হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১১

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১১

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা : ১১
689
0

১০ম পর্বের লিংক

পর্ব-১১

সে এবার সত্যিই ভালো চা বানিয়েছে। বেশ তৃপ্তি সহকারে চা খেতে খেতে ভাবলাম, এখনি আসল ব্যাপারটা জেনে নিতে হবে। এরই মধ্যে অনেক সময় বয়ে গেছে। তাছাড়া লেখার টেবিলে বসতে হবে। আজ বিকেলে নাট্য নির্দেশক খণ্ডত হাসান আসবে। সে নাকি ভালোবাসা দিবসের একটি নাটক বানাবে। একটা চ্যানেলের হেড অব প্রোগ্রামের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেছে। হেড অব প্রোগ্রাম নাকি আমাকে দিয়ে নাটকটি লিখিয়ে নিতে পরামর্শ দিয়েছেন। খণ্ডত হাসান এসব কথা আমাকে ফোনে বলেছে। আমি তাকে বলেছি টিভি নাটকের টেকনিক আমি জানি না। ও কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। সে বলেছে টেকনিক নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে না। শুধু একটি কাহিনি লিখে দিলেই হবে। তার সাথে ফোনে কথা বলেই বুঝতে পেরেছি সে একজন নাছোড়বান্দা। হয়তো নাটকটা আমাকেই লিখতে হবে।

আমি বললাম, ‘চা খুব ভালো হয়েছে।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ছার।’

হঠাৎ বিল্যাই মিঞা উসখুস করতে লাগল। একটু আগেও মনে হয়েছে তার কোনো তাড়া নেই অথচ এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে কী যেন ফেলে এসেছে। এখানে আর থাকা যাবে না।


‘দুদিনের পুত্র তোমাকে খুঁজছে? এটাও কি বিশ্বাস করতে হবে বিল্যাই মিঞা, স্যরি বিল্লাল হুসেন?’


বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আমি উঠি ছার।’

আমি বললাম, ‘উঠি মানে! আসল ব্যাপারটা না বলে তুমি যাচ্ছ কোথায়?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আমার পুত্র আমাকে খুঁজছে। এখানে থাকা আর ঠিক হবে না ছার। বড় অন্যায় হয়ে যাবে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘দুদিনের পুত্র তোমাকে খুঁজছে? এটাও কি বিশ্বাস করতে হবে বিল্যাই মিঞা, স্যরি বিল্লাল হুসেন?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘না না আপনি আমাকে বিল্যাই মিঞাই বলেন। অসুবিধা নাই। আমার পুত্র না জানলেই হলো। আর দুদিনের পুত্র তার পিতাকে খুঁজছে শুনে অবাক হচ্ছেন কেন ছার? আপনি জানেন না বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী মায়ের পেটে থাকতেই কোরান মুখস্থ করেছিলেন? এটা যদি সম্ভব হতে পারে তাহলে আমার দুদিনের পুত্র আমাকে খুঁজবে না কেন বলেন?’

বিল্যাই মিঞার যুক্তি মানতে হলো।

‘আমি খুব তাড়াতাড়ি আবার আসব ছার। আপনি যা জানতে চান সব জানাব। কিন্তু আজকে আর থাকা সম্ভব না। স্যরি ছার।’

দুই তিন দিন কেটে গেল। বিল্যাই মিঞার কোনো খবর নাই। শেষে আমিই একদিন ধানমন্ডি লেকে গেলাম। বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না। অল্পতেই তাকে পেয়ে গেলাম।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, আজই আপনার বাসায় যেতাম।’

আমি বললাম, ‘আর যেতে হবে না। তুমি আমার পাশে বসো। তোমার সাথে কথা আছে।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আগে আপনার কান পরিষ্কার করে দিবো তারপরে অন্য কথা। আজ কিন্তু না করতে পারবেন না।’

