হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ২৩

অন্যজন : ২৩

অন্যজন : ২৩
65
0

২২ পর্বের লিংক


পর্ব- ২৩

৪১.
লোকে বলে, বাম্বুটা হলো পেট ঢলঢলে একটা পাঙ্গাশ মাছ। যেমন চর্বিময়, তেমন নরম; ধাক্কা দিলেই পড়ে যাবে। ওর মনে গোবর দিতে হবে। হাল চষে ধান রোপণ করলে ভালো ফলনও হবে। কিন্তু তাদের তা মাথায় আসে না। তারা টেলিভিশনে সিনেমা দেখে।

দীর্ঘ শীত আর ধুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকে পাতার সৌন্দর্য। তাদের জীবনও তেমন। বসন্তে নতুন পাতা ফোটার মতো একটু শান্তি এলে বাম্বু তা নিয়ে যান। যেন তারা জিয়লগাছে জন্মানো ছোট্ট অশ্বত্থ চারা। তিনি দা হাতে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকেন।

মা প্রায় বলে, বাম্বুর রাজমোহনী আছে। সামনে এলে সবাই বোবা হয়ে যায়। আগে চোরা লাইন জ্বালাত। তারপর পল্লী বিদ্যুৎ এল। তখনো মিটার নেয় নি। কিছুদিন অবৈধভাবে জ্বালিয়েছিল। বিদ্যুৎ বিলের জন্য পুলিশ পর্যন্ত এসেছিল। ওর কি শরম আছে! বিল্ডিং বানিয়েছে, মরা বানিয়েছে। গ্রিলওয়ালা নাকি দেড় লাখ টাকা পাবে। এসে অনেক কান্নাকাটি করেছে। সামনে কিছু বলে না। জি হুজুর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।

বিকালের আড্ডায় ছালাম বলে, ও তো ধানের শীষ। ইউনিয়ন কমিটির একটা পদে ছিল।

গ্যারেজের টুলে পা তুলে বসেছে। বলে, আগে রাজনীতি ছিল গরুর গাড়ি। দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি মায়া-দয়া থাকত। এখন টেক্সি হয়ে গেছে। অনেক ড্রাইভার ভালো করে চালাতে জানে না, খালি অ্যাক্সিডেন্ট করে।

বাম্বু কেনকেইট্টে। মানে গোঁয়ার। এ কথা জানিয়ে ছালাম বলে, মাইনষি কয়, বাম্বু লাশারা।

নেতা সেজে তাই দুনিয়ার প্যাঁচ পাকান। সেই প্যাঁচে কতজনের পায়খানা-পেশাব এক হয়েছে! ধানে চিটা আছে, চিটার মতো তার মন।

মা বলত, গুয়ে ভনভন করা মাছির মতো ওর মন। ওর চেহারা, মুখ ভেংচিয়ে কথা বলা দেখে পেছনের টাট্টিখানার গুয়ের কথা মনে পড়ত। তাই দূরে দূরে থাকতাম।

সন্ধ্যার পর ঘরে এসে দেখি বাম্বুর বউ ও বড় চাচি ঝগড়ায় ব্যস্ত। তারা একে অপরের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছে।

মা সামনের রুমে বসে শুনছিল। য়িতির (ওর) মা য়িতির বাপরে বিষ খাওয়ায় মাইরতু চাইয়ি। এ কথা বলে বাম্বুর বউয়ের ঝগড়া ও অতীতে ঘৃণাভরে থুতু দেয়।


মানুষের মন নাকি কচুপাতার পানি। আমি জানি, কখনো তা শতবর্ষী বটের গোড়ার চেয়েও শক্ত।


ঝগড়া থেকে কান বাঁচাতে ফজা মনা ভাইয়ের ছেলে তারেককে প্রশ্ন করে, কিস্তে মিস্তে তুর বারি কডে? তারপর মুচকি হেসে বলে, দুই অক্ষরের নাম যার শুনে ভয়ে কাঁপি, প্রথম অক্ষরে আ-কার দিলে সবাই তা খাই, দ্বিতীয় অক্ষরে আ-কার দিলে সবাই তা পরি, শেষে যদি ই বসাই সকলে আদর করি।

