হোম গদ্য ইচ্ছার স্বাধীনতার দিওয়ানা ‘আমি’ কই?

ইচ্ছার স্বাধীনতার দিওয়ানা ‘আমি’ কই?

ইচ্ছার স্বাধীনতার দিওয়ানা ‘আমি’ কই?
274
0

মহাপ্রকৃতিতে বিধান (Lawfulness of nature) কার্যকর থাকার তথ্য মানবজাতি জেনেছে বহু আগে। বিধানগুলো মানুষের আচরণে প্রভাব রাখে, নিয়ন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিত সামনে আনে। তবু এইটুকু বুঝবার/ বলবার সাধ্য আছে যে, মানুষেরা নিজে নিজে কিছু করবার সীমিত স্বাধীনতা (Free will) পায়।

এই সীমিত স্বাধীনতা দিয়ে ব্যক্তি মানুষ বা সামষ্টিক মানুষ বস্তু জগতের (physical world) মর্ম বা তত্ত্ব-টত্ব, মানে বস্তুর ধর্ম বা গুণ বের করে দেখাতে পারছে কি না, তার কিঞ্চিত খোঁজ নেয়া যেতে পারে।

ধরা যাক, বিজ্ঞানি আইনস্টাইন ই= এমসিস্কয়ার পাওয়ার উদ্দেশেই কি সমীকরণ করেছিলেন?

উত্তর, নাহ।


বস্তুর যে কোনো মর্মমুখী চিন্তা (Essential thought) ধারাবাহিক বিবর্তন পদ্ধতির আওতাভুক্ত এবং চিন্তাগুলো অন্য চিন্তার অংশ বিশেষ।


“He didn’t arrive at his famous equation by complex mathematical reasoning. In fact, he didn’t use mathematical or scientific reasoning at all!” (‘How Einstein arrived at e= mc2’ by Mort Orman, M.D.)

গ্যালিলিওর ‘রিলেটিভিটি প্রিন্সিপল’ এবং সমকালের ফিজিক্সের নানা অগ্রগতির পাঠ নিয়েছিলেন আইনস্টাইন। আর তিনি ধাঁধা প্রহেলিকা পছ্ন্দ করতেন। একটা প্রহেলিকা তাকে পৌঁছে দেয় ই= এমসিস্কয়ার তত্ত্বটির কাছে। সেই প্রহেলিকাটি হলো :

‘If a person was flying in space at the speed of light (ala Superman) with his/ her arm fully outstretched holding a facial mirror, what would they “see” in the mirror? Would they see their face? Would it be bigger or smaller than if they were stationary? Would it be distorted in any way? Would light waves have time to bounce off their face, hit the mirror, and bounce back to their retina which was also moving at the speed of light? And what if an observer was watching all this from the ground. What would he or she see?’ (সূত্র : প্রাগুক্ত)

এই প্রহেলিকা—এই ধাঁধা, ভাঙবার জন্য তিনি দশ বছর পিছে লেগে থাকেন। সমকালের অনেক মাথাঅলা পদার্থবিদদের সাথে চিন্তা শেয়ার করেন। চিন্তায় এসে চিন্তা মিশে। প্রশ্নোত্তর ভিড় করে। এরপর, প্রতিদিন এই ধাঁধা ভাঙবার জন্যে নানা প্রকার অনুমান ভিত্তিক হিশেব করেন, দশ বছরের মাথায় একদিন—

”he took this assumption—that the speed of light was a constant—and he returned to the mathematical and electromagnetic equations that were worked out years before. He then plugged in the letter “C” (a constant) to represent the fixed speed of light (whatever it might be) and low and behold… Out Popped E= MC2 !!” (সূত্র : প্রাগুক্ত)

তিনি রচনা করলেন মাত্র তিন পৃষ্ঠার দলিল, যার মধ্যে তিন/ চারটি ছোট ছোট অঙ্ক। সবশেষ সমিকরণটি বের হলো ই= এমসিস্কয়ার। এই সমীকরণ মানবজাতিকে জানিয়ে দিল—যাহা বস্তু তাহাই শক্তি। আইনাস্টাইন নিজেই তত্ত্বটির সমীকরণের সমাধান দেখে বিস্মিত হন।

বিস্মিত হলেন কেন?

যার হাতে বের হলো তিনি বিস্মিত কেন? যারা আবিষ্কারটি দেখল তারাও বিস্মিত। সকল প্রকার বিস্ময়ের ভেতরে থাকে—’আরে কী এই!

