হোম গদ্য ‘আমি জানি, আমি একা’: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর মহাবিশ্বমানচিত্র

‘আমি জানি, আমি একা’: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর মহাবিশ্বমানচিত্র

‘আমি জানি, আমি একা’: ফের্নান্দো পেসোয়া ও তাঁর মহাবিশ্বমানচিত্র
886
0

রুষ্ট হই না আমি, কারণ তা শক্তিমানদের মানায়; মেনেও নিই না, কারণ তা সম্ভ্রান্তদের জন্য; শান্তিকেও আমি লালন করি না, কারণ নীরবতা মহানদের জন্য। আর আমি শক্তিমানও নই, সম্ভ্রান্তও নই, মহানও নই। অভিযোগ আছে আমার, কারণ আমি দুর্বল। আর যেহেতু আমি শিল্পী, আমি নিজে আমার অভিযোগগুলোকে সাংগীতিক করি এবং যে চিন্তা স্বপ্নগুলোকে সুন্দর করে তুলবে, সেই চিন্তা দ্বারা সাজিয়ে নিজে নিজে আনন্দলাভ করি।…পৃথিবী সম্পর্কে আমার অভিযোগ নেই। পৃথিবীর হয়ে আমার কোনো দ্রোহও নেই। আমি নৈরাশ্যবাদী নই। আমি যন্ত্রণা পাই আর অভিযোগ করি, কিন্তু আমি জানি না যন্ত্রণাভোগ দস্তুর কি না, যন্ত্রণাভোগ মানবিক কি না তা-ও আমি জানি না। কেন আমি জানতে চাইব? যন্ত্রণাভোগের উপযুক্ত কি না তা না-জেনেই আমি যন্ত্রণাভোগ করি। (এক শিকার করা মৃগী।)

আমি নৈরাশ্যবাদী নই, আমি বিষণ্ন।

[উদ্বেগ-পুস্তক]


পৃথিবীতে বোধহয় এমন একটি মানুষও পাওয়া যাবে না যিনি তার পৈতৃক নাম মনে মনে হলেও অস্বীকার না করেছেন, এবং নিজেই নিজের গোপন নামকরণ না করছেন।


‘কবি হওয়ার কোনো উচ্চাশা নেই আমার/ কবিতা আমার একা থাকার উপায়’―এরকমই এক অতিভাষিক কথা একটি কবিতায় বলেছেন তিনি, আর প্রকৃতপক্ষে তাঁর সমগ্র কবিতা এক একাকিত্বেরই অপর উত্থান, আত্মধ্বনি, যা মর্মরধ্বনি তুলে শুধু সেই গানই করতে চাইছে যা একান্তভাবে তাঁর। কবিতার ইতিহাসে অনন্য তিনি। শুধু কীর্তিতে নয়, জীবৎকালে ছিলেন না তিনি কীর্তিমান কেউ, কিন্তু একজন যখন চার নামে কবিতা লিখতে থাকেন আপন প্রতিস্বের ভিন্ন বিম্বায়নে, তখন তা এমন একটি ঘটনা হয়ে যায় যা ভিন্ন এক কবিসত্তার আত্মাকেও ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। মানুষের প্রদত্ত যে এক নাম তা একটি মুখোশমাত্র যার আড়ালে অনেক নামের এক ব্যক্তি থাকেন, যিনি অন্য নামে তার অপর সত্তাকে বর্ণনা করে যান। আর যে নামটি জন্মসূত্রে তাকে দেওয়া হয়, তা নিয়ত বদলে যায় তার আচরণে, কীর্তিতে, মনস্তত্ত্বে, অন্যমনে। এবং এটাও আমাদের এক গ্রাহ্য মনস্তত্ত্ব যে আমরা নিরন্তর প্রদত্ত নামটি বদল করতে থাকি আমাদের অন্য সত্তাধর্মীয় নামগুলোর অন্বেষণে। পৃথিবীতে বোধহয় এমন একটি মানুষও পাওয়া যাবে না যিনি তার পৈতৃক নাম মনে মনে হলেও অস্বীকার না করেছেন, এবং নিজেই নিজের গোপন নামকরণ না করছেন।

বহুধা ব্যক্তিসত্তার উপস্থিতি আধুনিক কবিদের এক মানস-সম্পূরণ, কবিতার ইতিহাসে যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে পরিদৃষ্ট। কবিদের অবচ্ছিন্ন আত্মপরিচয়ের স্পৃহা থেকেই সত্তার বহুত্বের ধারণাটির আবির্ভাব। পল ভালেরি তাঁর সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ লেখায় এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি একবার নিজেকে বলেছেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ যা তাঁর আত্মসংযমের এক অবস্থাকে চিহ্নিত করেছিল, যা ছিল প্রবণতাশীল আত্মসত্তাবাদের দিকে। এটার উৎস ছিল বোদল্যারের ‘নিজেকে ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই কবিতার’ এই ধারণায়, যা পরে গটফ্রিড বেনের কথায়ও প্রতিধ্বনিত হয়: ‘নিজেকে ছাড়া কবির কবিতার আর কোনো বিষয়বস্তু নেই’। এই অবস্থাকে বোঝাতে ভালেরি বলেছেন যে, তিনি ‘কোনো বিষয়ে নিজের উপলব্ধিকে অন্যের সাথে অংশভাগ করতে প্রয়োজন অনুভব করেন নি কখনও।’ ১৯৩৭ সালে ভালেরির এই উক্তির প্রায় দশ বছর পর গটফ্রিড বেন বলেন: ‘আমি হলাম একজন স্বতন্ত্রবাদী। আমার নাম হলো মনরো।’ বেন বলেছেন, চিন্তাভাবনা চিন্তককে অবশিষ্ট মানবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, বাস্তবতার মতো কোনো জিনিস নেই এবং মানবীয় চেতনা অবিরাম আকার নেয়, গঠিত হয়, যন্ত্রণাভোগ করে এবং তার সৃষ্টিশীল গুদাম থেকে পৃথিবীর ওপর মানসিক ছাপ রেখে যায়। শোপেনহাওয়ারের পর নিট্‌শে এ নিয়ে নিজের খেয়ালমতো ভেবেছেন এবং ‘স্বতন্ত্রীকরণ নীতি’ বা ‘দ্য প্রিন্সিপল অব ইনডিভিডুয়েশন’-এর কথা বলেছেন যেখানে ব্যক্তি বিশেষত নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। বের্গসন সময়ের সাথে সচেতনতাকে সম্পর্কায়িত করেছেন; নতুন মনোবিজ্ঞানও প্রথাগত ধারণাকে বাতিল করে এ ধরনের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। এই সত্তার বহুত্বের উপস্থিতিকেই ঔপন্যাসিকেরা বলেছেন চৈতন্যপ্রবাহের ধারণা। জয়েস বলেছেন ইপিফ্যানির কথা যখন মুহূর্তে ঘনীভূত এবং কেলাসিত হয় অভিজ্ঞতা ও পরাদৃষ্টি। আমরা জানি, গীতিকবিতা নিজ চরিত্রেই অবিচ্ছিন্ন হয় কম, তা নির্ভরশীল থাকে অন্তর্গত অভিজ্ঞতার ওপর যা আবার অভিজ্ঞতাশীল চৈতন্যের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ বাহ্যিক ঘটনের ক্রম নির্ধারণ করে দেয় কবিতার কাঠামো বা গদ্যের বর্ণনা। ফলে এই অভিন্নতা সব সময় এক থাকে না, তা বিশিষ্ট হয়ে নতুন চৈতন্যে আবির্ভূত হয়। রোম্যান্টিক কবিতায় যে সত্তা তা হলো ‘স্বীকারৌক্তিক আমি’ যা আসলে ‘অভিজ্ঞতাবাদী আমি’র সাথে অভিন্ন। কিন্তু ব্যক্তিসত্তার যে সংশয় এবং সন্দেহ, তাকে ধরার লক্ষ্যে আধুনিক গীতিকবিরা এর থেকে পরিত্রাণের জন্য এক ধরনের স্বাধীনতাকে খুঁজলেন এবং তাতে অন্য সত্তার আবাহন ঘটালেন। এভাবেই ‘কবিতার সত্য’ আর অস্কার ওয়াইল্ড কথিত ‘মুখোশের সত্য’ একাকার হয়ে গেল। আধুনিক কবিতায় দেখা দিল পারসোনা। হিমেনেস লিখলেন কবিতা ‘আমি আমি নই’: ‘আমি আমি নই/ আমি হলাম সে/ আমার অবলোকন ছাড়াই যে আমার পাশাপাশি হেঁটে বেড়ায়;/ মাঝে মাঝে, যাকে আমি দেখতে যাই/ আর মাঝে মাঝে যাকে ভুলে যাই।/ যে, লিখে চলে, আমার বলার সময় থাকে নীরব,/ যে থাকে প্রশান্ত, আমার ঘৃণাতে ক্ষমা করে দেয়,/ সে হেঁটে বেড়ায় যেখানে আমি থাকি নিশ্চল,/ যখন আমি মরি সে তখন সোজা দাঁড়িয়ে পড়ে।’ গীতিকার প্রথম ধাপে কবি তাঁর অনুভূতিকে ঘনীভূত করে তাকে প্রকাশ করেন। যেহেতু তাঁর থাকে পরিবর্তনশীলতা এবং বহুবিধ অনুভূতিরাশি, তাই কয়েকটি ব্যক্তিত্ব তাঁর ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এছাড়া এমন ধরনের কবি রয়েছেন যারা বহু এবং অলীক অনুভূতির বিবেচনায় আবেগময়তার পরিবর্তে অধিক কল্পনাপ্রবণ হন, মনের অবস্থাকে আবেগময়তার থেকে অধিক বৌদ্ধিকভাবে অভিজ্ঞতায় আনেন। খেয়ালি ও শৈলীর একীকরণ ছাড়া কবি শুধু নিভৃত ও একান্ত শৈলীতে বহু ধরনের ব্যক্তিপ্রতিস্বকে প্রকাশ করেন যেখানে কল্পনাপ্রতিভা জায়গা নেয় খেয়ালের, বুদ্ধি আবেগের। এর পরই আসে বিব্যক্তিকরণের পর্যায় যখন কবি মনের প্রতিটি অবস্থাকে বিশ্লেষণাত্মকভাবে পরখ করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিসত্তার আবাহন ঘটান, যেখানে শৈলীও বিচিত্রমুখী হয়। এ প্রক্রিয়ায় সবশেষে দেখা মেলে এমন নাটকীয় কবির যাঁরা একই সময়ে অনেক কবি, লেখেন গীতিকবিতা। মনের প্রতিটি বোধাতীত অবস্থা নিজস্ব অনুভবের শৈলী ও মেজাজে হয়ে ওঠে এক-একটি ব্যক্তিসত্তা যা কবির নিজস্ব ছকবদ্ধ আবেগময় অভিজ্ঞতা থেকে স্বতন্ত্র বা সম্পূর্ণভাবে তার বিপরীত। আর এভাবেই গীতিকবিতা নাটকীয় আঙ্গিককে গ্রহণ না করেই হয়ে ওঠে নাটকীয় কবিতা। এরই ব্যবহার দেখি ভালেরি থেকে পেসোয়া পর্যন্ত।

