হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ২১

অন্যজন : ২১

অন্যজন : ২১
45
0

২০ পর্বের লিংক


পর্ব- ২১

৩৬.
রোদের তাপে গা পুড়ছে। জিয়লগাছের আঠার মতো ঘাম লেগে আছে মানুষের গায়ে। এক যাত্রী বলে, দেশ তো বক্সিরহাট থেকে খারাপ হয়ে গেছে। এ কথা শুনে শফি গাড়ি স্টার্ট দেয়। কাপ্তাই লাইনে গাড়ি চালাচ্ছে প্রায় তিন বছর হলো।

নেশাগ্রস্ত লোকের হাঁটার মতো গাড়ি চলে। যেন গাড়ির ঝিমুনি এসেছে। ঝিমুনি পেছনে রং ওঠা আয়না হয়ে যায়। আয়নায় বুবু মুখ দেখে। দাগগুলোকে মনে হয় মেছতা। কিশোরীকালে ধানের পাড়ায় বসে স্বপ্ন দেখত। সোনালি খড়ের মতো সেসব স্বপ্নকে বাবা রাস্তায় শুকাতে দিত। স্বপ্ন মাড়িয়ে যেত মানুষের পা আর রিকশা-টেক্সির চাকা। তারপর খড়ের গাদা হয়ে ঘাটায় দাঁড়িয়ে থাকত। পরের বর্ষার আগে গাদা ছোট হয়ে যেত, খড় হতো কালচে। পচা খড়ের যে রং, বুবুর স্বপ্নও তেমন হয়ে যেত।


দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। তাদের কানের পর্দা মোটা। গরিবের কথা তারা শুনে না।


গাড়িতে বুবু-রঙের একটা মেয়েকে দেখে কত কথা মনে পড়ল! সফি ভাবে, ফুলে ফলে ভরা জীবন এল না। মাঝে মাঝে মনে হয়, দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। তাদের কানের পর্দা মোটা। গরিবের কথা তারা শুনে না। তাই গরিবের ভাগ্য একই থেকে যায়।

গল্পদাদা থাকলে বলত, শোন, কই মাছকে পাল্লায় রেখে মাপা যায়? যায় না। হাতায় রেখে মাপতে হয়। তারা আমাদের কই মাছ বানিয়ে হাতায় ছেড়ে দিয়েছে।

কখনো বাম্বুর বউ উত্ত্যক্ত করলে মা বলত, আল্লাহ আছে, ত্রিশ পারা কোরান আছে, বারো আউলিয়া বাজান আছে। সব আল্লাহ দেখছে। মায়ের সেই অসহায় কান্নামুখ মনে পড়ল। মনে হলো, কোথাও কেউ নেই। গাড়ির স্টিয়ারিং জোরে চেপে ধরে। লুকিং গ্লাসে দেখে, পেছনে কার। হেলপার চিৎকার দেয়, ডানে প্লাস্টিক।

গাড়ির গতি বাড়ায়। ফিঙের ডাইভ দেওয়ার মতো গতিতে চলে। বাতাসে গাড়ি ভরে যায়। যাত্রীদের মন শান্ত। তারা কর্ণফুলীর স্রোত কিংবা চিৎমরম ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরীর বেগুনি ফ্রকের মতো হয়ে যায়।

এই সুযোগে সফি ডুব দিয়ে চলে যায় রঙের এক দেশে। সেখানে মানুষের মুখ প্রশান্ত। তারা কথায় কথায় গালাগালি করে না। এ সময় একটা রেলগাড়ি আসে। গাড়িতে সব শিশু। তারপর মনে পড়ে, ঝিনুক সংঘের পাশে রেলরাস্তায় বসে ছোট নানার বলা গল্পের দৃশ্য এটা।

সামনের লক্কড়-ঝক্কড় ট্রাকটা সাইড দিচ্ছে না। ছোট নানা খারাপ মানুষকে যেভাবে গালি দিত, ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে দিত, সে রকম রেগে হর্ন দেয়।

