হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ২৪

অন্যজন : ২৪

অন্যজন : ২৪
107
0

২৩ পর্বের লিংক


পর্ব- ২৪

৪৩.
কন্ট্রাক্টর চাচা হলো আষাঢ়ে গল্পের মতো। চাষাঢ়ে বাবার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। গল্প বলার সময় চাচা হয়ে যায় অন্য মানুষ। তার ভাষা, ভঙ্গি সব পাল্টে যায়। যেভাবে লঞ্চ বা স্টিমারের ভেঁপু বাজে, চাচা সেভাবে কথা বলে।

দুই পাড়ার পনেরো-ষোলোটা কুকুর দুদিক থেকে দৌড়ে আসে। একেবারে মানুষের মতো ঝগড়া করছে। এবার এদিকে ধানচাষ হয় নি। আগে হালদায় পাম্প মেশিন বসানো হতো। এ সময়ে সবুজে ভরা থাকত এখানকার খেত। এখন মাঠজুড়ে শূন্যতা। শূন্যতার মাঝে কয়েকটা পেলন ও খিরা খেত। পেলন খেতে আগাছা জন্মেছে। তাতে আবার বেগুনি ফুল। বিকালের রোদের সাথে মিলে ফুলেরা সিঁড়ি তৈরি করে।

সিঁড়িতে পা রেখে চাচা বলে, ফসল তো অনেক হয়, হারামজাদারা কি তোর আর আমার পেটে ঢুইকতে দিবু? চোখ মেললে দেখবি চারপাশে ডাকাইত। একমুঠ ভাত খাওয়ার জন্য কত কী! এ কথা বলে দার্শনিক হয়।

মুন্না ভাই থাকলে বলত, সামন্ত ও পুঁজির প্রভুরা পুরোপুরি মারে না, একটু মারে একটু বাঁচায়।

চাচা বলে, অ্যাকটা গল্প শোন; কন্যার বর সাজছে এক পুরুষ। কন্যার ছোট ছোট ভাই-বোনেরা গম্ভীর স্বরে কয়, চারজন জীব/ সাতাশখান কান/ শোলক ভাঙাই পিঠা খান/ বইনেরে নিয়া যান। তখন চতুর হেসে বর কয়, পুকুরের মধ্যে লগির গুতা/ পর্দার কাপড়ে কয়টা সুতা? এ জিজ্ঞাসায় ভাই-বোনেরা একটুও না ঘাবড়ায় ঝটপট কয়, চালনে করে আনেন পানি/ তারপরে কয়ে দিব আপনের সুতার মানি।

না, চালনে করে পানি আনে না, বরং গোপালভাঁড় সেজে পরদিন দলবল নিয়ে হাজির হয়। কন্যার চোখ জলভরা। তার এত তাড়াতাড়ি মরতে ইচ্ছা করে না। কোমরে আঁচল বাঁধে। এখন সে পণ্ডিত কালিদাসের কন্যা। পুকুরঘাটে যায় বাসন ধুতে। বর জিজ্ঞেস করে, পণ্ডিত কোনে?

বাবা গ্যাছে এ্যাকদিনর মরা খাইয়া সাতদিনর মরা জিয়াইতে।

মা কোনে?

তোমরা যেগুলান ভয় পাই দৌড়াইছ সেগুলান বাঁধি আনতি গ্যাছে।


বাবার লাঙলে যেন বাঁশি বাজছে। বাঁশি শুনে লোকজন এক হয়। 


একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টিতে তারা দৌড়ে চালার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল। ভাবে, বাবারে বাবা কি কয় এতা? মেয়ের কথার ধার না বুঝে তারা ভাবে, কালিদাসের মেয়ে এমন, না জানি কত বুদ্ধির খনি কালিদাস। কালিদাসরে খোঁজনের কাম নাই।

সেই মেয়ে যেন আমাদের মা। দেখি, মার চেহারা কুয়াশা হয়ে গেছে। আমিও কুয়াশা হয়ে যাই। মঈনের মতো আমাকে জিনে পায়। দুপুরে তেঁতুলতলে ঝিমায় আমার মন।

