হোম গদ্য ইজিবাইক

ইজিবাইক

ইজিবাইক
697
0

ছুটিপুরের নিস্তরঙ্গ জীবনে ইজিবাইকের যুক্ত হওয়া খুব বেশি পুরনো ঘটনা নয়৷ আমরা তখন কিশোর৷ এইট পাশ করে নাইনে উঠেছি৷ পড়াশোনার বালাই নেই৷ সারাদিন ফুটবল খেলে বেড়াই৷ খেলার ফাঁক-ফোকরে কখনো যদি সুযোগ জোটে, পড়ি৷ না জুটলে পড়ি না৷ সে সময়কার গ্রামে পড়াশোনার তেমন চল নেই৷ প্রাইভেট-কোচিং আবিষ্কার হয় নি৷ বাবা-মা’রা সচেতন না৷ ছেলে রোজ সকালে গরম ভাত খেয়ে রাস্তায় কুলি ফেলতে ফেলতে বগলে বই নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে—এই পড়াশোনাই তাদের কাছে অনেক৷ আমাদের কাছেও৷ হাতে অঢেল সময়। এতটা সময় তো আর ঘাম ঝরানো ফুটবল খেলে পার করা যায় না৷ সম্ভবও না৷ আমরা আনন্দ খুঁজে বেড়াই৷ যাকে নিয়ে মগ্ন থাকা যায়৷ কিন্তু সেকালের গ্রামের আর দশটা জিনিসের মতো আনন্দেরও বড় অভাব৷ এর ভেতর হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করি, আমাদের একমাত্র খোয়া বিছানো রাস্তায় ইজিবাইক৷ প্যাসেঞ্জার বোঝাই ধুলো উড়িয়ে বাজারের দিকে ছুটছে৷আনন্দে আমরা হই হই করে উঠি—এই জিনিস কোনে ছিল এ্যাদ্দিন!

ইজিবাইক কোনোদিন দেখি নি আমরা এমন না৷ টাউনে গেলে দেদারসে দেখা হয়, চড়াও হয় এ-রোড থেকে ও-রোডে৷ কিন্তু এতদিন আমরা ভেবে এসেছি কারেন্টের চার্জে চলা তিন চাকার এই জিনিস বুঝি শুধুই শহরের গাড়ি৷ শহরেই তাকে দেখতে পাওয়া যায়৷ শহরে গিয়েই তার কোলে চড়তে হয়৷ সেই গাড়ি, শহরের সেই মূল্যবান গাড়ি যদি একদিন দুম করে আমাদের অজপাড়াগাঁয়ে চলে আসে আর প্যাসেঞ্জার বোঝাই করে উঁচুনিচু রাস্তায় হেলেদুলে চলতে থাকে, আমরা কিশোররা তো হইচই করবই৷ নাকি করব না!

আমাদের ক্লাসবন্ধু আবদুল, হ্যাঁ, আমাদের বন্ধুই সে৷ যদিও সে আমাদের বছর পাঁচেকের বড়৷ স্কুলে ভর্তি হয়েছিল দেরিতে৷ থ্রি আর ফাইভে ফেলের আশীর্বাদে দুই দুই চার বছর খরচা করে আমাদের ক্লাসে জুটে গেছে—পরদিনই সে ইজিবাইকের আগমনী রহস্য উদঘাটন করে ফেলে৷ এর আগে যেভাবে সে অনেক রহস্যের শিকড় উদ্‌ঘাটন করেছিল৷ এরপরেও যেভাবে অনেক রহস্যের শিকড় উদ্‌ঘাটন করবে—সেভাবেই৷