কোনা চোখে কর্ণফুলীর দিকে তাকায়। ওমা! একটা শুশুক ভেসে উঠেই ডুব দিল। মা-ও সৌভাগ্যের জন্য কত কত স্বপ্নে ডুব দেয়! স্বপ্নে মায়ের পাশে লাঙল কাঁধে বাবাকে হাঁটতে দেখা যায়।

৩৭.
বাবার কথা যদি বলি, বাবা হলো ঘুড়ির মতো। ঘণ্টি ওড়ে, উড়ে উড়ে স্বপ্ন নিয়ে আসে। স্বপ্নের মধ্যে বীজ থাকে। সেই বীজ ছড়িয়ে দেয় আসমানের বিলে। প্রতিদিন চোখে চোখে রাখে। বিকালে আসমানের দিঘির পাড়ে বসে ঘণ্টি ওড়ায়। মাঝে মাঝে বেড়ে ওঠা ধানগাছের দিকে তাকায়।

বসন্তকাল আসে মেহমানের মতো হেঁটে। গাছে গাছে নতুন পাতা, ফুলে ফুলে চারদিক ভরা। বাবা যেসব ঘুড়ি বানাত, তা ছিল বসন্তের ফুলের মতো। বেগুনি, লাল, হলুদ, আসমানি, কমলা—কত রঙের ঘুড়ি!

একবার জাতীয় পতাকার রঙে দুটি সুন্দর ঘণ্টি বানিয়েছিল। সেবার নাজিরহাট কলেজের মাঠে ঘুড়ি উৎসব হয়েছিল। বিভিন্ন স্কুলের কয়েক শ ছেলেমেয়ে ঘুড়ি নিয়ে হাজির হয়েছিল মাঠে।

কয়েকটা ঘণ্টি কাটার পর আমারটা কাটা পড়ে। সে কি কান্না! কান্না থেকে রাতে স্বপ্ন আসে। স্বপ্নে কলেজের মাঠের চেয়ে বড় একটা মাঠে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে লাল-সবুজ ঘণ্টি ওড়ায়। উড়তে উড়তে ঘুড়িগুলো একেকটা ছোট ছেলে হয়ে যায়। তারা নায়কের মতো হাঁটে। পথে মানুষের জটলা। তারা বলে, আমরা সিনেমা দেখছি।

সেই একবার স্বপ্নের মতো স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমার কাছে একটা ছোট থলে ছিল। মার্বেল, সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়ে বানানো তাস ও পয়সা রাখতাম। এরপর ওখানে স্বপ্ন রাখা শুরু করলাম।

বিকালে স্কুলের মাঠে পড়ে থাকা অশ্বত্থগাছের ফুল দিয়ে বাঁশি বাজাতাম। বেতফলের মতো থোকা থোকা স্বপ্ন থলেয় জমা হতো। এর মধ্যে থাকত অগ্রহায়ণের পাকা ধানের গন্ধ। সেই গন্ধ থেকে আসত নবান্নের উৎসব। উৎসবে সাত রকম পিঠা ও শিরনি খেয়ে সাহেব ভাগ করে কানামাছি, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, লুকোচুরি, হাডুডু, কান ফুইস্যেনি, ইসকি-মিসকি ও মাছখেলা খেলতাম। খেলতে খেলতে ছোটবেলা লাঙলের ফলার মতো উজ্জ্বল হতো। সেই উজ্জ্বলতায় মাটি মাখার জন্য জমিতে যেতাম। আসার সময় কেটে আনতাম নাড়া। মা পরদিন সকালে নাড়া জ্বালিয়ে নানারকম পিঠা বানাত।

পিঠার সুগন্ধে দিন শুরু হয়। বিকালে স্কুলের মাঠে ঘুড়ি ওড়াই। আলতাফ বলে, আমার ঘুড়ি চাঁদে পৌঁছে যাবে। তখন আমরা চাঁদের বুড়িকে ডাকি, স্কুলের মাঠে আসো। তোমাকে চনা-পেঁয়াজু খাওয়াব। চনার উপর পিঁয়াজ কেটে দিতে বলব। খেতে খুব মজা হবে।