মায়ের ছোটকালের স্মৃতি মনে পড়ে। মামাত ভাই-বোনেরা কিচ্ছার আসর বসাত। কত শত কিচ্ছা, রূপকথা আর রাক্ষসের গল্প, তার কি হিশাব আছে! মনে মনে বলে, তোদের প্রথমে জমের গল্প বলব। জম বা যমঘরের ভয়ে কাঁপিস না। ভিতু হলে মারব।

মার মুখ দেখে আমরাও শক্ত হয়ে বসি। বাইরে মৃদু বাতাস। মা বলে, বড় জামগাছে উঠে পাকা জাম পেড়ে আন। লবণ-মরিচ দিয়ে ঝাঁকিয়ে খাব। তারপর জমি থেকে এসে গোসল করবি। বাংলা সাবানে ভালো করে ধোয়া জামা পরে স্কুলে যাবি, পড়ালেখা করবি। বিকালে পুবপাড়ায় গিয়ে যৌতুকবিহীন বিয়ের জামাইকে দেখে আসবি।

ভাবি বলে, ঘরের ভেতর বানর নাচে/ না না করলে আরো নাচে।

ফজা বলে, বাইল পাতা। চোখের পাতায় যে চুল থাকে, তা হলো বাইল পাতা। চোখ বন্ধ করে আর খুলে সবাই পাতার নাচ পরীক্ষা করে।

ভাবি বলে, এই দেখি এই নাই/ তারা বনত বাঘ নাই।

তারেক মুচকি হেসে বলে, বিজলি।

তোকে কে বলতে বলেছে? মায়ের কথায় তারেক চুপ। ভাবি বলে, থালা ভরা সুপারি/ গুনতে পারে না ব্যাপারি।

ফজা বলে, আমি জানি।

বলো।

ফজা হাসে।

ওটার উত্তর যে ‘তারা’ জানলেও কেউ বলে না। কেননা মা বলে, রাজার পোয়া হাজারি/ চুল বাঁধে য্যা আছারি।

এই কিচ্ছার উত্তর ভাবি জানে, তাই মিটিমিটি হাসে। মনা ভাই কোত্থেকে এসে বলে, ধানের চারা।

বীজতলা থেকে ধানের চারা তোলার সময় মাটিসহ তোলা হয়। তারপর পায়ে আছড়ে মাটি ঝেড়ে আঁটি বাঁধা হয়। মনা বলে, আচ্ছা, এটা ভাঙো, ছয় ঠ্যাং, দুই কল্লা, পিঠের উপর লেজ।

আমি বলি, এটা তো দাদির কিচ্ছা। উত্তরটা ভুলে গেছি।

মনা ভাই ভাবির দিকে চেয়ে বলে, তুঁই ন কইও।

ফজা বলে, চুলা মনে হয়।

মনা বলে, না, ভেঙে দেবো না।

মা হাসে। বুবু বেড়াতে এসেছে। সে বলে, চুলার আবার লেজ আছে নাকি!

ফজা বলে, এটা কখনো শুনি নি। ভাই, বলে দাও না।

সবাই চিন্তা করে, কিন্তু কেউ বের করতে পারে না। মনা ভাইকে ধরি। একটু হেসে বলে, দাড়িপাল্লা।

শোনার পর সবাই মিলায়, মিলানোর পর আফসোস করে, এত সহজ জিনিসটা পারলাম না!

আফসোস শুনে মনে হয় বুবু যেন চাকা বাটা খেলছে। চাকা বাটা খেলায় সে ছিল দস্যি মেয়ে। তার হাতে পাঁচটা গুটি নাচত আর মুখ চলত বিজলির মতো। বলত, খেলেতা কামিনী/ দুটিকে যামিনী/ তিন চাটিকা/ চারশ দানা/ পামচমটি খানা/ উপর ঘেঁষা/ পূর্বে ভাসা/ তিনের ঝাঁটা/ চারের দানা/ পামচমটি খানা।/ শৈতাব এক, দুই…/ মাটি এক, দুই…/ বদলা এক, দুই…/ এতুল বেতুল তেতুল খাম/ চুরকি চাম্বা পামচমটি খাম…

