হোম গদ্য উপন্যাস অন্যজন : ১৫

অন্যজন : ১৫

অন্যজন : ১৫
106
0

১৪ পর্বের লিংক

পর্ব- ১৫

২৫.
ভাবতে ভাবতে চারপাশে তাকাই। এখানে সারাদিন বন্দি জীবন। সূর্যের আলো দেখা যায় না। টিউবলাইটের আলোয় মেশিনগুলো চলছে। মেয়েদের শ্রমের গন্ধ, মেশিনের আওয়াজ, মানুষের কথা—সব মিলে আজব লাগত। বিরক্ত লাগলে কাছের মেশিনে সেলাই হওয়া কাপড়ের দিকে চেয়ে থাকতাম। কাপড়টা সামনের দিকে যাচ্ছে, ফোঁড়ে ফোঁড়ে গাঁথা হচ্ছে অনেক কাহিনি।

আমার তখন খড় দিয়ে মানুষ বানাতে ইচ্ছে করত। সামনে কাজ করা মেয়েটাকে মনে হতো ধানের মেয়ে। জানতে ইচ্ছে করত ওর কাহিনি। সে মেহেদি মাখা হাতে নিপুণভাবে মেশিনটা চালাত। মনে হতো, মেশিনের সাথে তার নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছে।

আমার ভালো লাগত। কল্পনা করতাম, বহুদূরে সুন্দর একটা গ্রামে মেয়েটার বাড়ি। সেখানে যাওয়ার পথে বিলের মাঝখানে রাস্তা আছে। রাস্তার দুপাশে সবুজ ধানখেত। সবুজের গন্ধ মেখে মেয়েটা বাড়ি যাচ্ছে। সঙ্গে তার বাবা। বাবার মুখ হাসি হাসি। কারণ অনেকদিন পর মেয়ের দেখা পেয়েছে। মেয়ের জন্য আজ মোরগটা জবাই হয়েছে।

সন্ধ্যার পর পরই মেয়েটা জানতে পারে, প্রিয় রাতা জবাই করা হয়েছে তারই জন্য। সে খুব মন খারাপ করে। মা, এটা কেন করলে? আমি কি মাংস খাওয়ার জন্য এতই পাগল! আমাকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারলে না? মনের দুঃখ মনে চেপে অনেকদিন আগে উঠানে রাজকীয় ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকা রাতাটার কথা ভাবে। কক কক করে কোনা চোখে তার দিকে তাকাত। তখন লালঝুঁটি নড়ত অপূর্ব ভঙ্গিতে।


মেয়েরা যখন সেলাই করে, মেশিনগুলো দ্রুত গতিতে চলে, মনে হয়, তারা ধান রোপণ করছে।


কিছুক্ষণের জন্য মেয়েটি মন খারাপ করে বসে থাকে। তখন হয়তো ভাবে, লালঝুঁটির নাচের মতো সুন্দর এক পুরুষ এসে তার সঙ্গে কথা বলবে। ছেলেটির সঙ্গে তার পরিচয় হবে, ভালোবাসা জন্মাবে। তারা একজন আরেকজনকে খুব ভালোবাসবে। একসময় তারা ঘরও বাঁধবে। ঘরের কথা ভাবতে ভাবতে ছোট ভাইটির দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাইয়ের একটা কথায় সে প্রাণ খুলে হাসে।

আমি আনমনা হয়ে নিজেকে তার স্বপ্নের পুরুষ ভাবছিলাম। সময়টা সন্ধ্যার দিকে গড়ায়। কিছু ভালো লাগে না। এটাকে খোঁয়াড় মনে হয়। ইচ্ছে করে, ছুুটে গ্রামে চলে যাই। খোলা বাতাস গায়ে না লাগলে, প্রাণ খুলে হাসতে, কথা বলতে না পারলে জীবনে আর থাকে কী!