ইজিবাইকের যে মালিক তার নাম সাবদার৷ অচিরেই যাকে আমরা ইজিবাইক চাচা সম্বোধনে ডাকব। সেই ডাক শোনার জন্য আপনাদেরকে অবশ্যই আরো কিছুক্ষণ গল্পের সঙ্গে থাকতে হবে৷ ইজিবাইক চাচা সপরিবারে শহরের রেলের ধারে ঝুপড়ি বানিয়ে থাকত আর শহরে ইজিবাইক চালাত৷ সেই ঝুপড়িতে ছিল তার মোটামুটি সুখের সংসার৷ ঘর ভাড়া দিতে হতো না বলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটত দিন৷ বেশ টাকা-পয়সাও জমিয়েছিল৷কিছুদিন আগে সরকারি দলের এমপি রেলের ধারের সেই জায়গাটা দখলে নিয়েছে মার্কেট তৈরি করবে বলে৷ আর ইজিবাইক চাচা হয়েছে ঘরহীন৷ আমাদের গ্রামে ইজিবাইক চাচার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় আছে৷ সেই আত্মীয়র এক টুকরো জমি ক্রয় করে ঘর তুলে আমাদের গ্রামের নতুন বাসিন্দা হয়েছে ইজিবাইক চাচা৷ এখন থেকে সে আমাদের গ্রামে থাকবে৷ গ্রাম টু বাজার, বাজার টু গ্রাম ভাড়া খাটবে৷


ইজিবাইক চাচার এক যুবতী মেয়ে আছে৷ রোমানা৷ এই রোমানা নাকি এক নটি৷ সবাইরে দিয়ে বেড়ায়৷ উত্তেজনায় আমরা আবদুলকে ছাই দিয়ে ধরি—সবাইরে?


আমাদের গ্রামের সকল বাজারি কাজকর্ম সম্পন্ন হয় কমলাপুরে৷ কমলাপুর বেশ বড়সড় বাজার৷ শাক-সবজি, গোস-মাছ, ধানভানা কল থেকে শুরু করে গায়ের জামা, পায়ের জুতো সবই সেখানে পাওয়া যায়৷ এমনকি আশপাশের একমাত্র অভিজাত সিনেমা হল পান্না টকিজ, সেটাও এই কমলাপুরে৷ আর তাই আমাদের গ্রামের লোকদের প্রায়ই যেতে হয় কমলাপুর৷ ছুটিপুর থেকে কমলাপুরের দূরত্ব সাড়ে তিন কিলোমিটার৷ ভ্যানভাড়া পাঁচ টাকা৷ যাদের সাইকেল আছে তারা সাইকেলে যাতায়াত করে৷ যাদের সাইকেল নেই তারা পাঁচ টাকা খরচ করে ভ্যানে চড়ে৷ ভ্যানওয়ালাদের প্রায় সবাই আমাদের ছুটিপুরের। এই ভ্যানগুলোর সাথে নতুন করে যুক্ত হয় শহর থেকে আসা ইজিবাইক৷ ইজিবাইকের আবির্ভাবে দীর্ঘদিন থেকে সার্ভিস দিয়ে আসা পা-চালিত ভ্যানগুলো অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে৷ বাজারগামী লোকজন ইজিবাইকের জন্য মুখিয়ে থাকে৷ ইজিবাইক ভ্যানের চেয়ে তিনগুণ (গ্রামের মানুষের অনুমান) জোরে যায়৷ এই জিনিসে যাতায়াত করায় সাহেবি ভাব আছে। ভ্রমণ আরামদায়ক৷ অথচ ভাড়া সেই পাঁচ টাকাই৷ লোকেরা শুধু শুধু এত সুযোগ থেকে কেন বঞ্চিত হবে! অতএব, ভ্যান বাদ দিয়ে তারা কেবল ইজিবাইকের পেছনেই ছুটতে থাকে৷ ফলে ইজিবাইক চাচার পকেট ফুলেফেঁপে উঠতে লাগে আর দরিদ্র ভ্যানওয়ালারা শুকিয়ে মরতে থাকে৷ অবশেষে বাধ্য হয়ে ভ্যানওয়ালারা মাতবরদের কাছে যায়৷ ইজিবাইক তাদের কী সর্বনাশ করছে তুলে ধরে৷ মাতবররা গা করে না৷ কারণ, মাতবরদের ফিফটি মোটরসাইকেল আছে৷ তাদের ভ্যানেও চড়তে হয় না৷ ইজিবাইকেও চড়তে হয় না৷ এই মামলার সাথে তাদের কোনো যোগ নাই৷ অতএব তাদের কিছু করারও নাই৷ ভ্যানওয়ালারা মন খারাপ করে ফিরে আসে যে যার বাড়ি৷ আফসোস করে বলাবলি করতে থাকে—গরিব মানষির কতা কেও শোনে না৷

