হোম গদ্য আলোক সরকারের জীবাশ্ম ও ডিম

আলোক সরকারের জীবাশ্ম ও ডিম

আলোক সরকারের জীবাশ্ম ও ডিম
817
0

১.
আলোক সরকার ঘুমোতে গেলেন ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে। শীত যখন পড়ে নি। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল যখন ঘুমোতে চাইছে। বাতাসে যখন এক রকমের ঝাঁঝাল দারিদ্র্য লেগে গেছে। নিষ্পত্র গাছগুলো গরমের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া আর ঠান্ডার নিশ্চিত আসন্নতার মধ্যে অবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামের দিগন্তে হলুদ হয়ে আছে ভারি ধানক্ষেত। কলকাতায় চেপে বসেছে জমাট ধোঁয়াশা আর নাক-কান-গলার সমস্যাগুলো। এই ঋতু বরিশাল থেকে কলকাতা অবধিই জীবনানন্দ দাশের। জীবনানন্দ দাশ নামক কবিটি আলোক সরকারের পছন্দের তালিকায় ছিলেন না। কিছু কবি এবং পাঠকের মধ্যে জীবনানন্দকে নিয়ে যে আদিখ্যেতা দেখা যায়, আলোক সরকার তা পছন্দ করতেন না। সবাই যেটা নিয়ে মাতামাতি করে আলোক সরকার তার বাইরে পালাতে চাইতেন, তার বিরুদ্ধে কথা বলতেন। ১৯৫০ পরবর্তী শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি আলোক সরকার চলে গেলেন এই হেমন্তে। যেমন এক বেমানান ডাইনোসর রাজকীয় প্রসন্ন ভঙ্গিতে একদিন লুটিয়ে পড়ে মাটিতে, আর চলে যায় পৃথিবী থেকে, তার জীবাশ্ম ও ডিম ফেলে রেখে। এই ২০১৬-এ আলোক সরকারকে আর মানাচ্ছিল না। আলোক সরকারের কবিতায় অন্ধকারের মূল্য আলোর চেয়ে কম নয়। অনুপস্থিতি সেখানে হাজিরা দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি স্থান জুড়ে থাকে। এই হেমন্তে চলে যাওয়াই তাকে মানায়। আলোক সরকারের রৌদ্রময় অনুপস্থিতি আমরা হয়তো আরো ভালো করে অনুভব করতে পারব। একজন কবি মৃত্যুর পরে তার অনেক প্রাপ্য বুঝে নিতে পারেন। বিশেষ করে একজন আজীবন অফুরন্ত থেকে যাওয়া কবি। এবার রসিক তৃষ্ণার্ত পাঠকের সঙ্গে আলোক সরকারের কবিতার আলোকিত সমন্বয়ের পালাটি শুরু হবে। এবার উঠে আসবে অমরত্বের প্রশ্ন। কবির থাকা আর না-থাকার অভেদ এবার সূচিত হবে, আশা করা চলে।