‘আইনস্টাইন তার potential for free will ব্যবহার করে ধাঁধা নির্মাণ এবং জবাব খুঁজেছেন দশ বছর। যখন E= mc2 পেলেন, তিনি কি বিস্মিত হলেন এইজন্যে যে, এই অসাধারণ হিশাবের মর্ম এভাবে সামনে হাজির হবে তা তার জানা ছিল না? সেটা পেয়েছেন বটে by means of the power of sufficiently concentrated thought. এই যে পাওয়ার বা শক্তি মানে, একই সাথে তিনি পেয়েছেন এবং শুধু তিনি কর্তৃক পাওয়া হয় নি, এই রকম একটা ব্যাপার দেখা যায় না? বহু পদার্থবিদের নানামুখী বস্তুগত মর্ম চিন্তার সম্মিলন বিশ্লেষণ এই তত্ত্ব প্রাপ্তির পেছনে নয় কি? যে-বিশ্লেষণ তাকে চিন্তার একাগ্রতা এনে দিয়েছে।

এই কথা, এই চিন্তা গ্যালিলিও এবং কোপার্নিকাস কর্তৃক আবিষ্কারগুলোর ব্যাপারেও খাটে। ফলে Individual doer বা ব্যক্তি-আমি’র কর্ম পরিচ্ছন্নভাবে খুলেমেলে ধরে ফেলা যায় কি?

দেখা যায়, বস্তুর যে কোনো মর্মমুখী চিন্তা (Essential thought) ধারাবাহিক বিবর্তন পদ্ধতির আওতাভুক্ত এবং চিন্তাগুলো অন্য চিন্তার অংশ বিশেষ। আর এই চিন্তা পদ্ধতির কাঠামোটির শুরু কবে, কিভাবে, তা মানবজাতির জ্ঞানের বাইরে নয় কি? ফলে বিষয়টি টোটালি ব্যক্তির চিন্তা (Individual’s thought) বলবার/ বুঝবার সুযোগ থাকছে কি? ‘আমার চিন্তা’ বলা মাত্র সেটা রাজনৈতিক বিবৃতি পাঠ হয়ে যায় না? তাতে অন্যের চিন্তার ধারাবাহিকতায় আসার ব্যাপারটা চাপা দেয়া হয় না?

তাহলে, ব্যক্তির সীমিত ইচ্ছার স্বাধীনতার মাধ্যমে জগৎমণ্ডলের তত্ত্ব প্রাপ্তি এবং উন্নতি বা পরিবর্তন সাধন হয় কি? কিংবা এও কি ভাবা যায় যে, বিনাশ বা নির্মাণেও কেবল ব্যক্তি নাই, আছে সমষ্টির হাত? কিন্তু ‘আমি মনে করি’ ‘তুমি মনে করো’ ‘সে মনে করে’ ইত্যাদি বলতে হয় ভাষা দিয়ে চিন্তা ফরম্যাট করতে বা যোগাযোগের খাতিরেও বলা যায়। নইলে ভাষা মানুষের আচরণের খেলা জমাতে পারবে না। যেমন, সময়ের হিশাব বের করতে ‘বর্তমান কাল’ ধরতে হয়। কিন্তু ‘বর্তমান’ এক মুহূর্তের জন্যেও নাই। অন্তহীন চক্র গতিতে ভাগ করা সময়ের ভেতর ‘বর্তমান’ নাই। ঘড়ির কাঁটা শুধু অতীত থেকে চট করে ভবিষ্যতে পা রাখে। কিন্তু সেখানেও রাখতে পারে না। চট করে ভবিষ্যৎ অতীতে পরিণত। আবার ভাগ না-করলে শুধু ‘বর্তমান’ যার নাম ইটারনিটি বা চিরনিত্য। কিন্তু ভাগ করা সময়ের ভেতরে ধরা যায় না ‘বর্তমান’ অথচ ধরতে হয় আছে। এর ভেতরে জীবন যাপন।

