অন্যজন : ৫

অন্যজন : ৫
65
0

৪র্থ পর্বের লিংক

পর্ব- ৫

৮.
দুঃখের কথা মাকে বলতে পারি না, কিন্তু মা জেনে যায়। তার সংগ্রামী জীবনে দুঃখ মিশে দেয়াল তৈরি হয়। দেয়াল ভেদ করতে পারি না।

দেখি, কাজ ফেলে মা পুতুলের মতো বসে আছে। তখন টুুনটুনির মতো লাফাই, নাঁকি কান্না কাঁদি। রাস্তার পাশে গোবর ফেলার গর্তটা বড় করছেন বড় চাচা। মনে হয় আমার জন্যও কেউ গর্ত খুঁড়ছে।

মার প্রতি খুব রাগ হয়। উঠে দাঁড়াই। ছোট নানার মতো বুড়া যাযাবর নই, আমি চাষার বেটা চাষা। পুকুরে ভাসা হাঁসের পাশে দুপুরটা ঝিমায়। তখন বাজারে যাই। কালো জামা পরে দুপুর যখন সন্ধ্যা হয়ে পাহাড়ের ওপাশে চলে যায়, তখন ফিরি। নিজেকে জুগিপাড়ার জঙ্গলের শেয়ালগুলোর শুকনা গু মনে হয়। ভাবি, কোন দুর্ভাগ্যের কারণে বিদেশ যেতে পারব না?


লোকে যেভাবে কাপড় মুচড়ে পানি বের করে, পাকসেনারাও সেভাবে আমাদের রক্ত বের করে নিয়েছিল। আসমানের বিল তার সাক্ষী।


সাঁকোর ওপাশ থেকে লোক আসছে। সন্ধ্যাকে থলেয় ভরে কেউ তাদের মুখে ছুড়ে দেয়। ধলি বক ধানগাছের উপর দিয়ে উড়ে যায়। গাছপালা ঘেরা বাড়িগুলো থেকে আমার দুঃখের মতো ধোঁয়া বেরোয়। খালপাড়ে খুঁটিতে বাঁধা ষাঁড়টা ছটফটায়। তার ছটফটানি ভেতরে সংক্রমিত হয়। ফোঁস ফোঁস আওয়াজ ও পায়ের আঁচড়ানি শুনে মনে হয় টাকা জোগাড় করে মা আমাকে বিদেশ পাঠাবেই।

ঘরে এসে শুনি যুদ্ধের কথা চলছে। মা বলে, কিছুক্ষণ পর পর থাডা পড়ছে। মনে হয় দুনিয়া ঝিলিক দিচ্ছে। আশপাশের কয়েক বাড়ির মানুষ জুগিপাড়ার পেছনে জঙ্গলে ঢুকেছে। নিশ্বাস তাবিজের মতো গলার কাছে ঝুলিয়ে রাখে। সবাই আল্লাহকে ডাকে, দোয়া-দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দেয়। এ সময় মুক্তিরা এল। আহ! যদি তাদের দেখতি। আমার দিকে ফিরে বলে, আর তুই কী? তুই একটা মিচকে শয়তান, দূর হ সামনে থেকে।

ভাঙা বেড়ার দিকে চেয়ে থাকি। মনে হয় পরিমলদার মতো একজন কামার দরকার; যে পুড়িয়ে, পিটিয়ে আমাকে সাইজ করবে।

মা একদিন বলেছিল, আমার মন নাকি ব্রিটিশের মতো। কেন বলেছিল মনে নেই। এখন মনে মনে বলি, মা, আমাকে পাল্টে দেবে?