বুড়ি হয়তো বলবে, চাঁদের পাথুরে মাটিতে আর ভালো লাগছে না। আমি থাকব হালদার পাড়ে। দরকার হলে আমাকে নাজিরহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আয়া করে নিও। আমার সব মায়া তোমাদের মধ্যে ঢেলে দেবো। আমি সুতা কাটব, তোমাদেরকেও কাটতে শেখাব। বস্ত্রে বস্ত্রে দৌলতপুর ভরে যাবে। পাটিপাতার বাঁশির সুরে হালদাকে সাজাব। নদী আরো উর্বর হবে।

বাবা কেমন কর্মঠ তা তার চোখ, চাহনি ও গাট্টাগোট্টা আঙুল দেখলেই বোঝা যায়। হাঁটে লারে লারে। যেন পৃথিবীর কোনো কিছু ব্যথা না পায়। কিন্তু যখন মাটিতে লাঙল চালায়, তার হাতে জমা হয় অনেক শক্তি। মাটিকে জাগিয়ে দেয়। জেগে ওঠা মাটি সেই সুখ ছড়িয়ে দেয় ধানগাছে।

ছোটকালে বাবা হয়তো কালো ছিল। এখন কালো নয়, আবার শ্যামলাও নয়, রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে সেখানে কালচে আঁশ লাগে। চাষবাসের সময় রং হয় এ রকম। ধান রোপণ করার পর আস্তে আস্তে পাল্টে যায়। রঙে, চেহারায় ও কথায় তখন ফুর্তি আসে।

একটা কথা কেউ জানে না। বাবাকে আমি খুব পছন্দ করি, তবে কখনো তা প্রকাশ করি না। মাঝে মাঝে ধানপাতায় হাত বুলালে তাকে ভালোবাসার কথা টের পাই।

হাল চষে জমি থেকে উঠে এলে যে গন্ধটা পাই, তা আমার কাছে তার চিরচেনা গন্ধ হয়ে আছে। বাবা মাটির, বিস্তৃত এই জমি ও ফসলের। বাবা এত বড় হয়ে যায়, দুই হাত প্রসারিত করেও তাকে ছুঁতে পারি না।

তবে বাবা ছুঁতে চায় অনেক কিছু, কিন্তু পারে না। তার মনে হয়, দেশে হাসান-হোসেনের কারবালা এসে গেছে। মানুষের মন এখন সিমারের মতো। তাই বেড়ে গেছে অশান্তি।

ধানখেতের মতো সুন্দর জিনিস খুব কমই আছে বলে মনে হয় তার। আগে পুঁথি শোনা হতো। কারবালার পুঁথি শুনে দুঃখে ভারাক্রান্ত হতো মন। তবে লড়াই ও ত্যাগের কথা শুনে শক্তি পেত।

সেই শক্তি কোথায় হারিয়ে গেছে? মানুষ এখন আগের মতো নেই। সে বেশি অস্থির। খালি দৌড়ায়। মানুষের দৌড় দেখে বৃষের লড়াইয়ের কথা মনে পড়ে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন আসমানের বিলে বৃষের লড়াই হয়। লড়াই করে সবাই একটি বছর কাটাল। বৃষের লড়াইয়ের মাধ্যমে তা উদ্‌যাপন করে।

গরুর শিঙে শিঙে সংঘর্ষের আওয়াজ, ফুলে ওঠা পেশি, ক্রোধ তার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। উত্তেজনায় টগবগ করে। বাবা কোনো কিছুর পরোয়া করে না।

৩৮.
দূর থেকে দেখলে মনে হবে লোকটা জমিতে দাঁড়িয়ে ব্যায়াম করছে। দুই হাত দুদিকে প্রসারিত। গায়ে শাদা হাফ শার্ট, মাথায় টুপি। কাছে গেলে দেখা যায় খিরা খেত পাহারা দিচ্ছে।

কাকতাড়ুয়া লোকটার কাঠির পা। তার পেছনে কয়েকজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। তারা এক টুকরা অবসর খিরার হলুদ ফুলের সাথে মিশিয়ে দেয়। ওই সময় ফুল থেকে কালো পোকা উড়ে যায়।

পাশের খিল জমিতে দুটা ফিঙে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর গামারি গাছে উঠে এল। সব পাতা ঝরা, গাছটাতে এখনো বসন্তের ছোঁয়া লাগে নি।