মেয়েরা যখন সেলাই করে, মেশিনগুলো দ্রুত গতিতে চলে, মনে হয়, তারা ধান রোপণ করছে। সারা দিন এসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে কাজ করি। চাকরি আর ভালো লাগে না। মায়ের মুখটা মনে পড়ে, মনা ভাইয়ের গান শুনতে ইচ্ছে করে।

বাসা থেকে গার্মেন্টসের দূরত্ব প্রায় এক মাইল। বেশিরভাগ সময় হেঁটেই যাই। মেয়েরা লাইন ধরে হাঁটে। প্রায় প্রত্যেকের কাঁধে ব্যাগ। অনেকের হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। তখন মনে পড়ে ‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে’ কবিতাটি। মেয়েদের হেঁটে যাওয়াকে মনে হয় বাঁশির সুর। কোনো রাখাল জামগাছতলে বসে একমনে বাঁশিটা বাজাচ্ছে। তাদের হাসিমুখ, গল্পমুখ, দ্রুত হাঁটা আমার ভালো লাগে।

মার কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে এখন অনেক ভাবনা আসে। ভাবনাগুলো অগ্রহায়ণের কুয়াশা হয়ে দেওয়ানহাটের বাসার চারপাশে ওড়ে। উড়ে উড়ে মনে ঢুকে যায়।

কুয়াশা জমে একটি উঠান হয়। সেখানে হাতগুটি ও মার্বেল খেলি। খেলতে খেলতে ডেকে আনি গ্রীষ্মের দুপুরকে। সে কী রোদ! একেবারে রোদভাজা হই। রোদ আমাকে খরার বাড়িতে নিয়ে যায়। খরা বলে, তুই ধরা খেয়েছিস। আমাকে খোঁয়াড়ে বেঁধে রাখে। যেন আমি ধান খাওয়া গরু।

তখন ভাবনা পোকা হয়ে কাছে আসে। তারা বাঁশ দিয়ে টুলের মতো বানায়, সেখানে বসে। উত্তর পাড়ার ছালাম ও কালার বাপকেও নিয়ে আসে। আসেন সাহাব মিয়া। তিনি এবার সবচেয়ে বেশি জমি চাষ করেছেন। এ নিয়ে একদিন ছালাম ও কালার বাপের মধ্যে তর্কও হয়েছিল।

ছালাম বলে, বেশি চাষ করলেই ভালো চাষা হওয়া যায় না। খাঁটি চাষার থাকতে হয় আক্কেল। মাটি ও চাষের নাড়ি-নক্ষত্র বুঝতে হয়। বোঝাটাই আসল কথা। যা তোমার মনের মধ্যে আছে, সেটা তুমি জমিতে ঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারবে। তোমার মনে হাসি থাকলে জমিও হাসবে।

সবুজ ধানগাছের পাশে একটা খালি খেত। কেসের কারণে জমিটাতে চাষ করা যায়নি। কয়েক বছর ধরে খালি পড়ে আছে। ওখানে শাদা ফুল ফুটে আছে। ফুলের নাম তারা জানে না।

রাস্তার পূর্ব পাশে বাম্বুর একটা জমিতে একাশিগাছ লাগানো হয়েছে। ছালাম বলে, মানুষটা যেমন সন্ত্রাসী, গাছও লাগিয়েছে তেমন। বেটা মরা মানুষের ছা।

তার কথায় সবাই হাসে। সে সন্ধ্যার পশ্চিমাকাশের দিকে তাকায়। অদূরে টেক্সির গ্যারেজ। তারা চা আনিয়েছে। প্লাস্টিকের কাপে সবাইকে দেয়। চা খেতে খেতে চাষের সেইসব দিনের কথা মনে করে, যখন সে ছিল চাষের রাজা।

সবাই গল্পগুজবে মেতে ওঠে। আগে চাষবাসে কত মজা ছিল। এত সার ও হাইব্রিড ছিল না। চাষটা হতো নিরিবিলি। জমিতে ভালো করে গোবর ও ছাই দেওয়া হত।

ছালাম বলে, ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে। অনেক সুখ ছিল তখন। চাষ করো, ফসল তোল আর খাও। এখন ফসল বেড়েছে, অভাবও সমান তালে বেড়েছে। সেই বাড়াটা প্রতিদিন লাঙলের ফলা দিয়ে গুঁতায়।

আমি ভাবি, মাটি যদি তার শক্তি হারিয়ে ফেলে! এ রকম আশঙ্কা প্রায়ই মনে উঁকি দেয়। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, মাটি এত অত্যাচার কতদিন সইবে? অত্যাচার বলছি এই কারণে, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, মাটিকে আমরা এক খোন্দের জন্যও ছাড় দিই না। প্রতিনিয়ত চাষ আর চাষ। তার কি বিশ্রামের দরকার নাই? দেওয়ার যেমন শেষ আছে, নেওয়ারও তো শেষ আছে। অত্যাচার কেউ বেশিদিন সহ্য করতে পারে না। সে মানুষ হোক কিংবা মাটি।