পিঞ্জরের পাখিটা পিঞ্জরের ভিতরে ইচ্ছে মতো চৌদিকে ঘোরাফিরা করতে পারে, টুকটাক উড়াল দিতে পারে। পিঞ্জরের পাখির এই সীমিত স্বাধীনতা আছে। আর পিঞ্জরের বাইরে, ঐ যে উড়ে বেড়ায়, এই বন থেকে ঐ বনে যায়, ঐ পাখিদের উড়বার স্বাধীনতা কতটুকু? একটা সীমা এরকম যে, তাদের ডানাতে যতটুকু উড়তে পারবার ক্যাপাবিলিটি আছে, ততটুকু উড়তে পারবে, এর বেশি না। আরেকটা সীমা হলো, বায়ুমণ্ডলের স্পেস তাদের উড়বার স্পেস, এর বাইরে—পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের গণ্ডির বাইরে—আউটার স্পেসে গিয়ে তাদের ওড়াউড়ি নাই। পৃথিবীর গ্রাভিটির বাইরে, নিউট্রাল স্তরে ডানা না ঝাপটালেও ভাসবে শূন্যে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রাণীগুলো তাদের ইচ্ছার ব্যবহার করে। শুধু গৃহপালিত প্রাণীগুলো বন্দিদশায় না, বনের প্রাণীরাও মুক্ত অথচ স্বেচ্ছা বন্দিদশায় আছে। ওরা নিজেরাও কেউ কেউ হিশেব করে তৈরি করে নিজস্ব এলাকা। এবং এর ভেতরে থাকতে চায়। মানুষও জানে অমুক বনের তমুক জায়গায় ওই প্রাণীটাকে দেখা যায়। ওরা সীমা লঙ্ঘন করে লোকালয়ে যখন তখন এলে তাদেরকে মসিবতে পড়তে হয়।

আমরা যে-ছায়াপথের সংসারে আছি, সে-ছায়াপথের এক ক্ষুদ্র গ্রহের নাম পৃথিবী। অভিকর্ষের দ্বারা পৃথিবী তার পৃষ্ঠের সবকিছুকে ধরে রেখে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণে মগ্ন আছে। সুনির্দিষ্ট দুই গতি—আহ্নিক আর বার্ষিক। সুনির্দিষ্ট গতিপথে ধরিত্রীর উৎফুল্ল বন্দিদশা উপভোগ করছে যেন-বা।

গাড়ি চালক তার নিজের গাড়ি বলেই যেমন খুশি তেমন চালাতে পারে ট্রাফিক আইন মাথায় রেখেই। সুনিয়ন্ত্রিত হয়ে গাড়িটা চলে স্বাধীনভাবে। চালকের এক পা ব্রেক অর্ডারে, দমে দমে সতর্ক সে।

মানে, স্বাধীনতার চিন্তার মাঝে সীমার চিন্তাও হাজির। স্বাধীনতার সীমা বা সীমিত স্বাধীনতা কেমনে-কেমনে হয় এসব। মুক্ত স্বাধীন যারা আছে এখানে ওখানে, তারা একেবারে বাধা বন্ধনহীন নয়। বাকস্বাধীনতা মানুষ চায় ভাষা বুননের শৃঙ্খলা মেনে নিয়েই। বাকরীতির শৃঙ্খলা না মানলে কথা যে অর্থবহ কথা হয়ে ওঠে না রে বন্ধু।

তাকাও দিকে দিকে। চান্স দেখবে, নিয়ন্ত্রণ-যে আছে সেটাও দেখতে পারতে হবে। তোমার শরীরে ইন-বিল্ট এলার্ম আছে। একটা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে, হ্যাঁ, একটা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে তুমি মুক্ত স্বাধীন। চয়েস করবার স্বাধীনতা তোমার যেটুকু, সেটুকু-যে নির্ধারণ করা, দেখতে পাও? পাও যদি তাইলে এটা বোধগম্য যে—

‘We are free, in control, and morally responsible for our choices and actions, because they are adequately determined.’


আপনার একটা ‘আমি’, আমার একটা ‘আমি’, সকলের একটা একটা ‘আমি’ ত দেখা যায়ই। প্রত্যেকটা ‘আমি’তে নানা বিভাগীয় ‘আমি’ও দেখা যায়। যায় না?


আপনি কার্যকারণসম্বন্ধ দেখবেন—ডিটারমিনিজম দেখবেন, আবার ইনডিটারমিনিজমও দেখবেন। আপনি হতভম্ব হবেন। আপনি অন্যের কাছ থেকে ভাষা শিখে, সেটা নিজের ভাষা দাবি করেন, আপনার একটা ভাষা-যে হয়ে ওঠে, তা-ও ঠিক। কিন্তু আপনার ভাষা ঠিক ঠিক আপনার ভাষা ত নয়। মিথ্যা কথা দিয়ে ‘সত্য কথা’ কয়ে-বলে ভবিষ্যতের দিকে যান। আসলে যান কি? যেতে যেতে অনন্তেই স্থির থেকে যান না? কিন্তু আপনার ‘আমি’ ইচ্ছার স্বাধীনতার জন্যে দিওয়ানা যে সে কই? আপনার একটা ‘আমি’, আমার একটা ‘আমি’, সকলের একটা একটা ‘আমি’ ত দেখা যায়ই। প্রত্যেকটা ‘আমি’তে নানা বিভাগীয় ‘আমি’ও দেখা যায়। যায় না?