বলা দস্তুর যে বহুব্যক্তিত্ব এবং আত্মবিভাজনের দিক থেকে আধুনিক কবিতায় সবচেয়ে বিস্তারী নাম হলো ফির্নান্দো পেসোয়া যিনি শৈশব থেকেই ব্যক্তিসত্তাকে নানাভাবে বিশিষ্ট করেছেন। কবিতা লিখে গেছেন চার নামে: আলবের্তো কায়েইরু, আলভারু দ্য কাম্পুস, রিকার্দো রাইশ এবং ফের্নান্দো পেসোয়া। ‘পেসোয়া-নিজে’ ধরনের পর্তুগিজ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন অন্যনাম থেকে নিজনামকে (সাহিত্যিক বহির্ব্যক্তিত্ব ফের্নান্দো পেসোয়া) আলাদা করার জন্য। এই পারসোনা বা বহির্ব্যক্তিত্ব বলে যে  পেসোয়ার ছিল আরও অনেক ‘উপবহির্ব্যক্তিত্ব’, যেমন গীতিকবি পেসোয়া (যাঁর গীতিময়তা ছিল অস্তিত্ববাদ বিষয়ে অতিমাত্রায় উদ্বিগ্নতা), গূঢ়বাদী কবি পেসোয়া, অভিজ্ঞতাবাদী পেসোয়া, জাতীয়তাবাদী পেসোয়া, বা মরমিয়াবাদী পেসোয়া, জনপ্রিয় পেসোয়া, এবং হাস্যরসিক পেসোয়া। এবং এই নামগুলো কোনো ছদ্মনাম নয়, বরং বলা যায় ভিন্ন বা অন্যনাম (hetaronyms)। পেসোয়া যুক্তি দিয়েছেন যে, এগুলোকে বলা যাবে না ছদ্মনাম বা aliases, বরং তারা হলো বহুব্যক্তিত্বের প্রমাণ যাতে আমরা সবাই আচ্ছন্ন থাকি―এগুলো আমাদের সত্তার অসংখ্য প্রতিতুলনার এক এক দিক। পেসোয়া এই বহুনামের ব্যাপারে বলেছেন, ‘বিব্যক্তিকরণ ও কল্পিতকরণের এক অবিরত এবং মৌলিক প্রবণতা: a constant and organic tendency towards depersonalization and make-believe। একটি কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘অভিন্নতা হলো কারাগার’, তাঁর কাছে অন্য নাম ছিল নাটকের চরিত্রের মতো, শেক্সপিয়রের যে-কোনো নাটকের সংলাপ শেক্সপিয়রের রচনা হলেও যেমন তা শেক্সপিয়রের কথা নয়, তা ওই চরিত্রের কথা, তেমনি আলবের্তো কায়েইরু বা অন্য নামে লেখা কবিতা ব্যক্তি পেসোয়ার রচনা হলেও তা পেসোয়ার কবিতা নয়, তাঁর ভিন্ন প্রতিস্বের যে নামকরণ, তার কবিতা। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, যেমন কিং লিয়ার যা বলেন তা অকৃত্রিম, লিয়ার শেক্সপিয়র নয় বরং তাঁর এক সৃষ্টি…প্রতিটি নামেই জীবনের এক গভীর ধারণাকে আমি ঢুকিয়ে দিয়েছি, তিনটিই একেবারে আলাদা, কিন্তু সবগুলোতেই অস্তিত্বের রহস্যময় গুরুত্বের বিষয়টিকে গভীরভাবে সজাগ করা হয়েছে।

মনে রাখা ভালো, পর্তুগিজ ভাষায় পেসোয়া মানে পারসন, যার উৎপত্তি পারসোনা থেকে, যা ব্যুৎপত্তিগত অর্থে বোঝায় রোমান অভিনেতাদের মুখোশ। ওক্তাবিয়ো পাস বলেছিলেন, তাঁর এই মুখোশ যেন ছিল এক গল্পের চরিত্র যা ছিলেন পেসোয়া নিজেই। অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার অনেক আগে, আধুনিকতার গুরু এজরা পাউন্ড তাঁর প্রথম দিকের কবিতাগ্রন্থের নাম হিশেবে গ্রহণ করেছিলেন পারসোনা শব্দটি যা বোঝায় মুখোশ। এই নাম দিয়ে, তিনি প্রথমবারের মতো তাঁর ভবিষ্যৎ বিচ্ছিন্নতাকে অবচেতনভাবে আভাসিত করার জন্য প্রকাশ করলেন তাঁর নিজস্ব পরিচয়ের জটিলতা। পেসোয়াও এই ভাব থেকেই ইংরেজিতে লিখলেন তাঁর গ্রন্থ পঁয়ত্রিশটি চতুর্দশপদী, যা তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯১৮ সালে প্রকাশ করেন। পেসোয়া জানতেন, তাঁর প্রতিভায় নিয়তি এবং স্নায়বিক মনোরোগের ভূমিকা ছিল প্রবল। এসব থেকে মুক্ত হতেই পিরানদেলোর নাটকের এক চরিত্রের মতোই শুরু করলেন তাঁর অন্য জীবনকে চালনা, যা ছিল কাল্পনিক চরিত্রের কবিদের কাল্পনিক জীবন, যাদের প্রকৃত রচনাগুলো লিখে এসব অন্য নামে প্রকাশ করলেন। মানুষের সত্তার যে বিভক্তি, তাকে তিনি গ্রহণ করে গেছেন পরিপূর্ণভাবে, যা তাঁকে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কবিতা লিখিয়েছিল। কায়েইরু নামে লেখা কবিতাগুলো মুক্তছন্দের, কাম্পুস নামে লেখা কবিতাগুলো একই রকম ছন্দের হলেও স্বর ভিন্ন, রাইশ নামে লেখা কবিতাগুলো ছন্দোবদ্ধ তবে মিলহীন, আর পেসোয়া নামে লেখা কবিতাগুলো ছন্দোবদ্ধ এবং ঘনমিলযুক্ত। এটা যদিও অবচেতনাগত আবির্ভাব বলে বিবেচনা করা যায় বা সমাপতন হিশেবে ধরা যায়, তবে নেহায়েত দুর্ঘটনা নয় তা। এভাবেই তিনি ছিলেন একজন মানুষ, চারজন কবি। এখানে উল্লেখ করা যথার্থ হবে যে, ছোটোবেলায় নানা কল্পিত নামে তিনি নিজেকে চিঠি লিখতেন। হয়ত শৈশবের এই কল্পনাক্রিয়াই বড়ো হয়ে তাঁর বিভাজিত সত্তার ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকের জন্ম দিয়েছিল। এভাবেই পেসোয়ার সত্তার খণ্ডীকরণের মাঝ দিয়ে জন্ম নেয় চার কবির: আলবের্তো কায়েইরু, আলভারু দ্য কাম্পুস, রিকার্দো রাইশ এবং ফের্নান্দো পেসোয়া ।


এমনকি এক নারী মুখোশও ছিল তাঁর, কুঁজো, অসহায় প্রণয়জর্জর―মারিয়া হোসে। সুতরাং দেখা যায় শৈশব থেকে মুখ্য ও গৌণভাবে পঁচাত্তরটি নাম তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর বিভাজিত সত্তার অনেকানেক অঙ্কুরোদ্গমে।


জন্ম হয় আলবের্তো কায়েইরুর, যিনি বলে ওঠেন তিনিই প্রকৃতির কবি। এই কায়েইরু আসলে এক কাব্যিক উদ্ভাসন, ১৮১৪ সালের ৮ মার্চ পেসোয়ার ভেতরে কায়েইরুর জন্ম, পেসোয়া যাকে বলেছেন ‘জটিল ধরনের এক রাখালিয়া কবি’, আর তখন লেখা হয়ে যায় দি কিপার অব শিপ-এর অধিকাংশ কবিতা, যা সাধারণ জীবনের প্রথাগত ভাবনাচিন্তা নিয়ে লেখা, যা বহুত্ব বিষয়ে সচেতনতা থেকে যে বিতৃষ্ণা জন্মে, তাকে প্রতিফলিত করেছে। আধুনিক মানুষের চেতনার ভার মস্তিষ্কের ভেতর যে হাইপারট্রফির জন্ম দিয়েছে তা ধ্বংস করে দেবে নিরীহ প্রতিযোগিতা, আর এ ধারণা থেকেই আলবের্তো কায়েইরু, এক গেঁয়ো যুবক এবং রাখাল, যিনি পরিচিত ছিলেন নিট্‌শের সাথে, জন্ম দিলেন তাঁর চিন্তাহীনতার অধিবিদ্যা:

পৃথিবী সম্পর্কে আমার ভাবনা কী?
আমি কি জানি পৃথিবী নিয়ে কী ভাবি আমি?
অসুস্থ হলে হয়ত তা ভাবতে পারতাম।

বস্তু নিয়ে আমার কী চিন্তাভাবনা?
কার্যকারণ নিয়েই বা আমার অভিমত কী?
ঈশ্বর, আত্মা আর জগৎ সৃষ্টি নিয়ে কী সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছি?
আমি জানি না তা। কারণ আমার জন্য, এইসব চিন্তা মানে
চোখ বন্ধ করে রাখা আর চিন্তা না করা…

এটাই হলো আধুনিক কাব্যিক সংশয়বাদ, এক অযৌক্তিক সংশয়বাদ, যা প্রথম ধরা পড়েছিল কিট্‌সে, যাকে বলা হয় নিগেটিভ ক্যাপাবিলিটি। এটি আরও ভিন্ন রকম ও অন্য মাত্রায় প্রকাশিত পেসোয়ার লেখায়, যা তাঁর কবিতাকে দেয় প্রভাবন ক্ষমতা। এই সংশয়বাদ শুধু তাঁর কবিতায়ই নয় গদ্যেও পরিলক্ষিত, যেখানে একটি সংলাপ অন্যটির সাথে সওয়াল-জবাব করে। এভাবেই একে একে জন্ম হয় কাম্পুস, রাইশ এবং পেসোয়ার। চারটি নয়, তাঁর  ভিন্ন নাম ছিল আরও―পর্তুগিজ ভাষায় তিনি ছয়টি নামে, যা আসলে ছয়টি কাব্যিক বাগ্‌রীত, লিখেছেন এবং লেখা প্রকাশ করেছেন। কায়েইরু, রাইশ এবং কাম্পুস ছাড়াও বের্নান্দো সোয়ারেশ, সি. পাচেকো এবং আন্তানিয়ো মোরা নামেও তিনি লিখেছেন। এ ছাড়া ইংরেজিতে লেখা গদ্য-পদ্যগুলোর ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন অন্য নাম আলেকজান্ডার সার্চ এবং চার্লস রবার্ট অ্যানোন, ফরাসি লেখাগুলোর ক্ষেত্রে জাঁ সেউল। এছাড়াও ছিল অনেক অপর সত্তা যা ধারণ করেছে তাঁর অনুবাদক, ছোটোগল্প লেখক, ইংরেজি সাহিত্য সমালোচক, জ্যোতিষী, দার্শনিক  এবং অসুখী আদর্শের এক মানবকে, যিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। এমনকি এক নারী মুখোশও ছিল তাঁর, কুঁজো, অসহায় প্রণয়জর্জর―মারিয়া হোসে। সুতরাং দেখা যায় শৈশব থেকে মুখ্য ও গৌণভাবে পঁচাত্তরটি নাম তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর বিভাজিত সত্তার অনেকানেক অঙ্কুরোদ্গমে। অন্যনামে পেসোয়ার আশ্রয় তাঁকে দিয়েছিল বহুভাবে বিকশিত হবার সুযোগ, নিজের সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে সত্য বলার সুযোগ, বহু প্রতিস্বের বলার সুযোগ যা আত্মজীবনীকে বাতিল করে কথা বলে ওঠে। ‘পাগিনাস দ্য দাওত্রিনা এসতেতিকা’ নামীয় প্রবন্ধে পেসোয়া তাঁর বিভিন্ন অন্য নামের পার্থক্যের ব্যাপারে বলেছিলেন: ‘বের্নান্দো সোয়ারেশ…আমার যুক্তিক্ষমতা এবং আবেগময়তাকে বাদ দিয়ে আমি নিজেই। তাঁর গদ্য, অতিপরিশীলিত গুণ ব্যতীত যা আমার যুক্তি আমাকে দেয়, আমার সমান, একেবারে পর্তুগিজ সমতুল্য; অন্যদিকে কায়েইরু খারাপ পর্তুগিজ লেখে আর কাম্পোশ লেখে যথাযথ, কিন্তু ভুলত্রুটি সত্ত্বেও… রাইশ শৈলীর শুদ্ধতায়, যা আমি মনে করি বাড়াবাড়ি, আমার চেয়েও ভালো লেখে। আমার পক্ষে রাইশের গদ্য লেখা কঠিন কাজ, আর এ কারণেই তা অপ্রকাশিত, বা কাম্পোশের মতো। এই ধরনের অনুকরণ খুব সহজ, কারণ তা গদ্য আপেক্ষা কবিতায় অতি স্বতঃস্ফূর্ত।’ ‘আমাদের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য’ নামক কবিতায়ও এই এক সত্তার ভেতর বহু সত্তার উপস্থিতির কথাই ধ্বনিত হয়েছে:

