হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ২০

অন্যজন : ২০

অন্যজন : ২০
40
0

১৯ পর্বের লিংক


পর্ব- ২০

৩৪.
শফি ভাই বলে, নিজুর জাগাত ব্যাক ক্ষমতা দ্যাখায়।

সকালে পুলিশকে টাকা দিতে হয়েছিল। সেই রাগ চোখে-মুখে এখনো রয়ে গেছে।

কালাম বলে, লাইসেন্স রিনিউ করাইলেন না…

তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ড্রাইভার বলে, তোরা হালা হামদু। হামদু মানি বুঝছ্?

কালাম বলে, তেল-পানির মিশ খাওয়া দ্যাখছেন নি? হাত-পাও ধরনের দরকার আছে।

কাল থেকে লাগাতার হরতাল। কালাম প্রশ্ন করে, কেন জানেন নি? বলে, নৌকা উল্টায় গ্যাছে। এবার ইনশাল্লাহ ক্ষমতায় যাব।

সাদ্দাম বলে, ধানের ছড়ায় মানুষ আছাড় খায়। সে রেডিওর স্টেশন ঘোরায়, ছায়াছবির গান শুনবে। স্টেশনে ঘের ঘের আওয়াজ। ‘দেখেছি প্রথম বার দুই চোখে প্রেমের জোয়ার।’ গেয়ে বিরক্তি কাটাতে চেষ্টা করে।

তার গান কালামের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। সে অনুচ্চ স্বরে গায়, মাঝি নাও বাইয়া যাও।

শফি হেসে বলে, কডে যাবি?

কালাম বলে, ক্যান য্যা এ দ্যাশত আইলাম।

জাদু দিই অদৃশ্য অই যা। শফি হেসে বলে।


বৃষ্টির সুর শুনে উতলা হতো টিলার লালমাটি। লালমাটিতে কাদা ফুল ফুটত। সেই ফুল পায়ে মেখে এসে নানিকে দেখাতাম। নানি হেসে বলত, আমাদের এখানে রঙের বারো মাস।


গত রাতে কালাম স্বপ্ন দেখেছিল, তার শরীরের নাট-বল্টু সব খুলে গেছে। চিলেহাটি থেকে মায়ানমার বর্ডার, ঢাকা, বান্দরবান, যশোর, সিলেট, খাগড়াছড়ি, বিলাইছড়ি, মানিকছড়ি—কোথাও খুঁজতে বাকি রাখে নি। কিন্তু নিজেকে খুঁজে পায় নি। বলে, আইউব খানের আমলে একটা মুরগিও ত বাইর অইতে পারে নি। পারছে নি? আমাগো রক্ত ত টিকটিকির, তাই এত্ত নাচ।

সাদ্দাম বলে, বাঙালির জাত পোন টিপে বইয়া রইছে।

স্টার্ট না নেওয়া গাড়ির মতো ঘড়ঘড় কাশে শফি।

তারা শোনে, দোতলায় বাম্বুর মেয়ে তার মাকে বলছে, আম্মু, তুমি আমাকে কুত্তনি ডাকছ, তাহলে তুমি কী?

তখন রাত প্রায় নয়টা। শুয়ে আছি কাছারি ঘরে। শফির হাসি শুনে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। রিকশার রিং চালাত পাটিপাতার বেত দিয়ে। নোয়া রাস্তা, পাইন্যে পুকুরের পাড় ও খালপাড়ে দৌড়াত। মনে হতো, গতিই তার প্রাণ। গতি দিয়ে সব জয় করবে।

রাতে শুতে এলে বুবু তার গায়ে-মুখে হাত বুলিয়ে দিত। সে বায়না ধরত গান শোনানোর জন্য। তখন বুবু ঘুমপাড়ানি গান গাইত। আমাদের মনে হতো, এসব গানে পরিরা পৃথিবীতে এসে কয়েকজন শিশুর মনে অন্য এক জগতের আলো ছড়িয়ে দেয়। সেই জগতে যেতে হলে ঘুড়ি উড়াতে জানতে হয়।