ইচ্ছার স্বাধীনতা যে সীমিত এভাবেও দেখা যায়, নিজের গাড়ি যেমন খুশি তেমন চালাবার ক্ষমতা ব্যবহার করবার সময় রাস্তার সীমা এবং নিয়ন্ত্রিত গতির দিকে খেয়াল রাখতেই হবে। রাস্তায় চলতে থাকা অবস্থায় সতর্ক ড্রাইভ করা সত্ত্বে, নিজের ভুল না, অন্যের ভুলের কারণে আপনি দুর্ঘটনায় পড়তে পারেন। অন্যের ভুল কখনো আপনি টের পেয়ে বিপদ বুঝে নিজেকে রক্ষা করবার সর্বোত্তম উপায় অবলম্বন করতে পারেন। আবার কখনো এমন হয়, নিজের ভুল বা অন্যের ভুলের কারণে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা সম্ভব হয় না। ইচ্ছার স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারে না। ইচ্ছে করলেই কেউ পাখির মতো উড়তে পারে না। ইচ্ছে করলেই স্বাভাবিক মৃত্যুকে বহু বছর দূরে সরিয়ে দেয়া যায় না। নিজের ইচ্ছায় কোনো মানুষ এই পৃথিবীতে আসে না। আসতে পারে না। জনমের আগে তার কোনো ইচ্ছা নাই। আত্মহত্যা করতে পারে কিন্তু আত্মজনম দেয়ার তৌফিক নাই। মানুষ নিজেকে দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে মৃত্যু বরণের সম্ভাবনাকে নাকচ করতে পারে না রাজনৈতিক সদিচ্ছার দ্বারা। আবার বিমান দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে পারে কিন্তু সামান্য একটু পা পিছলে যাওয়ার কারণে কখনও মউত কবুল করতে হয়। আচ্ছা, এবার দেখা যাক একটু মনসুর হাল্লাজের ‘আমি সত্য’ এর ‘আমি’ এর খবর কি?

মনসুর হাল্লাজ নামে ইতিহাসে পরিচিত হওয়া খোদাভক্ত লোকটি বলেছিলেন :

‘আনা আল হক’। মানে ‘আমি সত্য’ বা ‘আমি আল্লাহ’। সে ‘আমি’ কি ব্যক্তি ‘আমি’? নাহ্।

খোদাপ্রেমে দিওয়ানা মানুষটির কথাটি গভীর অর্থবোধক ছিল। সাধারণ অর্থে দেখলে তৌহিদের খেলাফ, ঈমানের খেলাফ এ ধরনের কথা।

আসলে খেলাফ না—বিরুদ্ধে না ঈমানের, তৌহিদের। বরং ঈমানেরই একেবারে উঁচু পর্যায়ের ভাব প্রকাশ। তিনি মূলত বলেছিলেন—আল্লাহর ভালোবাসায় তিনি আত্মহারা। (the mystical annihilation (fanā’) of the individual ego.)

জালালউদ্দীন রুমি সেটা ব্যাখ্যা করেন এভাবে—

“এক সকালে, মানে, ভোরের একটু আগে, তারা দুজন—প্রিয়তম আর প্রিয়তমা ঘুম থেকে উঠে পানি খাইলেন।

প্রিয়তমা জিগাইলেন—
‘তুমি আমারে না তোমার নিজেরে বেশি ভালোবাস? ঠিক ঠিক কথাটা কও দেখি?

