অন্যজন : ২

অন্যজন : ২
136
0

১ম পর্বের লিংক

পর্ব- ২

২.
মানুষ চাষাকে অসম্মান করে। কিন্তু চাষা হলো রাজা। সে ফসল ফলায়। এ কথা ভেবে হাঁটছিলাম। রিকশার ক্রিং ক্রিং, সারিবদ্ধ লাউ, কাঁচামরিচ, টমেটো, মিষ্টি কুমড়ার চারাগাছ দেখে বাজারে ঢুকি। ফজার কাঁধে কচুর লতির ভার। পুকুরের হাঁইচ্চারায় করা কচুতে এবার ভালো লতি হয়েছে। আর কচু কী, এক্কেবারে ফজার বাহুর মতন।

ফজা ভার রাখে। দেখি বাম্বু চাচা এদিকে আসছেন। কাছে এসে পাওনা টাকার জন্য কথা শোনান। কথায় তো আর পাওনা পরিশোধ হয় না, তাই তার ব্রিটিশ আমলের মনও গলে না। তিনি কচু নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন।

বাম্বুকে মনে হয় কৈ মাছের কাঁটা। সকালের কথা মনে পড়ে। সকালে পুকুরপাড়ে কে যেন বলেছিল, মাছের ঘাইয়ের মতো নড়াচড়া করলে হবে না। এ কথা শুনে বের হয়েছিলাম। উত্তর পুকুরে মাছ ভাসছে। জোহার চাচা গাব কষানো ঘন জাল মেরে চিলের মতো তাকিয়ে আছে।


জীবনের চেয়ে মৃত্যুর পথ সোজা। তোমাদের ভেতর মৃত্যুর পোকা হাঁটছে।


ধানগাছ থেকে কুয়াশা উড়ে সূর্যকে যেভাবে ভেংচি কাটে, সকালটা তেমন। ধলি বক উড়ে যায়, আক্কাছ রিকশা নিয়ে বেরোয়। কাঁঠালপাতার আড়ালে শালিকের কিচিরমিচির। পুকুর কাঁপিয়ে গোসল করে আমার চার নম্বর ভাই ড্রাইভার শফি। গোসল করার সময়ও তার মুখের জটিল রেখাগুলো ফুটে থাকে। আবু খেজুরগাছের ঘাটে মুখ ধুতে আসে। লম্বা বলে রিকশা চালাতে সমস্যা হয়। তাই রিকশা ছেড়ে বাসের হেলপারি করছে, মাইক্রোবাস চালানোও শিখছে। গতকাল কালো ঢোলা প্যান্ট পরে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিল। লালুর দোকানে গেল পঞ্চাশ টাকা ভাংতির জন্য। বেগুন রোপণ করে ছালাম এসেছে বিড়ি কিনতে। তার জুতার দিকে তাকিয়ে হাসি লুকায়।

গত রাতে স্বপ্নে বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। বুড়া ড্রাইভার ধীরে গাড়ি চালাচ্ছে। তাই যাত্রীরা তার মা-বোন তুলে গালি দেয়। তাদের গালিতে ডোবায় মরে উল্টে থাকা ঢোঁড়া সাপের গন্ধ। ড্রাইভার বলে, জীবনের চেয়ে মৃত্যুর পথ সোজা। তোমাদের ভেতর মৃত্যুর পোকা হাঁটছে।

পুকুরে ভেলা নিয়ে মাছ ধরা মুনশি (রাজাকার সেজে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন খবর জানাত), ফরিদ (সাবেক ডাকাত ও মদখোর), মমতাজ (সাবেক চোর, লোহা চুরিতে পিটা খেয়েছিল) এবং জটিল জট পাকানোর বিশেষজ্ঞ বাম্বু পোকাগুলো দেখে না।

বানুর মা চিৎকার করে, মাছের লোভ বড় লোভ। ছাড়তে না পারলে ভেতরে ভুত ঢুকে যায়।

বাম্বু গতকাল শুক্কুরের মাথায় প্যাঁচের পেরেক মেরেছিলেন। তাই পাড়ে বসে সে অনুচ্চ কণ্ঠে ক্ষোভ ঝাড়ে, আমি গোস্ত ছিঁড়ে খাব। শালার পুত শালা, না জানলে কে মাপতে বলেছে?