বইয়ে পড়েছি, মাটি সর্বংসহা। মাটির সাথে মাকেও তুলনা করা হয়। নিজেও তা দেখেছি। ইদানীং মনে মনে মার মুখের দিকে তাকাই। দেখতে পাই মা অনেক ভেঙে গেছে। আগের সেই মুখ, শক্ত শরীর আর নেই। তার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে।

সারা দিন এলোমেলো ছিল মনটা। রাতে দুটা খেয়ে ঘুমাতে যাই। আজ অসম্ভব গরম পড়ছে। শরীরটা ছটফট করে। নিচে পাটি বিছিয়ে শুই। মরার মশাও শান্তি দিচ্ছে না। এর মধ্যে ঘুম-জাগরণ একাকার হয়ে যায়। দেখি বাবা ও ফজা ধান রোপণ করতে গেছে। বড় ভাই ও তোফেলও গেছে। সবাই লাইন ধরে ধান রুয়ে ঘরে আসে। একদিন, দুদিন, পাঁচদিন যায়, ধানগাছ সবুজ না হয়ে ফ্যাকাসে হয়। দশদিনের দিন দেখা যায় গাছ মরে গেছে। বিলে সবার জমিনের একই অবস্থা। আবার বীজতলা তৈরি, জালা ফেলা, বড় করা, রোপণ—সে তো ম্যালা ঝামেলা। সেই ঝামেলাও তারা চ্যালেঞ্জ হিশেবে নেয়। কিন্তু কয়েকদিন পর দেখা যায়, আবারও ধানগাছ মরে গেছে। মাটি কিছু বলছে কিন্তু কেউ তা শুনতে পাচ্ছে না।

সবাই মিলে মিলাদ পড়ায়, জমিতে গিয়ে দোয়া-দরুদ পড়ে। হুজুর পানি পড়া দেয়, বাড়ি ও জমি বন করায়। কিন্তু কিছুতে কিছু হয় না। সবার কান্না দেখে আমিও কাঁদি। কাঁদতে কাঁদতে স্বপ্ন ভেঙে যায়।

চিটা ধানে শূন্যতা নিয়ে আশপাশে তাকাই। মনে হচ্ছে, পাশে ফজার ভারি নিশ্বাস শুনতে পাচ্ছি। আমার কিছু ভালো লাগে না। উঠে পেশাব করতে যাই। শহরের আকাশের দিকে তাকাতে চেষ্টা করি। আকাশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল। আকাশে কি এখন তারা আছে? আকাশে তারা থাকুক বা না থাকুক, মনের মাঝে তো তারা ফুটতে দিতে পারি।

শুতে শুতে ভাবি, বড় আলসে হয়ে গেছি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে কালই বাড়ি চলে যাব। ফজার সাথে পাল্লা দিয়ে জমি চষব। মাটির বুকে ঢুকাব লাঙলের ফলা। লাঙলের গুঁতায় মনও সোজা হয়ে যাবে।

জমি বলবে, চাষ কর, তা না হলে খাবি কী? বাঁচবি কিভাবে? আমার বুকে শস্য ফলালে আমি নতুন করে জেগে উঠব।


এ কথায় যেন মৌচাকে ঢিল পড়ে। বাম্বুর বউ মৌমাছি হয়ে হুল ফোটাতে শুরু করে। সন্ধ্যার আঁধার ভয় পেয়ে পাতার আড়ালে লুকায়।


২৬.
ক্লাস ওয়ান, ক্লাস টু পড়ে ক্রমে উপরে উঠেছি। সমাজেও তেমন ক্লাস আছে। ক্লাস ওয়ান, টুর চেয়ে তা ভয়ানক। পড়ালেখা একটু করেছি আর মুন্না ভাইয়ের কারণে তা বুঝতে পারি।

বলা হয়, চাষা খাসা। কিন্তু সমাজে সম্মান নাই। তাই চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে বলি, জীবনে উন্নতির পথ খুঁজে নিতে হবে।