প্রিয়তম উত্তর দিলেন—
‘আমার নিজের বইলা কিছু নাই। আমি হইলাম রৈইদে ধইরা রাখা রক্ত-লাল রুবি পাথর।

এটা একটা পাথর নাকি একটা রক্তাভ দুনিয়া? এর মাঝে রৌদ্র প্রতিরোধের শক্তি নাই।

এইভাবে এই অর্থেই মনসুর হাল্লাজ সত্য বলেছেন—আনা আল হক।

রুবি আর সূর্যালোক একাকার।

সাহসী হোন আর নিজেকে সুশৃঙ্খল করুন। আর পুরাপুরি হয়ে যান শ্রবণ-শক্তি ও কান দুইই। আর পরেন এই সূর্য-রুবি এয়ারিং।

কাজ করতে থাকেন। আপনার কুয়া খনন কাজ চালাতে থাকেন।

কাজ বন্ধ করবেন না। পানি কোনো লেভেলে পেয়ে যাবেন।

নিত্যদিনের চর্চায় নিবেদিত থাকুন। আপনার আনুগত্য হলো দরজায় ঐ রিং। নক করতে থাকুন। শেষে অন্তরের আনন্দ একটি জানলা খুলে দিবে আর দেখবেন বাইরে কাকে দেখা যায়।” (দ্য এসেন্সিয়েল রুমি, কোলম্যান বার্কস)

(প্রসঙ্গত : মনসুর হাল্লাজের নাম হোসাইন বিন মনসুর আল হাল্লাজ। মানে তার নাম হোসাইন আর পিতার নাম মনসুর। কিন্তু তিনি ইতিহাসে মনসুর হাল্লাজ নামে পরিচিত। তিনি আব্বাসীয় খেলাফত আমলের সুফি শিক্ষক ছিলেন। পরে জালালউদ্দীন রুমি, হাফিজ, ফরিদউদ্দীন আত্তার প্রমুখ তার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আর রুমির চিন্তার প্রভাব পড়েছিল দার্শনিক হেগেল-র দর্শন চর্চাতে। হেগেল রুমিকে বলতেন ‘এক্সেলেন্ট রুমি’।

৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ বাগদাদে আব্বাসীয় আদালত রাজনৈতিক কারণে ভুল বুঝে দীর্ঘকাল বন্দি রেখে লোমহর্ষকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল। মনসুর হাল্লাজ রচিত উল্লেখযোগ্য বই ‘কিতাব আল তাওয়াসিন’, ‘দিওয়ান আল হাল্লাজ’।)

এই হলো ‘আমি’ নাই হওয়ার একটা হিশাব।

কিন্তু
‘আমি কী দেখিলাম জলের ঘাটে গিয়া না হরি লো/ আমার কুলে কালি লাগিল জল ভরা না হইল/ কাঙ্খের কলসি যায় ভাসিয়া না হরি লো/ কী দেখিলাম জলের ঘাটে গিয়া’

রাধারমণ দত্তের এই গানে, একজন ‘আমি’ কিছু দেখলেন মনোহর, যাকে দেখলেন, সেটি বিষয় না, একটা ‘আমি’ দেখার কাজ সম্পন্ন করল যে, সে ত কেউ, তারে আমরা দেখি কি? তারে আমি দেখি ও দেখি না দুইই একটা সত্য তাহলে বলা যায়?

জগতে ‘আছে’ আর ‘নাই’ দেখি আমরা। আবার ‘নাই’ অবস্থার মাঝে আছেও দেখি। নাথিং যে নাথিং না তাও দেখি। জাদুবিদ্যার মাধ্যমেও আছে আর নাই দেখি। জাদুকর সুকৌশলে নিজেকে বাক্সের ভিতর নাই করে ফেলে আমাদের চমক লাগান, আমরা সত্যিই নাই হওয়া দেখি। আবার তিনি যে নাই হন নাই, আছেন, সেটাও দেখি। এইরকম দেখাকে ম্যাজিক বলি, ভেলকি বলি, ইল্যুশনিজম বলি। সাধারণভাবে আমাদের চোখে দেখার মাঝে বিভ্রম যে আছে তাও দেখি। আকাশকে একটা বিশাল শামিয়ানা মনে হয়। আসলে ত অমন কোনো শামিয়ানা নাই। আকাশের দিকে যাইতে যাইতে যাইতে বহু দূরেরও অনেক দূর থেকে পেছনে ফিরে দেখলে দেখা যায় পৃথিবীটা আসমানে চাঁদের মতো।

মহাশূন্যে শূন্যস্থান নাই বিজ্ঞান বা বিশেষ জ্ঞানের নজরে আমরা দেখতে পাই। আমরা নানা ক্ষেত্রে শূন্যস্থান দেখাই, এর সাপেক্ষতা আছে। কোনো বাক্যের শূন্যস্থান মানে ঐ জায়গায় এক বা একাধিক প্রাসঙ্গিক শব্দ বিশেষ কারণে মুছে ফেলা হয়েছে। “একটি খালি চেয়ার আছে” মানে ঐ চেয়ারে কেউ বসে নাই বলেই ওটা খালি। এই খালিত্ব বা শূন্যতা কেউ না-বসার সাপেক্ষে। জায়গাটা ত আসলে খালি না, চেয়ার আছে, চেয়ারের শূন্যস্থানে চেয়ারের শরীর আছে।