আলোক সরকার সেই বিরল কবিদের একজন যারা কবিতার জগতে নিজেদের মানিয়ে নিতে আসেন নি


২.
আলোক সরকারের কবিতা মৃত্যুর পূর্ব অবধিও সজীব ছিল। এও এক বিরল ব্যাপার। আলোক সরকারের কবিতাকে বয়স ছুঁতে পারে নি। ২০১৬-র স্মার্টফোনওয়ালা-ওয়ালি তরুণ-তরুণীর চেয়ে বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের এই প্রাচীন কবি অনেক প্রাণবন্ত ও উৎসুক ছিলেন। ফোনে যখন কথা বলতাম, মনে হতো দূরত্ব পেরিয়ে তিনি আমাকে কিছুটা শুষে নিতে চাইছেন। বয়স যখন তার কলমকে শেষ মুহূর্ত অবধিও রেহাই দিয়েছে, আশা করা যায় মৃত্যুও তাকে অব্যাহতি দেবে। তার সমসাময়িকদের মতো আলোক সরকার মৃত্যুর পরেই ফুরিয়ে যাবেন না। এই প্রতিশ্রুতি খুব প্রয়োজনীয়। কারণ আজ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মিথ যতটা বেঁচে আছে, শক্তির কবিতা প্রায় ততটাই মৃত। এখনো প্রতিষ্ঠানের খবরের কাগজ তাকে নিয়ে ফিচার বের করে, কিছু লোক তার মৃত্যুদিনে ফেসবুকে হাহুতাশ করেন, কিছু লাইন পোস্ট করেন, কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আজ প্রায় একজন কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের কবিতার মতোই আলোচনার বাইরে চলে গেছে। কিছু মানুষের মুগ্ধতার শ্বাসটুকু ছাড়া তার বুঝি আর কিছু চাইবার নেই। মৃত্যুর অল্প কয়েক বছর পরেই কিছু গল্পগুজব ছাড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও আজ আর আলোচ্য নন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার সমবয়সীদের মধ্যে একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের কবিতা লিখেছিলেন, প্রকৃতই কবিতার তরবারি ছিল তার হাতে। সেই তরবারি পরে ফরমায়েশি লেখালেখির ঘাস কাটার কাজে এবং পদোন্নতির পথে গজিয়ে থাকা কচুবন সাফ করার কাজে লাগিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কেউ কি আজ ‘জ্বলন্ত জিরাফ’ বা ‘নীরা ও জিরো আওয়ার’ নিয়ে কথা বলে? আমি শুনি নি। তারাপদ রায় আজ আলোচিত নন, সমরেন্দ্র সেনগুপ্তও নন। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের নাম ২০১৫-র পরে লিখতে আসা কোনো কবির মুখে শুনতে পাই না আমি। আজ জীবিত থেকেও আলোক সরকারের সহপথিক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত কোনো কবিতার আড্ডায় আর তর্কের বিষয় নন, কেউ কেউ তার কবিতার ভক্ত অবশ্যই দেখতে পাই। শঙ্খ ঘোষ প্রায়ই আলোচিত হন, কিন্তু সেটা তার আলোকিত সামাজিক অবস্থান ও উচ্চকিত বক্তব্যগুলোর কারণে। শঙ্খ ঘোষের গদ্য আজ তরুণ কবির অবশ্যপাঠ্য, কিন্তু তার কবিতা নিয়ে কোনোকালেই কোনো তর্ক হয় না, তারা শুধু তর্কাতীতভাবে সুলিখিত এবং সন্দেহাতীতভাবে উত্তীর্ণ লেখা হয়ে থাকে। যে কবি তর্কের তিক্ত উপজীব্য নন, আলোচনার বিষ যার নাগাল পায় না, তিনি পিতল অথবা স্বর্ণনির্মিত আইকন। তাকে ঘিরে ভাষার ছুটে যাওয়া এবং আবর্তিত হওয়া ফুরিয়ে গিয়েছে। বিনয় মজুমদারকে নিয়ে আজও বিশ্রীভাবেই উত্তাল হওয়া যায়। নিছক মুগ্ধতার বাইরে বেরিয়ে আলোক সরকারকে নিয়ে আজও তর্ক করা যায়, এখনও অনেকদিন করাও যাবে। আলোক সরকারের দর্শনাক্রান্ত কবিতাগুলো আদৌ কবিতা কিনা, এই নিয়েও কিছু মহলে কি সংশয় থেকে যায় নি? ভাবার বিষয়। কিছু মহলে আলোক সরকারকে নিয়ে গভীর আলোচনা আজও বিপজ্জনক, কারণ এর ফলে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অস্তিত্বের শিকড় নিয়েই প্রশ্ন উঠে আসবে। আমি আশা রাখি, আলোক সরকার আজও আইকন হয়ে যান নি।।