দাদির সঙ্গে জুগিপাড়ার জঙ্গলে বসে থাকে মা। এ সময় একদল মুক্তিযোদ্ধা এসে বলে, শুনুন, আপনারা পালান। পাকিস্তানি হানাদারদের এখানে ঢুকতে কোনো সমস্যা হবে না। রাজাকাররা তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে।

এর ঘণ্টাখানেক পর পাকসেনাদের গুলি এসে জঙ্গলে পড়ে। লোকজন জঙ্গলের পাশে বিলে ঝাঁপ দেয়। কয়েকদিনের বর্ষণে বিল পানিতে ভরপুর। সেই পানি ধীরে ধীরে লালচে হতে থাকে।

ছোটবেলায় দাদি যখন গল্প বলত, তার গল্পে ঘুরেফিরে আসমানের বিলের কথা আসত। দাদি বলত, এই বিলে আমার ছেলে মিশে আছে। লোকে যেভাবে কাপড় মুচড়ে পানি বের করে, পাকসেনারাও সেভাবে আমাদের রক্ত বের করে নিয়েছিল। আসমানের বিল তার সাক্ষী।

আমাদের এক চাচা, বয়স নয় কি দশ, ওই দিন গুলিতে মারা গিয়েছিল।

রাতে ঘুমিয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিলের রক্ত থেকে ভেসে ওঠে শত শত মানুষ। তারা মিছিল করে মানুষের মুক্তির কথা বলে। বলে, মাটিতে মিশে আছে আমাদের রক্ত। যারা ফসল ফলায় তারা তা জানে, অন্যরা ভুলে গেছে।

ভুলের দুয়ার খুলে আসেন রাজাকার বাম্বু ও তার সঙ্গীরা। তাদের পায়ের চাপে দুমড়ে মুচড়ে যায় দাদির সোনার বাংলা। বাংলাকে টিপে টিপে তারা কমলালেবু বানায়। কমলাটা ঘুণে ধরা টেবিলে রেখে বলে, দেখ, সোনার বাংলা দেখ।

পচা ঘ্রাণ নাকে ঢুকে যায়। আমার আর বাংলাদেশ দেখা হয় না। চিৎকার করে দাদিকে ডাকি। দাদি সবসময় বার্মিজ থামি পরে থাকত। হাতে থাকত কেরেত বেতের লাঠি, ব্যবহারে কালচে ও তেলতেলে। লোকে যেভাবে মৌমাছির ঝাঁক থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করে, ছোটকালে দাদির পানের বাটা থেকে পান নিয়ে সেভাবে পালাতাম। তার চেয়েও জোরে দৌড়াই। রাস্তার কাছে গোলাগুলি। লোকজন বলে, মুক্তিযোদ্ধারা পাঞ্জাবিদের অ্যাটাক করেছে।

কারা যেন লাথি মেরে আমাকে পুলের নিচে খালে ফেলে দেয়। স্কুল থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দেখে। প্রতিবাদে তারা হাসে না, কথা বলে না।

খালের স্রোতে ভেসে যাওয়ার সময় দাদির গল্প শুনি। দাদি বলে : এক বুড়ি আছে। বুড়ির চার ছেলে। একজন যুদ্ধের সময় মরে গেছে। একজন কন্ট্রাক্টর আর দুজনে চাষবাস করে খায়। তাদের একজন কাজ পাগল, চাষবাসই তার সব। কোনো কুটিলতা নাই। অন্যজনের মন বিএস সিটের মতো। ওর মনে ছোট ছোট অসংখ্য খুপরি। খালি প্যাঁচ লাগায়। কোনো উপায় নাই বলে কিছু জমি চাষ করে। চাষবাস তার কাছে ছোটলোকের কাজ। পারলে আজই ছেড়ে দেবে। চাষ ভালোবাসা ও একাগ্রতার বিষয়, তা জানেই না। ভাইকে নিয়ে হাসাহাসি করে। ভাইয়ের সঙ্গে কথাও বন্ধ।

বুড়ি নিজের কাজ নিজেই করে। তাই যে মানুষ কাজ করে না, তাকে দেখতে পারে না। ঘাটাপুকুরপাড়ের তেঁতুলতলে তার নাতিকে জিনে ধরেছিল। সেই গাছটার বয়স এখন প্রায় একশ। বুড়ির বয়স গাছটার কাছাকাছি। হাত ও আঙুল গাছটার শিকড়ের মতো। ব্রিটিশ গেল, পাকিস্তান গেল, বাংলাদেশ চলছে—তিনকালে অনেক কিছু দেখেছে। তার জীবনটা এখন পাকা তেঁতুলের মতো।

কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারি দাদি নিজের গল্প বলছে। দাদিকে ধরে ঝাঁকুনি দিই। হাসতে হাসতে দাদি বলে, তখন মানুষ ছিল বৃষের মতন। গাড়িঘোড়া ছিল না। হেঁটে হেঁটে বিশ-পঁচিশ মাইল দূরে শহরে চলে যেত। সাথে নিত পানিভাতের গাঁটরি। পরিশ্রম বেশি করতে হতো, তাই রোগ-শোক কম ছিল। আর খেত কি, আধ সের, তিন পোয়া চালের ভাত একজনে খেত। মানুষ অনেক সাচ্চা ছিল। মুখের কথায় কাজ হতো। পড়ালেখা ছিল না, তবে জবান ঠিক রাখত। বিশ্বাস ভঙ্গের ঘটনা ছিল কম। দশজনের কথা ভাবত।

ছোট ছেলে বশর বাপের কিছুটা পেয়েছে। বড়টা হলো শয়তান, মেজ কন্ট্রাক্টর আরো বেশি। নাতি ফজার মধ্যে স্বামীর ছায়া দেখে। নিজের যখন বিয়ে হলো, পালকিতে চড়ে শ্বশুরবাড়ি এসেছে। পরে গরুর গাড়ি। এরপর আসা-যাওয়া পায়ে হেঁটে। সবচেয়ে বিস্ময় ছিল রেলগাড়ি। তার বোনের বাড়ির পাশ দিয়ে লাইন গেছে। যখন রেলগাড়ি যেত বুকের ভেতর দুপদুপ করত। মনে হত বিশ-পঞ্চাশটা হাতি রেগেমেগে দৌড়াচ্ছে।

বাড়ির বেশ কয়েকজন বম্বে না কলকাতায় জাহাজে কাজ করত। দাদাও কিছুদিন কলকাতায় ছিল। দুটি বড় বলদ আর দুটি গাইয়ে ভরা ছিল গোয়ালঘর। বলদ দিয়ে স্বামী হাল জুড়ত। তা ছিল দেখার মতো। বলদগুলো হাতির মতো। তাই হাল চষার সময় মানুষটাকে ভালো করে দেখা যেত না।


স্বৈরাচারের পতনের জন্য মানুষ যখন তীব্র আন্দোলন করছে, একটার পর একটা লাশ পড়ছে, তখন একদিন দাদি লাঠি ও থামি রেখে, তার গল্পগুলো পুরনো তেঁতুলের মতো বয়ামে রেখে টিয়া পাখি হয়ে উড়ে গেছে।


সাধারণত বৃষ দিয়ে হাল চষে মজা নেই। বৃষ প্রায় সময় উত্তেজিত থাকে, যার ফলে মনোযোগ দিয়ে চষা যায় না। ওদেরকে সামলানোও কষ্টকর।

স্বৈরাচারের পতনের জন্য মানুষ যখন তীব্র আন্দোলন করছে, একটার পর একটা লাশ পড়ছে, তখন একদিন দাদি লাঠি ও থামি রেখে, তার গল্পগুলো পুরনো তেঁতুলের মতো বয়ামে রেখে টিয়া পাখি হয়ে উড়ে গেছে। মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখি, খাগড়াছড়ি বা রাঙামাটির দিকে কোনো পাহাড়ে দাদি পাখি হয়ে উড়ছে। পাখি দেখলেই দাদির কথা মনে পড়ে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর দাদির কবরের সামনে দাঁড়ালেও পাখি দেখি। ওটা কখনো দোয়েল, কখনো শালিক বা ফিঙে হয়ে ওড়ে; উড়ে উড়ে গল্প বলে। সেই গল্পে একটা রানার থাকে। রানার আমার জন্য নিয়ে আসে চিঠি। চিঠি পড়ে মন ‘পালায় পালায়’ করে। মনে লাঙল চালাই। মই দিয়ে জালাবিছানের মতো সমান করি। মন তুমি কৃষিকাজ জানো না? মন বলে, জানি।

তাহলে পালাবে কেন?