দাদি একবার একটা কিচ্ছা বলেছিল, ধরি উপুড়, করি চিত/ ভিতরে গেলে মন পিরিত। পিরিতের কিচ্ছা ভাঙতে আমাদের একদিন লেগেছিল। ভাতের গ্রাস ধরে যেভাবে মুখে দিই, সে রকম চিন্তা নিয়ে হাঁটি। নদীর পাড়ে গরু জবাইয়ের স্থানে শুকনা রক্তের গন্ধ। এ সময় জোরে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির সাথে মার স্বপ্নও নেমে আসে। বৃষ্টির গান শুনে তার সন্তানেরা খেতে যায়। শক্ত হাতে হাল চষে বোরো ধানের জমি তৈরি করে, বীজতলায় গিয়ে চারার অবস্থা দেখে।

ভেজা মাটি ও ধানচারার গন্ধে বাতাসে স্বপ্নের ছড়াছড়ি; তাতে সোনালি ধানে ভরে যায় গাছ। পাকা ধানের গন্ধে ভরপুর মা ঢেঁকিছাঁটা মোটা চালের ভাত রাঁধে দু’পা চুলায়। তার ছেলেমেয়েরা পুঁই শাক ও করলা দিয়ে গরম গরম ভাত খায়। মা বলে, পেড পুরাই খা, খায় খায় শকতি গর।

মা শক্তির কথা বলায় শফি ভাইয়ের দিকে তাকাই। তার মুখের দুপাশ চুপসে গেছে। চাইলে কেউ ওখানে পিঁপড়ার ঘর বানাতে পারে। গাড়ি চালানোর সময় মাঝে মাঝে তাকে মরা লোকের মতো দেখায়। মৃত্যু তার মধ্যে শাল পরে বাম্বুর মতো বসে আছে। মদ ও সিগারেট খেয়ে শরীর শেষ করে ফেলেছে। গাড়ি চালানোর সময় মাঝে মাঝে ভাবে, ব্রেক করব না। গাড়ি যেদিকে যাবে চলে যাক। হয়তো কাপ্তাইয়ের রাস্তা থেকে কর্ণফুলীতে পড়ে যাবে আর নদীর তলে মৃত্যুর ঘর বানাবে।

রূপকথার এক চক্ষু দানবকে পরাজিত করছে—তার চোখে-মুখে এমন ভাব। মতি ঠিক থাকলে সে খুব গতিতে থাকে, ঢকঢক করে বাংলা মদ খাওয়ার আনন্দ হয় তখন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখলে চাচি নাক কুঁচকে সুর করে বলে, মুরগির গু খেয়ে এসেছিস?

মুখ খুললেই গন্ধ বের হবে, তাই শফি কথা বলে না। মুখ বাঁকা করে একটু হাসে। তারপর চোরের মতো ঘরে ঢোকে।

শুয়ে পড়লেই সে বাদশা। কেয়ামতের শিঙায় ফুঁ দেওয়া ভাব। ভাবের মধ্যে ঘোড়ায় চড়ে ভিনদেশি সৈন্য আসে। তাদের চোখ-মুখে গাড়ির হেডলাইটের আলো। সৈন্যদের আসতে দেখে লোকজন হাছন রাজার গান গেয়ে কেঁদে কেঁদে পালায়। গরমে কাহিল হয়ে তারা সিনেমা হলের সামনে মরিচ-লবণ মাখা কাঁচা আম কিনে খায়।

তখন বাবা লাঙল কাঁধে নিয়ে এক লাফে সুখী সমৃদ্ধ বাংলায় চলে আসে। চাষ করে শোষণের সব জমি সমান করে দেবে। গাইবে : লাঙল চালাতে ভালো/ শৌর্যে বীর্যে বাঁচতে ভালো।

বাবার লাঙলে যেন বাঁশি বাজছে। বাঁশি শুনে লোকজন এক হয়। তখন শফির ঘুম ভেঙে যায়। সে ফাইভ স্টার সিগারেট জ্বালিয়ে লম্বা টান দেয়।

খাটের ডান পাশে বেড়া একটু ভাঙা। সেখানে সিনেমার পোস্টার লাগানো হয়েছে। পোস্টারে নায়কের হাতে রক্তাক্ত কিরিচ। তার এক গ্লাস খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ঘরে খাওয়া সম্ভব নয়। টের পেলে বাবা দা নিয়ে তাড়া করবে।

নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গেলে রক্তাক্ত কিরিচের মতো সরু পথ দেখে। জিন্দেগি ভর যেন বিপজ্জনক পথেই হাঁটতে হবে। এ চিন্তা মন বিষিয়ে তোলে। বাতাসে বিষের ঘ্রাণ। হাড় জিরজিরে খালি গায়ে বসেই আছে। বুকে চিনচিন ব্যথা হয়।