৩.
আলোক সরকার সেই বিরল কবিদের একজন যারা কবিতার জগতে নিজেদের মানিয়ে নিতে আসেন নি, কবিতার জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আসেন নি। একেবারে প্রথম থেকেই এক অরব এবং আশ্চর্য বিদ্রোহ এই কবিদের মধ্যে দেখা যায়। এরা একটি কালখণ্ডের অন্তর্গত হয়েও সেই কালখণ্ডের কেতা এবং রীতি মানেন না, তার প্রবণতাকে নিজেদের কবিতায় সটান অস্বীকার করেন, তছনছ করে দেন সব বাধানিষেধ, কখনো সোচ্চারে, কখনও পুষ্পবিকাশের মতোই নিরুচ্চারে। এ-রকম কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ-রকম কবি স্বদেশ সেন। রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরী। আলোক সরকারও সেটা একেবারে প্রথম থেকেই করেছেন। পঞ্চাশের কবিতায় জীবনানন্দীয় বিষাদ আর সমর সেনীয় তিক্ত নাগরিক স্মার্টনেস ছিল অবশ্য পালনীয় দুই শর্ত। আলোক সরকার তার কবিতায় এ-দুটোকে কোনো জায়গা দেন নি। ছন্দ-অন্ত্যমিলের বাজনা বাজাতেও চান নি। আলোক সরকার স্বীকারোক্তিমূলক কৃত্তিবাসী কবিতার স্পর্শটুকুও স্বীকার করেন নি, যদিও তার কবিতা চরমভাবে ‘আমি’-নির্ভর। সেই ‘আমি’ কলকাতার কোনো উদ্বাস্তু, যৌনকাতর, নেশারু, বন্ধুখোর, বোহেমিয়ান, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, নিম্নবিত্ত, শিক্ষিত যুবক নয়। সেই ‘আমি’ এক চিরবহমান-আমি। সেই ‘আমি’-র চিরস্থায়ীত্বের কারণেই তার কবিতাও স্থায়ীত্বকে অনেকখানি অধিকার করতে পারবে, এই বিশ্বাস আলোক সরকারের ছিল। এই বিশ্বাসকে কবির সিদ্ধান্তের সুবিধা বলব আমি। একজন প্রকৃত কবিকে নিজের জন্য এটুকু সুবিধা তৈরি করে নিতে হয়, তার সমকাল সেটাকে কেতাদুরস্ত ভাবুক আর না-ই ভাবুক। কাল কখনও সমে চলে না।


কফি হাউসের মাতোয়ারা কবি আলোক সরকার কোনোকালেই নন।


৪.
আলোক সরকার, তাই, ফ্যাশনেবল কবি শুরু থেকেই নন। তার গুরুত্ব আলোক সরকারকে স্বনামধন্য করেছে, সেলিব্রেটি করে নি। কবিতাপাঠকের মান্যতা তিনি ছিনিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু কফি হাউসের মাতোয়ারা কবি আলোক সরকার কোনোকালেই নন। কবিতা লিখে সেলিব্রেটি হতে আলোক সরকার আসেন নি, কবিতা তার কাজের ঘর ছিল, যেখানে এঁটে উঠতে না পারলে উপন্যাস লিখে সামাজিক উন্নতির মইয়ে পা রাখার কোনো ব্যাপার নেই। আলোক সরকার মন দিয়ে একটা চাকরি করেছিলেন, বর্ধমানের মফস্বলে কলেজ শিক্ষকের নির্জীব এক চাকরি। শিক্ষকতার চাকরি একজন কবিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ক্যাম্পাসের বাইরের জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন এই অধ্যাপককূল, নিজেদের পণ্ডিতস্মন্যতাই তাদের সম্বল। কলেজে অধ্যাপনার কাজ যারা করেন, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, খুব দ্রুত সাহিত্যচর্চাকে সাংস্কৃতিক একটা কাজ হিশেবে তারা ঠাউরে নেন, মঞ্চই হয়ে ওঠে তাদের আলোকপ্রাপ্তির দিশা। তার সহকর্মীদের মধ্যে নিজেকে কেমন লাগত, এই আলাদা হতে চাওয়া মানুষটির? কিন্তু এটুকু রিস্ক আলোক সরকারকে নিতেই হতো, সম্ভবত। সংসার এবং গ্রাসাচ্ছাদনের ভার তিনি কবিতার উপরে চাপান নি। কেন চাপাবেন? এ-দেশে সাহিত্য যে বিশুদ্ধ চাকরি হতে পারে না, তিনি জানতেন। আমাকে একবার বলেছিলেন রিটায়ারমেন্টের পরে মফস্বলের সেই কলেজটিতে তিনি আর ফিরে যান নি, যাওয়ার কোনো ইচ্ছেও তার আর হয় নি। এই ইচ্ছে না হওয়াটাও একটা সিদ্ধান্ত থেকেই জাত। বৃক্ষ এভাবেই তার পাতাকে ত্যাগ করে, এবং আর ফিরে তাকায় না। এই ত্যাগ তার কবিতার অন্যতম গুণ।