পালাব না, চাষেই থাকব। এবার আমারে উদ্ধার করো, নিয়ে চলো দাদির কাছে।

৯.
আষাঢ়ের সেই ঘনঘোর বৃষ্টির রাতে ঘুমের মধ্যে উড়তে উড়তে দাদির কাছে যাই। দাদি তখন কাজির গল্প বলে : বোছা একজন, বাচ্চু একজন, ওরা দুই ভাই। বাচ্চু পাগলা কাজির বাড়িতে কাজ করতে এসেছে।

দাদি বলে, হরাল দিতে হবে, হরাল না দিলে কিচ্ছা বলতে ভালো লাগে না। হরাল মানে দাদি কিচ্ছা বলবে আর যারা শুনবে তারা কিচ্ছার ফাঁকে হু হ্যাঁ করবে। বলে, কাজির আছে বারো দোন ভুঁইয়ের চাষ, বারো বলদের ঘাস, বারো ঢেঁকিতে পল্লত, পোয়া কোলত। বিশ্রাম নেবে পাটবনে পাটগাছের আগাছা বাছতে বাছতে। বারো আঙুলের পিঁড়ি, ছয় আঙুলে পাত, মানা করলে না দিস ভাত। বারো দোন ভুঁইয়ে চাষ দিয়ে, বারোটা গরুকে ঘাস খাইয়ে, কাজির ছেলেকে গোসল করিয়ে বারো আঙুলে পিঁড়িতে ভাত খেতে বসে। ছয় আঙুলের পাতে ভাত দেওয়া হয়। একটু দিলেই পড়ে যায়। কাজি বলে আর দিস না।

বাচ্চুর অবস্থা কাহিল। রোগা হয়ে পড়ে সে। তারপর একদিন বাড়ি চলে যায়, বাড়ি গিয়ে সব বলে। ভাই, ভাইয়ের বউ তাকে যত্ন করে খাওয়ায়।

এদিকে কাজি পড়েছে মুসিবতে। বারো দোন ভুঁইয়ের চাষ কে করবে, বারো বলদের ঘাসও-বা কে কাটবে? কাজি গেল বাচ্চুদের বাড়ি। কাজির কথা শুনে বোছা বলে, ঠিক আছে, আমি করব তোমার কাজ। তবে তুমি নাখোশ হতে পারবে না। নাখোশ হলে তোমার কান কাটা যাবে। কাজি বলে ঠিক আছে।

বোছা এল কাজির বাড়ি। কাজি বলে, বোছা, বারো দোন ভুঁইয়ের চাষ করতে হবে। বোছা বারো দোন ভুঁইয়ের জন্য বীজধান ভিজাল।

কাজি বলে, তুই একলা পারবি?

বোছা বলে, পারব।

সে জমিতে যায়। লাঙলের ঈষে বীজধান বেঁধে নিয়ে হাল চষে। বাড়ি এলে কাজি বলে, বোছা জালা ফেলেছিস?

ফেলেছি।

এত তাড়াতাড়ি?

তুমি নাখোশ হয়েছ?

কাজি বলে, না। গরুগুলোকে ঘাস-টাস, পানি-টানি খাওয়ায় আন।

বোছা গরু নিয়ে যায়। ওগুলোর পাছায় চোঙা দিয়ে পানি দেয়।

আমরা জিজ্ঞেস করি, গরুগুলো কি মরে গেছে?

দাদি হেসে বলে, বোছা এল বাড়ি। বারো ঢেঁকিতে পল্লত দিতে হবে। তো দিল। কাজির একটা ছেলে আছে। এই ধর ছয়-সাত মাস। কাজি বলল, ছেলেটারে ভালো করে গোসল করায় আন। বোছা ছেলেটাকে গোসল করাল। কাজি বলে, ছেলেকে গোসল করাইছস?

বোছা বলে, হ্যাঁ, গোসল করিয়ে বেড়ায় শুকাতে দিছি।

কাজি তো অবাক। বোছা বলে, তুমি নাখোশ হইছ?

কাজি বলে, না।

তারপর বোছাকে বারো আঙুলে পিঁড়িতে বসতে দেওয়া হলো, ছয় আঙুলে পাতে ভাত দেওয়া হলো। ভাত খেয়ে পাটবনে আগাছা বাছতে বাছতে বিশ্রাম নিতে হবে। সে করল কি, সবগুলো পাট তুলে ফেলল। কাজি এসে বলে, তুই কী করছস?

বোছা বলে, আগাছা বাছছি। তুমি নাখোশ হইছ?