ঠিক কথা। বাদশা সমর্থন জানায়। আটচল্লিশ ঘণ্টার হরতাল চলছে, তাই চাকরিতে না গিয়ে মাছ ধরা দেখতে এসেছে।
মাঝ পুকুরে বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে মুনশি বলে, শাহ সাহেব মাটি মাপার ওস্তাদ।

এ কথা শুনে শুক্কুরের মনে হয় শিয়াল হুক্কা হুয়া করছে। তার ইচ্ছে করে বাম্বুর হাতে শিং মাছের কাঁটা ফুটিয়ে দিতে। ভাবে, মাছরাঙাটা কোথায় যে পালিয়েছে! বাম্বুর মাথায় লম্বা ঠোঁটটা ঢোকালে একটা-দুটা শয়তান খুঁজে পেত। তখন ঘোলা পানিতে মাছ না ধরে সে মা-বাপকে ডাকত।

মুনশির কথায় বাম্বু গোঁফের ফাঁকে হাসেন। কিছুদিন লিবিয়া ছিলেন। তিনি গাদ্দাফির ভক্ত, তার মতো গোঁফ-দাড়ি রেখেছেন। শ্বশুরবাড়িতে রাখা প্রথম বউকে নিয়ে এসেছেন। ফলে দ্বিতীয় বউয়ের সঙ্গে এখন প্রায় প্রতিদিন ঝগড়া হচ্ছে।বানুর মা আঙুল ও ঠোঁট সমান্তরাল চালায়, যারা মাটি মাপে তারা জটিল মানুষ।

এ কথা শুনে শুক্কুরের মনে পড়ে তার মৃত স্বামীর কথা। মফজলের হাতে সবসময় একটা লাঠি থাকত। মাথায় থাকত বার্মিজ গাঢ় খয়েরি টুপি। টুপিটা পরে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াত। জমিদারি মেজাজ ছিল। তাই তার সঙ্গে সাবধানে কথা বলতে হতো। শুক্কুর মনে মনে বলে, ওরে বাপরে, সে এক ব্রিটিশ।

বানুর মা স্বামীর অনেক গালি খেয়েছে, ওই লাঠির তাড়াও খেয়েছে। মা-ছেলে মিলে লাঠিটা লুকিয়ে রাখত। তখন সে কী আস্ফালন! তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা হাসত। বুড়া তো কবরে গেছে। খাটের নিচে টায়ারের স্যান্ডেল এখনো পড়ে আছে।মাটি মাপার ওস্তাদের কাছে একটা ডোবা হারিয়েছে বানুর মা। এখন কেবল ঘৃণা। মনে পড়ে, স্বামী একবার লাঠি দিয়ে বাম্বুকে মেরেছিল। তার জন্য কেইসও খেতে হয়েছে।

লেজ কাটা শেয়ালের গল্পের মতো এরা মাছ ধরছে। মাছে ঘা এসেছে। খাঁচায় ঘাওয়ালা কাতলা ছটফট করে। মুনশির জালে বোয়াল ধরা পড়ে। উত্তর পাড়ার হারেছ সেটা বাম্বুর ঘরে নিয়ে যায়।

ঘাড়ের কাছে কালো পিঁপড়া হাঁটে। ডলা দিয়ে নাকের কাছে এনে গন্ধ শুঁকি।

বানুর মা চোখ ও মাথা নাচিয়ে বলে, ওই দেখ, বোয়াল মাছের পাখা গজিয়েছে।

বোয়ালের চোখ দেখে মন খারাপ হয়। মসজিদের পুকুরে গোসল করতে যাই। পেপারের হকার বজল চাচাও এসেছেন। আমাকে দেখে হঠাৎ তিনি দাদা-দাদির কথা বলতে শুরু করেন। তার কথার ভেতর অনেক বছর আগের দাদাকে পুবের ঘরে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশে হামাগুড়ি দেয় বাবা। এখন বাবা যে রকম, দাদা ছিল ঠিক তেমন। এ কথা বলে তিনি দাদার দাদা বাকর আলী, তারও দাদা মনুর আলীকে ঘাটে নিয়ে আসেন।