ব্যথা ভুলতে মনে মনে গাড়ি স্টার্ট দেয়। যাত্রীরা কার আগে কে পারে গুঁতাগুঁতি করে ওঠে। সে হর্ন দিয়ে গাড়ি জোরে টান দেয়। যাত্রীরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে—দেখা যায় সামনে মিছিল। গাড়ি থেমে যায়। এ সময় তার খুব ঘুম পায়।

গাড়ির শেষ মাথায় বসা বুড়া র‌্যাট কিলার নিয়ে কথা বলছে। কেননা ইঁদুরের উৎপাত খুব বেড়ে গেছে। বুড়া বলে, মানুষের গায়ে এখন মরা ইঁদুরের গন্ধ পাই।

যাত্রীরা তখন গন্ধ শোঁকে। বুড়া সুর করে বলে, ও মন কোথায় যাবি বল। মনে অনেক যন্ত্রণা, এ রকম কণ্ঠে বলে, ভরা কলস ফালাইয়া মানুষ কী করবে?

লোকজন তার ঝোলার ভেতর উঁকি দিতে চায়। ড্রাইভারের পাশে বসা শ্রীদুর্গা ঔষধালয়ের কর্মচারী জিজ্ঞেস করে, য়িতেরে মহাশক্তি ওষুধ

খাওয়াই দিলি টিক অই যাইবু।

একটু পর আরেকজন বলে, বাঁআলির অষুদ অইলু ডাণ্ডা ডাণ্ডা ছাড়া তারে ঠান্ডা গরন যাইতু নু।

পুলিশ রঙের পোশাক পরা দারোয়ান কালাম বলে, আয়ুব খান বউত ভালা আছিল। কেউ রা কইরতে পারছে নি? মোরগা পরযন্ত বাগ দিতে ভয় পাইছে। এগুলান সরকার নি?

রাজমিস্ত্রি গালি দিয়ে বলে, আয়ুব খান এত ভালা আছিলু কঁত্তে?

এরপর গাড়িটা কালামের বাড়ি হয়ে যায়। সদর থেকে আনা দলিলটা নিয়ে সে গভীর রাতে চুপি চুপি বাপের ঘরে যায়। বাপের ডান হাতের সামনে বসে বুড়া আঙুলটা ভালোভাবে দেখে, কালির বাক্স খুলে কয়েকটা টিপসই নিয়ে নেয়। আপন বোন ও সৎ ভাই-বোনদের সব অংশ এখন তার। যেন সে নতুন আইউব খান।


আমি ভাবের কারিগর। আসছি বৃষ্টির দেশ থেকে। ঘুম আসা-যাওয়ার ফাঁকে-ফুঁকে গায়েবি বাতাস আমারে বলেছে, এহানে তোর সোময় শ্যাষ


তখন কন্ট্রাক্টর চাচা বলে, তোমার আইউব খানরে পোঁদের তলে রাই দ। চাই কওছে, মনে করো তোমার কাছে এ্যাকডা লোক আইছে লাউ কিননের লাইগা, নাপিত আইছে চুল কাডনের লাইগা, মা ডাকে ভাত খাইবার লাইগা। এহন এ্যাক কথায় তিনু কথার জওয়াব দাও।

চাচার কথায় কালাম চিন্তায় পড়ে। মনে মনে বলে, ওই এ্যাকডা আস্ত জানুয়ার। হেতে মানুষ নি? এ্যাকদিন কইরলে বারোদিন গোসলের খবর থাহে না। পাপী শয়তান। দোজখের আগুন জিব বাইর কইরা আছে, খাইব তারে।

শফি দেখে, অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। সে একটা জাল নিয়ে বিলে যায়। কোথাও পানি নাই। লোকজন কাঁধে জাল নিয়ে মাছের জন্য হা-পিত্যেশ করছে। কেউ কেউ উদবাত্তি জ্বালায়। ঢোঁড়া সাপ ব্যাঙ ধরেছে। ব্যাঙে কুঁ কিঁ করে। বলে, আল্লাহ তুমি বড় নিষ্ঠুর। সাপে খুশি হয়ে চোখ মিটমিট করে, তোমার দুনিয়ায় বহু নিয়ামত।

বৃষ্টি পড়া থেমে গেছে। আকাশে হাজার হাজার বাদুড় উড়ছে। কলা বাদুড় ঠ্যাং উপরে দিয়ে রাস্তার গাবগাছে ঝুলে আছে। সে জালটা বসিয়ে দেয়। বাদুড় ধরা পড়বে। সন্ধ্যা হলে সেও বাদুড়ের সাথে উড়বে।