৫.
বুদ্ধদেব বসু এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘কবিতা’-র প্রতি আস্থা হারিয়ে তরুণ মিত্র, দীপঙ্কর দাশগুপ্ত, সত্যেন্দ্র আচার্য, রণজিৎ সেন, এবং অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর সঙ্গে মিলে আলোক সরকার একটা কবিতা পত্রিকা করছিলেন—‘শতভিষা’। এই পত্রিকাটি কিছু তরুণের দুর্গবিশেষ ছিল, শুদ্ধ কবিতার, নিরিবিলি সাধনকক্ষগুলো থেকে যে কবিতাগুলো আসে, সারা গায়ে কবিতা লেখার বিস্ময় মেখে নিয়ে। ‘শতভিষা’ পত্রিকা তার সমসাময়িক এবং অধিকতর বিখ্যাত ‘কৃত্তিবাস’-এ তুমুল এবং উচ্চকিত উপস্থিতির পাশে নিজের দৃঢ় কিন্তু শান্ত এবং নৈরাশ্যমুক্ত অবস্থান নিয়ে ছিল। এই অবস্থান কবির নিজের বিশ্বাসেরও বটে। একজন কবি যদি সম্পাদক হন, তার নিজের কবিতাবিশ্বাস অনুসারে হওয়াই সততার পরিচায়ক। এক ঋজু মেরুদণ্ড সেটার জন্য লাগে। প্রণবেন্দু দাশগুপ্তর মতো কবির আত্মপ্রকাশ যে এই পত্রিকা থেকে হয়েছিল সে এক সুচারু সমাপতন বলে মনে হয়। ১৯৬৪-র পর আলোক সরকার ‘শতভিষা’-র ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে গেলেন। এই পত্রিকা সর্বসাধারণের হয় নি, হতেও চায় নি। বলা ভালো, আলোক সরকার সম্পাদনার প্রতি বিমুখ হয়ে নিজের কবিজীবনের প্রতি সুবিচার করলেন। যদি তিনি আজকের একটি আন্তর্জাল পত্রিকা সম্পাদনার সুযোগ পেতেন, এই ক্লান্তি তার আসত না। সম্পাদক হিশেবে তরুণ আলোক সরকার এই ২০১৬ সালের একটি ওয়েবম্যাগেই সম্ভবত নিজের কাজের জায়গা পেতেন। প্রিন্ট পত্রিকার যে বিষম লড়াই, তা একজন নির্জনতাকামী কবিকে ধ্বংস করে দেওয়ার পক্ষে পর্যাপ্ত। চাকরি এবং সংসারের পরে সেই বোঝা বয়ে চললে হয়তো আমরা কবি আলোক সরকারের অনেকখানি হারাতাম। ‘শতভিষা’ যদি দীর্ঘস্থায়ী হতে চাইত, তাকে তুমুল জনপ্রিয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাপ্রাপ্ত ‘কৃত্তিবাস’-র সঙ্গে লড়তেই হতো, এবং সেই প্রাতিষ্ঠানিক লড়াইয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আলোক সরকারের চেয়ে অনেক চতুর দক্ষ ফ্লেক্সিবল এবং সেক্সি সেনাপতি ছিলেন, মেনে নিতেই হবে। ‘কৃত্তিবাস’-এর পাশাপাশি, হাংরি কবিদের এসে পড়ার ফাঁকে, জনসাধারণের জিভে ‘শতভিষা’ নুন-ঝালহীন একটি নিঃস্বাদ নিরামিষ পত্রিকা ছাড়া কিছু তো হতে পারত না। সে যেন শীৎকৃত উল্লাস আর চিৎকৃত আর্তনাদের মধ্যে লাগানো একটি নম্র সাবধানী শিউলিগাছ। আলোক সরকারের কবিতার মতোই।