মার বুক জ্বলে। মনে হয় গ্যাস্ট্রিক। বুকে হাত রেখে বসে আছে। এ সময় শাশুড়ি আর তার হামানদিস্তার কথা মনে পড়ে। দাঁত ছিল না, তাই পান ছেঁচে খেত। শীত এলেই দমদমায় উঠে পিতলের থালায় বিন্নি চাল নামাত। কাতলা মাছের ঝোল দিয়ে বিন্নি ভাত খেতে খুব মজা।

এক সন্ধ্যায় শাশুড়ি বাপের বাড়ি থেকে ফিরছিল। বটতলে দেখে, শাদা বৃষটা তাদের দিকে চেয়ে আছে। ভাবে, এ রকম একটা গরু তো আমাদের ছিল। গত বছর মারা গেছে। সেই রাতে স্বপ্ন দেখে, শাদা বৃষটা শিং নাড়ছে আর দুনিয়া নড়ছে।

মার সব মনে পড়ে। ভাবে, দুনিয়া কি নড়বড়ে হয়ে গেছে!

৪২.
মুরাদপুরে তিনজন ভিক্ষুক আছে। একজনের কাঁধে একজন হাত রেখে একসঙ্গে ভিক্ষা করে। দুজন অন্ধ, একজন ইয়া মোটা। লোকটা দীর্ঘদেহী। গায়ের রং মহিষের চোখের মতো। ডান হাত কাটা, যেন গণ্ডার। একবার স্বপ্ন দেখেছি, তার হাত ধরে হাঁটছি আর ‘দয়াল আল্লাহ ইয়া রাসুলুল্লাহ’ বলে ভিক্ষা করছি।

মুরাদপুর পার হওয়ার সময় তাদের দেখে সেই কথা মনে পড়ল। ইপিজেড যাচ্ছি। শহরে এসেছি ওই মেয়েকে দেখার আশায়। গাড়িতে ভিড়ে ছুরি মাছ হয়ে যাই। সামনে জ্যাম দেখে এক যাত্রী ড্রাইভারকে বলে, সব ডলে দিয়ে চলে যাও। আরেকজন বলে, মানুষের মানসিকতা দেখেছেন!

গার্মেন্টসে চাকরি করার সময় ওকে দেখেছিলাম। দীর্ঘদিন দেখি নি। কেমন আছে সে?

বেশ কিছুদিন আগে একটা গান শুনেছিলাম, ‘না রাখি মাটিতে, না রাখি পাটিতে, না রাখি পালঙ্কের উপরে, বন্ধুরে রাখি সিঁথির সিঁদুরে।’ গানটা এখন মনের হাওয়ায় উড়ছে। হাওয়াকে বলি, কে বানাইল প্রেম?

তার কথা ভাবতে গিয়ে বাবার ভাবনা আসে। বিদেশ যাওয়ার কথা বললেই বাবা বলে, উপার্জন কম হলেও পরিবারের সাথে থাকা—এ হলো সুখে থাকা।

বাবা প্রায় বলে, মানুষের আদি পেশা চাষ। যখন চাষে থাকে, কাদার সাথে মাখামাখি হয়, মানুষ তখন বড় থাকে।

মনে হয়, বাবা বহুদিন আগের এক পৃথিবীতে আছে। সেখান থেকে হেঁটে বাড়ি আসছে। তার রাস্তাটা গোলা ভরা ধানের মতো সুখের। সুখের মধ্যে রাত আসে, ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি ওড়ে। আমরা তখন জোনাকি ধরে কাচের বয়ামে রাখি, আলো জ্বলা দেখি।

মেঘগুলো কর্ণফুলী নদী আর দক্ষিণ কূলের গাঁয়ের মাথায় দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন ভেঙে পড়বে। ইচ্ছে করে কোদাল দিয়ে মেঘের গা কোপাই। ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ুক।

দুপুরে ফ্যাক্টরিতে গিয়ে শুনি, ও চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। অনেকের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় আছে কেউ জানে না।

জমে থাকা মেঘ আমার ওপর ভেঙে পড়ে। নদীর পানি ভাটার টানে সাগরের দিকে যাচ্ছে। কোনো এক টানে আমার মনও চলে যায় গ্রামের দিকে। পুবের বিলে বর্গা চাষ করা বড় জমির ধানপাতায় দেখি মেয়েটার মুখ। পাতায় কুয়াশা জমার মতো মনে বিন্দু বিন্দু কান্না জমে। কান্নার ভেলা নিয়ে কর্ণফুলীতে ভাসতে ইচ্ছে করে। ভেসে ভেসে বঙ্গোপসাগর, সাগর-মহাসাগরের আনাচে-কানাচে ঘুরব; দেখব মেয়েটি কই মাছের মতো কোথাও লুকিয়ে আছে কি না।