কয়দিন পর ভয়াবহ ঝড় হয় ছুটিপুরে৷ আশপাশের গ্রামগুলোতেও হয়৷ কয়েক জায়গায় কারেন্টের পুল ভেঙে পড়ে৷ গাছ ভেঙে তার ছিড়ে যায়৷ ছুটিপুরে পাঁচদিন কারেন্ট থাকে না৷ কারেন্ট থাকে না বলে ইজিবাইক চাচার ইজিবাইকও অচল পড়ে থাকে উঠানে৷ তখন ভ্যানের কদর বেড়ে যায়৷ কিন্তু ভ্যানওয়ালারা বড় অভিমানী৷ তারা স্ট্রাইক করে বসে৷ ইজিবাইক সমস্যার সমাধান না হলে ভ্যান নামাবে না রাস্তায়৷ বাজারগামী লোকজন বিপদে পড়ে৷ মরতে মরতে এই দুর্দিনে ফজল মাতবরের শ্বশুরবাড়ির মহিলা-আত্মীয় বেড়াতে আসে ছুটিপুরে৷ এসে তারা আর ফিরতে পারে না বাহনের অভাবে৷ তখন এই সমস্যার সমাধান করতে ফজল মাতবরকে এগিয়ে আসতে হয়৷ ফজল মাতবর আরো দুই মাতবরকে নিয়ে ভ্যানওয়ালাদের সাথে বসে৷ ইজিবাইক চাচাও সেখানে থাকে৷ আমরা না থাকলেও আমাদের বন্ধু আবদুল সেখানে থাকে৷ সে সবখানেই থাকে৷ মজলিসে সিদ্ধান্ত হয়—সাবদার অর্থাৎ আমাদের ইজিবাইক চাচা ছুটিপুর টু কমলাপুর ভাড়া মারতে পারবে না৷ ভাড়া খাটতে তাকে প্রতিদিন ভোরে চলে যেতে হবে বারো মাইল দূরের থানা শহরে৷ সেখানে অনেক ইজিবাইক আছে৷ তাদের সাথে ভাড়া খাটবে৷ ফিরবে সন্ধ্যায়৷ অবশ্য যাওয়া এবং আসার পথে ছুটিপুরের লোকদের আনা-নেয়া করা যাবে৷ ভ্যানওয়ালাদের পেটের দিকে তাকিয়ে ইজিবাইক চাচাকে এই কষ্টটুকু স্বীকার করতেই হবে৷ মজলিসের সিদ্ধান্তে আমাদের মন খারাপ হয়৷ মন খারাপ হয়, কারণ, গত কয়েক মাস ধরে আমাদের রঙচঙহীন ছোট্ট গ্রামটার জৌলুস খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল ওই ইজিবাইক৷

আমরা ইজিবাইক চাচাকে পথের ভেতর ধরি—ইজিবাইক চাচা, আপনের কি মন খারাপ?

আমরা মনে করেছিলাম, ইজিবাইক চাচার খুব মন খারাপ৷ শত হোক রিজিকের ওপর হামলা৷ অথচ আমাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে ইজিবাইক চাচা হো হো করে হেসে ওঠে৷ হাসতে হাসতে বলে—মন ক্যান খারাপ হবি! মাতব্বাররা তো আমার ভালো করেছে৷

—ভালো করেছে! আমরা বিস্মিত হই৷

—হ৷ গিরামের রোড ভালো না৷ গাড়ি খালি ঝাকি খায়৷ আমার কলজের মুদি কাঁপে৷ থানার রোড শানের মতো৷ ভাড়াও ম্যালা৷ গিরামে পড়ে থাকপ ক্যা!