আলোক সরকার কিংবদন্তি নন, তিনি ইতিহাস।


৬.
জীবনের শেষদিকে এসে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার আলোক সরকার পেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটির কোনো সাহায্য তার কবিজীবনে নেই। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে তার একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশনাটির আচরণে আলোক সরকার অপমানিত বোধ করেন এবং চিরতরে সংশ্রব ত্যাগ করেন। এটা আমাকে তিনি ফোনে কথা বলার সময় জানিয়েছিলেন। আরো কেউ কেউ অবশ্যই জানেন। শুধু ওই প্রকাশনা নয়, ওদের ‘দেশ’ পত্রিকাতেও তিনি আর লেখা দেন নি। প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করেন নি আলোক সরকার, ‘শতভিষা’-ও তো একটা প্রতিষ্ঠান হিশেবেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নির্মিত কবি তিনি ছিলেন না। পঞ্চাশের দশক থেকে বাংলা কবিতায় যে কর্পোরেট ব্যবস্থা, স্টারসিস্টেম চালু হয়েছিল, যেগুলোকে হাওয়া দিয়েছিল কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিভাবান তরুণের উদ্বাস্তু মানসিকতা, আলোক সরকার তার বাইরে ছিলেন। তিনি পুরনো পৃথিবীর মানুষের মতো নতুন পৃথিবীর কবিতা রচনা করে যেতে চেয়েছিলেন, এবং মৃত্যুর আগে অবধি সেটাই করেছেন। আলোক সরকারের কবিতা কাউকে মোহাচ্ছন্ন করে না, নেশা ধরিয়ে দেয় না। নেশা ধরানোর যে কবিতা, কবিতার যে ভঙ্গি, সেটার জন্য কবিত্বের প্রাচুর্য লাগে। শান্ত মহৎ কবিতা লেখার জন্য অফুরন্ত কবিত্বের প্রয়োজন হয় না। কবিত্ব অনেকটাই তো পেশিশক্তির মতো এক প্রতিভা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে, তাদের কবিত্বের পেশি শুধুই বাহার হয়ে থেকেছে, মঞ্চে ভারোত্তোলন আর লোহার দণ্ড বাঁকানোর কসরত দেখিয়েছে, হাততালি আর কেয়াবাৎ কুড়িয়েছে, কিন্তু কোনো নতুন ভূখণ্ড জয় করে নি। অনেক শীর্ণ কবিত্ব নিয়েও কিছু মানুষ মহৎ কবি হয়েছেন, নতুন পৃথিবী গড়েছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোক সরকারের যে সেই মহত্বের ভেদ রয়ে গেছে, তা যেন পাঠক খেয়াল রাখেন। আলোক সরকার কিংবদন্তি নন, তিনি ইতিহাস।