আলাউদ্দিন চাচার গায়ে লুঙ্গির পানি ফেলেছে। সে চলে যাওয়ার পর চাচা তাকে বেয়াদব বলেন। ওরা সায়ের গোষ্ঠী নয়, চুনুত্যে গোষ্ঠী। এ গোষ্ঠীর হলো ফকির বক্স, হামদু মিয়া। সুলতান ডাক্তার এসেছে চাঙের কূল থেকে। কাঞ্চনপুর যেতে পড়ে।

চাচা বলেন, বাম্বুর দাদি ছিলেন কাঞ্চনপুরের জমিদারের মেয়ে। কাঞ্চনপুর থেকে গরুর গাড়িতে করে এখনো ধান আসে। একদিন হাতির খেলা দেখতে তোর দাদি কাঞ্চনপুর গিয়েছিল।

বাবার চাচাত ভাইয়ের ছেলে মুন্না ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন থার্ড ইয়ারে পড়ে। একবার তারা শহরে শহিদ মিনারে পথনাটক করেছিল। নাটকটা দেখেছি।

নাটকে দেখা যায়, জমিদারের উঠানে অনেক চাষা। একজন লাঠিয়াল সেজে জমিদারের পেছনে গিয়ে পাদ দিয়ে সরে পড়ে। জমিদার নাকে হাত দিয়ে ভেতরে চলে যায়। অদূরে হাততালি দিয়ে চাষারা গান ধরে, আমাদের কষ্টগুলো জমিদারের কাছ থেকে পাই/ দূর ছাই দূর ছাই দূর ছাই।

হাতির গলায় ঘণ্টা বাজে। ঘণ্টার শব্দে চাষারা জেগে ওঠে। তারা কান টেনে জমিদারকে উঠানে আনে। প্রশ্ন করে, তুই কোথায় যাবি? জমিদার কাতর কণ্ঠে বলে, ফিরিয়ে দে জমিদারি।

তখন কৃষকেরা গান ধরে : ধান কাটি প্রেমেরও লাগিয়া। জমিদারকে বলে, কাস্তের আগায় তোকে বসতে হবে। জমিদার কাস্তের উপর বসে। তার পাছা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে।

মুন্না ভাই এমন অভিনয় করেছিল—সেই দৃশ্য মনে পড়লে এখনো হাসি পায়।

কচুর লতি বিক্রি করে এসে মাকে বলি, বড় বুবুর শ্বশুরবাড়ি যাব। মা বুবুর জন্য একটা লাউ দেয়। ঝংকার সিনেমা হলের পাশে লাল বুড়ার সঙ্গে দেখা হয়। ছেলেপিলেরা তাকে ডাকে ‘টমেটো’। শুনলেই গালাগালি শুরু করে। কেন, তা কেউ জানে না। আমরা ডাকি ‘বুইয্যে চাচা’। মুখটা বাঁদরের মতো উঁচু করা, নাপিত দাড়ি কামাচ্ছে। আমাকে দেখে বলে, ঝংকার ইসলামর মেজজান খাইও না?


বুবুর চেহারা দেখে ইচ্ছে করে বুড়ির মনে হাল চষে দিই। লাঙলের ধারাল ফলায় ফালা ফালা করে দিই মনের জমিন।


ঝংকার ইসলাম হলেন হলের মালিক। বুড়া নাকি ঝামেলায় যায় না। দুর, আর ন কইও। মানুষ রেশরম হই গেয়ি। মানুষ কত্থুন আইস্যি জান নি? নোয়াহাট, বিবিরহাট থেকে লাইন ধরেছে। ঘরে দুটা ডালে-ভাতে শোকর আলহামদুলিল্লাহ। ছেঁড়া লুঙ্গি দিয়ে বানানো রশি কোমরে বাঁধা। ঠেলাগাড়ি চালাত। কিছুদিন আগেও চালিয়েছে। বয়স এখন আশির উপর। বুবু আমাকে দেখে খুব খুশি হয়। অভুক্ত গরু কুঁড়ার বালতি দেখলে যেমন দৌড় দেয়, তেমন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। বুবু অনেক শুকিয়ে গেছে। তার শাশুড়িকে চোখে পড়ে না। বুড়ি কোনো কাজ করে না, সারা দিন পান চিবায় আর বুবুর সঙ্গে লাগে। বুবুর চেহারা দেখে ইচ্ছে করে বুড়ির মনে হাল চষে দিই। লাঙলের ধারাল ফলায় ফালা ফালা করে দিই মনের জমিন। সেখানে কালাজিরা ধান রোপণ করব। কালাজিরার সুগন্ধে তার মন ভালো হবে। নতুন মনে নতুনভাবে বুড়ি সব দেখবে। বুবুটা শান্তিতে থাকবে।

ছাগলের মতো পান চিবিয়ে বাইরে থেকে এসে বুড়ি জিজ্ঞেস করে, ওয়া ক্যান আছ?