তখন সুর ছিল, বীজতলার মতো জীবনও ছিল। কিন্তু জনম-দুঃখী হয়ে আমরা দুঃখের চাষাবাদে মগ্ন ছিলাম।


একটা ফিঙে ঠোঁট ঝাড়ে। ঠোঁট থেকে পোকাটা পালিয়ে যায়। ওই সময় অনেক উপর দিয়ে উত্তরে উড়ে যায় তিনটা টিয়ে। ওরা যেন কারো বিয়েতে যাচ্ছে। আরেকটা ফিঙে উড়াল দিয়ে পোকা ধরে ডালে এসে বসে। বলে, আজ সন্ধ্যার বিয়ে। এ কথা শুনে সন্ধ্যা লজ্জা পায়। রাস্তার পশ্চিম পাশে বেয়ারিঙের গাড়িতে বসা এক শিশুকে ঠেলছে আরেক শিশু। সন্ধ্যা ওই গাড়িতে চড়ে। গা থেকে চৈত্রের ধুলো ঝেড়ে বলে, রাতের বাড়ি বেড়াতে যাব।

তার কথা শুনে জিয়লগাছের ফুলের পাশে বসা চড়ুই ফুড়ুত করে উড়ে যায়। আমের ডালে কোকিলটা তীব্র স্বরে কুহু কুহু ডেকে সন্ধ্যাকে তাড়া করে। তা দেখে পাইন্যে পুকুরে মৃগেল মাছের হাসি পায়। সে করে কি, জোরে ঘাই মারে। তখন আকাশে রাতের তারারা জাগবে বলে সন্ধ্যাতারার কাছে খবর পাঠায়। সেই খবর শুনে গোধূলির রঙে হেসে ওঠে পশ্চিমাকাশ।

তখন আমার অবকাশ মেলে। হাতে মাটির গন্ধ। আজ সারা দিন আগাছা বেছেছি। মনের মধ্যে কত আগাছা জমে আছে! সেগুলো পরিষ্কার করার কথা ভাবিও না।

প্রায়ই কারেন্ট থাকে না। আজ শুক্রবার বলে জুমার নামাজের পর প্রায় তিন ঘণ্টা মেশিন চালাতে পেরেছেন হাফেজ ইদ্রিস। মেশিন মানে ডিপ টিউবওয়েল। এখন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন সেই জমিটার সামনে, কয়েকদিন আগে গণ্ডা তিন লাখ সত্তর হাজার টাকা করে চার গণ্ডা বিক্রি করেছেন। সেখানে পাকা ঘর উঠছে। মিঠাবাড়ির এনামের বোনের শ্বশুরবাড়ি সুয়াবিল। এখানে এসে ঘর বাঁধছে। ঘরবাড়িতে চারপাশে অনেক জমি হারিয়ে গেছে। হুজুর এবার পাঁচ কানি জমির চাষ করেছেন। বলেন, চাষে লাভ নেই। নিজের কিছু জমি আছে তাই করা। এবার ইরি ২৮ ও গোলধান রোপণ করেছেন।

গল্পদাদা অদূরে দাঁড়িয়ে জমির উপর বয়ে যাওয়া বাতাসের রেখা দেখছিল। বলল, গোলধানের কথা আরেক দিন হবে। ধরো, সারা দিন বর্ষার ঝুম বৃষ্টি। বিকালে বৃষ্টি থেমে উঁকি দিল সূর্য। গাছে গাছে, নদীতে, বিলে, আকাশে, মানুষের মুখে ছড়িয়ে পড়ে এক রং। সেই রঙের নাম কী? জবাবের অপেক্ষা না করে হুজুরকে বলে, পুরনো দিনের কথা তোমার মনে আছে? তখন সুর ছিল, বীজতলার মতো জীবনও ছিল। কিন্তু জনম-দুঃখী হয়ে আমরা দুঃখের চাষাবাদে মগ্ন ছিলাম।