আমি ও সফি ভাই ঘুড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি করতাম। বাবা আমাদের জন্য সাতরঙা ঘুড়ি বানাত। একটার পর একটা বানিয়ে দিত, আমরা ওড়াতাম। ঘুড়ির সাথে উড়ে যেতাম পৃথিবীর সেই দেশে, যেখানে ইচ্ছেমতো চলা যায়।

গল্পদাদা যেভাবে রস মিশিয়ে গল্প বলে, বাবা সে রকম হেসে-খেলে ঘুড়ি বানাত। তার হাতে তখন খেলা করত ধানফুলে বয়ে যাওয়া বাতাস। বুবু সেভাবে গাইত, ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি/ মোদের বাড়ি এসো/ খাট নাই পালংক নাই/ পিঁড়ি পেতে বসো।/ বাটা ভরা পান দেব/ গাল ভরে খেও/ সফির চোখে ঘুম নাই/ ঘুম দিয়ে যেও।

সফি বলত, আরেকটা বলো। বুবু গাইত, খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল/ বর্গী এল দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেব কিসে?/ ধান ফুরাল পান ফুরাল/ খাজনার উপায় কী?/ আর কটা দিন সবুর করো/ রসুন বুনেছি।

তারপর গাইত, নিন্দারালি মারে তুই/ মোদের বাড়ি আয়/ মোদের আছে সফিমণি/ ঘুম দিয়ে যা।

সফি আরো শুনতে চাইত। বুবু বেড়ায় হেলান দিয়ে বলত, সফিমনি লক্ষ্মীমণি/ বাড়িত আছনি/ সর্তার ঘাটে সাম্পান আছে/ রেঙ্গুন যাইবা নি।

বুবু গাইত, দোলনা দোলনা দেখেছ/ দোলনা যাইতে দেখেছ/ দেখেছি দেখেছি /কোনখানে কোনখানে/ নাজিরহাটের মাঝখানে/ সওদাগরের দোকানে।

ছোটকালে বুবু কত গান ও ছড়া শুনিয়েছে! আজ ঘুম আসছে না। রসুনের কোয়া হয়ে বর্গীদের নাকে ঢুকে ঘুমপাড়ানি গান শুনতে ইচ্ছে করছে। গানে গানে চলে যাব বিদেশে। পরিশ্রম করব, টাকা কথা বলবে। হান্নান শাহ’র কাছে থুতুর মতো যে টাকা, তা আমিও কামাব। দেখাব, টাকা মানে মানুষকে অপমান করা নয়, নিচে নেমে যাওয়া নয়। টাকা মানে সবকিছু গুছিয়ে ইজ্জতের সাথে চলা, মানুষের মতো মানুষ হওয়া। মানুষ হতে না পারলে সব বৃথা।

মনে মনে নানাবাড়ি চলে যাই। টিলায় ঘুরি। ধানগাছের বয়স প্রায় দেড় মাস। ধানপাতায় লেগে আছে শিশির বিন্দু। গাছের সারা দিনের সুখ-দুঃখ এসব বিন্দুতে ফুটে উঠেছে। এরা যেন পাতার ভাই-বোন। গল্পে, হাসিতে বিকালের আলোটা খেয়েছে। খালের পাড়ে দুটা শালিক ডাকে। ধানপাতার ভাই-বোনেরা তা দেখে।

টিলায় অনেকগুলো খেজুরগাছ। গ্রীষ্মকালে এসব গাছে হলুদ পরিরা আসে। টিলায় দাঁড়িয়ে আমরা ‘চুপ’ খেলা খেলতাম। কে কতক্ষণ নীরব থাকতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলত। যে প্রথম হেসে দিত বা কথা বলত সে হেরে যেত। তখন আমরা যা চাইতাম তাকে তা-ই করতে হতো। কতবার কতজনকে ন্যাংটা হাঁটিয়েছি!