আমাদের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য;
আমি অনুভব করি বা ভাবি,
না জেনেই যে কে ভাবছে, কে করছে অনুভব।
আমি কেবল সেই জায়গা
যেখানে রয়েছে এইসব অনুভব বা ভাবনারা।

আমার রয়েছে অনেকগুলো আত্মা।
রয়েছে ‘আমার’ চেয়েও অনেকগুলো ‘আমি’।
আর সবার প্রতি আসক্তিহীনভাবে
আমি এখনও বেঁচে রয়েছি।

পেসোয়ার চোখে সব কবিতাই অনুকরণ, আর সব কবিই সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত তখনই যখন তাঁরা সবচেয়ে কম বিশ্বস্ত, তখনই বেশি সত্যবাদী যখন তারা ভান করে বেশি। রিকার্দো রাইশ মনে করতেন, সে-ই জ্ঞানী যে জগতের আশ্চর্যগুলো দিয়ে নিজেকে পূর্ণ করে রাখে। আর পেসোয়া মনে করতেন, অস্তিত্বহীন কারও সাথে কথা বলা যদি নিরর্থক হয় তাহলে লিসবনের অস্তিত্ব আছে বলেও কোনো প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। আধুনিক বিনির্মাণবাদী ধারণায় কোনো পাঠ বা রচনার তাৎপর্য উন্মোচনের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দেয়। মনে হতে থাকবে পার্থক্যের কারণে অর্থ যেন কোনো স্থিরতায় যেতে পারে না, যেন কোনো বিরোধাভাস দানা বেঁধে ওঠে। বিনির্মাণ পদ্ধতিতে পড়লে মনে হবে, সত্য বা অর্থ কোনো পরিপূর্ণতায় উপনীত হতে পারে না, পাশাপাশি অন্য এক সমান্তরাল বা ছায়া-অর্থ উঁকি দিতে থাকে। বিনির্মাণবাদের কাজই হলো রচনার এই অনির্ণিতকে, অভাবিতকে, ফুটিয়ে তোলা। তত্ত্ব হিসেবে বিনির্মাণবাদ আবির্ভূত হওয়ার আগেই পেসোয়া তাঁর রচনায় এই আত্মবিনির্মাণের উন্মোচন করেছিলেন, আর এই অনির্ণিত উপস্থিতিকে অনুধাবন করেই তিনি বুক অব ডিসকুয়াইআট-এ বলেছিলেন, ‘আমরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র, বহু, আমাদের রয়েছে ব্যক্তিসত্তার প্রাচুর্য। এজন্যই যে ব্যক্তিসত্তা চারপাশকে উপেক্ষা করে আর যে ব্যক্তিসত্তা চারপাশের মাঝে দুঃখভোগ বা আনন্দ ভোগ করে, তারা এক নয়। আমাদের সত্তার বিশাল এলাকায় রয়েছে অনেক প্রজাতির মানুষ যারা ভিন্নভাবে চিন্তা এবং অনুভব করে।’ আমি আছি কারণ আমি  চিন্তা করি―এই সমস্যা পেসোয়ায় কোনো দার্শনিক নীতিতে নয় বরং ব্যাকরণগত ভিত্তিতে উপস্থাপিত। তিনি মনে করতেন কবিপ্রতিস্বের অননুজ্ঞাত যে বিষয় রয়েছে, তার সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক এক স্বস্তিত সম্পর্ক। উদ্বিগ্ন- পুস্তক-এ তিনি বলছেন: ‘আমি স্থান এবং কালের চেয়েও পুরোনো, কারণ আমি চেতনা। বস্তুরা আমার থেকেই আসে, সমগ্র প্রকৃতিই আমার সংবেদন থেকে সৃষ্ট। আমি অন্বেষণ করি কিন্তু পাই না। আমি চাই কিন্তু আমার হয় না। আমাকে ছাড়াই সূর্য ওঠে এবং অস্ত যায়; আমাকে ছাড়া বৃষ্টি হয় আর বাতাস গর্জন করে ওঠে। ঋতু, বারো মাস, সময়ের প্রস্থান যে রয়েছে তার কারণ নই আমি।’

‘কবি থেকে কবিতা অধিক সত্য’―এই চিন্তার আবরণে পেসোয়া যা বলতে চান তা ব্যক্তিক পরিচয়কে ধন্দে ফেলে দিতে চায়। ব্যক্তিক পরিচয়কে নিয়ে তাঁর যে চরম সন্দেহ তা বাস্তবতাকেও চরম সন্দেহে পরিণত করে। এটা তাঁর আগেও অনেক কবির মধ্যে দেখা গেছে। এজন্যই এক চিঠিতে তিনি লিখতে পারলেন, ‘আমার চেয়েও রিকার্দো রাইশ ভালো লেখেন, কিন্তু তাতে থাকে এমন এক বিশুদ্ধতা যাকে আমি মনে করি বাড়াবাড়ি।’ ‘তামাকের দোকান’ কবিতায়  আলভারো দ্যা কাম্পোশ দেখালেন এমন এক বাহ্যিক বাস্তবতা যা এসেছে স্বপ্নসদৃশ অবাস্তবতার হাত ধরে। এখানে যে অস্তিত্ববাদকেই উপস্থাপন করা হয়েছে তা শুধু নয়, বরং এসেছে ন্যুভো রোমা বা আয়োনেস্কোর নাটকের গর্ভচিন্তা যা তামাক বিক্রেতার সাথে কবির আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে  রোম্যান্টিক-সিম্বোলিস্ট ধারণার বাইরে নিয়ে আসে কবিকে: ‘সে মরবে, আমিও মরব/ সে ত্যাগ করবে তার ইশারা আর আমি, কবিতা’। এখানে ধীর, সতর্ক এবং অকিঞ্চিৎকর আনুষঙ্গিক বর্ণনার মাধ্যমে একটি আচ্ছন্নতাকে আনার চেষ্টা আমরা লক্ষ্য করি, যেমনটা দেখা গেছে টি.এস. এলিয়টের প্রথম দিকের কবিতায় যেখানে এলিয়ট খেয়ালখুশি এবং দোদুল্যমানতার দ্বারা এক ধরনের সৃজনকল্পনার সম্ভাবনাকে সৃষ্টি করেছেন। পেসোয়ায় আমরা আরও দেখি প্যারেনথিসিস বা গর্বিত বাক্যের ব্যবহার―যেমন এই কবিতাটিতে: ‘যদি আমি আমার ধোপানির মেয়েকে বিয়ে করতাম তাহলে সুখী হতাম আমি’,―যা নাটকীয়তা বা ঔপন্যাসিকের সক্ষমতাকে মনে করিয়ে দেয়। আমার ন্যুভো রোমা-র আকস্মিক ক্রিয়া ও সঞ্চালনও এখানে প্রতিভাত হয়: ‘লোকটি দোকান থেকে চলে গেল…তামাকবিক্রেতা হেসে ফেলল।’ ‘সমুদ্রবিষয়ক কবিতা’ বা ‘ওড  মেরিতিমা’ কবিতাটি  আলভারু দ্য কাম্পুসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী ও বৈশিষ্ট্যময় কবিতা, যা গতিশীলতা এবং স্থিতিশীলতার স্পন্দন এবং আততি থেকে শক্তিলাভ করেছে। এর সাথে মিল আছে গডফ্রিড বেনের মধ্যে পরিলক্ষিত আততির সাথে, যা তাঁর শেষের দিকের সংকলন নিশ্চল কবিতার (static poems) মধ্যে পরিদৃষ্ট। পেসোয়ার কবিতাটি একজন অধিপ্রাণবাদীর, যে কখনও বা বর্বর, বুনো দৃঢ়তায় দোলায়িত। শুধু সমুদ্র নয়,  নাবিক ও তাঁর ক্লান্তি, এক অন্তর্গত সমুদ্রে তার প্রশান্ত ও নম্য প্রত্যাবর্তনের কাঙ্ক্ষা রয়েছে কবিতাটিতে। রয়েছে নাবিকের প্রতি বৌদ্ধিক এক সম্বোধন যা বিষণ্ন ও মর্ষকামী উপাদানে স্পন্দিত আর ভয়ঙ্কর এবং শয়তানি দেবতা, এক কঠোর সর্বেশ্বরবাদী দেবতার প্রতি আবাহন। গিন্‌সবার্গের হাউল বা কাদিশ-এর সাথে রয়েছে এর মিল, বলা যায় আলভারো দ্য কাম্পোশ একজন বড়ো বহিরস্থিত-অন্তরস্থিত পরিসরের কবি, তিনি শুরু করেন একজন বহিশ্চারী হিশেবে আর উপনীত হন একজন অন্তশ্চারীতে। শুরু করেন সকল পথ ও পাথেয়’র অন্বেষণে আর শেষ করেন সম্মোহনে, অস্তিত্বের জিজ্ঞাসায়। কাম্পুসের মাধ্যমে পেসোয়া রাইশের সর্বগ্রাসিতা থেকে নিজেকে রক্ষা করেন, যেন দিয়োনিসুস নিজেকে করেন অ্যাপোলো থেকে। কবিতায় এলিয়টের প্রথম দিকের কবিতার ভাব ও চিত্রকল্পের মিল পাওয়া যায়।

ভ্রমণকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমি সিগারেট ধরাই,
সব ধরনের ভ্রমণকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য,
সমগ্র বিশ্বকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য।