ইজিবাইক চাচার এই খুশিতে আমরা হতাশ হই৷ হতাশ হই আর ভেতরে ভেতরে গজরাই—সব শালা স্বার্থের গুলাম! গাড়িখেন গিরামে চললি কত ভালো হতো! হতাশার ভেতর দিয়ে দিন কেটে যায় আমাদের৷ আমরা ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠি। আমাদের কারো কারো ঘুমের ভেতর মেয়ে মানুষ হানা দেয়। সেই খারাপ স্বপ্নের কথা বলাবলিও করি নিষিদ্ধ আনন্দে৷ এর মাঝে হঠাৎ একদিন খুবই চটকদার এক খবর নিয়ে হাজির হয় আবদুল৷ কী সেই চটকদার খবর? ইজিবাইক চাচার এক যুবতী মেয়ে আছে৷ রোমানা৷ এই রোমানা নাকি এক নটি৷ সবাইরে দিয়ে বেড়ায়৷ উত্তেজনায় আমরা আবদুলকে ছাই দিয়ে ধরি—সবাইরে?

—হুম, সবাইরে৷

ফস করে বলে ফেলি আমি—রুমানাও তাহলি এক ইজিবাইক৷ সবাই তার ওপর চড়ে৷ বলেই আমি লজ্জায় পড়ে যাই৷ বন্ধুরা হো হো করে হেসে ওঠে— চরম কইছিস দোস্ত!


অভিজ্ঞতা ছাড়া যে কোনো কাজে নামার আগে মানুষ একটু-আধটু নার্ভাস হয়৷ তবু আমরা ঠাট্টা করতে ছাড়ি না—শালা এখুনি এ্যাম্মা ঘামলি আসল কামের সুমায় কী করবি হে!


চর্মচক্ষে রোমানাকে দেখার জন্য আমরা ব্যাকুল হয়ে উঠি৷ ইজিবাইক চাচার বাড়ির পেছনে ঘুরঘুর করি৷ খুব সহজেই তার দেখা মিলে যায়৷ তাদের বাড়ির পেছনে হাতের তালুর মতো এক টুকরো জমিতে লালশাকের চাষ৷পরদিন বিকেলে দেখি রুমানা কোমর বাঁকা করে শাকে পানি দিচ্ছে৷ লাল রঙের সালোয়ার কামিজ পরা। ঠোঁটে পুরু লিপস্টিক। কাজের ফাঁকে গোপনে সে একবার আমাদের দিকে তাকায় বলে মনে হয়৷ আবদুল ছাড়া আমরা সবাই বয়সে তার ছোট৷ আর সেজন্যই বোধহয় আমাদের পছন্দ হয় না তার৷ একটু তাকিয়ে আবার সে কাজে মনোযোগ দেয় পেছন ঘুরে৷ আবদুল ফিসফিস করে বলে—দেখছিস, মাগির কোমর দেখছিস!

রোমানা যেহেতু বয়সে আমদের বড়, তাকে নাম ধরে সম্বোধন করা যায় না৷ এমন শিক্ষা বাবা-মা আমাদের দেয় নি৷ তাই আবডালে তাকে আমরা ইজিবাইক আপা বলে ডাকতে থাকি৷ কেননা তার বাবাকে আমরা ইজিবাইক চাচা ডাকি এবং রোমানা নিজেও একটা ইজিবাইক৷ অতএব সে ইজিবাইক আপা৷

মাসখানেক পর আবদুল আমাদের কাছে টাকা ধার চায়৷ তার ত্রিশ টাকার খুব দরকার৷ বন্ধুরা সবাই মিলে যেন ত্রিশ টাকার ব্যবস্থা করে দেই৷ প্রথমে আমরা টাকা দিতে অস্বীকার করি৷ কারণ, আমাদের হাতে টাকা থাকে না৷ স্কুলে যাওয়ার আগে টাকার বায়না ধরলে মায়েরা আঁচল খুলে আমাদের হাতে দুই টাকার নোট গুঁজে দেয় এবং সেই টাকা দিয়ে আমরা মশলা মাখানো আমড়া কিনে খাই৷ আমরা তখনো দুই টাকার পাবলিক৷ ত্রিশ টাকা কোথায় পাব! আবদুল তবু ছাড়ে না৷ সে কাঁঠালের আঠার মতো লেগে থাকে আমাদের পেছনে৷ বলে, আচ্ছা যা, ত্রিশ দিয়া লাগবিনেন, বিশ দে৷ দশ টাকা আমি নিজিই বেবস্থা করবনে৷

আমরা এবার বলি, আচ্ছা ক তো, এত টাকা দিযে তুই কী করবি আবদুল?