বর্ষায় দেখতাম পুবের পাহাড়ে তুলার মতো মেঘ উড়ছে। আসলে বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হতো বৃষের ডাক, জিহ্বা কাঁপিয়ে এরের বলে গরুর পালকে তাড়া করা লোকটা কিংবা আছাড়গোলাগাছের গোটা দিয়ে ফড্ডাশি ফাটানোর মতো বৃষ্টি।

বড় টিলাটা পার হলে সরকারি রাবার বাগান। সেখানে লম্বা লম্বা ঘাস। ঘাসের রাজ্যে গরুগুলো সারা দিন মুখ ডুবিয়েছিল। এখন অলস পায়ে হেঁটে যায়। তাদের চোখে-মুখে সন্ধ্যার প্রশান্তি।

একটু পর চোখ ফিরিয়ে খিরামের পাহাড়গুলো আর দেখি না। বৃষ্টিতে হারিয়ে গেছে। উত্তর আকাশে ঘন মেঘ ছিল, তা মিশে গেছে। মেঘেরা কোথায় যায়? বাতাস কি তাদের খেয়ে ফেলে?

টিলার গাছের ফাঁকে হট্টিটি পাখির ভেজা ডাক শোনা যায়। একটা কালো কুকুর আলে দাঁড়িয়ে পূর্ব দিকে তাকিয়ে আছে। ধানের মেশিন চলছে। তেল দিয়ে চলে বলে আওয়াজ বেশি।

একটা-দুটা কালো মেঘ উত্তর আকাশে উড়ে যায়। মনগুলাগাছের কাঁটায় বৃষ্টির ফোঁটা দেখে হেডস্যারের বেতের কথা মনে পড়ে। স্যার ক্লাসে এলে আমরা ফিসফিস করতাম, মনগুলাগাছ এসেছে।

মেঘের ধোঁয়া সরে পাহাড় একটু করে উঁকি দেয়। ধান চুরিয়ে কাঁধে নেওয়া লোকটা পাড়ার এক চাচিকে বলে, কান্তা ইরি ধানে বরকত বেশি, কিন্তু দিনাজপুরি পাইজাম মজা। তাই দুই খোন্দে দুই ধানের চাষ করি।

ছোটবেলার জামগাছটা আরো বুড়া হয়ে পুকুরে ঝুঁকে আছে। জাম খেয়ে জামগাছ থেকে পুকুরে ঝাঁপ দিতাম।

বৃষ্টির সুর শুনে উতলা হতো টিলার লালমাটি। লালমাটিতে কাদা ফুল ফুটত। সেই ফুল পায়ে মেখে এসে নানিকে দেখাতাম। নানি হেসে বলত, আমাদের এখানে রঙের বারো মাস।

রং নিয়ে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। হাঁসের মতো ভাসতে ভাসতে মিশে যেতাম সন্ধ্যার সাথে। নানা তখন হট্টিটি পাখি হয়ে এসে বলত, চাষার বেটা, চল মোষের পিঠে চড়ে ঘুড়ে বেড়াব। এ কথায় দ্রুত উঠে যেতাম। নানা আমাদের নিয়ে ঘরে ফিরত। আমরা চায়ে ভিজিয়ে করই খেতাম। মহিষের পিঠে চড়ে যাওয়ার সময় যে রকম দুলুনি থাকে, করইয়ের শব্দ তেমন। অথবা মেহেদি ধুয়ে এসে হাতের রং দেখে খালার মুখে যে হাসি ফুটত, ওই রকম।

উঠানে একটা মেহেদিগাছ আছে। ওটা রোপণ করার সময় নানি ব্লেড দিয়ে তালু কেটে গাছের গোড়ায় রক্ত দিয়েছিল। এতে নাকি পাতার রং গাঢ় হয়।

নানি থাকত চুলায়। কড়াইয়ে শিমের বিচি ভাঙত আর তার মেহেদি মাখা হাত রঙিন ফুল হয়ে বাতাসে দুলত। ফুলের দুলুনি দেখা বা বিচি খাওয়ার অপেক্ষায় নানার গল্প শুনে যেতাম।

৩৫.
মা যেন বউছি খেলার বউ। চাঁড়া দিয়ে আঁকা গোলাকার ঘরে বসে আছে। চোখে-মুখে সতর্ক দৃষ্টি। তার দলের ঘরে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছে। ফসল ভরা মাঠ ও গোয়াল ভরা গরুর স্বপ্নের মতো একটা সুযোগ চায়।