ছোটকালে বেড়াতে গেলে সকালে কলাগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বুবু হাঁস-মুরগিকে আদার খাওয়াত। পাশে সেনিটারি পায়খানার ভেতরে দেখতাম একটা প্যাকেট। প্যাকেটে মেয়েটি বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে লেখা, লোম নাশক…। কথাগুলো মাথায় চিলের মতো চক্কর দিত। একদিন স্বপ্ন দেখলাম, প্যাকেটের জিনিসগুলো নিয়ে বুড়ির মাথায় মাখিয়ে দিয়েছি।

৩.
হে বাঙালি! টাকার বস্তা আছে? আমাকে দেখে মুখ ভেংচে প্রশ্ন করেন পাগলা নানা। তিনি মার চাচা। কিছুদিন পর পর তার পাগলামি ওঠে। শাদা চুল এখন রঙে লাল, গলায় তসবি।

নানাবাড়ির বাজারে ঢোকার মুখেই দেখলাম, নানা নেচে নেচে আকাশ দেখছেন। পুলিশ লম্বা কমলা বাঁশি বাজায়। তারা এক আসামিকে ধরতে এসেছে। নানা পুলিশকে বলেন, পৃথিবীতে মানুষ আসে আসামি হয়ে। আমিও আসামি। আমাকে ধরেন।

পুলিশ হাসে। তিনি আল্লাহকে ডাকেন। কয়েকজন তাকে ভেঙায়। তিনি পায়খানা করে পথে লেপ্টে দেওয়ার ভঙ্গি করেন। ভঙ্গিতে বলেন, তোরা তো পড়বি, পুলিশও আছাড় খেয়ে পড়বে।

এদিকে বাজারের বটগাছের সামনে বেয়ারিঙের চাকা লাগানো পিঁড়িতে বসে আছে মার ছোট ভাই গুরা মিয়া। গত বর্ষায় একটা হোঁচট থেকে ভোগান্তির শুরু। তা ডান পা হরণ করে ক্ষান্ত হয় নি, বাম পায়েও পচন ধরেছে। কয়েকটি স্থানে ধূসর হয়ে যাওয়া ব্যান্ডেজ।

টেক্সির ড্রাইভারটা কাতুকুতু দিলে মামা রেগে যায়। বলে, আঁর বাফর নাম যদি আবদুল খালেক অয়, তুর মাথা চিবি খাইয়ুম। আঁই বেরাজ্যে ন, বেরাজ্যে অইলি রাস্তাত থাইকতেম।

সবাই হো হো করে হাসে। অদূরে যাযাবরদের খুপড়ি। এক লোক নেংটা ছেলেকে নিয়ে রাস্তার পাশে জলাশয়ে গোসল করতে যাচ্ছে।

আমাকে দেখে মামার রাগ পড়ে যায়। তার হাসি প্রসারিত হয়। মামা রিকশার সিটে সঙের মতো দলামোচড়া হয়ে বসে। পাশে আমি বসি। তার আঙুলের ফাঁকে বিড়ি পোড়ে। কিছুদিন আগেও কত সুন্দর জিলাপি ও রসগোল্লা বানাত!