আবদুল জানায়—তার ইজিবাইকি চড়ার শখ হইছে৷

—ভালো কতা৷ ইজিবাইকির ভাড়া তো পাঁচ টাকা, ত্রিশ টাকা কী হবি!

আবদুল নববধূর লজ্জার হাসি হাসে—এই ইজিবাইক সেই ইজিবাইক না৷ এইডা হইল ইজিবাইক আপা৷ মানে রুমানা৷

আমরা এবার সত্যি সত্যি বাজপড়া তালগাছ হয়ে যাই—কয় কী ছ্যামড়া!

—হ, ঠিকই কই৷ তুরা আমার পিয়ারের দোস্ত। তুরা আমার এই শকখেন পূরণের বেবস্থা করে দে!

হামিদুল বলে, কিন্তু ত্রিশ টাকা কী জন্নি লাগবি?

—ত্রিশ টাকা রোমানার ইজিবাইকির ভাড়া৷ ভাড়া ছাড়া তার গাড়িতি উটা যায় না৷ একবের উটলি ত্রিশ টাকা৷

হামিদুল বলে, তার বাপ নেয় মাথাপতি পাঁচ টাকা৷ সে ত্রিশ টাকা নিবি ক্যান?

আমি বলি, ইজিবাইক চাচা এক সাতে ম্যালা মানষির গাড়িতি তোলে সেই জন্নি কম ভাড়ায় পুষায়ে যায়৷ কিন্তু ইজিবাইক আপা একসাথে ম্যালা মানষির তুলতি পারে না সেই জন্নি মনে হয় বেশি ভাড়া রাখে৷

আবদুল আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে—ঠিক ধরছিস৷ এই জন্নিই তুই ফাস্ট হইস পরীক্ষায়৷ এইবার আমার টাকাডা…৷

আমরা কতক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসে থাকি৷ আমাদের গালে হাত দিয়ে বসে থাকা দেখে অচেনা কেউ ভাবতে পারে—আমরা বোধহয় জীবন-মরণ কোনো সমস্যায় নিপতিত৷ কিন্তু আমরা জানি, এই সমস্যা আবদুলের জীবন-মরণ সমস্যা না৷ এটা তার শখ কিংবা নারী মাংসের লোভ৷ ভাবতে ভাবতে আবদুলের লোভ ধীরে ধীরে আমাদের ভেতরেও সংক্রমিত হয়৷ আমাদেরও ইচ্ছে করে ইজিবাইকে চড়তে৷ তবে আমরা বুঝতে পারি, আবদুল পারলেও আমরা পারব না। আমাদের সে বয়স হয় নি৷ অবশ্য আবদুলকে টাকা দিয়ে সাহায্য করে এই কাজের স্বাদ আমরাও পরোক্ষভাবে নিতে পারি। তাই আমরা বন্ধুরা বিশ টাকা জোগাড়ের মিশনে নেমে পড়ি এবং খুব শীঘ্রই সফল হই৷

ইজিবাইকে চড়ার রাতে বিকেল থেকে আবদুল ক্রমাগত ঘামতে থাকে৷ কারণ, ইজিবাইকে চড়ার পূর্ব-অভিজ্ঞতা তার নাই৷ আর অভিজ্ঞতা ছাড়া যে কোনো কাজে নামার আগে মানুষ একটু-আধটু নার্ভাস হয়৷ তবু আমরা ঠাট্টা করতে ছাড়ি না—শালা এখুনি এ্যাম্মা ঘামলি আসল কামের সুমায় কী করবি হে!

আবদুল রেগে গিয়ে আমার হাতে টাকা ছুড়ে দিয়ে বলে—তুই যা, দেখি তোর কতবড় কলিজা!