তাইলে আমাদের নাথিং নির্ধারণের জ্ঞান কোনো বস্তু বা বিষয় সাপেক্ষে। টেবিলের উপর কিছুই রাখা ছিল না। আমরা তখন বললাম—”কিছুই নাই, নাথিং।” যখন কিছু রাখলাম, নাই-য়ের মাঝে ‘শাই’ এল। ‘শাই’ আরবি শব্দ, মানে কিছু একটা। এখানে আছে আর নাই এর দ্বৈততার জ্ঞান দেখতে পাই।

জগৎ বাস্তবতায় ডুয়েলিজম আছে দেখি। ননডুয়েলিটি-ও দেখি। ডিফল্ট বা এবসেন্স বা অনুপস্থিত অবস্থায় থাকাও দেখি। মানে, আছে কিন্তু নাই অবস্থায় আছে দেখি। এই দেখা চোখে দেখা না, জ্ঞানের আলোতে দেখা, যে দেখা মানে উপলব্ধিতে আসা।

এই যে আমাদের আছে আর নাই জ্ঞান, এটা আবার আমাদের দর্শনেন্দ্রিয় দ্বারা বুঝ পাওয়া সাপেক্ষে। মানে, চোখ দেখছে আছে, চোখ দেখছে নাই। ভুলও দেখে এই চোখ।

জালালুদ্দিন রুমি অন্তরের চোখে দেখলেন অস্তিত্বের আয়না অনস্তিত্ব। সাফ বললেন—

What is the mirror of being? Non-being. Always bring a mirror of non-existence as a gift. Any other present is foolish.

মানে কী? অনস্তিত্বে উদ্ভাসিত অস্তিত্ব? অনস্তিত্বে প্রতিবিম্বিত আমি? নাকি শূন্যতে আমি এক সপ্রাণ বস্তু প্রকাশিত সেই কথা? শূন্যস্থান পূরণ হয়েই মেনিফেস্টেশন হচ্ছে? মানে বিকাম (become) হচ্ছে নাথিং-এর অবস্থান থেকে? এই হওয়া আর না-হওয়ার মাঝে পূর্ণতা আর অপূর্ণতার পরিপ্রেক্ষিত দেখি আমরা।

তার আগে ভাবা যাক আয়না জিনিসটা কী?

যে জিনিসের সেল্ফ মেনিফেস্টেশন নাই, মানে নিজেকে দেখায় না, অন্যকে দেখায়। আয়না তেমন এক চিজ। আয়নার সামনে যাকিছু আসে তা প্রতিবিম্বিত হয়। আয়নার আমিত্ব নাই, আত্মঅহং নাই।

রুমি জানান, আপনার ক্ষতিকর আদত, আপনার ত্রুটি, অপূর্ণতা আপনার মনের আয়নায় দেখবার পর, পরম পূর্ণতার দিকে আপনার যাওয়া হলো শুরু। তিনি বলেন—

“An empty mirror and your worst destructive habits, when they are held up to each other, that’s when the real making begins. That’s what art and crafting are.”

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ক্যানারি পাখিটি তার প্রিয়তমাকে কাছে পাচ্ছে না বলে, সে নানা সুরে ডাকে, তার মাঝে দিওয়ানাপন আসে, বেকারার হয়, অস্থির হয়, তার ডাকে শিল্প ফোটে, শিল্পনৈপুণ্য প্রকাশ পায়, শ্রোতা দর্শক মুগ্ধ হয়। যখন সে তাকে পেল, আর তার ডাক নাই, মর্মস্পর্শী গান নাই, অপূর্ণতার হায় হায় নাই, শিল্প রচনা নাই।

আমি অপূর্ণ। আমি ইবলিসের মতো বলব কেন “আমিই উত্তম”? আমার বুঝ ষোলআনা নাই-ই। আমি আমাকে আয়নাতে দেখে, আমার জাহেরি বাতেনি ময়লা সাফ করে, আমি আয়না হয়ে ফিরে যেতে হবে তার কাছে। যেতে যেতে দেখব—আয়না আমি, আমার আমিত্ব নাই, আয়নাতে প্রতিবিম্বিত মুখও আমি। আমার মাঝে অন্য দেখে তার নিজকে, তাই ভালোবাসে আমাকে, তাই ভালোবাসা হয়। মানে, ‘আমি’ থাকে ‘তুমি’ এর ভিতরেও? এই রকম একটা জ্ঞানের সাথে আমাদের পরিচয় আছে।


‘আমি’ মানে কি আমার মস্তিষ্কে আরোপিত অন্য? তাহলে তো ‘আমি’ মানে অন্য! যে-‘আমি’তে অন্য আর ‘আমি’ একাকার হয়ে ভূমিকা রাখে জীবনে?


