অন্যজন : ১

অন্যজন : ১
149
0

পর্ব- ১

আমার ছোটকাল ছিল পুকুরের পুবপাড়ের আমগাছের আমের মতো মধুর। আবার কিছুটা কাঠবিড়ালি খাওয়া। হাল চষতে চষতে বাবার হাঁটু পর্যন্ত কাদা জমত। কাদাপানি গড়িয়ে পড়ত। আমার শৈশব ছিল গড়িয়ে পড়া সেই কাদাপানির মতো। কখনো তা লাঙলের ধারাল ফলা হয়ে যেত। তখন কেঁচোর মতো নাচতাম বা শালিক হয়ে উড়ে গরুর পিঠে বসতাম। সেই শালিকটা মনের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে।

বাবার ঘাম আর মার বেদনা খেয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছি। মনের মধ্যে বাহাদুরি এসেছে। তাই এখন চাষ করতে ভালো লাগে না। ক্ষুধার্ত হাঁসের মতো ঠোঁটটা অল্প পানিতে ডুবিয়ে ফরফর করকর করতে চাই।

আমাদের পরিবারটা বড়। বছর বছর একটা করে ভাই অথবা বোনের সংখ্যা বাড়ত। লোকে বলত, বশর মিয়া ভালা গাই ফাইয়ি। এ কথা মার কানে গেছে, বাবা জানত আর পথে-ঘাটে হাস্যরস মিশিয়ে লোকজনকে বলতে শুনেছি। ছোটবেলায় ভাত খেতে বসলে প্রায় বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকতাম। এ রকম তাকিয়ে থাকার জন্য কতবার মার বকা খেয়েছি!

তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। বড় ভাই পশ্চিম আকাশে গোধূলি রঙের ঘর বানাচ্ছে। আমগাছের শিকড়ে তবলা বাজিয়ে ভাণ্ডারী ভক্ত মনা ভাই গায়, বানাইছ আজব এক মানুষ/ তার মধ্যে যত মায়া/ আছে তার নানান ছায়া/ ছায়ায় কেন মারো তির/ মনের মাঝে অনেক ভিড়/ ভিড় ঠেলে তোমার কাছে/ পৌঁছতে পারি না/ হায়রে যাব কেমনে কইয়া দাও না।


চিন্তা করছি বিদেশ যাওয়ার। সুযোগ পেয়ে বাবাকে বলি, কিছু একটা করো। কিন্তু তার মন গলাতে পারি না। বাবা আমার কথা শুনে চুপচাপ আবুল বিড়ি টানে। বিড়ি টানলে দুই গালে দুটা গর্ত হয়। সেই গর্তে গোবর লেপে দেওয়ার কথা ভাবি।


দুই ব্যাটারির টর্চ জ্বালিয়ে সেজ ভাই মঈন পুকুরপাড়ে হাঁটে। সপ্তাহখানেক আগে পুরনো ছাতার শিক দিয়ে কোচ বানিয়েছিল। এখন ওটা নিয়ে মেতে আছে। বিকালে বাচ্চা পাহারা দেওয়া শোল মাছকে কোচ মেরেছিল। শিকের খোঁচা খেয়ে পালিয়েছে। মাছটা ভেসে উঠতে পারে ভেবে দেখতে এসেছে।

উত্তর পাড়ার হারেছ পুকুরে ঢিল মারে। মঈন ভাই চমকে ওঠে। মাছে ঘাই মেরেছে মনে করে টর্চ মারে। তখন হারেছের হাসি শুনতে পায়। সেও হাসে। হাসতে গিয়ে তার মুখ বাঁকা হয়। বোবা হয়ে যাওয়ার পর সে স্বাভাবিকভাবে হাসতে পারে না। মুখ দিয়ে সবসময় হালকা লালা পড়ে।

ঘরে মেজ ভাই তোফেলের হাসি শোনা যায়। তার দাঁতগুলো ফেকাসে হলদে। তার হাসি, না হাসি একই রকম। আগে কাঠচেরাই, ধান চুরানো, কারো মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে পিঠা বা আম-কাঁঠাল পাঠানো—এসব করত। টাকা-পয়সা কিছু কামিয়েছে। তার বেশিরভাগ খায়রুলের বউ ও বড় চাচির কাছে জমা আছে। ওরা আবার অন্য জায়গায় টাকাগুলো লাগিয়েছে। প্রয়োজনের সময় তোফেল প্রায় টাকা পায় না। ইদানীং কাজের প্রতি তার অনীহা দেখা যাচ্ছে। গতকাল সকালে মদনের সঙ্গে কালা মুন্সিরহাটে ভিক্ষা করতে গিয়েছিল।

তোফেল ঘরে টাকা দেয় না, বউকেও দেয় না। মা মাঝেমধ্যে বলে, আমাকে দিস না ভালো কথা, তোর বউকে তো দিতে পারিস।

এটা তার তৃতীয় বউ। বউয়ের কথাবার্তা কাকের ডাকের মতো। তা শুনে লোকেরা দূরে সরে যায়।