আমরা বারবার চোখ রগড়ে পানের বোরজের দিকে তাকাই। আমাদের শিকার আবদুল আর ইজিবাইক আপা যেন চোখ ফসকে না যায় কোনোভাবে।


ওই টাকায় যেন বিদ্যুৎ মাখানো৷ আমার হাত স্পর্শ করার সাথে সাথে কেমন ঝিনঝিনিয়ে ওঠে৷ আমি তাড়াতাড়ি টাকাটা আবদুলের হাতে গুঁজে দিয়ে বাঁচি আর বলি—আমার অতো শক নি৷ তুই যা গা!

কাজ হবে সন্ধ্যা একটু গাঢ় হলে হারু চাচার পানের বোরজে আবদুল ইজিবাইক আপার ঘরের পেছনে গিয়ে দুইবার হাততালি দেবে৷ আপা বেরিয়ে আসবে৷ তারপর আগে আগে আবদুল ঢুকে যাবে পানের বোরজে৷ পেছন পেছন ইজিবাইক আপা৷

আবদুল তো কাঁপেই, সন্ধ্যা নামলে আমরাও কাঁপতে থাকি উত্তেজনায়৷ আমরা যেহেতু টাকা দিয়ে সাহায্য করছি তাই আমাদের কিছু দাবি-দাওয়া আছে৷ আবদুল বলে—কী দাবি-দাওয়া?

আমরা বলি, হারু চাচার পানের বোরজের সাথে যে বাঁশঝাড়, কামের সুমায় আমরা সেখেনে থাকপ৷

আবদুল বলে, থাকতি পারিস, কিন্তু কুনু সাউন্ড করা চলবিনে৷ ধরা খালি সবার একসাতে মরা লাগবি৷ তাছাড়া রুমানা টের পালি মাইন্ড করবি। ওর মাইন্ড আবার খুব বেশি৷

আমরা বলি, আচ্ছা৷ আমরা কুনু সাউন্ড করব না৷

সন্ধ্যার পরপরই আমরা শিকারীর মতো ওঁৎ পেতে বসে থাকি বাঁশবনে৷ শুরু সন্ধ্যাতেই বাঁশঝাড়ের তলে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে৷ আমরা বারবার চোখ রগড়ে পানের বোরজের দিকে তাকাই৷ আমাদের শিকার আবদুল আর ইজিবাইক আপা যেন চোখ ফসকে না যায় কোনোভাবে৷ মশার কামড় খেতে খেতে আমরা অপেক্ষা করি৷ পাছার ওপর হুল ফুটিয়ে অসহ্য যন্ত্রণা দেওয়া মশাটাকে এক থাপ্পড়ে চ্যাপটা করতে যাব, তখনই দেখি আবদুল, পানের বোরজের উত্তরের বেড়া ফাঁক করে ঢুকে গেল৷ আর তার পেছন পেছন ওড়নায় ঘোমটা টানা রোমানা, আমাদের ইজিবাইক আপা৷ আমরা পরস্পরের মুখের ওপর হাত চাপা দিই—এই চুপ চুপ!

আমাদের নীরবতায় মশার ডাক যেন সশব্দে আছাড় খেতে থাকে৷ আমরা মশার ওপর বিরক্ত হই৷ কারণ, নিষিদ্ধ আওয়াজ শোনার আশায় আমরা বোরজের দিকে কান তাক করে আছি৷ অথচ মশার প্যানপ্যানানি সব ভণ্ডুল করে দিচ্ছে৷

ফয়সাল গলায় কৃত্রিম চিন্তা ফুটিয়ে বলে, চিন্তা করছি রে হামিদুল, আবদুলের পয়জনে পানগাছ মরে না যায়!