এ সময় গাবগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে এক যাত্রী গালি দেয়। শফি ভাবে, এসব মানুষ হাতি লাদানো ঘোড়া পাদানো ছাড়া কিছুই করতে পারবে না।

একটু মদ পেলে হয়তো রাগটা হজম করে ফেলত। এখন মদ কোথায়? অক্ষমতায় গজগজ করে। হাঁটতে হাঁটতে বুদ্ধি বের হবে, পাবে তেজি তামাটে ঘোড়াটা। পাহাড়ি নদীর স্রোতের মতো ঘোড়াটাকে ডাকবে।

সে ডাকে আর ঘোড়াটা মুখ বাঁকিয়ে তাকে দেখে। সে এগোয়, জীর্ণ মগজ ও শীর্ণ শরীর পাল্টে নতুন সাজে দক্ষ তিরন্দাজ হয়ে ঘোড়ায় ওঠে। বহু সাহসী বাঙালকে স্মরণ করে জোরে ঘোড়া ছোটায়। এ রাস্তা, সে রাস্তায় ছোটে। কোথাও কোনো শত্রু দেখে না।

যাত্রীদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। তিরন্দাজ চিৎকার করে সবাইকে লাইন ধরায়। তবু তারা পায়রা হয়ে বাকবাকুম করে। যেন পালকিতে বসা নতুন বউ, লাজ ভাঙতে সময় লাগবে। যুদ্ধে যদি লজ্জার ব্যবহার থাকত—এ রকম ভেবে পরিত্রাণ পেতে চায়।

হেডস্যারের মতো কড়া মেজাজে তিরন্দাজ সবাইকে ধমক দেয়। তাদের মনে লুকিয়ে থাকা ঘোড়ায় চড়িয়ে তির চালানো শেখায়।

র‌্যাট কিলারের গল্প করা বুড়া ঝোলায় কী যেন খোঁজে। মাজারে মাজারে ঘোরা জটাধারী বুড়া গায়, মাইজভান্ডারী বাবাজান/ বানাইল নতুন এ্যাক নভুযান/ এ্যাক রকেটের তিন গতি/ জোর-জোরাইয়া চলেরে বাবা/ জোর-জোরাইয়া চলে।

বুড়াটা বলে, বাবা, আমি ভাবের কারিগর। আসছি বৃষ্টির দেশ থেকে। ঘুম আসা-যাওয়ার ফাঁকে-ফুঁকে গায়েবি বাতাস আমারে বলেছে, এহানে তোর সোময় শ্যাষ। বাইর হইয়া পড়। বাইর হইয়া পড়লাম। এক বছরতক বাইরে। আমার কিবা আইসা যায়। পথে পথে ঘুরন, আহা! বাবার লীলাখেলা বোঝন বড় ভার। এইবার চলছি বাবার দরবারে। বাবা আমারে ডাক দিছে। আ! মনরে চল বাবার ভাণ্ডারে।

শফি আরো কত স্বপ্ন দেখে! সকালে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে পানিতে নিজের চেহারা দেখে ভাবে, সব স্বপ্ন একত্র করলে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত লম্বা হবে। এখান থেকে খাগড়াছড়ি প্রায় আশি কিলোমিটার।

৪৪.
সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে। মা থালায় কুঁড়া নিয়ে নাড়াচাড়া করে আর তৈ তৈ ডাকে।

হাঁসের ডাক শুনে শফি ভাই আমার দিকে তাকায়। বাম্বু আমাদের এক হাত জায়গা দখল করে ঘরের দেয়াল দিয়েছেন। মা সেদিকে তাকিয়ে গজগজ করে, য়িতে কিয়ামতর দেয়াল বানাইয়ি।

এ সময় শফি বলে, দেয়ালটা ভেঙে দিলেই তো হয়।

যা মরার ছা। মা শফিকে ঝাড়ি মারে।

শফি নাসিরুদ্দীন হোজ্জার মতো মুখ নাড়ে। এক সপ্তাহ ধরে গাড়ি চালাচ্ছে না। কন্ট্রাক্টর চাচা যেভাবে গা ডলে চুটকি পিঠা সাইজের কালো ময়লা বের করে কিংবা চোখ বুজে ঘামাচি চুলকায়, সে মনে হয় ওই রকম আরামে আছে।

চাচার কাছ থেকে পান নিয়ে মুখে দেয়। মা না দেখে মতো আস্তে করে বাম্বুর কেয়ারটেকার কালামের রুমে যায়। মুখে চুন লেগে আছে। নিজেকে গালি দিয়ে বলে, তখন ঠাহর পাই নি, দুনিয়ার সব সুযোগ হারিয়ে ফেলেছি। জিয়াউল হক বাজান আমার গাড়িতে কত চড়েছে!