আগামীকাল ফিরে আসা, বাস্তবতা!
আজকের জন্য ঢের, ভদ্রমহোদয়গণ!
একটু জিরিয়ে নাও, নিরঙ্কুশ বর্তমান!
এ রকম হওয়ার চেয়ে না হওয়া ঢের ভালো।

পুরো কবিতাতেই হওয়া না-হওয়া, খোলা না-খোলার গতানুগতিক এবং আস্তিত্বিক বিষয় তাচ্ছিল্যময় নিরাশায় প্রতিধ্বনিত যা বোদল্যারের, লাফোর্গ, মালার্মের বিচ্ছিন্নতার চিন্তা বা ‘পজে দ্য দেপাতে’কে, এবং এলিয়টকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আলভারো দ্য কাম্পোশের অন্য কবিতায়ও এর দেখা মেলে:

ফালতু জীবন, ভালো হয় পেছনে পড়ে থাকলে, জীবন কি এক কোষ?
না হলে তা কী? সমগ্র জগৎই এক কোষ, আর তাতে বন্দী হতে গেলে
কোষের আয়তনে কী যায় আসে।


বন্দরগুলোতে পৌঁছার জন্য অনেক নৌকা রয়েছে কিন্তু জীবনের যন্ত্রণা লাঘবের জন্য কোনো নৌকা নেই, না আছে কোনো অবতরণস্থল যেখানে সবকিছু ভুলে যেতে পারি আমরা।


১৯১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি আর্মান্দো কোয়ের্তেশ-রদরিগশকে লেখা গুরুত্বপূর্ণ চিঠিতে তিনি তাঁর কাজের বিশ্বস্ততা এবং সত্যবাদিতা সম্পর্কে জোর দেন। কায়েইরো-রাইশ-কাম্পুসের কবিতা সম্পর্কে তিনি লেখেন, ‘এমন এক সাহিত্য যা আমি সৃষ্টি করেছি এবং আমি তাতে বাঁচি, তা বিশ্বস্ত কারণ তা অনুভূত…অন্য ব্যক্তির কাছে অনুভূত; নাটকীয়ভাবে লেখা, কিন্তু কিং লিয়ারের কথার মতোই বিশ্বস্ত (আমার গভীর শাব্দিক বিবেচনায়), যদিও লিয়ার শেক্সপিয়র নন, বরং তাঁর এক সৃষ্টি।’ ১৯১৬ সালের ১৪ মার্চ তারিখে আর্মান্দো কোয়ের্তেশ-রদরিগশকে লেখা আরেক চিঠির শুরুতে তিনি বলেন, ‘আজ আমি আপনাকে লিখছি এক আবেগময় প্রয়োজনে―আপনার সাথে কথা বলার এক মনস্তাপিত আকাঙ্ক্ষা থেকে। অন্যভাবে বলতে গেলে, বিশেষ কিছুই বলার নেই এটুকু ছাড়া যে, আজ আমি অতল এক হতাশার একবারে তলায় পড়ে আছি। আমার জন্য নিরর্থকতা শব্দটিই মানায়। এটা এমন এক সময় যখন আমার কোনো ভবিষ্যৎ-ই নেই। কেবল উদ্বেগের দেয়াল ঘেরা এক স্থিতিশীল বর্তমান। নদীর অপর পারে, যতক্ষণ তা অপর পার, নয় তা এই পার, এটাই আমার সব যন্ত্রণার কারণ। বন্দরগুলোতে পৌঁছার জন্য অনেক নৌকা রয়েছে কিন্তু জীবনের যন্ত্রণা লাঘবের জন্য কোনো নৌকা নেই, না আছে কোনো অবতরণস্থল যেখানে সবকিছু ভুলে যেতে পারি আমরা। এসবই অনেক আগের ব্যাপার কিন্তু আমার দুঃখ যেন অভিজ্ঞ।’ আবার ৫ জুন, ১৯১৪ সালে মাকে লেখা চিঠিতে যা বললেন তাও একই রকম হতাশা আর উদ্বিগ্নতায় ভরা: ‘আমার স্বাস্থ্য ভালোই আছে আর মনের অবস্থাও অদ্ভুত রকমভাবে উন্নত হয়েছে। তারপরও, এক অস্পষ্ট হতাশায় আমি কষ্ট পাচ্ছি। জানি না তাকে কী বলা যায় কিন্তু তা এক ধরনের বৌদ্ধিক চুলকানি,যেন আমার আত্মায় গুটিবসন্ত উঠেছে। এই নিরর্থক ভাষাতেই আমি আমার অনুভূতিকে ব্যাখ্যা করতে পারি শুধু।’ একই চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন:‘ আগামীকাল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, দেখার জন্য নয়, সেখানে বসবাসের জন্য প্যারিসের উদ্দেশে আমাদের ছেড়ে যাচ্ছেন।’ এই বন্ধু আর কেউ নন তিনি আর্মান্দো কোয়ের্তেশ-রদরিগশ যিনি এই চিঠি পোস্ট করার এক মাস পর সেখানে হোটেল দ্য নিস-এ তাঁর কক্ষে আত্মহত্যা করেন। পেসোয়া লিখতে পারতেন নানা ধরনের কবিতা কিন্তু তাঁর প্রয়োজন হয়ে পড়ে আলভারু দ্য কাম্পুসকে, যাকে দিয়ে তিনি বলিয়েছেন জীবনস্থিত মৃত্যুর মতো আধুনিক  অভিজ্ঞতার কথা: কিছুই না আমি।/ তখনোই কিছুই হব না আমি। রিকার্দো রাইশের প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিশুদ্ধ কবিতা লেখার জন্য, যদিও কোয়ের্তেশ-রদরিগশকে লেখা একই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন: ‘আমরা শিল্পের জন্য কেবল শিল্প সৃষ্টি করব চৈতন্য এটাকে হতে দেয় না, বরং আমাদের এবং মানবতার জন্য চৈতন্য এক দায়িত্ব পালন করে। এটাই জীবনের ভয়ঙ্কর গুরুত্বপূর্ণ কথা।’ পেসোয়া বিশ্বাস করতেন, ‘শিল্পকর্মের প্রবুদ্ধকরণের ভূমিকায়’।  লেখার প্রতি তাঁর আন্তরিকতা কখনও বা ছদ্মবেশ বা আড়াল খুঁজত, এমনকি কখনও কখনও ব্যক্তিগত মিথ্যার মাঝ দিয়ে সর্বজনীন সত্যের প্রকাশ হয়ে উঠত, যাকে তিনি একই চিঠিতে কপটতার সাথে তুলনা করে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, এলোমেলো কিছুর জন্য লেখা আর মৌলিক অধিবিদ্যাহীন চিন্তার লেখা, যার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় না জীবনের কোনো রহস্য এবং ঔজস্বিতা। মোটের ওপর আলঙ্কারিক শৈল্পিকতার জন্য―যারা নানা অপকৃষ্ট কারণে শিল্পের জন্ম দেন, যেমন নিজেদের আনন্দ দেওয়া বা সুরুচি দিয়ে বসার ঘর সাজানো—তাঁর কোনো অপেক্ষা ছিল না। তাঁর অনুশীলন ছিল মহান গভীরতা, ঋদ্ধতা আর গূঢ়ৈষার প্রকাশ যা আদৌ তিনি অনুভব করেন না। তাঁর আড়াল বা ছদ্মবেশ তাঁর সত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, কারণ তা তিনি কোনো চালাকি করার জন্য করেন না বরং বাস্তবতার অন্বেষণ এবং তাঁর সম্ভাব্য ব্যক্তিসত্তার বা বহুত্বের প্রতিষ্ঠার জন্য করে থাকেন। যে অভিজ্ঞতালব্ধ প্রতিস্ব কবিতার সম্প্রসারণ বা পরিপূরণ বা কখনও কাল্পনিক কোনো কিছুর সাথে প্রতিস্থাপন ঘটায়, কেননা তা নয় সমগ্র প্রতিস্ব, তার অনুভূতিকে তিনি ধরতে চেয়েছেন।

তিনি ছিলেন এমন জাতের আধুনিক কবি যাকে বলা যায় অবজেক্টিভ ইনট্রোভার্ট। কখনও ছিলেন না দলে, জনে, ভিড়ে; সবসময় ছিলেন সম্ভাব্য এবং অচেনা। প্রকৃত আত্মাকে তিনি অন্বেষণ করে গেছেন বহুবিধভাবে আর কবিতাকে রেখেছেন নৈর্ব্যক্তিক। নিজেকে যেভাবে বহুত্বে বিভক্ত করেছেন, আবার বহুত্ব থেকে যে একত্বে ফিরে এসেছেন, তা কবিতার ইতিহাসে এক ব্যক্তিগত দর্শনের জন্ম দিয়েছে। লিখেছেন দু ধরনের কবিতা―নাটকীয় এবং গীতিকবিতা। গীতিকবিতাগুলো ঐতিহ্যিক ছন্দে লেখা, যদিও তার বিষয়বস্তু হলো এক আধুনিক মানুষের আত্মমুখোমুখিতা এবং বিচ্ছেদ। সুতরাং কবিতায় নিজের সময়কে অন্বেষণ করতে এসে পেসোয়া গীতিকবিতার ভিন্নরূপ আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন যা বিষয়বস্তুর কারণে ভিন্ন স্বরকে হাজির করে। একই সাথে তিনি হয়ে ওঠেন একজন নাটকীয় কবি, লেখেন নাটকের পরিবর্তে কবিতা। নতুন ধরনের দীর্ঘ কবিতার তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ, যা বিংশ শতাব্দীর কবিতার এক মুক্ত নাটকীয় মনোক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রকৃত নামে পর্তুগিজ ভাষায়  লেখা অধিকাংশ কবিতাতেই পেসোয়া নিজেকে আধুনিক নন, বরং বিলম্বিত রোমান্টিক কবি বা প্রতীকবাদী কবি হিসেবে প্রকাশ করেছেন। আর এসবই ছিল এক কবির আত্মউন্মোচন যা ব্যক্ত করতে চেয়েছে যে কবিতা লিখতে হয় গুণ্ঠন এবং গোপনের স্বরায়নে যখন ভেতরের দৈবনির্দেশ এমনটাই বলে, মানুষ হলো অজানার সাথে ধস্তাধস্তিতে রত, যার ঘামবিন্দুগুলোই আসলে শাব্দিক অবয়বে কবিতা হয়ে ওঠে।

…আমার সংবেদনের বেদনাময় তীব্রতা, এমনকি যখন তারা সুখী; আমার সংবেদনের সুখকর তীব্রতা, এমনকি যখন তারা বিষণ্ন। এক রবিবারে আমি লিখছি, সকাল অনেকটা গড়িয়ে গেছে, এমনই এক পরিপূর্ণ নরম আলোয় ভরা দিনে, আড়াল করা শহরের ছাদ পেরিয়ে মন ছুটে যায় সেখানে, যেখানে সবসময় চিরনতুন আকাশের নীল শেষ হয় তারাদের রহস্যময় অস্তিত্বের বিস্মৃতিতে।

আমার ভেতরে তা-ও এক রবিবার…

আমার হৃদয়ও চলে যাচ্ছে এমন এক গির্জার দিকে, জানা নেই যার অবস্থান।

[উদ্বেগ-পুস্তক]