ফয়সালের কথায় আমরা না হেসে পারি না। আমাদের হাসি থামার আগে বোরজের ভেতর থেকে কেমন আওয়াজ ওঠে৷ আমরা আবারও চুপ চুপ বলে কান খাড়া করি৷ কান খাড়া করার সাথে সাথে আওয়াজও কোথায় যেন মিলিয়ে যায়৷

ভেবেছিলাম ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হবে৷ ওমা! দশ মিনটি যেতে না যেতেই দেখি ইজিবাইক আপা, খুব দ্রুত অথচ পায়ে কোনো শব্দ না তুলেই বোরজ থেকে বেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাড়ির দিকে৷ বুঝি, এই নিঃশব্দ হাঁটার ক্ষমতা একদিনে হয় নি। দিনে দিনে হয়েছে। আমরা হা করে তাকিয়ে থাকি আবছা অন্ধকারে নড়তে থাকা তার পেছনের দিকে৷ ইজিবাইক আপা আমাদের দৃষ্টি থেকে মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের হুশ হয়৷ ত্রিশ টাকার শোকে আমরা হায় হায় করে উঠি৷ এত অল্প সময়ে ত্রিশ টাকার মেয়াদ শেষ হয়ে গেল! অথচ টাকাটা জোগাড় করতে বাড়িতে কত বড় বড় মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে আমাদের!

একটু পর হাতির মতো হেলেদুলে বের হয়ে আসে আমাদের হিরো আবদুল। উইকেট পাওয়ার পর বোলারকে যেমন ঘিরে ধরে বাকি খেলোয়াড়, উল্লসিত আমরাও সেভাবে ঘিরে ধরি আবদুলকে৷ যেন সে মাত্রই মস্তবড় উইকেট ফেলে এসেছে৷ আমরা কাছাকাছি হতেই আবদুল টান মেরে গায়ের গেঞ্জি খুলে ফেলে৷ পাখা বানিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাতাস খেতে থাকে৷ ঘামে ওর গা চপচপ৷

হামিদুল বলে, এত জলদি হয়ে গ্যাল!

আমি বলি, ক্যাম্মা লাগল রে!

ফয়সাল বলে, ফুল তিরিশ টাকাই নিল? কম টম কিছু করল না!

আবদুল আমাদের কারোর কোনো প্রশ্নের জবাব দেয় না৷ বাতাস খেতে খেতে সে বরং পাশ কাটায়—আইজ খুপ গরম রে৷


সে যা জানায় তা এমন এবং তা আমাদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়—রোমানার বড় খদ্দের হলো মাতবররা৷


সেই যে আবদুল আমাদের পাশ কাটায় তারপর থেকে সে পাশ কাটাতেই থাকে৷ আমরা তাকে ধরি, ছাই দিয়ে ধরি, জিগের আঠা দিয়ে ধরি, সে হাত ফসকে বেরিয়ে যায়৷ শেষমেশ আমাদের সন্দেহ হয়—সেই রাত্তিরে আবদুল আসলেই কি কিছু কত্তি পারিসলো!

দিন যায়৷ গ্রামের মানুষের আলোচনায় ইজিবাইক আপা ক্রমেই পাখা বিস্তার করে৷ শুধু আমাদের আড্ডায় না, সবখানেই তার নাম—রোমানা৷ নামের সাথে বিশেষণ হিশেবে যুক্ত থাকে মাগি অথবা খানকি অথবা অন্যকিছু৷ যার যা বলার রুচি৷ আমরা যেমন বলি ইজিবাইক৷

অচিরেই ছুটিপুরের ধার্মিক মানুষেরা রোমানা ইস্যুতে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে৷ রমজান হাজীর নেতৃত্বে নামাজিদের একটা দল মাতবরদের সাথে বৈঠকে বসে৷ তারা প্রস্তাব রাখে—রোমানার বাপের ইজিবাইক যেভাবে গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, সেইভাবে এই নষ্ট মেয়েটাকেও গ্রামছাড়া করা হোক৷ নয়তো চ্যাংড়া পোলাপানের ধ্বংস অনিবার্য৷

চ্যাংড়া পোলাপানের ধ্বংস যে অনিবার্য সেই ব্যাপারে একমত হয় মাতবররাও৷ রোমানাকে গ্রামছাড়া করতে তারা রাজি নয়৷ কারণ, মেয়ে মানুষ আর ইজিবাইক এক নয়৷ ইজিবাইক গ্রামছাড়া করা গেলেও মেয়ে মানুষকে গ্রামছাড়া করা যায় না৷ কাজটা অমানবিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ৷ তবে তারা মুসল্লিদের আশ্বস্ত করে—রোমানার বাপকে কঠিনভাবে সতর্ক করা হবে, তার মেয়ে যেন গ্রামের ভেতর নষ্টামি না করে৷