ঘণ্টাখানেক পরেই চলে আসি। আসার সময় ভাবি, মা মামাকে নিয়ে ডাক্তারে-হাসপাতালে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছে। মাসখানেক আগে এসেছিল আমাদের বাড়িতে। তাকে দেখে মার খুব মন খারাপ হয়েছিল। সেদিন বাতে তার হাঁটু কামড়াচ্ছিল। মেজাজ ছিল খিটখিটে। দুর্ভাগ্যকে গালি দেয়, অভিশাপ দেয় ওই হোঁচটকে।

রাতে পাশের ঘরে মামা খসখস করে দাদ চুলকায় আর শণের ফাঁক দিয়ে এক কণা আকাশ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে মা। আমি ঘুমের চেয়েও বেশি সুখ প্রত্যাশা করি। ভাবি, গতকাল দুপুরে পুকুরঘাটে কেউ ছিল না। খালেদা একা বসেছিল। তাকে চুমু খেলে বেশ হতো। এক মন ভাবল, তার চোখে সম্ভবত প্রশ্রয়ের হাসি ছিল। সুযোগ হারালাম। আরেক মন ভাবে, ঠিক কাজই করেছি। চুমু খেলে সে যদি বলে দিত! মান-ইজ্জত সব যেত।

উত্তেজিত মন অলস হয়ে একা একা হাঁটে। ধানখেতের উপরে এক ঝাঁক টিয়ে ডাকে। মনের দরজা খুললে দেখি ঘন অন্ধকার। অন্ধকারের পাশে ছোট বোন ফাতেমা দাঁড়িয়ে আছে। সে এখন কেবল মরে যাওয়ার কথা বলে। তার গ্যাস্ট্রিক বেড়ে গেছে। বমি করে ঘর ভাসায়। মা ও ভাবিকে বলে, আমি মরে যাব, মরলে আমার ত্রিপিসটা কাফনের সাথে দিয়ে দিও।

তারা ওর হাবভাব বুঝতে পারে না। কারো সঙ্গে প্রেম করে সে কি ধোঁকা খেয়েছে! নাকি কেউ তার সঙ্গে খারাপ কিছু করেছে!

মৃত্যুর কথা থেকে মুক্তিযুদ্ধের কথা ওঠে। এ সময় বড় চাচি একাত্তরের গাটরি খোলে। চাচির দেশের বাড়ি যশোর। দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে থাকায় তার ভাষাটা হয়ে গেছে অদ্ভুত। বলে, যুদ্ধের সোময় সব জ্বালাইয়া দেচ্ছিল। পাকা বাড়িতে পেট্টল ঢালি দেয়। আমরা পলায় ইন্ডিয়া যাচ্ছিলাম। আরে মানুষের ঢল! দ্যাশডা য্যান বিরান হইতাছে। বাপজান নড়বে না কোনোমতেই। কয়, বাপের ভিটাত আছি। তোরা পরাণ বাঁচায় আয়। পাঞ্জাবি তানেরে মারব না। মাথায় টুপি, সামনে আল্লার কালাম। পাঞ্জাবিরা টো টো করি আইলো। কয়, তুম কন হ? বাপ কয়, আমি আলী, মুসলমান।

না, কোনো মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। খান সেনারা চলে যাবে, এ সময় রাজাকার ইশারা করে। কোরানে রক্তের ফোঁটা পড়ে। একজন ভালো বাঙালির মৃত্যু হয় টিক্কা কিংবা ইয়াহিয়ার মদের ঘোরে।

মার বিষণ্ন মন শরণার্থী হয়ে হাঁটে। চাচির বাবার জন্য খুবই কষ্ট হয়।

ঘণ্টাখানেক পরের কথা। আমি তখন শুয়ে আছি। ভাবছি খালেদার কথা। বড় চাচি তাদের ঘর থেকে বলে, শহরে নাকি গণ্ডগোল হচ্ছে!

সামরিক সরকারের অত্যাচারে মানুষ শান্তিতে নাই। তারা নিজেদের মতো বাঁচতে চায়, তাই আন্দোলন করছে। সারা দেশে তীব্র আন্দোলন হচ্ছে।

মা মাঝের কক্ষে মসল্লায় বসে তসবি পড়ছে। তার বুক কেঁপে ওঠে। বোনেরা কাল যেতে মানা করে। বলে, বিষ্যুদবার তো একটুখানি দিন, শুক্রবারে যেও।


ঝুপ্পুর করে ফেদা পুকুরে নামি। নানি বলেছিল, এই পুকুরের নিচে সাতটি পুকুর আছে। সাত পুকুরে সাঁতার কাটি।