ফের্নান্দো আন্ত্যোনিয়ো নুগেইরা পেসোয়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৮ সালের ১৩ জুন লিসবন শহরে, মারাও যান সেখানেই, ১৯৩৫ সালের ৩০ নভেম্বর, অ্যালকোহলের ক্রিয়ায়। শৈশবেই পিতৃহীন হন। পাঁচ বছর বয়সে পিতা যক্ষ্মায় মারা গেলে তাঁর মা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। পেসোয়া তখন তাঁর মায়ের কাছে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে চলে যান, যেখানে তাঁর বিপিতা পর্তুগালের কনসাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অত্যন্ত একাকিত্বময় শৈশব তাঁর। সতেরো বছর বয়সে তিনি লিসবনে ফিরে আসেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই রয়ে যান। তাঁর মধ্যে ভ্রমণস্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। হয়ত এ কারণেই অন্য কবিদের মতো তিনি ছিলেন না ভ্রামণিক, অথবা হয়ত অন্তর্গত গোটানো মানসিকতাই এর কারণ ছিল। তাঁর ঘটনাহীন আত্মজীবনী উদ্বেগ-পুস্তক-এ তিনি বলেছেন, ‘ভ্রমণের চিন্তা এলেই আমার বিবমিষার উদ্রেক হয়। যা দেখি নি তা এরই মধ্যে দেখে ফেলেছি আমি। যা দেখার আছে তাও এরই মধ্যে দেখে ফেলেছি আমি।’ এই কথাটিতে মূর্ত হয়ে উঠতে চায় অন্তর্দর্শনের ব্যাপারটি যে, বাহ্যিক জগৎকে মোটাদাগে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। শৈশবের নয়টি বছর ব্রিটিশশাসিত ডারবানে থাকাকালীন ইংরেজি ভাষায় লেখাপড়া এবং চর্চা করার কারণে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর মাতৃভাষার মতোই দখল তিনি অর্জন করেন। ইংরেজি ভাষায় প্রবন্ধ লিখে সে সময়ে কুইন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পুরস্কারও পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ফরাসি ভাষাও  ভালো জানতেন। লিসবনে ফিরে কিছুকাল লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন কিন্তু অবশেষে তা-ও ছেড়ে দেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় অর্জিত ঐতিহ্যগত ইংরেজি শিক্ষাকে প্রসারিত করার জন্য তিনি জাতীয় পাঠাগারে নিজে নিজে পাঠ নেন―দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, এবং বিশেষভাবে পর্তুগিজ সাহিত্য। এ সময়ের রচিত তাঁর ইংরেজি গদ্য ও পদ্য রচনা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯১০ সালে তিনি পর্তুগিজ ভাষায় লেখা শুরু করেন। সাহিত্যের সমালোচনামূলক তাঁর প্রথম প্রবন্ধ  প্রকাশ পায় ১৯১২ সালে। তাঁর প্রথম সৃষ্টিশীল গদ্যের অংশবিশেষ, যা  তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত গদ্য গ্রন্থ দ্য বুক অব ডিসকুয়াইআট-এর অংশ, প্রকাশিত হয় ১৯১৩ সালে, আর প্রথম কবিতা ১৯১৪ সালে। এখানে উল্লেখ্য, তাঁর মৃত্যুর পরে ট্রাঙ্কে যে বিপুল পরিমাণ পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, সেখানেই ছিল আত্মজীবনীমূলক গদ্যগ্রন্থ দ্য বুক অব ডিসকুয়াইআট-এর পাণ্ডুলিপি। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ইংরেজি-ফরাসি চিঠি লিখে দিয়ে যে আয় হতো, তাতেই তিনি  কবিতালেখায় আত্মনিয়োগ করে জীবনের অবশিষ্টকাল কাটিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ে করেন নি তিনি, তাঁর প্রেম ছিল দমিত এবং হয়ত কষ্টকর, কারণ এর জন্য তিনি যে স্বাধীন ছিলেন তা-ও নয়, আবার স্বেচ্ছাচারিতাকেও প্রশ্রয় দেন নি। তবে সবকিছুই শেষ পর্যন্ত লেখার কাছে আটকে যেত। ১৯২০ এবং ১৯২৯ সালে লেখা কিছু প্রেমপত্র পাওয়া গিয়েছিল। জানা যায়, তাঁর প্রেমিকা ছিলেন ওফেলিয়া কুয়েইরোজ নামের এক নারী, একই অফিসে একসাথে কাজ করতেন এবং সেখানেই তাঁদের পরিচয়। বৃদ্ধ বয়সে এই নারী জানিয়েছিলেন যে, হাতে মোমবাতি নিয়ে হ্যামলেট থেকে সংলাপ উচ্চারণ করতে করতে তাকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন পেসোয়া: ‘হে প্রিয় ওফেলিয়া, আমি ভালো নই কবিতা রচনায়: কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি, আহ, বিশ্বাস করো, সবচেয়ে বেশি।’ প্রেম সম্পর্কে নোটবইয়ে তিনি লিখেছিলেন, কীভাবে ভালোবাসতে হয় তা জানতেন না  তিনি, শুধু জানতেন ভালোবাসার স্বপ্ন দেখতে।


বুদ্ধিজীবী এবং কবি হিশেবে যদিও লিসবনে ছিলেন মান্য, কিন্তু তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি আসে তাঁর মৃত্যুর পরে। জীবিতাবস্থায় প্রচার-প্রকাশে ছিল না তাঁর তাড়াহুড়ো।


ছোটোবেলা থেকেই, অধিকাংশই ইংরেজিতে, কিছু ফরাসিতে কবিতা লিখতেন তিনি, যদিও তাদের বললেও বলা যায় এলিয়টের ফরাসি কবিতার মতোই অপ্রধান কবিতা। জীবিতকালে প্রকাশিত চারটি কাব্যের মধ্যে তিনটিই ইংরেজি সংকলন: পোয়েমস―১,২,৩। ইংরেজিতে লিখতে শুরু করেন তিনি ব্যাপকভাবে, উচ্চাশা ছিল ইংরেজি ভাষার বড় কবি হবেন। তাঁর বিশ বছর বয়স পর্যন্ত লেখা প্রায় সব কবিতাই ছিল ইংরেজিতে লেখা, এবং ১৯২১ সাল পর্যন্ত অভিনিবেশের সাথে তা তিনি করে যান। তারপর ইংরেজিতে লেখায় কিছুটা ভাটা আসে কিন্তু তা একদম বন্ধ হয় নি কখনোই। ইংরেজিতে তাঁর শেষ কবিতা, যা ছিল সাধারণ একটি গীতিকবিতা, লেখেন ১৯৩৫ সালের ২২ নভেম্বর, তাঁর মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে। ১৯১৮ সালে নিজ খরচেই ইংরেজিতে বই প্রকাশ করেন তিনি। তার আগে লন্ডনে এক প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইংরেজিতে লেখা নিজের কবিতা বিষয়ে তাঁর মনোভাব বোঝা যায় ১৯১৫ সালের ২৩ অক্টোবর এক ইংরেজ প্রকাশককে ষোলোটি কবিতাসমেত মলাটে লেখা একটি চিঠিতে, যাতে তিনি বলছেন: ‘এই কবিতাগুলোতে, এখানে-ওখানে, ধরা আছে প্রকাশের কিছু নিশ্চিত উৎকেন্দ্রিকতা আর উদ্ভটত্ব; এগুলোকে আমার ভিনদেশি-সত্তার অবস্থা বলে মনে করবেন না, বা এ কবিতাগুলোর বিচারের ভিত্তিতে বাস্তবিকই আমাকে ভিনদেশি হিশেবে মনে করবেন না । অতি উচ্চ পর্যায়ে, পর্তুগিজেও, আমি একই জিনিস চর্চা করি। (…) আসল কথা হলো, এগুলো প্রয়োজনীয়ভাবে অতি সর্বেশ্বরবাদী প্রবণতা থেকে সৃষ্ট প্রকাশশৈলী, যেহেতু তা নির্দিষ্ট চিন্তনের সীমাকে ভাঙে, অতএব অবশ্যই যৌক্তিক অর্থসূত্রকে অগ্রাহ্য করে।’ মাতৃভাষার স্বাভাবিকতা ছিল না তাঁর ইংরেজি লেখায়, তাঁর ইংরেজি ছিল বইপড়া ইংরেজি, সুরহীন এবং গতিহীনও। তবু বস্তুত ইংরেজি ভাষার লেখকই হয়ে পড়ছিলেন তিনি। যদি না ফিরে আসতেন লিসবনে, তাহলে বোধ হয় তা-ই হতো তাঁর ললাটলিখন। লিসবনে ফিরে আসার তিন বছর পর থেকে তিনি আবার পর্তুগিজে লিখতে শুরু করেন। পর্তুগিজে প্রকাশিত প্রথম লেখা হলো তিনটি প্রবন্ধের একটি সিরিজ লেখা, যা ১৯১২ সালে আ আগিয়া পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় রেনাসেন্সা কাগজে ১৯১৪ সালে, নাম ‘গোধূলির স্মৃতি’। পর্তুগিজ লেখালেখির জগতে মাঝেমাঝেই তিনি সক্রিয় হয়ে উঠতেন, সম্ভবত তা হয় ১৯১৫ সালে যখন আঁভাগার্দ রিভিয়্যু পত্রিকা ‘অরফেউ’র প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যা বের হয়। এই ‘অরফেউ’ পত্রিকা ঝড় তুলেছিল সে-সময়। যদিও তা ছিল স্বল্পায়ু তবু তা সাহিত্যকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে দিতে পেরেছিল এবং এর হাত ধরেই ‘সংবেদনবাদ’ নামের সাহিত্যধারার লেখা আবির্ভূত হতে থাকে। দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল পেসোয়ার তির্যক বৃষ্টি নামের দুটো কবিতার সিরিজ। ‘গোধূলির স্মৃতি’ থেকে জন্ম হয় পাউলিশ্‌মু বা পাউলীয় সাহিত্যধারা আর ‘তির্যক বৃষ্টি’ থেকে জন্ম হয় ইন্‌তের্‌সেস্‌সউনিশ্‌মু, আর এ দুই থেকেই পেসোয়া এবং সা-কার্নাইরু-সৃষ্ট সংবেদনবাদ বা সেন্‌সাসউনিশ্‌মু ধারার সূত্রপাত হয়। সংবেদনবাদে তিনটি স্তর রয়েছে যেখানে প্রতিটি স্তরেই স্রষ্টা তাঁর নিজের সত্তা থেকে সৃষ্টিকে ধীরে ধীরে পৃথক করে ফেলেন। পর্তুগিজে লেখা কবিতাগুলোর কিছু কিছু সময়ে সময়ে নানা ছোট কাগজে প্রকাশ হয়েছিল, কিন্তু এসব কবিতার একমাত্র বই মেনসাজেইঁ বা বার্তা বা মেসেজ তিনি প্রকাশ করেছিলেন যা ছিল চুয়াল্লিশটি দেশাত্মবোধক কবিতা যা আসলে ছিল, তাঁর ভাষায় একটিই কবিতা। এই কাব্যটি তিনি কাময়েঁশের মহাকাব্য উশ লুজিয়াদাশ-এর অনুকরণে লিখতে চেয়েছিলেন, উশ লুজিয়াদাশ ছিল পর্তুগিজ জাতির অতীত গৌরবগাথার দ্বারা তাড়িত। এর জন্য তিনি ১৯৩৪ সালে সালাজারের একনায়কতন্ত্রী সরকারের প্রদত্ত পুরস্কারে ভূষিত হন। জীবনের শেষ বছরে সবকটি নামে প্রায় একশ পঞ্চাশটিরও বেশি কবিতা নিয়ে প্রাথমিকভাবে গানের বই নামে একটি সংকলন করার পরিকল্পনায় ছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করে যখন অতিরিক্ত মদ্যপানের প্রতিক্রিয়ায় হেপাটাইটিস সংক্রমণে তিনি মারা যান, তখন এক ট্রাঙ্কভর্তি পাণ্ডুলিপি রেখে যান যাতে প্রায় তিনশরও বেশি কবিতা ছিল, ছিল আরও টাইপ কপি বা হাতে লেখায় পর্তুগিজ বা ইংরেজি বা ফরাসিতে লেখা গদ্য, নাটক, দর্শন, সমালোচনা, অনুবাদ, ভাষাতাত্ত্বিক সূত্র, রাজনৈতিক লেখালেখি, ঠিকুজি এবং হরেকরকম অন্যবিধ রচনা। লিখতেন তিনি নোটবইয়ে বা আলগা কাগজে, কখনও চিঠি বা বিজ্ঞাপন ও হ্যান্ডবিলের উল্টো পৃষ্ঠায়, কখনও কাগজের টুকরায় বা আগের লেখা পাণ্ডুলিপির মার্জিনে। আর এসব লেখার বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য লিখতেন ডজন ডজন অন্যনামে যার অনুশীলন শুরু হয়েছিল তাঁর শৈশবেই। এই লেখালেখিই ধীরে ধীরে তাঁকে কামোয়েনস-এর পর পর্তুগিজ ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক হিশেবে খ্যাতিমান করে তোলে। বলা যায় একেবারে একাকিত্বময়, সীমিত সামাজিক জীবন এবং  একেবারেই প্রেমহীন এক জীবন নিয়ে (সম্ভবত, যদিও প্রমাণিত নয় যে তিনি আমৃত্যু রয়ে গিয়েছিলেন নারীসম্ভোগ বঞ্চিত একজন) ১৯১০ সালের আধুনিকবাদ আন্দোলনের সাথে ছিলেন তিনি সক্রিয়, ছিলেন কিউবিস্ট-প্রভাবিত প্রতিচ্ছেদবাদ এবং সংবেদনবাদের মতো আন্দোলনেরও পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বুদ্ধিজীবী এবং কবি হিশেবে যদিও লিসবনে ছিলেন মান্য, কিন্তু তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি আসে তাঁর মৃত্যুর পরে। জীবিতাবস্থায় প্রচার-প্রকাশে ছিল না তাঁর তাড়াহুড়ো। যদিও আশা করতেন কিছুটা, এবং পরিকল্পনাও ছিল তাঁর সমগ্র রচনার পর্তুগিজ  এবং ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশের।