ওদিকে জ্ঞান ছাড়া মানুষের ইচ্ছা রচিত হয় না। মানে, তাকে জানলাম—এ ত অন্য রকম বিস্ময়, মনে হয় খুব মজার—এবার তারে কাছে আনো সখি ও সখা, ছুঁয়ে দেখতে মন চায়, পাইতে মন চায়, স্বাদ আস্বাদনের পর্ব বহিয়া যায়, যাক, তাকে আরো বুঝতে চাই। সে এক জ্ঞান।

আর যে-জ্ঞান ইচ্ছা উস্কে দেয়, সেই জ্ঞান নিরঙ্কুশ ত্রুটিমুক্ত না। ত্রুটিও শনাক্ত করা হয় প্রাপ্ত জ্ঞানের আলোকে। যেন জ্ঞানের ভেতরই ঘোরাফিরা জ্ঞান নিয়ে জ্ঞানতত্ত্বের (epistemology) ফয়সালা হবে কোন কালে কে জানে!

আমরা দেখি, ইচ্ছা যখন অসহায় হয়, তখন যেন তকদিরের খেলা স্পষ্ট হয়। ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে’ (কাজী নজরুল ইসলাম) এর ভিতর, মানে যখন খেলাটা এক অদ্বিতীয় ‘আমি’-র কুদরতি হাতে, সেখানে সৃষ্ট ‘আমিসকল’ এর ভূমিকাই-বা কী? এ প্রশ্ন ত আসেই।

আমরা এও দেখি, প্রখর ইচ্ছা কখনো উপসংহারে গিয়ে দেখে ফেলে নসিব। বলে, ‘নসিবে নাই, তাই পাওয়া যায় নি’। মাটির পুতুল যখন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নৃত্য করে নির্দিষ্ট জায়গায় স্বাধীনভাবে, তখন তার ভাগ্যের হিস্যাও দেখে ফেলে। পুতুল খুঁজতে থাকে—

‘কে তরে শিখাইল রাধা নামটি রে, শ্যামের বাঁশি/ রাধা রাধা রাধা বলে মন করলায় উদাসী রে, শ্যামের বাঁশী’।

কেন তার মাঝে অন্যের জন্যে পেরেশানি? সে কি এক খণ্ডিত আমি? পূর্ণ হতে চায়? ১ + ১ = ১ এর হিশাবে?

তাহলে জ্ঞান ছাড়া ‘আমি’ কই? ‘আমি’ একটা জ্ঞান, ভাষার জ্ঞান? আবার জ্ঞান সেও তো অন্য। ‘আমি’ মানে কি আমার মস্তিষ্কে আরোপিত অন্য? তাহলে তো ‘আমি’ মানে অন্য! যে-‘আমি’তে অন্য আর ‘আমি’ একাকার হয়ে ভূমিকা রাখে জীবনে? যে-‘আমি’ ধরতে গেলে নাই, যেন ‘বর্তমান কাল’ হিশাবের ভেতর। হিশাবে আছে কিন্তু ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ব্যক্তি-‘আমি’কে দেখা যায়। কথা বলে—’আমি খাই’ ‘আমি যাই’ ‘আমি করি’ ‘আমি হেন’ ‘আমি তেন’ ‘আমি এটা চাই’ ‘আমি ওটা চাই না’। আবার এও জানায়, ‘আমি ওটা পেতে চাই নি, কিন্তু পেয়ে গেছি’ ‘অন্য কিছু পাওয়ার আশায় বের হয়ে যা চাই নি তা পেয়ে গেছি’ ইত্যাদি।

এই যে ব্যক্তি-আমি, এই আমিকে দেখতে পাওয়া যায় যেন রংধনুর মতন। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আবির্ভাব এবং তিরোধান ত্রিমাত্রিক দৃষ্টি শক্তির বিবেচনার আলোকে।