বর্ষার গন্ধটা ভরা ভরা। দাদি বলত, মানুষ মাটির সাথে চাষের গল্প করে। অনেক বছর ধরে যারা তার সাথে চাষের বন্ধন রচনা করেছে, তাদের কথা শোনে। মাটি ধানের ছড়া বা কচি লাউয়ের মতো মনে ধরে থাকে। তাদের কষ্ট নিয়ে নেয়।

নানি বলত, মানুষ হবে ভোরের মতো। আমি মন খারাপ করলে বলত, চিনিগুঁড়া, বোয়ালভোগ, কালাজিরা কিংবা রসমালাই ধানের সুগন্ধে কষ্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখবি।

রসমালাইয়ের গাছ অনেক লম্বা, প্রায় গলা সমান। ওটা আসলে পানির ধান, পানি থাকলে সোজা থাকে, পানি সরে গেলে কাত হয়ে পড়ে। আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে চাই।

মেঘ সরে আলো খুলে যায়, বিকালের মনও মেলে যায়। সেই আলো ডানায় নিয়ে কাক ওড়ে। উড়ে যাওয়ার সময় কিছু আলো মানুষের গায়ে ছিটকে পড়ে। তখন বিকালটা মোরগের লালঝুঁটি হয়ে যায়। আমার কষ্ট কোথাও উড়ে যেতে চায়।

গতকাল বিকালের কথা মনে পড়ছে। দক্ষিণ বিলের পাশের বাড়িতে বানরটাকে শিকল দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছিল রাইস মিলে চাকরি করা ইউসুফ। শখ করে বারো শ টাকায় কিনেছে তার ছেলে। বয়স মাত্র তিন মাস, এখনো দাঁত ওঠে নি। ধূসর ছাগলটার সাথে দুষ্টুমি করছে। দৌড়ে ছাগলকে মারতে যায়, ছাগলটা শিং দিয়ে গুঁতা দিতে চায়। বানর দ্রুত সরে যায়। কখনো এক লাফে গাছে ওঠে।

জমিতে অনেক ফড়িং উড়ছিল। ফড়িং উড়লে নাকি বৃষ্টি আসে। একটু মেঘও আছে। পুব আকাশে রংধনুর হালকা আভা। রঙটা দেখতে দেখতে সরে যায়। আলো কমে আসে। আসমানের বিষণ্ন ছায়া হালচষা জমিনে পড়েছে। বিষণ্নতার ফাঁক গলে হট্টিটি হট্টিটি ডেকে পাখিটি উড়ে যায়।

এখন শহরে সন্ধ্যা আসছে বৃষ্টির ফোঁটার মতো। কোথায় যেন ফাঁকা, মন খারাপের ফাঁকা, কাকের ডাকে আর রোদ ক্রমশ হলদে হয়ে যাওয়ায় ফাঁকা।

মানুষের মন নাকি কচুপাতার পানি। আমি জানি, কখনো তা শতবর্ষী বটের গোড়ার চেয়েও শক্ত। মা বলত, আরেকজনের কাছে সোনার থালে ভাত খাওয়ার চেয়ে মার লাথি খাওয়া অনেক ভালো। কথাটা কেন মনে পড়ে জানি না। সাম্পানের মাঝির শক্ত বাহুর মতো মন শক্ত করতে চেষ্টা করি।

বড় আপাকে দেখতাম, সারা দিন পিঁপড়ার মতো পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কোনো ক্লান্তি নাই, সবসময় শান্ত একটি মুখ। নাকের আগায় ঘামগুলো জমে থাকত। সেখানে আমরা নদী দেখতাম। নদীটার নাম হালদা। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ভোর থেকে শুরু হতো তার কর্মযজ্ঞ। কত রকমের কাজ যে করত! এমনকি কাছের জমিতেও চলে যেত। শুধু হালটা চষত না, ধান রোপণ থেকে শুরু করে সার দেওয়া, আগাছা বাছা—দক্ষতার সাথে করত।


