। বুদ্ধিমান মানুষ অল্পতেই বোঝে।


আপনি আর আমি তো এক না ছার। আমার আর আপনার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক।


‘ছার, ফাও প্যাঁচাল শেষ। আপনাকে অনেক বিরক্ত করেছি। সেজন্য আমি খুবই দুঃখিত। এইবার আসল কথা বলব। এখন আপনি এককাপ চা খান। চা খেলে গল্প শুনতে ভালো লাগবে। আমি আপনার জন্য চা নিয়ে আসি। আপনি বসেন।’

আমার মনে হলো বিল্যাই মিঞা বুঝতে পেরেছে যে, আমি তার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী। এই সুযোগে সে আমাকে নিয়ে খেলছে। চা খাওয়ার ব্যাপারটা আসলে তাল-বাহানা। অবশ্য আমার গলাটাও শুকিয়ে এসেছে। এক কাপ চা হলে মন্দ হয় না। বিল্যাই মিঞা একজন চাঅলাকে ডেকে আনল। লেবু চা। বেশ ভালো। আমি এককাপ চা খেয়ে আরও এক কাপ চাইলাম। বিল্যাই মিঞা গোল গোল চোখ করে আমার চা খাওয়া দেখতে লাগল। মনে হলো সে-ও চা খেতে চাচ্ছে। কিন্তু আমার সামনে চা খেতে সাহস পাচ্ছে না।

আমি বললাম, ‘বিল্যাই মিঞা! তুমিও চা খাও। মন চাঙ্গা হবে।’

এই কথা বলামাত্র সে চাঅলাকে চা দিতে বলল। চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগে একবার আমার দিকে তাকাল।

আমি বললাম, ‘যদি কিছু মনে না কর তাহলে একটা কথা বলব তোমাকে।’

বিল্যাই মিঞা সিরিয়াস ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলেন ছার।’

আমি বললাম, ‘সেদিন তুমি আমার সামনে শব্দ করে চা খেয়েছিলে। আমার ভালো লাগে নি। আমার সামনে শব্দ করে চা খাওয়া যাবে না।’

সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ কালো হয়ে গেল।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘এটা কী বলেন ছার! গরম চা খাওয়ার সময় তো একটু আধটু শব্দ হবেই। না হলে তো জিব্বা পুড়ে যাবে।’

আমি বললাম, ‘না না, শব্দ হবেই বলছ কেন? এই যে আমি খাচ্ছি। একটুও তো শব্দ হচ্ছে না।’ একবার চা খেয়ে দেখালাম।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আপনি আর আমি তো এক না ছার। আমার আর আপনার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক।’

আমি বললাম, ‘দেখ মিঞা, আমার সাথে কথা কাটাকাটি করবে না। তুমি হয়তো জানো না, মেজাজ গরম হয়ে গেলে আমি আর আমি থাকি না। একেবারে বদলে যাই। আমার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলতে পারি। সুতরাং তুমি দ্রুত সিদ্ধান্ত নাও, চা খাবে কি খাবে না।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘মুশকিলে ফেলে দিলেন ছার।’

আমি বললাম, ‘তাহলে বাদ দাও। এক কাপ চা-ই তো। কী এমন হবে, না খেলে?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘না ছার, খাওয়ার নিয়ত করেছি। না খেলে মনটা আনচান করবে। মনের সুখ বড় সুখ। মনকে কষ্ট দেওয়া ঠিক না। আমি বরং একটু দূরে গিয়ে খেয়ে আসি। বট গাছটার আড়ালে গিয়ে মনের খায়েশ মিটিয়ে বড় করে ফুঁ দিয়ে চুমুক দিবো। আপনি টু শব্দও পাবেন না।’

বিল্যাই মিঞা চলে গেল। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম।

এই ফাঁকে চাঅলা ছেলেটি বলল, ‘শব্দ করে চা খেলে কী হয় ছার?’

‘তোমার মাথা হয়।’ ছেলেটার কথা শুনে রাগে আমি আগুন হয়ে গেলাম।


আমি বিল্যাই মিঞার ওপর বিরক্ত হলাম, ‘ঠিক আছে এক কথায় উত্তর দিতে না পারলে তুমি দুই কথায় উত্তর দাও।’


চাঅলা ভয়ে আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না। আমি চায়ের বিল দিলাম। সে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিল। তার ওভাবে হেঁটে যাওয়া দেখে আমার কিঞ্চিত মায়া হলো। তাকে ডাকলাম।

‘এই ছেলে শোনো!’

চাঅলা আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে ডাকছেন ছার?’

আমি বললাম, ‘তো কাকে?’

চাঅলা এল। আমার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।

আমি বললাম, ‘তুমি কি মন খারাপ করে যাচ্ছ?’

চাঅলা বলল, ‘না ছার, আপনি তো আমার চায়ের বিল দিছেন। বিল না দিলে মন খারাপ করতাম।’

আমি বললাম, ‘মিথ্যে বলছ কেন?’

চাঅলা বলল, ‘ছার, ফুরফুরা মন নিয়ে যাচ্ছি। মন একটু খারাপ হইছিল। কিন্তু এই মাত্র তা ধুয়ে মুছে গেল।’

আমি বললাম, ‘ধোয়েমুছে গেল কিভাবে?’