কেন চাষবাস, শেকড় ছেড়ে বহুদূরে মরুর দেশে যাওয়ার জন্য উতলা হয়েছি; সেই কথা কাউকে বলি নি। তবে তার একটা বড় কারণ হান্নান শাহ। বাম্বু একদিন আমাকে লাথি মেরেছিল। সেই কথা জীবনে ভুলব না। তার চোখে সেদিন টাকা ও ক্ষমতার দম্ভ দেখেছি। আমাকে সে ছুঁচো হিশেবে দেখেছে, তা-ও ভুলতে পারব না। তাছাড়া এদেশের আলো-হাওয়ায় বেঁচে আছে হারামজাদাটা, এখানেই তার সবকিছু; তবু দেশটাকে সহ্য করতে পারে না।

বাম্বুটা বেশিরভাগ সময় ভালো ভালো কথা বলে। জানি, খারাপ মানুষ ভালো কথা বেশি বলে। সে যখন ভালো কথা বলে, তখন ইচ্ছে হয় তার মনটা খুলে দিই। লোকে দেখুক সে কেমন।

এক সন্ধ্যার কথা মনে পড়ছে। বাম্বুর বউ বলল, সব ভুলে রূহ সাফ করে ফেলেছি, তবু মানুষের কাছ থেকে মুক্তি নাই। তাদের জন্য অনেক করেছি, কিন্তু নাম নাই। মানুষের গুঁতানি, হিংসা দেখলে চল্লিশ রাত ঘুম হয় না।

তখন পাখিরা বাসার দিকে যেতে শুরু করেছে। কয়েকটা টিয়ে তার আফসোস শুনতে শুনতে উত্তর দিকে উড়ে যায়। আপনমনে কথা বলে সে, মানুষ তো এখন হিংসা করবেই। মানুষকে একবার খুঁজলে আমাকে খোঁজে দশবার। মানুষ তো টিটকারি মারবেই। মানুষ ‘অইয়ি’ কথা বলে, ‘গেইয়ি’ কথা বলে না।

এদিকে মা মঈনকে গালি দিয়ে মানুষের বাচ্চা রাখে না। কথা প্রসঙ্গে বলে, মানুষ পাগল নয়, হুঁশের পাগল। বাম্বুর বউকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলা।

এ কথায় যেন মৌচাকে ঢিল পড়ে। বাম্বুর বউ মৌমাছি হয়ে হুল ফোটাতে শুরু করে। সন্ধ্যার আঁধার ভয় পেয়ে পাতার আড়ালে লুকায়।

বাম্বুর বউ বলে, কইলে কথা বাড়ে। কেন আমি গেলাম, ওমা কেউ কথা বলে না। মানুষের মুখ বাঁকানি, ফিসফিসানি সব দেখেছি। আমরা দেইখ্যা ঘরের বিবি। আমাকে দেখে কেমন করবে ঠাহর পায় না। চুলুবুলুতে পড়ে গিয়েছিল।

দক্ষিণ পাড়ার একটা বিয়েতে মা-চাচিরা কেউ তার সঙ্গে কথা বলে নি। সেই ক্ষোভ এখন ঝাড়ছে। তাদের ঘরে ডিশে হিন্দি গান চলছে। তার চিৎকারে সুর চাপা পড়ে।

মা চুপ করে থাকে। মাগরিবের আজান দিচ্ছে। বাম্বু বউকে চুপ করতে বলেন। তখন বউ বলে, মাহাবু সেদিন এসেছিল। পুরনো কথা সব বলেছে। তুমি নিজের বউকে প্রতিবাদ করার সুযোগ না দিয়ে উল্টা গলা চিপে দিচ্ছ। তুমি দশজনের বিচার করো, নিজের বিচার করতে পারো না।

মা মনে মনে বলে, আল্লাহ তার মুখ বন্ধ করো। আমার আর ভালো লাগছে না।

পরদিন সকালে আবার শুরু হয়। বিরক্ত হয়ে শফি ভাই বলল, আল্লাহর ওয়াস্তে তোমার মুখে এবার ক্লিপ দাও। এত বেশি বাহাদুরি দেখানো ভালো না। বলে বাজারে চলে যায়।