ধর্মের একটা রূপ পাওয়া যায় মাইজভাণ্ডারে। মাইজভাণ্ডারে কে আসে? উত্তর হলো, সবাই আসে।


খেলোয়াড়রা বোলানি দেয়, পুকুরে শোলমাছের আশপাশে ফুসকুড়ি তোলা পোনার মতো ঘোরে। মানুষের আওয়াজ পেয়ে কিংবা কাকের ডানা ঝাপটানিতে শোলের পোনা ডুব দেয়। বোলানির সুরে খেলোয়াড়রাও তেমন ডুব দেয়। এই সুযোগে মা বিকালের আলোর মতো লম্বা হয়ে শাঁ করে নিজেদের ঘরে চলে আসে। কেউ তাকে ছুঁতে পারে না। তারা জয়ী হয়।

উঠানে ধানের পাড়া দেখলে যে আনন্দ হয়, খেলোয়াড় মা সে রকম আবেশে চোখ বোজে। ভাবে, কানামাছি খেলবে। একজনের চোখ বাঁধা হবে, অন্যরা নেচে নেচে ছড়া কাটবে, কানামাছি ভোঁ ভোঁ/ যারে পাবি তারে ছোঁ। দল বেঁধে হৈ চৈ করে এদিক-ওদিক দৌড়াবে, চোখ বাঁধা খেলোয়াড়ের ছোঁয়া থেকে বাঁচতে চেষ্টা করবে।

মা কতকিছু থেকে বাঁচতে, আমাদের বাঁচাতে চেষ্টা করে! কিন্তু লড়াই করে ক্লান্ত কানামাছির মায়ের ঘুম পায়। মা যেন ঘুমমাছি খেলছে। খেলতে খেলতে ছোটকালে চলে যায়।

তখন জ্যৈষ্ঠ মাস। প্রচণ্ড গরম। কাঁঠাল পেকে টসটস। মানুষের মনও পেকে যাচ্ছিল। এ সময় এক রাতে চারপাশে চিৎকার শোনা যায়। মশাল জ্বালিয়ে দা-কুড়াল, খন্তা যা আছে নিয়ে বের হয় লোকজন। কিন্তু কেউ বাঘটাকে খুঁজে পায় না।

পরদিন সকাল। মানুষ স্বাভাবিক কাজকর্ম করতেও সাহস পাচ্ছে না, আবার না গিয়েও পারছে না। মহিষ ও গরুর অস্বাভাবিক আওয়াজ শুনে নানা লম্বা ঠুইট্টে দা নিয়ে গোয়ালঘরের দিকে যায়। নানি চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে জড়ো করে।

গোয়ালে গিয়ে দেখে ভাঙা বেড়ার ওপাশে ও দাঁড়িয়ে আছে। খিদে পেলে পেটে যেমন আওয়াজ হয় তার চোখগুলো সে রকম। বুক কাঁপলেও নানা সরে না। সবাই চিৎকার করে। একজন কোত্থেকে ঢোল এনে বাজায়। তারা হৈ হৈ চিৎকার দেয়, ভেঙায়, আক্রমণ করছে এমন ভঙ্গি করে।

একসময় বাঘটা পিছু হটে। সবাই তাড়া করে। মানুষের দল আরো ভারি হয়। টিলা পেরিয়ে বড় পাহাড়টা পার করিয়ে দেয়। সেই বাঘ আর আসে নি। হয়তো রাঙামাটি বা খাগড়াছড়ির গভীর জঙ্গলে তার হাড়গোড় এতদিনে মাটির সাথে মিশে গেছে। সেই মাটিতে অনেক গাছও জন্মেছে। নদীর স্রোতে কোনো গাছের একটা-দুটা ফল ভাটিতে তাদের এলাকায় এসেছে। কেউ কেউ কুড়িয়ে খেয়েছেও।

মায়ের মনে হয়, তার বাবাও এ রকম কুড়ানো কোনো ফল খেয়েছে। বাবার শক্তি ও সাহসে কখনোই কমতি দেখে নি। তাই মা সারা জীবন নানার সাহস-শক্তি নিজের ও সন্তানদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছে।

জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে এসে কত বাঘকে মরতে হয়েছে। মা চায় না, শক্তি, সাহস ও খাদ্য হারিয়ে তার সন্তানেরা মৃতের মতো থাকুক। বেদমার মতো বেঁচে কি কোনো লাভ আছে?