বিল্যাই মিঞার আবদারে আমি সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলাম। কারণ এই কাজটা অবৈজ্ঞানিক। দ্বিতীয়ত বিল্যাই মিঞারা যেভাবে কাজটা করে তাতে অ্যাকসিডেন্টের রিস্ক আছে। তবে এটা সত্যি যে, কান চুলকালে  দারুণ আরাম পাওয়া যায়। এই আরামের কারণেই মানুষ নিজের কান দুটো ছেড়ে দেয় কানখাউজানিকরের হাতে। কানখাউজানিকরেরা মানুষের কান ধরে ইচ্ছা মতো টানাটানি করে অথচ কেউ কিছু মনে করে না। ব্যাপারটা ভাবলে আমার হাসি পায়।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘চিন্তার কিছু নাই ছার। আপনার সামনেই ডেটল দিয়ে আমার হাত এবং যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে নিবো। আপনি ১০০% নিশ্চিত থাকতে পারেন। আমার দ্বারা মানুষের ক্ষতি হয় না।’

শেষমেশ রাজি হলাম। কিন্তু তাকে সাবধান করে দিলাম, কান ধরে যেন অযথা টানাটানি না করে। বিল্যাই মিঞা স্বভাবসুলভ জিহ্বায় কামড় কেটে বোঝাল, আমি তার কাছে বিশেষ সম্মানী লোক। সে ভুলেও এমন কাজ করবে না, যাতে বিন্দু পরিমাণ সম্মানহানি ঘটে।

সে কানখাউজানি শুর করল।

‘একটা ব্যাপার কি জানেন ছার?’ কান খাউজাতে খাউজাতে খোশগল্পের ভঙ্গিতে কথা বলা শুরু করল সে।

আমি ততক্ষণে আরাম পেয়ে গেছি। বেশ ভালো লাগছে। ছোট্ট করে বললাম, ‘কী?’

বিল্যাই মিঞা একটা মারাত্মক কথা বলে ফেলল, ‘ডলারের দাম বাড়লে পিয়াজের ঝাঁঝ বাড়ে।’

কথাটা শুনে আমি নড়েচড়ে উঠলাম, ‘মানে?’


ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পর বিল্যাই মিঞা প্রাচ্যের রাজনীতির দিকে দৃষ্টি দিয়েছে।


বিল্যাই মিঞা বলল, ‘নড়বেন না ছার। কানে খোঁচা লাগবে। আমার কথাটা সত্য। বিশ্বাস না হলে আজই পরীক্ষাটা করে দেখতে পারেন। বর্তমানে ডলারের দাম চড়া আছে। পরীক্ষা করার জন্য এখনই ভালো সময়। আর একটা মজার ব্যাপার শোনেন—গত কয়েক বছরে জিনিসিপত্রের দাম এত বেড়েছে যে, আল্লাতালা না থাকলে আমাদের মতো গরিবরা কবেই মরে যেত। মরে ভূত হতো। কিন্তু একটা ব্যাপার আপনি লক্ষ করেছেন কিনা জানি না, সব কিছুর দাম বাড়লেও একটা জিনিসের দাম কিন্তু বাড়ে নাই।’

আমি জানতে চাইলাম, ‘জিনিসটার নাম কী?’

বিল্যাই মিঞা  বলল, ‘কটনবাড।’

আমি হাসলাম। কিছু বললাম না।

বিল্যাই মিয়া বলল ‘কেন এর দাম বাড়ে না, জানেন ছার?’

আমি বললাম, ‘কেন?’