কাজি বলে, না।

দাদি আস্তে করে বলে, কাজি তো, দরবারে বসে, মানুষের বিচার করে। কথার বরখেলাপ করতে পারে না।

এই করতে করতে কাজির ভাতের অভাব পড়ে যায়। কী করবে? একদিন চুপে চুপে বোছাকে ডেকে বলে, ভাতের সময় তুই আস্তে করে আমাকে ডাক দিস।

সে মাথা নাড়ে। দুপুরে খাওয়ার সময় হলে বোছা চিৎকার করে বলে, ভাবি তোমাকে জাউ ভাত খাওয়ার জন্য ডাকছে।

কাজি এসে বলে, তোকে না বলেছি আস্তে করে ডাকতে!

বোছা বলে, নাখোশ হইছ?

কাজি মাথা নাড়ে। এক কাজ কর, কাল তোর তালই বাড়িতে বেড়াতে যাব। তুই আগে গিয়ে বলে আসিস। বোছা গেল কাজির শ্বশুরবাড়ি। গিয়ে বলল, তোমাদের জামাই তোমাদের মেয়েকে নিয়ে কাল বেড়াতে আসবে। আমাদের জন্য মুরগি জবাই করিও। জামাইয়ের পেট খারাপ। তার জন্য কলার মোচা রান্না করতে বলেছে।


কিচ্ছা বলার পর দাদি জালালি কবুতর হয়ে উড়ে বেড়াত। আমরা শুধু বাকবাকুম শুনতাম। 


শ্বশুরবাড়ি এসে দেখে পাতে কলার মোচা। কাজি তো অবাক। শ্বশুরবাড়ি, কিছু বলতেও পারছে না। বোছা মাংস দিয়ে আরাম করে খেল। রাতে কিছুক্ষণ পর কাজি বোছাকে ডাকে, অ বোছা, আমার পেট কামড়াচ্ছে। বোছা বলে, এক কাজ করো। সে রান্নাঘর থেকে খালি কলসি এনে দিল। বলে, এটাতে পায়খানা করো। কাজ সেরে কাজি বলে, পানি খরচ করব কোথায়? ঘরের ভেতর টিনের কৌটায় গজ্জমগাছের রস ছিল। রসগুলো আঠা আঠা। বোছা ওগুলো এনে দিল। আঠালো রস লেগে গেল কাজির পাছায়। সে বলে, কাল সকালে কেউ ওঠার আগে কলসিটা নদীতে ফেলে দেবে।

দাদি জানায়, গজ্জমগাছের রস দিয়ে তখনকার মানুষ চেরাগ জ্বালাত। তখন মানুষ অনেক কষ্ট করেছে।

সকালে মাথায় কলসি নিয়ে কাজি যাচ্ছে নদীর দিকে। এদিকে বোছা শ্বশুরবাড়ির সবাইকে বলল, তোমাদের জামাই কলসি নিয়ে নদীতে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। সবাই বলে, এখন কী করা যায়? বোছা বলে, এক কাজ করো, একটা লাঠি নাও, পেছনে গিয়ে কলসিতে জোরে বাড়ি দাও। তাহলে আর আত্মহত্যা করতে পারবে না। যেই বলা সেই কাজ। একজন পেছনে গিয়ে কলসিতে দিল একটা বাড়ি।

শেষ অংশটা দাদি এমনভাবে বলত, দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরেও না হেসে পারতাম না। দাদি বলত, কিস্তে শ্যাষ অইয়ি, গরম ভাত জুরাইয়ি।

কিচ্ছা বলার পর দাদি জালালি কবুতর হয়ে উড়ে বেড়াত। আমরা শুধু বাকবাকুম শুনতাম। দাদি এখন সন্ধ্যার আকাশের সাতটি তারা সাত ভাই সাজুলির এক বোন হয়ে গল্প বলে বেড়াচ্ছে; গল্প দিয়ে সাত ভাইয়ের বন্ধন আরো দৃঢ় করছে। আমার ওই দাদির কাছে যেতে ইচ্ছে করে। তার হাসি ও পান খাওয়া লাল ঠোঁটের মতো ছোটবেলায় চলে যেতে ইচ্ছে করে।

৬ষ্ঠ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)