৭.
আলোক সরকার কখনওই পোস্টমডার্ন ছিলেন না। বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে, স্বাধীনতা পরবর্তী, শিকড়হীন মানুষে ছেয়ে যাওয়া শহর কলকাতায় বাস করেও, তিনি আজন্ম আধুনিক। প্রায় একজন উনবিংশতি শতাব্দীর মানুষ ছিলেন তিনি, যে মানুষ বিশ্বযুদ্ধ দেখে নি, মানুষের হাতে মানুষের চরম লাঞ্ছনা দেখে নি। আমার পুনরাধুনিক কবিতাভাবনায় আলোক সরকার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন আধুনিক কবিমানুষের প্রকৃতি কী হতে পারে, সেই ধারণা তার থেকে পাই। কিন্তু তিনি পুনরাধুনিকের দিশারি নন। একমাত্র কারণ হলো আলোক সরকারের মধ্যে আধুনিকতার দিকে যাত্রার কোনো ব্যাপার নেই, তিনি আজীবন আধুনিকই ছিলেন। যে আধুনিকতা অবলম্বন করে তিনি বেঁচেছেন, যার জন্য তিনি লড়েছেন এক নীরব লড়াই, সেই আধুনিকতা তার শিক্ষা, তার প্রস্তুতি, তার পরিবার থেকে পাওয়া এক জেনেটিক জিনিস। একজন পুনরাধুনিক কবি একজন পোস্টমডার্ন মানব থেকে একজন আধুনিক মানব হয়ে উঠবেন। তিনি বিশৃঙ্খলা থেকে, কেওস থেকে আধুনিকতার দিকে যাবেন, যেখানে সংহতি সামঞ্জস্য শান্তি সার্বিকতা সমগ্রতা ও কল্যাণবোধ রয়েছে, যেখানে অন্ধকার আলোর ভাষায় কথা বলতে চায়। আলোক সরকারের মধ্যে এই বিষয়গুলো অর্জনের প্রয়োজন ছিল না, তার অন্তঃকরণে এগুলো শুরু থেকেই ছিল। এই কারণেই তার অপছন্দ ছিল জীবনানন্দ দাশের প্রতি, সমর সেনের প্রতি, যদিও জীবনানন্দের কবিতা ‘শতভিষা’ ছেপেছে, সানন্দেই ছেপেছে। এই কারণেই ‘কৃত্তিবাস’-এর চিৎকৃত কবিদের বিপ্রতীপে তার বেছে নেওয়া অবস্থান, যদিও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘শতভিষা’-য় লিখেছেন, আলোক সরকারও ‘কৃত্তিবাস’-এ লিখেছেন, এবং তারাপদ রায় তো দুটো পত্রিকারই আপনজন ছিলেন। কিন্তু সমর সেন-জীবনানন্দ থেকে শুরু হয়ে কৃত্তিবাস-হাংরি ছুঁয়ে এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক অবধি বাংলা কবিতার যে পোস্টমডার্ন পরিসর, সেখানে আলোক সরকারের কোনো চিহ্ন নেই। আলোক সরকার আধুনিক, তাই আধুনিক হয়ে উঠতেই তাকে হয় না। স্বাধীনতা পরবর্তী বুভুক্ষা, অনাহার, বেকারত্ব, মর্যাদাহীনতা, যৌন অধঃপতন, নৈতিক শূন্যতার কোনো স্থান আলোক সরকারের কবিতায় নেই। এগুলোকে অতিক্রমও তিনি করেন নি, কারণ এদের থেকে শুধু দূরে থেকেছেন। এটা পলায়ন নয়, এটা স্বভাব। এ ছিল তার উতল নির্জন আশ্রয়। এক বিশুদ্ধ অরণ্য। যিনি আধুনিক, তিনি পুনরাধুনিক হতে পারেন না, কারণ সেই তীর্থযাত্রার প্রয়োজন তার নেই, তিনি তো তীর্থের স্থানটিতেই তপোবন তৈরি করে বাস করছেন। অবিশ্যি সেই তপোবন শান্তিনিকেতনের চেয়ে অনেক ছোট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে আধুনিককে রেখে গিয়েছেন, তার অনতিপরে এসে আলোক সরকারও বাংলা আধুনিক কবিতায় একজন সামান্য নাগরিক মাত্র, এটা স্বীকার করতেই হবে।