ওই সময় সে জিপ চালাত। একদিন কী হয়েছে শোনা যাক : তার গাড়িতে বাজান চড়েছেন। বলেন, এ্যাই চালা। সে চালাতে শুরু করে। কোথায় যাবে তা বাজান বলবেন না। সামনে যে রাস্তা পড়ে চালিয়ে যেতে হবে। চালাতে চালাতে সামনে পড়ে হাঁটু পানির খাল। তখন গনগনে দুপুর। ঘেমে সে বলে, বাজান গারি ত আর যায়তু নু।

বাজান বলেন, চালা।

বাজান মরি যাইয়ুম।

চালা।

মরলে মরবে, বাঁচলে বাঁচবে—এ সংকল্পে চোখ-মুখ বন্ধ করে সে চার নম্বরে লাগায়। খাড়া পাড়ে উঠতে গিয়ে চিদ্দির-মিদ্দির খেয়ে উল্টে পানিতে পড়ে যাচ্ছে গাড়ি—এমন আশঙ্কায় আল্লাহর নাম নিয়ে চালিয়ে দেয়। দেখে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওই পাড়ে ওঠে গেছে। তারপর বাজান নারায়ণহাটে মিষ্টির দোকানে মিষ্টির অর্ডার দেন, সবাইকে খাওয়ান। একবার তো লাঠি নিয়ে তাড়া করেছিলেন।


বাংলাদেশের সেরা মানুষ বলো কে তুমি?/ রাজা বলে আমি/ রানি বলে আমি/ মন্ত্রী বলে আমি/ চোর বলে আমি/ আমি আমি আমি…


ভাগ্যকে গালি দেয় শফি। কিছু ধরে নিতে পারল না। এখন একটু পেটে ঢোকাতে পারলে আফসোস তুলার রাস্তা হয়ে যেত। সেই রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে সে পৌঁছে যেত সুখ-সমৃদ্ধির দেশে। তাহলে বাম্বু হারামজাদা ডিস্টার্ব করতে পারত না।

মায়ের কাছে কতবার প্রতিজ্ঞা করেছে, মদ ছোঁবে না। এখন সে মদ না ছোঁয়া এক ড্রাইভার। তার মন বাদল দিনের গাছভর্তি কদম ফুল। সুখের দেশে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য হর্ন বাজাচ্ছে। সেখানে পৌঁছে স্বপ্নের বীজ লাগাবে।

একবার মনা ভাইয়ের কাছে কুষ্টিয়ার এক লোক এসেছিল। শফির সঙ্গে গপ জুড়ে দেয়। বলেছিল, সুবর্ণবৃক্ষের ফল খেলে যৌবন বাড়ে। তোকে খাওয়াতে হবে। এমন শক্তি হবে, চাষে নেমে পড়বি। কেউ রুখতে পারবে না।

পান মুখে দিয়ে লোকটা বলেছিল, আমরা হইলাম ভ্যাঁ করে কেঁদে দেওয়ার জাত, তোদের নাথপাড়ার শিয়ালের মতো চিৎকার জুড়ে দেওয়ার জাত।

কথাগুলো কি সফির মনে পড়ে! তার নীরবতায় হেলপার রুবেল গান ধরে, বাংলাদেশের সেরা মানুষ বলো কে তুমি?/ রাজা বলে আমি/ রানি বলে আমি/ মন্ত্রী বলে আমি/ চোর বলে আমি/ আমি আমি আমি…

শফি জিজ্ঞেস করে, এই গান কোথায় শুনলি?

রুবেল শার্ট নেড়ে বলে, গান আমাদের কলারের ভিত্রে থাকে। তারপর গায়, ধান বালি লুল্লুরি/ তারে খালি ধরি।

উঠানে তারেক ছড়া কাটে, সাগর কেলা বাঘর দুধ/ খাইত ন পারলি আঁর দুষ।

রুবেল তাকে ভেংচি কাটে।


২৫ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)