ভাবি, আমাদের মধ্যে কে এই দুঃখ ছড়িয়েছে জানতে হবে। হেঁটে হেঁটে ওই দূর পাহাড়ে যাব। পথে দেখব গরু ও মহিষের পায়ের অসংখ্য ছাপ। বালুমাখা পথ পেরোব। তখন শুনব, কে যেন মহিষের শিং দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে।

নানাবাড়ির পাশের টিলায় একবার হাতি এসেছিল। সাথে ছিল একটা বাচ্চা হাতি। লোকেরা বাচ্চা হাতির চোখের যে বর্ণনা দিয়েছিল, তাতে গাছের নতুন পাতা দেখলেই বাচ্চাটার কথা মনে পড়ত।

সামনে একটা চালাঘর। গরুকে ঘাস ও কুঁড়া খাওয়ানোর জন্য এখানে বাঁধা হয়। একটা ফিঙে উড়ে এসে চালায় বসে। তার ঠোঁটে পোকা নড়ছে। আরেকটা ফিঙে খেজুরগাছে বাবুইয়ের বাসার পাশে বসে আছে। সন্ধ্যার অন্ধকারে মিশে গেছে তার চোখের রং।

তখন গন্ধটা পাই। ধান, চাল, কুঁড়া মিলে যে গন্ধ, তা আমাকে মুগ্ধ রাখে। একটু আগেই কল বন্ধ হয়েছে। বেল্ট এখনো নড়ছে। অন্ধ কলঘরওয়ালা টুল থেকে ধীরে ধীরে ওঠে।

ঝুলকালি মাখা কলঘর। মরিচের গুঁড়া ও ধানের কুঁড়া মিশে ঝুলকালিতে অন্য রং ধরেছে। মনে হয় কোনো শিল্পী অবহেলায় এ শিল্প তৈরি করেছে। মাঝে মাঝে আমারও এ রকম অবহেলার মতো ঝিম মেরে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। ঝুল হয়ে ঝুলব। অন্ধের চলার কারুকাজ দেখে, কলের শব্দ শুনে ঘুমিয়ে পড়ব।

কলঘরওয়ালার চোখে সবসময় কালো চশমা থাকে। সবাই বলে কানাইয়ের কল। চোখওয়ালা মানুষের মতো মেশিনের গর্তে আঙুল ঢুকিয়ে চাল পড়া নিয়ন্ত্রণ করে। তার দক্ষতা দেখে লোকে আশ্চর্য হয়। প্রায় সময় পরনে থাকে শাদা গেঞ্জি। মরিচ, মসলা ও কুঁড়ার ধুলমাখা সেই গেঞ্জি। গলায় লাল-শাদা হাজি রুমাল জড়ানো থাকে। লম্বা দাড়ি। এমনভাবে বসে, মনে হয় কোনো হুজুর ধ্যানে বসেছে। ধান চুরাতে গেলে মাথা থেকে লাই নামাতে সাহায্য করে। তার বাম হাতের বুড়া আঙুলের নড়াচড়া, ডান হাতে লাই বসানো, সরানো দেখি। কলের শব্দে মনকল খুলে যায়।

আমাদের জমিগুলোতে ধানের চাষ বেশি হয়, সবজি হয় কম। উপজেলায় মোটিভেশন প্রোগ্রামে কয়েকবার গিয়েছিলাম। কৃষি অফিসার বলতেন, ফুড সিকিউরিটি দরকার। গতবার আমন মৌসুমে বাবা কৃষি অফিস থেকে দশ কেজি উফশি বীজ পেয়েছিল। পুরো উপজেলায় দেওয়া হয়েছিল ত্রিশজনকে। তার মধ্যে বাবাও একজন। ওই বীজে দুই কানি জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে জমি তৈরি, রোপণ থেকে শুরু করে সব বিষয়ে উপ-সহকারী কৃষি অফিসার পরামর্শ দিয়েছেন, কিভাবে কী করতে হবে বলেছেন। উন্নত জাতের বীজ সংরক্ষণ, চাষাবাদ ও বীজ বিক্রি—এটাই ছিল তাদের কার্যক্রম। কৃষকের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে এবং বীজে পরনির্ভরতা কাটাতেই এই উদ্যোগ।