অমিয় চক্রবর্তী-আলোক সরকার-স্বদেশ সেন একটা ধারা মনে হয় আমার।


৮.
আমি মনে করি, অমিয় চক্রবর্তী থেকে আলোক সরকার ছুঁয়ে যে বিশেষ সুরের আধুনিক কবিতা ফুরিয়ে আসছিল কৃত্তিবাসী কবিতার চাপে, একদম পোস্টমডার্ন পরিসরে বাস করেই তার সূত্র ধারণ করেছিলেন কবি স্বদেশ সেন। অমিয় চক্রবর্তী-আলোক সরকার-স্বদেশ সেন একটা ধারা মনে হয় আমার। স্বদেশ সেন আমার পুনরাধুনিক ভাবনার অন্যতম দিশারি, কারণ আধুনিক তো স্বদেশ সেন শুরু থেকে ছিলেন না, আধুনিক তিনি হয়ে উঠেছিলেন, নিজের অন্তর্নিহিত জীবনদেবতার টানে, এক আশ্চর্য মানবিকতায়। পুরনো পৃথিবীর আলোক সরকারকে নতুন পৃথিবীর অনেক কম ক্ষমতাশালী স্বদেশ সেন প্রাসঙ্গিকতায় অতিক্রম করেছিলেন, শুধু আধুনিকতার উদ্দেশে নিজের যাত্রার কারণে। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের চরম পোস্টমডার্ন পরিসরে বেঁচেও, ঝাড়খণ্ডের একটি কারখানাভিত্তিক শহরের একজন সামান্য নন-ইন্টেলেকচ্যুয়াল চাকুরে মানুষ স্বদেশ সেন তার কবিতায় পেলেন এক আশ্চর্য আধ্যাত্মিক সুর, যার জন্য অমিয় চক্রবর্তীকে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেতে হয়েছিল, আলোক সরকারকে সেটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিতে হয়েছিল দৃঢ় কিছু অবস্থান ও সিদ্ধান্ত। স্বদেশ সেনের কবিতা আলোক সরকারের উত্তরাধিকারকেই বাঁচিয়ে রেখেছে, বাংলা কবিতাকে আবার পৌঁছে দিয়েছে আধুনিকের মধ্যে। কিন্তু স্বদেশ সেনকে অনুসরণ এবং অনুকরণের মাধ্যমে কিছু কবির উদয় হলো বাংলা কবিতায়, যারা তথাকথিত মেধাবী লিরিক লেখার নামে, অতিচেতনার নামে, স্বদেশ সেনের জার্নিকেই বিক্ষিপ্ত করে দিতে চাইলেন। এরা দলবদ্ধ কবিতাচর্চা শুরু করলেন, এবং নিজেদের কবিতাকে সাম্প্রতিকতার উদাহরণ হিশেবে মেলে ধরলেন। কিন্তু সাম্প্রতিকতা নয়, প্রায় এক সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হয়েছে এর ফলে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায়। এরা আলোক সরকারের নামে অস্বস্তি বোধ করেন, কারণ আলোক সরকারের নাম স্বদেশ সেনকে বাংলা কবিতায় একজন আকাশ থেকে এসে পড়া কবি থাকতে দেয় না। স্বদেশ সেনেরও যে একাধিক পূর্বপুরুষ আছেন, তাদের একজনের নাম যে আলোক সরকার, এই সত্য এদের নিজেদের কৃত্রিম জেনেটিক কোড এবং কাঁটাতার ঘেরা স্বচ্ছ উপনিবেশটির পক্ষে নিরাপদ নয়। এরা ছিঁড়ে নেওয়া সম্পত্তিতে বিশ্বাস করেন, উৎসকে অস্বীকার করে।

৯.
এবং আলোক সরকার চলে গেলেন। লিওনার্দ কোহেনের মৃত্যুর কয়েকদিন পরেই, ফিদেল কাস্ত্রোর প্রয়াণের কয়েকদিন আগে। পুরনো পৃথিবীর মানুষরা চলে যাচ্ছেন, পৃথিবী তার পুরনো মাদুর গুটিয়ে নিচ্ছে। আমাদের মাথার উপরে ভার কি কমে যাচ্ছে? সম্ভবত না। এই কেওটিক পরিস্থিতির মধ্যে এই মানুষগুলোকে দূরবর্তী লাইটহাউস মনে হতো। আলোগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে। কবিতা, সংগীত, লোকনীতি, আন্তর্জাতিকতা, সামাজিক সংযোগ… সর্বত্রই আজ আভিজাত্যের অভাব, দৃঢ় অবস্থানের খামতি। একজনের লেখা আরেকজন যখন লিখে ফেলছে, শুধু নাম দেখে বুঝে নিতে হচ্ছে কোনটা কার লেখা, আলোক সরকার চলে গেলেন। এই হেমন্তে আমাদের আর কত রিক্ত করবে, হে দু-হাজার ষোল? পৃথিবীতে আজ ভারের খুব প্রয়োজন মনে হয়। সেই ভার যদি একটি ফুটে উঠতে চাওয়া জবাফুলেরই হয়, মন্দ নয়।

অনুপম মুখোপাধ্যায়

জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯; কন্যাগর, ঘাটাল, পশ্চিম মেদিনীপুর, ওয়েস্ট বেঙ্গল, ইন্ডিয়া।

ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়।

কবি ও প্রাবন্ধিক।

সম্পাদনা করছেন বাঙলা কবিতার প্রথম ব্লকজিন ‘বাক্‌’।

ই-মেইল : anupam_gtl@yahoo.co.in

Latest posts by অনুপম মুখোপাধ্যায় (see all)