চাঅলা বলল, ‘এইমাত্র আপনি সুন্দর করে আমারে ডাক দিলেন। তাতেই।’

আমি বললাম, ‘তোমার নাম কী?’

চাঅলা বলল, ‘ছার, আমার নাম পর্বত আলী।’

ততক্ষণে বিল্যাই মিঞা চা খাওয়া শেষ করে এসেছে। আমি বিল্যাই মিঞার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘পর্বত আলী কি তোমার আত্মীয় লাগে?’

বিল্যাই বলল, ‘ছার, আপনার প্রশ্নটা জটিল। এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন।’

আমি বিল্যাই মিঞার ওপর বিরক্ত হলাম, ‘ঠিক আছে এক কথায় উত্তর দিতে না পারলে তুমি দুই কথায় উত্তর দাও।’

বিল্যাই মিঞা আমার দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকাল। আমি চুরি করে দেখে নিলাম ভয়ে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু কম্পন বয়ে যাচ্ছে। ইতস্তত করতে করতে বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আমরা একসঙ্গে বিজনিস করি। মানে ভ্রাম্যমাণ হকার। একসাথে উঠাবসা করি। এক অর্থে সে আমার পরমাত্মীয়। আর এক অর্থে কিচ্ছু না। যাই হোক কথা বেশি প্যাঁচালে জিলাপি হয়। এই ব্যাপারে আমি আর কথা প্যাঁচাব না। বলতে পারেন সে আমার বন্ধু।’

পর্বত আলী চলে যাওয়ার পর বিল্যাই মিঞা তার গল্প শুরু করল :

১৩৮১ বঙ্গাব্দ। মাঘ মাসের ২১ তারিখ দিবাগত রাত্র তিন ঘটিকায় মাতুলালয়ে আমার জন্ম। আমি আটাইশা। মানে আট মাসে আমি জন্ম নিয়েছি। তার উপর চোখ না ফোটা অবস্থায়। আমার শরীরটা ছিল খুব রোগা-পটকা। মানব সন্তান সাধারণত যতটুকু ওজন নিয়ে ভূমিষ্ট হয়, আমি ছিলাম তার অর্ধেকেরও কম। গ্রামের সবাই ধারণা করেছিল আমি বাঁচব না। আমার মা পর্যন্ত তার সন্তানের আশা ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমি আল্লাতালার অশেষ রহমতে বেঁচে আছি। আমি যে বেঁচে আছি এটা একটা বিশাল ঘটনা। ছার, আমার জন্য খাস নিয়তে একবার সোবহানাল্লা বলেন।

আমি বিল্যাই মিঞার দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ বোধক মাথা দোলালাম। কিন্তু এতে কাজ হলো না।


কান টানলে মাথা আসে ছার। আমার বেঁচে থাকার হিস্ট্রির সাথে জড়িয়ে আছে আমার নাম বৃত্তান্ত।


বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, মুখে উচ্চারণ করে বলেন। আল্লার ফেরেস্তাারা শুনুক। ধানমন্ডি লেকে প্রচুর ফেরেস্তা আছে।’ অগত্যা আমি সোহানাল্লা বললাম।

বিলাই মিঞা বলল, ‘আপনি সহিভাবে সোবাহান্নাল্লা বলাতে দ্যাখেন গাছের পাতাগুলো আনন্দে নেচে ওঠল।’

আমি তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই গাছের পাতাগুলো নড়ছে।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আল্লাতালার কুদরত। বুঝলেন কি-না। যাই হোক ছার, এইবার আপনিই বলেন, আমি যে বেঁচে আছি, এটা একটা আজব ঘটনা কি-না?’

আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না। বিল্যাই মিঞা আমার মনের অবস্থা বুঝল। বলল, ‘ছোরি ছার, আপনি কিভাবে বলবেন আমার বেঁচে থাকাটা আজব ঘটনা কি-না। আপনি তো এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। আপনার কাছে কেবলমাত্র আমার লাইফ হিস্ট্রি বলা শুরু করেছি।’

বিল্যাই মিঞার লাইফ হিস্ট্রি বয়ানের ভূমিকা পর্বের শানে-নজুল যা পাওয়া গেল, তাতে মনে হচ্ছে, সে বেশ সময় নেবে। ততক্ষণে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটার সম্ভবনা রয়েছে। তার জন্ম কবে, কোথায়, সে আটমাসে জন্মেছে নাকি ষোল মাসে জন্মেছে সেটা আমার জানার দরকার নাই। আমার দরকার তার বিল্যাই মিঞা নাম বৃত্তান্ত। অথচ তা না বলে সে বলে চলেছে, সে কিভাবে বেঁচে আছে সেই বৃত্তান্ত। বিল্যাই মিঞা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছার, সবুর করেন। সবুরে মেওয়া ফলে।’

আমি বললাম, ‘মানে কী? তুমি আমাকে এসব বলছ কেন?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘কারণ আপনি শুরুতেই অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। ভাবছেন, আমি কিভাবে বেঁচে আছি সে কাহিনি শুনে আপনার কি লাভ, তাই না?’

আমি কিছু বললাম না।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘কান টানলে মাথা আসে ছার। আমার বেঁচে থাকার হিস্ট্রির সাথে জড়িয়ে আছে আমার নাম বৃত্তান্ত।’

১৩ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com