‘কারণ আমাদের দেশের মন্ত্রী-মিনিস্টাররা কান পরিষ্কার করেন না। সেই কারণে কটনবাডের কোনো টেন্ডার হয় না। মানে চাহিদা কম। চাহিদা কম থাকলে সে জিনিসের দাম কম থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। অর্থনীতির ভাষায় কথা বলে ফেললাম ছার। ভুলত্রুটি মার্জনীয়।’

ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পর বিল্যাই মিঞা প্রাচ্যের রাজনীতির দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। কিন্তু আমি মানুষটা রাজনীতির ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন। বেশির ভাগ সময় এই ব্যাপারটাতে মন্তব্য না করেই গা বাঁচাতে চাই। এখনও তাই করলাম। বিল্যাই মিঞাও এ ব্যাপারে আর কথা বাড়াল না। কান পরিষ্কার শেষ করে হাত পরিষ্কার করল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে, ‘সোবহানাল্লা! আপনি জব্বর দুইখান কান পেয়েছেন ছার। এক্কেবারে খানদানি কান।’

আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। বললাম, ‘খানদানি কান মানে কী?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘মানে আপনার কানে কোনো খৈল নাই। কোনো ডিফেক্ট নাই। ফকফকা ক্লিন। এইরকম কান পাওয়া বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। মানে খানদানি ভাগ্য ছাড়া এমন কান পাওয়া যায় না। অনেক ভদ্রলোক আছেন যাদের কানের বিশ্রী অবস্থা! জানেন ছার, কোনো মানুষের কান দেখেই তার জীবনের মর্মার্থ অনুধাবন করা যায়।’

আমি আবারও অবাক না হয়ে পারলাম না। বিল্যাই মিঞার কথাগুলো মার্ক করার মতো। তবে বুঝতে পারলাম না কেন সে এ-ধরনের কথা বলছে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তার কথা বলার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। যা আমার জন্য বিরক্তিকর।

সে বলতে লাগল, ‘এই হাতে বহু লোকের কান পরিষ্কার করেছি ছার। জ্ঞানী-গুণী ডাক্তার কোবরেজ মন্ত্রী-মিনিস্টার আরো কত রকমের মানুষের। কিন্তু একজনের কান পরিষ্কার করতে পারলে আমার জীবন ধন্য হতো। জানি না আমার সেই আশা পূরণ হবে কি-না।’


প্রেসিডেন্ট ওবামা আসার আগে আমি আমার খায়েশের কথা আমরিকান দূতাবাসে গিয়ে বলব।


‘তুমি কার কথা বলছ?’

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামা। ছার, এ ব্যাপারে কি আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারেন?’

আমি বললাম, ‘নাহ।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘কিন্তু  আমার তো মনে হয় আপনি পারবেন।’

আমি বললাম, ‘আমি পারব? কিভাবে?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ধরেন যে ওবামা আমাদের দেশে আসলেন। যেমন আসছিলেন ক্লিনটন সাহেব। তিনি তো এই দেশের পান্তা ভাত খেয়ে গ্যাছেন। মনে আছে আপনার?’

আমি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লাম।

‘তো ওবামাও যদি কখনো আসেন তাহলে আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে পারে।’

‘আগে আসুক। পরে না-হয় এ ব্যাপারে চিন্তা করা যাবে।’

‘আমি আগে থেকেই একটা ছক করে রাখতে চাই। তাড়াহুড়া করে কাজ করা ভালো না। বুচ্ছি ছার আপনার মাথায় বিষয়টা ধরে নাই। আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলি। প্রেসিডেন্ট ওবামা আসার আগে আমি আমার খায়েশের কথা আমরিকান দূতাবাসে গিয়ে বলব। যতগুলো টিভি সেন্টার এবং পত্রিকা অফিস আছে, সবগুলোতে যাব। আমার মনের কথাটি ভালোভাবে তাদেরকে বোঝাব। আশা করি ওরা না করতে পারবে না। আর পত্রিকায় তো এইসব আজব জিনিসের খুব চাহিদা। যদি আমি এতে সাকসেসফুল হই তাহলে মনে করেন যে বিশাল একটা ঘটনা ঘটার চান্স আছে। দেখা যাবে যে আমিই হিরো হয়ে গেছি। বলেন ছার এ-রকম কি হতে পারে না?’

১২ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com