এ কথা শুনে বাম্বুর বউ তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। মুখে বিষ মিশিয়ে বলে, আমি তার কবর পর্যন্ত গিয়ে পিটাব। ও কেমন বাপের জনম, কেমন মায়ের ছেলে দেখে নেব। বিচার ডেকে ওকে জুতার মালা পরাব। না পারলে আমার শান্তি হবে না।

সেই সকালবেলা শুরু হয়েছিল, এখন আসর ওয়াক্ত। চারদিকে আজান দিচ্ছে, রোদের আলো মরে আসছে। কিন্তু তার কণ্ঠ এতটুকু স্তিমিত হয় নি। আগে একবার ফোনে কথা বলেছিল। এখন আবার দুবাইয়ে বড় ছেলের সঙ্গে কথা বলে। ‘শইফ্যের’ বিচার চাই, পাঁচজন দিয়ে বিচার করে ওর গলায় জুতার মালা পরাতে চাই। ওর কেমন সাহস, আমাকে মুখে ক্লিপ আটকাতে বলে!

দুপুরে মেজ ছেলেকেও ওভাবে বিষিয়ে দিতে চেয়েছিল। গতকাল মায়ের সঙ্গে তার অনেকক্ষণ ঝগড়া হয়েছিল। আজ মার বিষ-কথা শুনে বলে, য়িতেরে কাডি ফেলন দরকার।

রাতে বড় ছেলেকে আবার ফোন করে। বলে, আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, তোরা এমন পয়সা কামাবি, সবাই যেন তোদের পায়ের নিচে থাকে।

এদিকে সন্ধ্যায় বড় চাচি আমাদের ঘরে আসে। রান্নাঘরে পিঁড়িতে বসেছে। মা পান দেয়। পান মুখে দিয়ে চাচি বলে, তার জ্বালায় তার মা বিষ খেয়ে মরতে চেয়েছিল। সে চাচ্ছে চাচাত ভাইদের মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে। শাবানার তখনো বিয়ে হয় নি। একবার ঝগড়ার সময় ওকে বলেছিল, মেয়ের বিয়ে দিতে পারে না। তোর মাকে কুত্তর গু পানির সাথে মিশিয়ে খাইয়ে দে।

ছোট বোন প্রাইমারি স্কুল থেকে গম পেয়েছে। মা রুটি বানাচ্ছে। ফজার জ্বর এসেছে, পেটও ব্যথা করছে। মা বলে, ওর মুখ মুখ না, দাঁড়াশের চেয়েও ভয়ংকর।

একটু পর হাজেরা টিউবওয়েল থেকে পানি নিতে এসে চাচি ও মাকে দেখে ঘরে ঢোকে। জানায়, তার মা অসুখে মরে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ দেখছে না।

এ সময় পুকুর থেকে হাঁস উঠে আসে। বাম্বুর বউ তৈ তৈ করে হাঁসকে ডেকে ছোট ছেলেকে গালি দেয়, সারা বছর মাস্টারের কাছে পড়ে তোরা বিয়াদব হচ্ছিস। পড়াব না, গ্যারেজে ঢুকিয়ে দেবো। কালি-ঝুলি মেখে ভুত হবি।

পিঠের লোম ওঠা সাত বাচ্চার মা কুকুরটা দুধের বাঁট নেড়ে বাম্বুদের গোলার নিচে যায়। পাগলা চাচাত ভাই পুকুরের পুবপাড়ের গাছটা দেখিয়ে বলে, মা, বরুনা গাছে বরুনা ধরেছে।

ওটা কার্তিকের ফুলে ভরা ছাতিম। মাছরাঙার ঠোঁটে মাছের মৃত্যু দেখতে দেখতে সবাই হাসে। ঠাট্টার রসগোল্লা খাওয়ার মতো হাজেরা বলে, ওটা হলো মিষ্টি গাছ, যা মিষ্টি খেয়ে আয়।

বাম্বুর বউয়ের ম্যারাথন ঝগড়ার কথা আশপাশের বাড়িতেও ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলমাঠে গল্পদাদারা এ নিয়ে হাসাহাসি করে।

কোমরে লুঙ্গির উপরে বাঁধা রশির গিঁট খুলে লাল মিয়া বিরক্তি প্রকাশ করে, বেঁচে থাকতে আর ভালো লাগছে না। তার চোখ-মুখ কুঁচকানো, ভ্রুতে পোকা বসেছে। রশিটা রেখে গল্পদাদাকে জিজ্ঞেস করে, সোনা বজলের মেজবান খেতে গেছিলি?