সেদিন কৃষি অফিসার বলেছিলেন, পেট থাকলে খাদ্য লাগবে। খাদ্য থাকলে ঘর থাকবে, বউ থাকবে, শান্তি থাকবে। ঘরে যদি ভাত থাকে বউ-পোলা বাইরে যাবে না। দেখেন, আবার জমিও বাধ্য করছে। ধান না করলে আগাছা জন্মে, ঝোপঝাড়ে ভরে যায়, জমি নষ্ট হয়ে যায়, তাই চাষ করতেই হয়। তবে ফসলের বহুমুখীকরণে লাভ আছে। আর এখানে তো ইনভেস্ট একবারে করতে হয় না। ধীরে ধীরে ইনভেস্ট। ধানচাষ না করলে আপনার শ্রম কোথায় যাবে? আপনি তো অন্য কোথাও শ্রম দিতে পারছেন না। এ রকম নির্ভেজালভাবে, নিজের মতো করে কোথায় শ্রম দেবেন?

পরে ক্ষুব্ধ হয়ে ছালাম বলেছিল, ভালো কথা, শ্রম দিল, ধান পেল, বছরের খোরাকি হলো। ধানের খরচ উঠাতে কিছু ধান বিক্রি করতে হয়। কিন্তু সরকার এখানে কেন রাজনীতি করে?

রাজনীতির কথা উঠে মন্নানের চায়ের দোকানে। কেমন সে রাজনীতি? এ বিষয়ে ভালো বলতে পারে ছালাম। যেকোনো বিষয় সে দ্রুত বুঝতে পারে। বলে, সরকার জনগণকে কম দামে চাল খাওয়ানোর জন্য, তাদের কাছে ভালো থাকার জন্য ধানের দাম কমিয়ে দেয়। জানটা যায় কার? আমাদের। লোকে কম দামে ভাত খাবে। একজনের কষ্ট, আরেকজনের হাসি।

তো, বাঙালির রাজনীতি এ রকম কেন? এত বছরেও আমরা ঠিক হতে পারছি না কেন? এক মোটিভেশনে এ কথার জবাব দিয়েছিলেন কৃষি অফিসার। খটোমটো ইংরেজি ও বাংলা মিশিয়ে বলেছিলেন, বাঙালির অরিজিনালিটি নাই। আমাদের বডি, মন ডাইভার্সিফাইড। আমাদের ক্যারেক্টার ডাইভার্সিফাইড। ডাইভার্সিফিকেশন শস্যের জন্য ভালো, মানুষের জন্য ভালো না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভালো হয় না। আমাদের সবকিছুতে ভেজাল। মানুষ পয়সা দিয়েও ভালো জিনিস পায় না। অথচ জাপানে খাদ্যে ভেজাল দিলে মৃত্যুদণ্ড। তুমি অ্যাক্সিডেন্ট করো, কম শাস্তি। কিন্তু ইচ্ছে করে কিছু করলে বেশি শাস্তি। আমি সুইডেনে তিন মাস ছিলাম। ওখানে সাইকেল চালিয়ে এমপি অফিস করতে যান। আর আমাদের?


স্বাধীনের পর আস্তে আস্তে সব পাল্টে গেছে। এখন মানুষ অনেক ভালো আছে।


তিনি ব্রিটিশদের একটা গল্প বলেন। একদিন ছালাম তা আমাদের বলে, গাধা ও ঘোড়া ক্রস করলে খচ্চর হয়। প্রতি চারটার মধ্যে একটা হয় খচ্চর, বাকি তিনটা ঘোড়া। ইংরেজরা চিন্তা করল, গাধা মাল টানতে পারে, দৌড়াতে পারে না। ঘোড়া দৌড়াতে পারে, মাল টানতে পারে না। সৈন্যদের মাল টানার জন্য খচ্চর জাত করল। মাল টানতে পারে, দৌড়াতেও পারে। তবে এগুলো বলদের মতো। অফিসার বলেছিলেন, রিপ্রোডাকশন ক্যাপাসিটি নেই।