কাল শহরে যাব, তাই তারা উদ্বিগ্ন। হয়তো চাকরির কথা বলতে চাইছি, বোনেরা হেসে গত রাতের স্বপ্নটাকে গাড়িতে চড়ায়। আমি নাকি বাণিজ্য করতে দূর সমুদ্র পাড়ি দিয়েছি। এ খবরে বাবা-মা দুজনেই নাখোশ। এতদিনেও তাদের পুত হালচাষ বুঝতে পারল না। বাবা ঘরময় হাঁটে। মা তখন মোনাজাত ধরেছে। খোদাকে বলছে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিতে।

বিকালে ঘাটায় যাই। সামনে কবরস্থান, এরপর পুকুর, পুকুরের পর স্কুলের মাঠ। মাঠে ছেলেরা গোল্লাছুট খেলছে। ঘুষখোর নূর মিয়ার বউ নোয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। রিকশার মাইকে ওয়াজের ক্যাসেট বাজে।

মাঠের পাশে বিশাল দুটি অশ্বত্থগাছ। অশ্বত্থের পাতায় বাতাসের ঢেউ। মনে হয়, চোখ বন্ধ করলেই ধরতে পারব সুখ ও সমৃদ্ধি; যা মাঝে মাঝে দেখতে পাই মার হাসিতে।

ডোবা থেকে পচা সাপের গন্ধ আসছে। ধানখেত পেরিয়ে শিমগাছের ফাঁকে দেখি, দরজায় হেলান দিয়ে বউটি বিকালের আলোর মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা শিমফুলের মতো।

ঘাটায় বসে মরা বাঁশ কাটি। আমার হাতে দা, ফজার হাতে বাঁশ। দা-র কোপে বাঁশের ভেতর থেকে একটা উড়কো বাহা বা সুতানালি সাপ বেরিয়ে কানের পাশ দিয়ে উড়ে কোথায় গেল কেউ টের পেলাম না। দুজন মৃত্যুর কত কাছ থেকে ফিরে এলাম তা নিয়ে সবাই কথা বলছে।

সেই আলোচনার ফাঁক দিয়ে সরে মনে মনে খালেদাদের ঘরে যাই। তার বাপ রিকশাওয়ালা। ঘরে একগাদা মেয়ে। ভাবি, রাত গভীর হলে খালেদার গায়ে হাত রাখব।

রাত বাড়ার সাথে সাথে ভাবনা পাল্টে যায়। কেননা ফাতেমার কথা মনে পড়ল। সে শহরে বাম্বুর ছোট ভাইয়ের বাসায় কাজ করে। এবার বাড়ি আসার পর থেকে বলছে, আর যাবে না।

বিকালে বাবা জমিতে যেতে বলেছিল। যাই নি বলে রাতে ভাত খাওয়ার সময় মা বেতের আগার লিল্লা কাঁটা নিয়ে তাড়া করে। কেননা মাটি থেকে আলগা থাকা তার কাছে মরে থাকার সমান।

শোয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে দেখি, বিশাল একটা মাঠ। বাম্বুর ছোট ভাই সেই মাঠের ঘাস। ঘাস বলল, তোর ছোট বোন হারিয়ে গেছে।

হারিকেন নিয়ে তাকে খুঁজতে বেরোই। গরুর চামড়ায় লবণ মেখে রাখা ঘরটির পাশে বাম্বুর সঙ্গে ধাক্কা খাই। হারিকেনের চিমনি ভেঙে যায়।

যুদ্ধের সময় টিলায় নাকি মানুষের কান্না শোনা যেত। সেই থেকে লোকে বলে কাঁদারা টিলা। টিলার ওপাশে মেথরটির কুঁড়েঘর। টিলার পায়ের কাছে শুয়োরটি চড়ছে। মেথরের কাছ থেকে লাঠি নিয়ে আমাকে মারতে শুরু করেন বাম্বু। কেঁদে কেঁদে তাদের পুরনো দালানের বড় উঠানে ধান মাড়াতে যাই। গুরা মামাকে ডাকি। তাকে বাম্বুর কথা বলব। শুনে মামা মুখে আগুন ফোটায়। আগুন দিয়ে বাম্বুর মাথায় বাত্তি জ্বালাই। বাত্তির আলোয় পৌঁছে যাই নানাবাড়ি। ঝুপ্পুর করে ফেদা পুকুরে নামি। নানি বলেছিল, এই পুকুরের নিচে সাতটি পুকুর আছে। সাত পুকুরে সাঁতার কাটি।

৩য় পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)