ঠাইস্যের নাতির মেজজান?

লোকের ধারণা, সোনার ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সোনা চোরাচালানের কাজও করেন। তাই তার নাম ফেটেছে সোনা বজল। না হয় এত টাকা হয় কিভাবে? সুযোগ পেয়ে গল্পদাদা বজলের সম্পদগুলো খেজুর কাঁটায় গাঁথে। তারপর ঘাটাপুকুরের পানিতে ভিজিয়ে বজলকে শাঁ করে তুলে নেয় ঠোঁটের আগায়।


দাদা হাসে। তার হাসিটা হলুদ আমপাতার মতো ঝরে পড়ে। বলে, একটা সময় ছিল, যখন দুই হাতে চাষ করতাম, ফসল ফলাতাম। 


দাদা জানায়, ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় বজলের দাদার ভাতের হোটেল ছিল। এলাকার লোকেরা খেতে গেলে বলত, ঠাসি খা, ঠাসি খা। দেশি ভাইদের পেট ভরে খেতে বলা থেকে নাম ফাটল ‘ঠাইস্যে’। তার নাতি এখন পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ায়।

লাল মিয়ার চুল, দাড়ি, ভ্রু পুরো শাদা। তাকে সবাই ডাকে ‘টমেটো’। তবে শুনলে খবর আছে। সাথে সাথে পাকা টমেটো ফেটে যাবে, বিচি ও রসের মতো সেখান থেকে গালি বের হবে। সেই গালিতে উদ্ধার হবে চৌদ্দগুষ্টি।

সন্ধ্যার অন্ধকারে যেন বিষণ্ন তার ছায়া। সেদিকে তাকিয়ে বুড়া অনেকবার বলা কথাটা পুনরায় বলে, বাম্বুর বাপের কাছে কিছু টাকা পাইতাম…।

গল্পদাদা হেসে বলে, ওটার জন্য তোমারে নবাব সিরাজদ্দৌলার কাছে বিচার দিতে হবে।

বুড়া বলে, চাইতে লজ্জা লাগে।

কালো মুরগি পাতার টালে ঝিমায়। কাপড়ে সুই দিয়ে ফুল তোলার সময় মার চোখ যে রকম থাকে, মুরগিটার চোখও তেমন। গল্পদাদা হেসে বলে, ভরার চেয়ে খালি ভালো যদি জল ভরিতে যায়।

কলসি নিয়ে মসজিদের পুকুরে যাওয়া পাড়ার এক নাতনিকে এ কথা বলে। নাতনি মুখে উড়না দিয়ে হাসে। দাদা বলে, লাল মিয়া, একটা কথা মনে পড়ে গেল।

কী?

আমার দাদা কি বলত জানিস? বলত, এত সুফলা একটা দেশ, কিন্তু চাষার ভাগ্য খুলতে দেখলাম না।

গলায় সুর এনে বলে, শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি/ একদিন দুইদিন থাকতাম পারি/ তিনদিনের দিন ঝাঁটার বাড়ি।

পুকুরে ভেসে উঠে বহুদিনের পুরনো একটা তেলাপিয়া। ওজন প্রায় দেড় কেজি। ওটা ডিম ছেড়েছে।

উত্তর পাড়ার শাহজাহানের ভাই মদ খেয়ে এসেছে। তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ইশারায় বলে, দশ টিঁয়ার খায় ল।

সেই কথায় কান না দিয়ে দাদাকে বলি, সারা দিন এত কথা বলো কিভাবে?

দাদা হাসে। তার হাসিটা হলুদ আমপাতার মতো ঝরে পড়ে। বলে, একটা সময় ছিল, যখন দুই হাতে চাষ করতাম, ফসল ফলাতাম। এখন সেই বয়স নাই। ছেলেদের টুকটাক সাহায্য করি। কিন্তু মন চায় আগের মতো থাকতে। হয়তো মনের চাওয়া কথা হয়ে বেরোয়। কথাই আমার কাজ, আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।


১৬ পর্বের লিংক

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প, ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প, ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]
বক মানুষের দেশে [গল্প, ২০১৭]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)