ছালাম ইশারায় বলে, ওটার ক্ষমতা নাই।

সবাই হাসে। হাসির মাঝে কালাইয়ের বাপ হঠাৎ বলে, আইউব খান চীন থেকে চীনা ইরি এনেছিল।

ছালাম বলে, স্বাধীনের পর আস্তে আস্তে সব পাল্টে গেছে। এখন মানুষ অনেক ভালো আছে। আগে মানুষ ভালো করে খেতে পেয়েছে? গরুও ছিল হাড্ডিসার। মানুষ অনেক কষ্টে ছিল। বেশিরভাগ মানুষের ঘর ছিল শণের ছাউনি। পায়ে স্যান্ডেল ছিল না। জুঁইর মাথায় দিত বর্ষাকালে। এখন জুঁইর দেখা যায়?

কালাইয়ের বাপ যোগ করে, সারা দিন কাজ করে এক সের চাল কিনতে পারত না। মানুষ কামলা খাটাত, ঠিকমতো বেতন দিতে পারত না। তখন এতসব হাইব্রিড জাতের ধানও ছিল না। ছিল চাক্কল, বড় চিন্নেল, ছোট চিন্নেল, গচ্ছা, সোনামুখী, চাঁদমনি। চাঁনমনি ছিল সোনালি রঙের ধান। গচ্ছা ধান জমিতে ফেলে দিত। তারপর বড় হলে গরু খেত। গরু খাওয়া ধানগাছ এক-দেড় হাত পানিতে রোপণ করা হতো। খুব শক্ত গাছ হত এটার। আর চাল কী, অল্প একটু খেলেই পেট ভরে যেত। কানিতে বিশ-ত্রিশ আড়ি ধান পেত। এখন মানুষ এত হ্যাপা নিয়ে ওটার চাষ করে না।

ছালাম বলল, এখন কম করে পেলেও যেকোনো ধানে ষাট-সত্তর আড়ি পাওয়া যায়।

এবার বিন্নি ও দিনাজপুরি পাইজামের বীজতলা করেছে ছালাম। জানায়, যুদ্ধের সময় বয়স ছিল এগারো। বয়স হয়েছে। শরীর এখন কম টানে।

কালাইয়ের বাপ বলে, আগে বর্ষায় হালদা কয়েকবার ভাঙত। ধান রোপণ করে এসে কয়েকদিন পর দেখতাম পানি। অনেক জায়গায় নদীর পাড় ছিল না। যেখানে পাড় ছিল তা ছিল নিচু। ভারি বর্ষণ হলেই দুই কূল উপচে পড়ত।

আইউব বলে, পরে জমি চাষ হতো ভাদ্র মাসে। তারপর পাড় বাঁধা হলো। এছাড়া ধুরুংয়ের একটা শাখা খাল কাটায় এদিকে পানি কম আসছে। আগের মতো গাছও ভেসে আসে না। এর ফলে তেরপারি খালে চিংড়ি মাছের পোনা উঠছে। হালদা বেয়ে ওঠে। আষাঢ় মাসের পোনা খুব ভালো।

ছালাম বলে, আজ সকালে পোনা এসেছিল। হালদা-রায়পুর মিক্স।

দাম কত? আইউব জানতে চায়।

সাড়ে ছয় শ টাকা।

ফটিকছড়িতে পঞ্চাশটি ব্লক আছে। উপ-সহকারী কৃষি অফিসারও পঞ্চাশজন। তারা অবস্থাসম্পন্ন, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিদের মাঝে কাজ করেন। এ কথা জানানোর পর আইউব বলে, হাইব্রিড ধানগাছ মিষ্টি, তাই পোকা বেশি আসে। নিচে থেকেও অনেক পোকা ওঠে। কৃষি অফিসার বলেছেন, এই জাতের ধানের জন্য জমিতে কাঠি বা একটা-দুটা গাছের ছোট ডাল পুঁততে। এতে পাখি বসবে, পোকা খাবে।

সে এবার বগুড়ার পাইজামের বীজ ফেলবে। আড়ি (১৬ সের) সাড়ে তিন শ টাকা করে ১৩ কেজি বীজধান কেনা হয়েছে। নদীর ভাঙনে তৈরি হওয়া জলাশয়ের পাশে বীজতলা করবে।


২২ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)