মায়ের মধ্যে প্রায়ই নানার শক্তি ও জিদ দেখি। মা কোনোকিছুর শেষ না দেখে ছাড়ে না। আমিও ছাড়ব না। জ্যৈষ্ঠের মধুফলের সুবাসে পৌঁছে যাব স্বপ্নে। স্বপ্নের কাছে পৌঁছতে হয়তো গরমে সিদ্ধ হতে হবে, কিন্তু পরোয়া করি না। লাঙলের ফলায় ফালা ফালা করে দেবো। মনা ভাইয়ের মতো বুক ভরে নেব, মন ভরে নেব। আমি যাবই।

কোথায় যাব সেটা মনা ভাই জানে। তাই কখনো অস্থির হলে বা দুশ্চিন্তা করলে হাত নেড়ে বলে, আমার সামনে থেকে যা তো। মনে অশান্তি নিয়ে বেঁচে লাভ কী?

মনা ভাই অন্তরে আলো জ্বেলে রাখে। দুপুরে কিংবা মাঝরাতে গলা ছেড়ে গায় : নৈরাশ করো না বাবা ভাণ্ডারী/ নৈরাশ করো না।

ভাই বলত, ওরে আমিন, আগে দিবি গরুকে ঘাস, তারপরে করবি চাষ, পাবি সুখ পরাণের পাখি।

সুখ পরাণের পাখি যেন চিনিগুঁড়া। চিনিগুঁড়ার গাছের মতো একটু কাত হয়ে, চালের খুশবু হয়ে পথ চলে মনা ভাই।

বিকালটা খালপাড়ের গাছপালার আড়ালে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হওয়ায় চারদিক ভেজা। লোকটা আইলে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। তার চেহারাও ভেজা ভেজা। পায়ে একটা-দুটা মশা বসেছে। জমির পানির দিকে তাকিয়ে মনা ভাইকে শাহ সাহেব হুজুরের কথা বলে, আমি একবার গিয়েছিলাম বাবার কাছে। আমাকে দেখে বললেন, যা, এক প্যাকেট সিগারেট আন। সিগারেট নিয়ে গেলে বললেন, যা যা, দক্ষিণে যা। দক্ষিণে মানে শহরে গেলাম, উন্নতিও করলাম।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, এখন নিজের দোষে সব হারিয়ে কামলার কাজ করছি। বউটা খরচে, কোনো আড় নাই, বিচার বিবেচনা নাই। ঘরের বউ ঠিক না থাকলে মুসিবত।

মনা ভাই তখন নিজের বউয়ের কথা ভাবে। তার বউটা কলাপাতার মতো একেবারে সরল।

বাঁশডুয়ার বাঁশপাতার খোলে কালো আল থাকে, যা হাতে হুলের মতো ঢুকে যায়। তুলে না ফেললে বা হাত না ধুলে যায় না। কখনো বউয়ের মধ্যেও ওই আলের মতো কিছু দেখা যায়। তখন তার চোখের যে জ্যোতি, সেই আলোয় তা তুলে ফেলে।

ভাবিকে দেখি আবার যেই সেই। প্রকৃতি কোথাও খালি রাখে না। বুবু আমাদের মধ্যে বড় জায়গা দখল করে ছিল। বিয়ের পর তা খালি হয়ে গিয়েছিল। বড় ভাবি সেই জায়গাটা পূরণ করেছে। ভাবি এখন মায়ের পেটের বোনের মতোই।

মনা ভাই লোকটার কথা শুনে শেষ বিকালের কাক বা টিয়ের মতো উড়ে কোথায় চলে যায় কে জানে! ধানের চারা লাগানোর পর মাটির সাথে শিকড়ের সখ্য হয়। কেউ তা দেখে না। মনার মন কোথায় যুক্ত হলো বোঝার উপায় নেই। তার চোখের দিকে তাকালে আষাঢ় মাসের বৃষ্টি দেখা যেতে পারে। যে কেউ ওখানে ধুয়ে নিতে পারে মন।

এ সময় যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ধর্ম কার জন্য? সে বলবে, কেন, মানুষের জন্য! বলবে, আমাদের এখানে যারা ধর্ম মানে, তাদের অনেকে ধর্মের মূল বিষয় থেকে সরে যাচ্ছে।

ধর্মের মূল বিষয় কী?