মুসল্লিরা অর্ধেক সন্তুষ্টি অর্ধেক অসন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে আসে যে যার বাড়ি৷ কিন্তু রোমানার নষ্টামি থামে না৷ দু’দিন পরপরই নতুন নতুন নষ্ট-কাহিনী আমাদের আড্ডাকে রোশনাই করে তোলে৷ আবদুল আমাদের আড্ডায় আর যোগ দেয় না৷ পথে ঘাটে দেখা হলে আর ইজিবাইক আপার কথা জিজ্ঞেস করলে সে বালকের নামতা পড়ার মতো মুখস্থ গালি দিতে থাকে রোমানাকে৷ আমরা তাড়াতাড়ি কানে আঙুল দিয়ে সেই গালি থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করি৷ স্পষ্টতই আবদুলের সাথে আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরে৷ তবু যখন দেখি মাতবরদের হুশিয়ারি সত্ত্বেও ইজিবাইক আপা তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে তখন আমরা বিস্মিত হই৷ কারণ, গ্রামাঞ্চলে মাতবররাই মানুষের প্রভু৷ বিশেষ করে দুর্বল মানুষের ওপর তাদের খবরদারি দিনের বেলা সূর্য ওঠার মতোই পরিষ্কার৷

তবু কোন সে খুঁটির জোরে ইজিবাইক আপা তার কাজে অবিচল থাকে! আমাদের তখন আবদুলের কাছেই ফিরে যেতে হয়৷ এর আগে প্রতিটা গোপন বিষয় জানতে যেভাবে তার কাছে ফিরে যেতে হয়েছিল৷ আবদুল প্রথমে বলতেই চায় না৷ ইজিবাইক আপার প্রসঙ্গ তুলতেই সে গালাগালির বিষে বাতাস দূষিত করে ফেলে৷ অনেক অনুনয় বিনয়ের পর সে মুখ খোলে৷ সে যা জানায় তা এমন এবং তা আমাদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়— রোমানার বড় খদ্দের হলো মাতবররা৷ এর আগে রোমানার বাপের ইজিবাইক মাতবররা নিষিদ্ধ করেছিল, কারণ, মাতবরদের মোটর সাইকেল আছে৷ রোমানার বাপের ইজিবাইকে চড়ে বাজারে যাওয়ার কোনো গরজ তাদের নেই৷ কিন্তু রোমানা এমন এক ইজিবাইক, তাতে না চড়লে মাতবরদের রাতের ঘুম ম্যাড়ম্যাড়া হয়ে যায়৷ তাই নিজেদের প্রয়োজনেই রোমানাকে জল-হাওয়া-খাবার দিয়ে পরিচর্যা করে যাচ্ছে মাতবররা৷ যতদিন না আরেকটা রোমানা তৈরি হয় ততদিন এই পরিচর্যা চলতেই থাকবে।

আবদুলের বড়দের মতো কথায় আমরা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে থাকি৷ এবং এটা বুঝতে পারি, হারু চাচার বোরজের সেই আধো রাত আধো সন্ধ্যার ঘটনার পর থেকেই আবদুল কেমন বদলে গেছে৷ কেমন অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে গেছে৷ ওকে আর আমাদের বন্ধু বলে মনে হয় না এখন। হতভম্ভভাব কাটলে সুযোগ বুঝে আবার আমরা সেই পুরনো প্রসঙ্গ তুলি—রুমানারে সেই রাত্তিরি কিছু কত্তি পারিসলি, আবদুল?

আমাদের প্রশ্নে আবদুল তার ভাণ্ডারে সঞ্চিত গালাগালির বস্তার মুখ খুলে দেয়৷ আজ আর আমরা কানে আঙুল দিই না৷

 

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৯৪; কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)