সকালে তোফেল বাম্বুদের ঘরে গিয়ে বলেছিল, চইল দ।

বাম্বু অর্থাৎ হান্নান শাহ বলেন, চইল বাজারত।

ত্রিশ টাকায় বাম্বুদের নালা সাফ করেছে। এখনো দশ টাকা বাকি। হে হে করে বলে, দশ টিঁয়া দঅ।

হান্নান শাহকে পাড়ার সবাই আড়ালে বাম্বু ডাকে। কারণ তিনি সুযোগ পেলে লোকের পেছনে বাঁশ দেন। দেখতে ভালুকের মতো, দুই হাত ও মুখ মিলে তার থাবা তিনটা। হাঁটেনও ভালুকের মতো।

বাম্বু বাবার জেঠাত ভাই। ঝাড়ি মেরে তাকে তাড়িয়ে দেন। সে ঘরের পেছনে বাম্বুর বউয়ের কাছে যায়। ‘অ চাচি’ বলে ফিসফিসিয়ে ডাকে।

দুপুরে মসজিদের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে বাম্বুর বাপের ধমক খায়। পরিষ্কার করতে হয় কচুরিপানা।

খেজুরগাছটা পুকুরের দিকে ঝুঁকে আছে। কাঁটার দিকে তাকিয়ে বাম্বুর বাপ বলেন, জিন্দেগিতে তোরে নামাজ পড়তে দেখলাম না।

তোফেল দাঁত দেখিয়ে হাসে।

কে যেন বুদ্ধি দিয়েছিল। বিকালে বাজারে যায়। চোখ দুটা বড় বড় বলে তার ছেলেকে সবাই ভুতো ডাকে। তার জন্য পাঁচ টাকায় বাল্যশিক্ষা দরদাম করে।

সেই সময় বাম্বু চাচা তাকে দেখে গালি দিয়ে বলেন, পড়ালেখা গরি কচু হইবু।

রাতে এ কথা শুনে খুব রাগ হয়। ভাবি, বাম্বুর ঘাড় ভেঙে দেবো। ভাবতে ভাবতে হাঁসের মতো হাঁটি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ভিতু ছেলেটা গায়, আল্লারে আল্লা কিয়া করো/ আমি পাপীরে দয়া করো…

গান শুনে ভাবি, বাম্বুটা যদি ভালো হয়ে যেত, আমার মনে শান্তি আসত। আল্লাহকে বলি, ওর মন যেন আমাদের গাই গরুটার চোখের মতো হয়ে যায়।

বেশ কিছুদিন ধরে চিন্তা করছি বিদেশ যাওয়ার। সুযোগ পেয়ে বাবাকে বলি, কিছু একটা করো। কিন্তু তার মন গলাতে পারি না। বাবা আমার কথা শুনে চুপচাপ আবুল বিড়ি টানে। বিড়ি টানলে দুই গালে দুটা গর্ত হয়। সেই গর্তে গোবর লেপে দেওয়ার কথা ভাবি। আমাকে বিদেশ পাঠানোর মতো টাকা তার কাছে নাই। জমি বিক্রির পরামর্শ দিই। বাবা রেগে গালি দেয়। বলে, য্যা ন বুঝে মনে/ তারে বুঝাইবু কনে (কে)।

বড় চাচি ডাকে। তার বসন্তের দাগ ভরা মুখ দেখে হনহনিয়ে চলে যাই হালদা নদীর দিকে। এখন নিজেকে লুকানোর মতো আঁধার। পায়ে পায়ে গোল মোহাম্মদ বাড়ির ফরিদের দোকানে যাই। বাবার প্রতি রাগটা গল্পের ব্যাঙের মতো ফুলতে থাকে। ঢক ঢক করে এক গ্লাস খেয়ে ফেলি। আরো এক গ্লাস নিই। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বাম হাতে নাক ধরে দ্বিতীয় গ্লাস শেষ করি। ওয়াক থুু! চোলাই মদের গন্ধে মনে হয় নাকে পিঁপড়া ঢুকেছে, পেটে ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। গলা যেন আগুনে লাল করা লোহার চোঙা। ফরিদের ছেলেটা চানাচুর দেয়। গপাগপ কয়েক মুঠ খেয়ে একটু সুস্থির হই।


ছোটবেলায় সবাই আমাকে ‘মুতারা গাই’ বলে ক্ষেপাত। প্রায় প্রতিদিন বিছানায় পেশাব করে দিতাম। এ নিয়ে মার ছিল অনেক জালা। দোয়া পড়ে শোয়া, পানি পড়া খাওয়া, রাতে পানি কম খাওয়া—মা নানাভাবে চেষ্টা করত।


আমি ঘামি, ঘাম নয় যেন মদের ফোঁটা পড়ছে। ঘাম কমে গেলে প্রজাপতি হয়ে বাম্বুর মনে ঢুকতে চেষ্টা করি। তিনি ডানা ছিঁড়ে দেন। তখন ছেলেবেলার মতো হেঁটে বাবার সঙ্গে জমিতে যাই। ধানখেতের তদারক করি। মায়ের হাতে ভাত খাওয়ার যে আনন্দ সেভাবে আগাছা বাছি।

এলোমেলো পা ফেলে উঠানে এসে গোঙাই, গালি দেই। মা দৌড়ে এসে বুকে-পিঠে হাত ঘষে। বলে, অ পুত, তুর কী অইয়ি?