মনা ভাই বলবে, মানবিকতা। ধর্মের একটা রূপ পাওয়া যায় মাইজভাণ্ডারে। মাইজভাণ্ডারে কে আসে? উত্তর হলো, সবাই আসে। বাবা কাউকে নিরাশ করেন না, তবে চাইতে জানতে হয়। কেন আসে? সবাই কিছু পেতে আসে। কী পেতে চায় তারা? ঘুরে-ফিরে একটাই অর্থ হতে পারে, তারা শান্তি চায়।


বকটার লম্বা ঠোঁটে জাদুর কাঠি। কাঠি দিয়ে ছোঁয়। আমি সোনালি ধানের ছড়ার মতো হয়ে যাই। পাকা ধানের খুশবু ছড়িয়ে পড়ে।


শান্তির রূপ দেখি বড় ভাইয়ের মধ্যে। কারো পেছনে না লাগা, ঈর্ষান্বিত না হওয়া, সবার ভালো কামনা—মাইজভাণ্ডারের স্মরণ নিয়ে ভাই ধর্মের এই শিক্ষা পেয়েছে। ওখানে যাওয়ার পর থেকে তার চোখ খুলে গেছে। লোভ কী জিনিস, তার মধ্যে দেখি নি। তাকে আমার ফেরেশতা মনে হয়। তবে মাঝে মাঝে বিরক্ত হই। এত ভালো হলে দিন-দুনিয়া দেখবে কে?

দিন-দুনিয়া আমার কাছেও মাঝেমধ্যে ফালতু লাগে। তখন আলপথ ধরে একা একা ঘুরে বেড়াই। ধান থাকলে ধানের চারা, না হয় নাড়া দেখি। মাটি আমাকে ডাকে। বিদেশে যাওয়ার চিন্তা বা চেষ্টা করতে ভালো লাগে না। ভাবি, এ-ই ভালো। কারো ক্ষতি না করে বাবার মতো চাষা জীবন কিংবা ভাইয়ের মতো ভাণ্ডারী জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়।

তখন মুন্নার কথা মনে পড়ে। সে বলেছিল, ফসল ফলানোর মধ্যে আদিম কালের আনন্দ লুকিয়ে আছে। হালচষা জমি, মাটির প্রতিটি কণায়, গন্ধে, ফসলে আনন্দের গান।

ভেজা মাটিতে পা মাখা, কাঁধে লাঙল নিয়ে গরুর পেছন পেছন যখন ঘরে ফিরি, আনন্দ নিয়েই ফিরি।

গরু লেজ নেড়ে মাছি তাড়ায় আর গরুকে গোসল করিয়ে, গোসল করে সেই মাটি পুকুরে মিশিয়ে দিই। মাটির গন্ধে মাছেরা কি পুলকিত হয়!

ভাবনার মধ্যে কোত্থেকে শালিক এসে কানের কাছে কিচকিচ করে। আমগাছে বসা দোয়েলটার গভীর কালো চোখের দিকে তাকাই। দোয়েলের চাহনি ও শালিকের পালকের রং দিয়ে ধানের গোলা বানাব। ওখানে রাখব বছরের ধান। এক পাশে আলাদা করে বীজধান রাখব।

শাদা বক ডানা মেলে উড়ে আসে। দেখি, ওটা বড় ভাই মনা। তার কথা বলা, চলা, তাকানো—সব বকের মতো হয়ে গেছে। বকটার লম্বা ঠোঁটে জাদুর কাঠি। কাঠি দিয়ে ছোঁয়। আমি সোনালি ধানের ছড়ার মতো হয়ে যাই। পাকা ধানের খুশবু ছড়িয়ে পড়ে। খুশবু থেকে জেগে ওঠে একটা মহিষ। মহিষটা শিং নেড়ে হাঁটে।


২১ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)