সবার সাথে যদিও জানাশোনা ছিল, নিকট আত্মীয়দের সাথে সম্পর্কও রাখতেন,  থেকেছেন মাসি-পিসি-মা-বোনের সাথে, কখনও বা ভাড়া বাড়িতে, তবু তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা কমই ছিল। তবে একজন ছিলেন ঘনিষ্ঠতম, তিনি মারিউ দ্য সা-কার্নাইরু যিনি ছিলেন এক ঐশ্বরিক প্রতিভা, যিনি ১৯২৬ সালে, তাঁর ছাব্বিশতম জন্মদিনের কয়েক সপ্তাহ আগে, প্যারিসের হোটেলকক্ষে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর জীবন, বলা যায় ছিল ঘটনাহীন, ছিল অব্যবস্থিতও, কিন্তু প্রকৃত জীবন ছিল উদ্ভাবনসম্পন্ন। কেননা আত্মকে তিনি এমনভাবে ভাঙাগড়া, পরিবর্তন ও রূপান্তর করেছেন যা ছিল তাঁর সৃষ্টিশীলতার কৌশল। আর এর ফলেই লেখা হয়েছে অসংখ্য কবিতা-প্রবন্ধ। ৩০.১০.০৮ তারিখে, যখন তাঁর বয়স কুড়ি, ইংরেজিতে লেখা এক নোটে তিনি বলছেন: ‘আমার ভয়ঙ্কর ও শব্দাতীত মানসিক গোলমেলে আবস্থার অন্যতম কারণ হলো পাগলামির ভয়, যা নিজেই এক পাগলামি।’ সম্ভবত একই দিনে লেখা আরেকটি নোটে তিনি বলছেন: ‘আমি নিশ্চিত যে, সুনির্দিষ্ট মাত্রার উন্মাদনায় আমি কষ্ট ভোগ করছি―যেন সবই আমি করতে পারতাম আর ইচ্ছার অভাবে তা করতে সমর্থ হই নি।’

নিজের আত্মমগ্ন এবং আগন্তুক চরিত্রের বিষয়ে সচেতন ছিলেন তিনি। উদ্বেগ-পুস্তক বা দ্য বুক অব ডিসকোয়াইআট-এর ৪২৯ সংখ্যক নোটে তাই তিনি লিখেছেন:

সারাটি জীবন, প্রত্যেকটি ঘটনায় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে, সর্বদাই সবাই আমাকে দেখেছে একজন অনধিকার প্রবেশকারী হিশেবে। বা নিদেনপক্ষে একজন আগন্তুক হিশেবে। আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজন যা-ই হোক না কেন আমি বিবেচিত হয়েছি একজন আগন্তুক রূপে। বলছি না যে এই ব্যবহার তাদের ইচ্ছাকৃত। এটা ছিল প্রাপ্য, বলা যায় আমার চারপাশের মানুষজনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। সব জায়গায় সবাই আমাকে দয়াই করেছে। খুব কম মানুষই আমাকে পছন্দ করেছে…

তিনি কি হ্যামলেটের অভিনয় করছেন নাকি তিনিই হয়ে উঠছেন হ্যামলেট? ১.২.১৩ তারিখে মারিয়ো বাইরায়োকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলছেন:

আমার মন এক কাল্পনিক ক্ষিপ্রতায় এতটাই আবেগতাড়িত যে একটি ডায়েরিতে আমি আমার মনোযোগ নিবদ্ধ করতে চাই, আর, তৎসত্ত্বেও, পৃষ্ঠা যা আমাকে লিখতে হবে তা এত বেশি যে তার কিছু হারিয়ে যায়… বাকি সব অস্পষ্ট হয়ে যায়… আমার হারিয়ে যাওয়া চিন্তাগুলো এক অসীম মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তারা যেন নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে যন্ত্রণায়, অন্যতর দুর্বোধ্যতায়।

১৯১০ সালের এক ‘ব্যক্তিগত নোট’-এ তিনি যা লিখেছেন তা আরও বেশি অস্বস্তিকর:

সাহিত্যিক নৈপুণ্যের মৌলিক নিয়মনীতিগুলো এখন আমার পুরো আয়ত্তে। শেক্সপিয়র আমাকে এখন আর সুগভীর হতে শেখাতে পারেন না, না মিলটন পারেন সম্পূর্ণ হতে শেখাতে। আমার বৌদ্ধিকতা এমন এক নমনীয়তা এবং বিস্তার অর্জন করেছে যে, যে-কোনো আকাঙ্ক্ষিত আবেগকে গ্রহণ করতে আমার সক্ষমতা ও ইচ্ছাকে জাগায় যে-কোনো অবস্থায়। এজন্যই তা কখনও আপ্রাণ চেষ্টার জন্য এক উদ্বেগ এবং উদ্যম, পূর্ণতা, কোনো বইই মোটের ওপর কোনো সাহায্যে আসে না।

মনের এই অবস্থা তাঁকে ভবিষ্যতের লেখার দিকে মনোনিবেশ করিয়েছিল। তিনি দেখলেন, ব্যক্তিবাদ বা আশকারা দেওয়া ব্যক্তিগত কবিতা থেকে ভিন্ন কী করা যায়। পাউন্ডের মতোই তিনি প্রথমে তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন, তারপর তাকে কবিতায় প্রতিপন্ন করতে মনস্থ করলেন। তত্ত্বের সাথে তাঁর এই পূর্ববোধ প্রেরণাকে ও কবিতাকে আরও স্বচ্ছ এবং নিশ্চিত করে তুলল। আর তারই ফলাফলস্বরূপ ১৯১৪ সালে তিনটি অন্য নামের আবির্ভাব ঘটল। কীভাবে তা ঘটল এর বর্ণনা পাই ১৩ জানুআরি, ১৯৩৫ সালে কাসাইস মোনতাইরোকে লেখা এক চিঠিতে। আর আমাদের জানা আছে যে ছোটোবেলায় কাল্পনিক ব্যক্তিকে নিয়ে দীর্ঘ সংলাপ করতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন, যাকে তিনি শুধু শুনতেনই না, দেখতেন এবং নামকরণ করতেন। ১৯১২ সালের দিকে কিছু পেগান কবিতা লেখার চেষ্টা করেন তিনি। এটা ব্যর্থ হয়েছিল কিন্তু সেসব পেগান লেখকদের এক অস্পষ্ট চেহারা তাঁর ভেতরে গেড়ে বসেছিল আর এভাবেই ‘আমার অজান্তেই রিকার্দো রাইশের জন্ম হয়ে গিয়েছিল।’ এর দু-বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, সা-কার্নাইরুর ওপর মজা করতে গিয়ে, তিনি এক জটিল ধরনের রাখাল কবিকে আবিষ্কার করতে চাইলেন:

সেই দিনটি ছিল ৮ মার্চ, ১৯১৪, যেদিন আমি চূড়ান্তভাবে নিবৃত্ত হলাম, সেদিন আমি একটি উঁচু টেবিলের ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম, এক শিট কাগজ নিলাম, আর দাঁড়িয়েই লিখতে শুরু করলাম যেমনটা আমি সবসময় করি যখন পারি। আর এক ধরনের উল্লাসে, যার ধরন আমি বলতে পারব না, তৎক্ষণাৎ লিখে ফেললাম তিরিশটি মিলহীন কবিতা। এটা ছিল আমার জীবনের এক সাফল্যের দিন, আর আমি জীবনেও এমনটা আর পাব না। শুরু করলাম ‘দ্য কিপার অপ দ্য শিপ’ এই শিরোনামে। আর আমি আমার ভেতরে অন্য একজনের প্রচ্ছায়াকে অনুবর্তী হতে দেখলাম, যাকে আমি নাম দিলাম আলবের্তো কায়েইরো। প্রকাশভঙ্গির এই উদ্ভটতার জন্য আমাকে মাফ করে দিন: আমার প্রভু আমার ভেতরে দেখা দিয়েছেন। এটাই আমার অব্যবহিত সংবেদনা যা আমার মধ্যে ছিল।

যেই মাত্র কায়েইরুর তিরিশটি কবিতা লেখা হয়ে গেল, তাঁর আবার মনে হলো:

দ্রুত আমি আরেকটি কাগজ নিয়ে তাৎক্ষণিক ছয়টি কবিতা লিখলাম যার ফলে জন্ম হলো ফের্নান্দো পেসোয়ার ‘তির্যক বৃষ্টি’ (chuva Obliqua)। অব্যবহিত এবং সম্পূর্ণভাবে… এটা ছিল এক ফের্নান্দো পেসোয়ার কাছে ফের্নান্দো পেসোয়া এবং আলবের্তো কায়েইরুর প্রত্যাবর্তন। অথবা বলা ভালো, এটা ছিল  আলবের্তো কাইয়েরু হিশেবে তাঁর নিজ অনস্তিত্বের বিরুদ্ধে ফির্নান্দো পেসোয়ার প্রতিক্রিয়া।

এভাবেই আলভারু দ্য কাম্পুস, গাসগোতে শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন নৌ-প্রকৌশলী, এক ফিউচারিস্ট মডার্নিস্ট, লেখেন হুইটম্যানের ঢঙে দীর্ঘ উচ্ছ্বাসপূর্ণ পঙ্‌ক্তি। রিকার্দো রাইশ এক ধ্রুপদি পেগান যার কবিতা ভয়াবহ রকমের, আঙ্গিকের দিকে থেকে যা ঐতিহ্যমুখী। আলবের্তো কায়েইরু এক বুদ্ধিবাদী গ্রাম্য, নগরবিমুখী। পেসোয়া কবিতা লেখার সমস্যা নিয়ে কবিতা লেখেন। পেসোয়ার অধিবিদ্যা কাম্পুসের আধুনিকতাবাদের, রাইশের ঐতিহ্যবাদের বিপরীত; আর এসব কিছুই কায়েইরুর ইন্দ্রিয়জগতের সচেতনতায় অন্তর্ভুক্ত। কায়েইরু তাৎপর্যপূর্ণভাবেই এক অনুপ্রেরণার কবি। বিংশ শতাব্দীর কবিদের সচেতনতার বিরাট সমস্যাকে পেসোয়া তুলে ধরতে চেয়েছেন। এই বহুত্ব  শুধু ব্যক্তিগত প্রয়াস নয়, পাশ্চাত্যের অবিনির্মাণবাদের আগেই পেসোয়া ছিলেন অবিনির্মাণবাদী। নিজের জগৎকে পাঠ করার আগে সব অলীকত্ব আর পূর্ববোধ থেকে তিনি নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। আমরা জানি অবিনির্মাণবাদে  সত্য বা অর্থ কখনোই মৌলিক পরিপূর্ণতায় উপনীত হয় না। যে-কোনো অর্থের মধ্যেই থাকে বিপরীতার্থ বা তার আভাস। এভাবেই নানা পার্থক্যের সমাহারে তাৎপর্যের সৃষ্টি হয়। পেসোয়া যখন তাঁর একটি কবিতায় বলেন, ‘বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো’, তখন এই অর্থময় হওয়ার বিলম্বের দিকটিকেই যেন বলে দিতে চান। তাঁর নিজ পেসোয়া নামে লেখা ‘অটোসাইকোগ্রাফি’ নামের কবিতায় মুখোশের সত্য বা সত্য উচ্চারণে তাঁর সমস্যার স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এই কবিতাটি তাঁর অন্য তিন নামে লেখা কবিতা থেকে শৈলীগতভাবে স্বতন্ত্র, যদিও এই চার নামেই আত্মকে আড়াল করার প্রাসঙ্গিক বিরোধাভাস তাঁর সহজাত ছিল, যা আধুনিক কবিতায় আত্মপ্রকাশের এক পূর্বশর্ত।

কবিরা ভান করে
ভান করতে ওস্তাদ তারা
এমনকি তারা ভান করে
সেই যন্ত্রণা যে যন্ত্রণা তারা ভোগ করে
কিন্তু তাঁদের পাঠকেরা অনুভব করে না
ছলনার ব্যথা
করে না অনুভব  সেই অস্তিত্বশীল ব্যথার
বরং অনুভব করে তাদের নিজ ব্যথা যা সত্যি নয়।

পেসোয়া সরল ছিলেন না, ছিলেন সরলের মতো জটিল বা জটিলের মতো সরল। অর্থের অনুসন্ধান করতেন তিনি এবং তা ছিল উদ্দেশ্যহীন এই অর্থে যে তা-ও অস্পষ্ট হয়ে উঠত। বাতিল করতেন না কোনো সম্ভাবনা, যা ভাবতেন আর যা আবির্ভূত হতো তাকে পছন্দও করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন যেমন একজন বিশ্বাস করেন যে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাঁর সংশয়বাদ ছিল বিরামহীন। বলা যায়, এই একটা জিনিসই তিনি বিশ্বাস করতেন এবং নানাভাবে ও উপায়ে এর শাখাপ্রশাখা বিস্তার করতেন। দ্বিধা আর দোদুল্যমানতা ছিল তাঁর অর্থহীন দুই শক্তি যা তাঁর অন্তর্জগৎকে শক্তিশালী করে তুলেছিল এমনভাবে যে, এই দুই প্রবৃত্তির দুর্মর মানচিত্রায়ন আমরা দেখি তাঁর গদ্যে-পদ্যে। দ্য বুক অব ডিসকোয়াইআট-এর লেখাগুলো নিয়ে তাঁর সমস্যার কথা বলতে গিয়ে তিনি তাঁর কবি-বন্ধু আর্মান্দো কোয়ের্তেশ-রদরিগশকে ১৯ নভেম্বর ১৯১৪ তারিখে লেখা এক চিঠিতে বলেন: আমার মনের অবস্থা  আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্য বুক অব ডিসকোয়াইআট-বিষয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে আমাকে বাধ্য করে। কিন্তু তা সবই বিচ্ছিন্ন অংশ, বিচ্ছিন্ন অংশ, বিচ্ছিন্ন অংশ মাত্র।’ একই ব্যক্তির কাছে আগের মাসে লেখা আরেক চিঠিতে তিনি বলেন এক ‘গভীর এবং প্রশান্ত অবসাদের’ কথা, যার কারণে ওই বইটির সামান্য অংশবিশেষ বা কিছু ভাঙা ও অসংলগ্ন অংশমাত্র তিনি লিখে উঠতে পেরেছিলেন। বুক অব ডিসকোয়াইআট-এ এমন অনেক উক্তি আছে যা তাঁর এই উদ্বিগ্ন অনিশ্চয়তা এবং অক্রিয় মানসিকতাকে প্রতিফলিত করে। বইটির ১৫২ সংখ্যক রচনায় তিনি বলছেন: ‘যখনই কোনো কিছু সমাপ্ত করি, আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। হতভম্ব হই আর বিষণ্ন হয়ে পড়ি। আমার পূর্ণতাকাঙ্ক্ষী প্রবৃত্তি শেষ করতে আমাকে নিষেধ করে; এমনকি আরম্ভ করতেও আমাকে নিষেধ করে। কিন্তু আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি আর কিছু-একটা করতে শুরু করি। ফলে যা অর্জিত হয় তা নয় আমার ইচ্ছার কোনো কাজের ফল বরং তা আমার ইচ্ছার আত্মসমর্পণ। আমি শুরু করি কারণ ভাবনার কোনো শক্তিই আমি পাই না; আমি শেষ করি কারণ ছেড়ে দেবার কোনো সাহসই আমি পাই না। এই বইটি আমার এই দুর্বলচিত্ততার কাজ।’ এই বেঁচে থাকা ছিল তাঁর কাছে ‘বিশ্বাস আর অর্ধেক প্রত্যাখ্যানের বিশাল দোলন।’ বলা সংগত যে, বিশ্বাস আর সন্দেহ―যাকে বলা হয় আধুনিক কাব্যিক সংশয়বাদ―দুটোই ছিল তাঁর লেখার সারবস্তু। অস্তি ও নাস্তি, ভাবনা ও প্রতিভাবনা, সদর্থক ও নিরর্থকের যে অনন্ত দোলা, তার নন্দনকে পেসোয়া তাঁর কবিতায় এমনভাবে প্রতিভাসিত করেছেন যা সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে একক এবং অনুপম। অসংখ্য কবিতায় এই তোলপাড় করা দ্বিধা এবং ব্যক্তিচিত্তের চঞ্চলতা উঠে এসেছে। দ্ব্যর্থকতা বা আপাতবিরোধিতা তাঁর কবিতার এক অভিলষিত বিষয়। কায়েইরুর কবিতায় এমন এক আধুনিক প্রবণতা পরিদৃষ্ট হয় যা দেখা দিয়েছিল টি. ই. হিউম, এজরা পাউন্ড প্রমুখের মধ্যে, চিত্রকল্পবাদের আবরণে, যা সংশয়বাদের হাত ধরে ধারণামূলক চিন্তায় এবং বিশ্বাসের স্থানান্তরণে দাঢ্য দৃশ্যমান প্রপঞ্চে উপনীত। কায়েইরুর সর্বপ্রাণবাদ এমন ধরনের যা সবশেষে ঈশ্বরে ভাগ হয়ে যায়, দৃশ্যমান জগতের প্রতি ঈশ্বরের গুণারোপ করে, যা রিলকের কবিতাকে মনে করিয়ে দেয়। ‘রাখাল’ কবিতায় তিনি বলছেন:

কিন্তু যদি ঈশ্বর হন ফুল এবং বৃক্ষ
এবং পাহাড়পর্বত এবং সূর্য এবং চাঁদের আলো,
তাহলে তাঁকে আমি বিশ্বাস করি,
তাহলে প্রতি মুহূর্তেই তাঁকে আমি বিশ্বাস করি,
আর আমার জীবন শুধুই এক প্রার্থনা আর এক উপাসনা,
আর দর্শনে এবং শ্রবণে এক গভীর চিন্তন।

কিন্তু যদি ঈশ্বর হন গাছপালা এবং ফুল
এবং পাহাড়পর্বত এবং চাঁদের আলো এবং সূর্য,
তাহলে কেন আমি তাঁকে ডাকব ঈশ্বর?
আমি তাঁকে ডাকব ফুল এবং বৃক্ষ এবং পাহাড় এবং সূর্য
আর চন্দ্রকিরণ;