চড়ুই পাখি হয়ে ভাবনারা উড়ছেই। সন্ধ্যার আকাশে ফুটে উঠেছে আমার বিষণ্নতা।


ধানকে মনে হতো বড় আপা। ধান পাকা শুরু হতো, পাকা ছড়া নুয়ে পড়ত। মনে হতো, আপা ধানের ছড়া হয়ে ঝুলছে। কার্তিকের রোদ ঝিকমিক করত। সকালের শিশিরবিন্দু গা থেকে পুরো মুছে যেত না। ওই কোমলতা মেখে হাঁটতাম।

আপা তো জল আর হাওয়া। গরুর গাড়ির চাকার মতো ঘুরে ঘুরে, নাইয়রি মেয়ের চাহনির মতো কাজ করে যেত। কাজ তার সাজ, এ সাজে উজ্জ্বল থাকত মুখ। তাই আপাকে কখনো অসুন্দর দেখি নি।

কাজের প্রতি ন্যূনতম ভালোবাসা যদি জাগে, আপা জাগিয়েছে। আপার মধ্যে কাক-স্বভাব আছে, কাকের মতো ভালোবাসা ও সামাজিকতা আছে।

পনেরো নম্বরে এসেছি। নদীর পাড়ে বসে আছি অনেকক্ষণ ধরে। ওই তো দেখা যায় কর্ণফুলীর মোহনা। নদী গিয়ে সাগরে মিশেছে। নদীর পানি একরকম, সমুদ্রের অন্যরকম। আমার মনেও নানা দোলাচল।

চড়ুই পাখি হয়ে ভাবনারা উড়ছেই। সন্ধ্যার আকাশে ফুটে উঠেছে আমার বিষণ্নতা। কান্তা ধানের মতো একটু লালচে হয় মন। পশ্চিম আকাশেও সেই রং ধরছে। কানিভুঁই একশ আড়ির মতো হয় এ ধান। ধানের স্বপ্নে মন ভরতে চায়।

গত বছর একটা কাজে কাঞ্চননগর গিয়েছিলাম। আসার সময় এক লোককে দেখলাম খেত থেকে আসছেন। লম্বা, শ্যামলা লোকটার কাঁধে ভার। জিজ্ঞেস করলাম, এদিকে এবার কোন ধান রোয়া হচ্ছে? তিনি কান্তা ইরির কথা বলেন। তারপর হেসে বলেন, আজ আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসেন।

পরদিন দুপুরে বাড়ি আসি। কোথায় গেছি মা পুনরায় জানতে চায়। মুন্না ভাইয়ের বাসায় ছিলাম বলে গোসল করতে যাই।

রাতে স্বপ্নের সাগরে হাবুডুবু খাই। কেউ আমাকে ইলিশ শুঁটকি বানায়। এ সময় মাটি মাপার ওস্তাদ বাম্বু শাদা কার থেকে নামেন। ‘কেরেংকাল’ বলে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তারপর ফিতা দিয়ে মাপামাপি শুরু হয়। এটা কাউকে গর্তে ফেলার পূর্ব প্রস্তুতি।

শফি ভাইকে খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতে ঘুম আসে। চেরাগ হাতে এসে মা ক্রোধে ফেটে পড়ে। কেননা বাবা সকালে লাঙল-জোয়াল নিয়ে বেরিয়েছে, কিন্তু জমি খুঁজে পায় নি।

এ সময় ঢোঁড়া সাপের মতো হেঁটে এসে এক মাঝি বলে, মালগারি আইবু।

কণ্ডে? কোথায় আসবে তা জানতে চাই।

মাঝি জবাব না দিয়ে পালিয়ে যায়।

মা এসে বলে, জমিটা পাওয়া গেছে।

বাবা হাল চষতে শুরু করে। কোত্থেকে একতারা এনে মুন্না ভাই গান ধরে : দস্যুরা মরে গেছে/ পলিমাটি ভরেছে ফসলে/  ধোঁয়া ওঠা ভাতে ফুলের গন্ধ…

রাতে চাঁদের আলোয় উঠানে খড়ে বসে বড়রা ধানের কথা আলোচনা করে। অনেকদিন পর দাদিকে দেখি। দাদি বলে, কাল সকালে ঢেঁকিগুঁড়া চালের পিঠা খাওয়াব।


২৪ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)