আবার মানুষ এও বুঝতে পেরেছে ব্যক্তি-আমি’র অসামর্থ থেমে থাকছে না সামষ্টিক আমি এর ভূমিকার কারণে। ব্যক্তি-আমি’র মৃত্যু দেখা যায়। সামষ্টিক আমি’র মৃত্যু ধরা পড়বে তখন, যখন মানবজাতির সামগ্রিক বিনাশ হবে। সেই বিনাশের সাক্ষী হতে পারবে না কোনো ব্যক্তি-আমি প্রবল ইচ্ছা করলেও। বিনাশ মানে, ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানে বিনাশের যে-অর্থ আমরা জানি।

এই দেখবার বাস্তবতায় ব্যক্তি-আমি’র জন্ম ও মৃত্যু, এই জন্মমৃত্যুও বলে দিচ্ছে, প্রতি ন্যানো সেকেন্ডে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবের সিঁড়িতে পা রাখবার বাস্তবতাতে, ব্যক্তি-আমিকে পাওয়া যায় না। তার শরীরের কোষ পর্যায়ে প্রতি মুহূর্তে জন্ম মৃত্যু চলছে। এভাবে বলা যায়, যা থাকে না, তার আছে হওয়া ক্ষণকালের জন্যে। মানে, মায়াজালের উপস্থিতি নানা আকারে প্রকারে। মায়াজাল—মায়া জাল সংযুক্ত। তাহলে কিভাবে বুঝে নেব—এত এত কর্ম সম্পাদন ‘আমি’ এর দ্বারা, যে-আমিকে ধরতে পারা যায় না। অথচ মানুষগুলো নিশিদিন চিৎকার করছে—আমি আমি আমার আমার।

এবং ব্যক্তিসমূহের রাজনৈতিক দাবি—’এসো সমষ্টির জন্যে কিছু করি’। এই দাবি শুধু এবং শুধুমাত্র রাজনৈতিক দাবি, অগভীর স্বার্থফেনায়িত, বিভ্রান্তিমূলক এবং অমূলক। এইখানে, এই দ্রুত সন্তরণশীল আপন কক্ষপথে দুনিয়াটিতে ‘Will and Action are really the two aspects of the same process.’ তোমার ইচ্ছা আমার কর্ম, আমার ইচ্ছা তোমার কর্ম, আমার ইচ্ছা আমার কর্ম, তোমার ইচ্ছা তোমার কর্ম, অবশেষ উপসংহার আমিতুমিহীন ইচ্ছা আর কর্মের ধারাবাহিকতা ক্রমাগত বংশ পরম্পরায় চলমান।

আমি বলছি, আমি সারওয়ার, আমার হাত পা নাক মুখ কান চোখ মাথা ইত্যাদি আমার। অথচ পরিবারের লোকেরা বলছে আমি তাদের, সমাজের লোকেরা বলছে আমি তাদের, দেশের লোকেরা বলছে আমি তাদের, ধর্ম বলছে : ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ মানে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং তার কাছেই প্রত্যাবর্তন আমাদের।’ ওরা বলেন—’তোমার জীবন তোমার নয়’।

মানে, অতঃপর, ‘আমি’কে দেখা যায় সংস্কৃতির ভিতর, দেখা যায় জনে জনে ‘আমি’ আছি কিন্তু ‘আমি’ নাই, ‘আমি’ ছুঁইতে পারলেও কোনোভাবে ‘আমি’ কোথাও নাই হে সখি ও সখা।

সারওয়ার চৌধুরী

জন্ম ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৬; চট্টগ্রাম। নানাবাড়িতে। কবি, গল্পকার, প্রবন্ধিক ও অনুবাদক। প্রাক্তন সদস্য, সিলেট প্রেসক্লাব। পড়াশোনা করেছেন ‘ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ’-এ (বিকম পরীক্ষা দেন নি)। সহকারী সম্পাদক হিশেবে কাজ করেছেন ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এ (১৯৯৩- ১৯৯৭)। বিশ বছর ধরে প্রবাসে। একটি পারফিউম কোম্পানিতে সেলস এগজিকিউটিভ হিশেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই—

একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৬]
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৭]
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে [প্রবন্ধ; আদর্শ, ২০১২]
শিশির ও ধূলিকণা মায়া [গল্প; শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত [অনুবাদ গল্প; চৈতন্য, ২০১৫]
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম [অনুবাদ উপন্যাস; চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : sarwarch@gmail.com