উপুড় হয়ে পড়ে যাই। মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হয় না। পরে শুনেছি, আমাকে কেটে ফেলার জন্য বাবা দা নিয়ে দৌড় দিয়েছিল। মনা ভাই ও ফজা তাকে আটকেছে। বাবা ঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল।

সেই রাতে মুখভর্তি ধুলাবালিসহ উঠানেই পড়েছিলাম। কেননা মাকে বাবা টেনে নিয়ে গিয়েছিল আর ভাইদেরও আমাকে ধরতে দেয় নি।

নতুন ধানে শিষ ভরে ওঠে। বাতাসে কার্তিকের গন্ধ। এ গন্ধ ফসল ভরা অগ্রহায়ণের গল্প বলে। নদীর পাড় ধরে হাঁটি। বাম্বুও দুই হাত পেছনে রেখে হাঁটছেন। তার রক্তচক্ষু দেখে চিংড়ি মাছের মতো দৌড়াই। বাম্বুর লোকেরা গাবের কষে কালো করা জাল দিয়ে আমাকে ধরতে চেষ্টা করে। না পেরে নিয়ে আসে প্লাস্টিকের কামান। তারা কামানে তেল মালিশ করে।

কামানের বদলে বাবা কিনে আনে প্লাস্টিকের জুতো। মা রাগ করে তা পানাভর্তি জলাশয়ে ফেলে দেয়। বন্দুক কেনার জন্য টাকা জমানোর কথা ভাবি। দুপুরে ভাত খেয়ে বাবা ঘুমায়। তার শার্টের পকেট থেকে টাকা চুরি করি। লুকিয়ে রাখি কবরস্থানের শুকনা পানার নিচে। বাবা প্রতিদিন নিজের ভাগ্যকে গালি দেয় আর মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। কয়েকদিন পর প্লাস্টিকের বন্দুক কিনি। বন্দুক চালিয়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করি। তারা হাতুড়ির আঘাতে মগজ বের করে হালদায় ফেলে দেয়। তখন আমি নদীর পানির মতো হয়ে যাই।

ডেকচি ঘষার আওয়াজে ঘুম ভাঙে। মা নিশ্চয় ছাই দিয়ে ডেকচি মাজছে। মনে হলো কে যেন ঘষে ঘষে ঘুমের ময়লা, মদের ময়লা তুলে ফেলছে। মদের ময়লা মুছে যাওয়ার আগেই বাবার হাঁকডাক শুনি। চমকে বিছানার দিকে তাকাই। নিশ্চয় মা ও বড় ভাবির কাজ। রাতে কোন ফাঁকে হয়তো তুলে এনেছে। তাদের জন্য শিশির জমা হয়। লুকোচুরি খেলার চোরের মতো উঁকি দিয়ে শীতের বাড়ি যাই। শীত আমার ঠোঁট ফাটিয়ে দেয়। জমা রাখা শিশির ঠোঁটে মাখি। শিশিরের ছোঁয়ায় শৈশবের রোদ ওঠে। জাম্বুরার বল নিয়ে স্কুলের মাঠে দৌড় দেই।

ছোটবেলায় সবাই আমাকে ‘মুতারা গাই’ বলে ক্ষেপাত। প্রায় প্রতিদিন বিছানায় পেশাব করে দিতাম। এ নিয়ে মার ছিল অনেক জালা। দোয়া পড়ে শোয়া, পানি পড়া খাওয়া, রাতে পানি কম খাওয়া—মা নানাভাবে চেষ্টা করত।

শীতের সকালে পেশাব করার পর ঝিম মেরে পড়ে থাকতাম। মা ডাকলেও সাড়া দিতাম না। সাড়া দিলে গালে চড় পড়বে, কান ধরে পুকুরে পাঠাবে।

মা বলত, তোরে নাস্তি ফাইয়ি।

মায়ের সাথে ফোকলা দাঁতের বুড়াটার কাছে প্রায় যেতে হতো। লোকটা আমার ভাগ্য গণাত, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলত। ঝামা ধরা কয়েকটা দাঁত বের করে বলত, তোর ছেলে সমুদ্র পাড়ি দেবে। সব ভালো লাগলেও ‘সমুদ্র পাড়ি দেওয়া’ ছিল মার অপছন্দ। বুড়ার কথার সাথে ছিটকে আসা থুতু নাকে-মুখে পড়ত। ফুঁ দেওয়ার সময় বাধ্য হয়ে তার মুখের গন্ধ হজম করতাম। মা প্রতিবার হাসিমুখে যেত, ফিরে আসত মুখ কালো করে। নদীতে ঢিল মেরেও সেই কালো মুছতে পারতাম না।

এখন মনের মধ্যে মদের গন্ধ। বড় ভাবি চুপি চুপি এসে কান টেনে দেয়। লজ্জা কাটাতে হাসতে চেষ্টা করি। কত কথা মনে পড়ে!

২য় পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)