আমি বিশ্বাস করি না ঈশ্বরে, কারণ আমি তাঁকে কখনও দেখি নি।


এই কবিতার ৭-সংখ্যক স্তবকের সমাপ্তিতে পেসোয়া বলছেন যে ‘প্রতিভাত হওয়াই আমাদের একমাত্র সম্পদ’ যা ৫-সংখ্যক স্তবকের বিপরীত-অধিবিদ্যার পঙ্‌ক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়: ‘বস্তুর একমাত্র অন্তর্নিহিত অর্থ হলো তার নেই কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ।’ দীর্ঘ দ্বিধার পর, ১৯১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি আর্মান্দো কোয়ের্তেশ-রদরিগশকে (১৮৯১-১৯৭১, একজন আজোরীয় কবি যিনি ১৯১০ সালের দিকে পেসোয়া ও অন্যান্য পর্তুগিজ আধুনিক কবির সাথে মিলে কাজ করেছিলেন) লেখা এক দীর্ঘ চিঠিতে পেসোয়া নিজেকে বলেছেন ‘একজন মৌলিক ধর্মীয় সত্তা’। আরও বলেছেন ভয়ঙ্কর ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর অবিরত আগ্রহের কথা যা ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রতিভার মাধ্যমে প্রত্যেক প্রতিভাবান মানুষ পেয়ে থাকে। এরই সমান্তরাল উচ্চারণ আমরা পাব উদ্বেগপুস্তক বা  বুক অব ডিসকোয়াইআট-এর শুরুতে: এমন এক সময়ে আমি জন্মেছিলাম যখন অধিকাংশ তরুণেরা ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছিলেন, যেমনটা একই কারণে তাদের পূর্বসূরিরা  হারিয়েছিলেন―সত্যিকার কারণ না জেনেই। আর পরবর্তীকালে মানবসত্তা স্বাভাবিকভাবেই যুক্তি ব্যতীত অনুভূতির ওপর ভর করে মীমাংসায় যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে, এইসব তরুণের অধিকাংশই ঈশ্বরকে প্রতিস্থাপনের জন্য মানবতাবাদকে পছন্দ করে নেয়। যা-ই হোক না কেন, আমি হলাম এমন ধরনের মানুষ যে সর্বদাই তার অধিকারের মধ্যে থাকি, তিনি যে বহুত্বের অংশ শুধু তাকেই দেখি না বরং এর চারপাশের খোলামেলা পরিসরকেও দেখি। এ কারণে আমি ঈশ্বরকে একেবারে এমনভাবে ছেড়ে দিই নি যেমনটা তারা ছেড়ে দিয়েছিল, আর আমি মানবতাবাদকেও কখনও গ্রহণ করি নি। যদিও বা অপ্রামাণ্য, থাকলেও থাকতে পারে, তবু এই ঈশ্বরকে আমি যুক্তি দিয়ে বুঝে নিয়েছিলাম  যে কোন ক্ষেত্রে তিনি পূজনীয়। কিন্তু রাফায়েল বালদায়া, এই  অন্যনামে  কিছু দার্শনিক রচনা রয়েছে তাঁর,  যার মধ্যে আছে ‘নিষেধবিষয়ক নিবন্ধ’ বা ‘ট্রিটিজ অন নিগেশন’, যাতে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন যে সত্তা ‘আবশ্যকীয়ভাবে এক বিভ্রম এবং মিথ্যাচার। ঈশ্বর হলো এক চরম মিথ্যা।’ ‘রাখাল’ কবিতায় এই ঈশ্বর-বিষয়ে যা তিনি বলেছেন তা-ও হেঁয়ালিতে ভরা এবং  বিশ্বাসের স্থানান্তরণের এক আধিবিদ্যক মজা উপস্থাপন করে:

আমি বিশ্বাস করি না ঈশ্বরে, কারণ আমি তাঁকে কখনও দেখি নি।
যদি তিনি চাইতেন যে আমি তাঁকে বিশ্বাস করি, তাহলে তিনি
অবশ্যই আসতেন আর আমার সাথে কথা বলতেন,
আমার দরজাপথ দিয়ে এসে বলতেন, এই যে আমি এখানে!

পেসোয়া যখন বলেন যে, কখনও কখনও তিনি অনুভব করেন পূর্বঘোষিত মৃত্যুস্পর্শ, বা  মৃতদেহ দেখলে তাঁর মনে হয় মৃত্যু এক প্রস্থান, মৃতদেহকে যেন মনে হয় ফেলে রেখে যাওয়া একপ্রস্থ পরিধেয় বস্ত্র যা কেউ ফেলে রেখে চলে গেছে, তখন তার মধ্যে ধ্বনিত হয় এক উদাসীন আধ্যাত্মিকতা। এ আধ্যাত্মিকতায় প্রাচ্যও এসে হাজির হয়। আমরা জানি নানা ধরনের ও নানা এলাকার ধর্ম-দর্শন এবং গূঢ়বিদ্যায় তাঁর আগ্রহ ও আতিশয্যের কথা। হয়ত এ কারণেই প্রাচ্য সম্পর্কে তাঁর ধারণা অতিরিক্ত মাত্রা পায় দু-একটি কবিতায়:

উত্তরের দিকে সজোরে ছুড়ে দিই আমার একটি পাপড়ি,
আজকের শহরের বাড়িগুলোকে ভালোবাসতাম আমি খুব বেশি।
আমার আরেকটি পাপড়ি সজোরে ছুড়ে দিই দক্ষিণে,
নাবিকেরা যেখানে হাল ফেলেছে সমুদ্রের আশ্রয়ে।
আরেকটি পাপড়ি ছুড়ে দিই পশ্চিমে,
যেখানে মনে হয় ভবিষ্যৎ দেদীপ্যমান হয়ে লাল-তপ্ত হয়ে আছে,
আর এমনকি যদিও তা অজানা তবু আমি তাকে ভক্তি করি।
আর আরেকটি, অন্যটি, যা অবশিষ্ট আমার কাছে, তা সজোরে ছুড়ে দিই
পূর্বে,
পূর্ব, যেখান থেকে বিশ্বাস এবং নতুন দিন, সবকিছু আসে,
জাঁকালো আর অনুরক্ত আর উষ্ণ পূর্বদেশ,
বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ, শিন্টোবাদের পূর্বদেশ,
সেই পুবদেশ যেখানে সবকিছু আছে যা নেই আমাদের,
আমরা নই, পুবই সবকিছু,
সেই পুবদেশ যেখানে―কে জানে?―সম্ভবত খ্রিস্ট এখনও বেঁচে আছেন,
যেখানে সম্ভবত ঈশ্বর সত্যিকারভাবে অস্তিত্বশীল আর সবকিছুকে শাসন করছেন…

শিল্পের জন্য শিল্পকে তিনি ঘৃণা করতেন, নিজের সাম্প্রতিক সাহিত্যিক তৎপরতাকে কেবল নিজের বিশ্বস্ততার শুরু বলে মনে করতেন। মনের নৈর্ব্যক্তিক নিয়ন্ত্রণ যে কবিতার জন্য দরকারি, এলিয়টের মতো তিনিও তা বিশ্বাস করতেন। এলিয়টের মতো তিনিও মনে করতেন, শিল্পী যতই পূর্ণ হবে, ততই তার ভেতরে যে যন্ত্রণা আর যে মন সৃষ্টিশীল মন, তাদের বিবিক্তি ঘটবে। কিট্‌স কথিত ‘নিগেটিভ ক্যাপাবিলিটি’ ছিল পেসোয়ায়। তাঁর এই নৈরাত্ম্যরীতি সকল অনিশ্চয়তা, রহস্য এবং সন্দেহকে অভিজ্ঞতার সমগ্র সত্যের ওপর নির্ভরশীল উভবলতাকে ছেড়ে দিতে তাঁকে শক্তি জুগিয়েছিল। আর ছিল বিশ্বাস ও সন্দেহ, দেশপ্রেম এবং সন্দেহ আর দেশাত্মবোধ ও প্রেমের মধ্যে অন্তহীন স্থানপরিবর্তনকারী দ্বন্দ্ব, এবং এটাই ছিল জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। সকল যথার্থ নৈর্ব্যক্তিক কবিতা অথবা প্রেমবিষয়ক ব্যক্তিক কবিতাগুলো তীব্র যন্ত্রণার এক সারাৎসার। আর এ কারণেই কবিতার পর কবিতায় অন্তচিন্তা এক রহস্যময়তায় পরিণত, যা ধাবমান ও বলা যায় দৈবনির্দেশিত। সমালোচকেরা বলেছেন তাঁর কবিতা হলো―বদ্ধ আধার, মুক্ত আধেয়। তিনি এক অসাধারণ জটিল ব্যক্তিত্ব যিনি লিখেছেন অসাধারণ সারল্যে। সারল্যে, কেননা তাঁর কবিতাগুলোতে ধ্বনিত হয়েছিল এক নিষ্ক্রিয় আর্তি যা ছিল সহজ, কিন্তু তাতে ব্যাপ্ত ছিল সমগ্র। ব্রহ্মাণ্ডের মতোই অনেক হতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন: ‘প্রত্যেকটি মানুষই আমার ভেতর অস্তিত্বশীল। আমার মধ্যেই রয়েছে সকল সমাজ। আমিই আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু এবং একনিষ্ঠতম শত্রু।’ সৌন্দর্য সম্পর্কে কি কিছুটা বিমানবিক ছিলেন? হয়ত, কেননা জগতের সাথে তাঁর যে সম্পর্ক তা ছিল অনিশ্চিত এবং অভৌতগত। এজন্যই বলতে পারলেন, ‘এমনকি একজন সুন্দরী নারীও মূর্তির মতো তৃপ্ত করতে পারে না। কারণ একজন নারী অন্যান্য ভৌত ও নৈতিক জিনিসের মতোই সুন্দর, যা নয় আদতে কোনো সৌন্দর্য। একটি মূর্তি কেবলই সুন্দর। (এটা যদিও পাথর, কিন্তু তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না, এটাকে আমরা উপেক্ষা করে যাই, শুধু নিই সৌন্দর্যটা।)’

সবকিছুই নিরর্থক। সারাটি জীবন একজন মানুষ অর্থ রোজগার আর সঞ্চয় করে যায়, যদিও সে কোনো সন্তানাদি রেখে যায় না বা তার জন্য স্বর্গে কোনো অতুলনীয় অংশ সংরক্ষিত রাখার আশাও থাকে না। অন্য একজন মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে অবিশ্বাসী হয়েও মরণোত্তর খ্যাতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যায়, যা তাকে এই খ্যাতির জ্ঞানগম্যি দিতে পারবে। আবার আরেক জন এমন সব জিনিসের পেছনে নিজেকে ছুটিয়ে নিঃশেষ করে, যার জন্য আসলেই তার কোনো অভিনিবেশ নেই। তারপর এমন একজন আছে যে…

একজন খামোখাই শেখার জন্য পড়ে। অন্য একজন খামোখাই বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে ফুর্তিতে রাখে।

[উদ্বেগ-পুস্তক]

তাঁর জীবন তাঁর নিজের ভাষায়, দিনেও অর্থহীন রাতেও অর্থহীন, তাঁর জীবন যেন এক স্বাক্ষরহীন রসিদ। ব্যর্থতা তাঁরই আরেক নাম হতে পারত। তিনি যখন বলেন, ‘জীবন আমাকে হিম ধরিয়ে দেয়। আমার জীবন এক স্যাঁতসেঁতে ভূগর্ভস্থ কক্ষ বা আলোহীন এক ভূগর্ভস্থ সমাধি। আমি হলাম দুর্যোগে পরাজিত সেই শেষ যোদ্ধা যে ধরে রেখেছিল শেষ সাম্রাজ্য। হ্যাঁ, মনে হয় আমার, যেন আমি এক প্রাচীন শাসিত সভ্যতার সমাপ্তিতে ছিলাম। আমি, যে কিনা অন্যদের হুকুম করতে ছিল অভ্যস্ত, এখন একা এবং পরিত্যক্ত। আমি, একদা যার কিনা ছিল পরামর্শক দল, এখন নেই কোনো বন্ধু বা পথপ্রদর্শক। আমার ভেতরে  সর্বদাই যেন কেউ একজন করুণা ভিক্ষা করছে, আর তা এমনভাবে তার ওপর কাঁদছে যেন মৃত এক দেবতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদছে যার সকল বেদী ধ্বংসপ্রাপ্ত যখন তরুণ বর্বরদের আক্রমণ সীমান্তকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল আর জীবন জানতে চেয়েছিল যে সুখশান্তি দিয়ে সাম্রাজ্য কী করেছিল। অন্যরা আমার সম্পর্কে কী বলে এই ভেবে আমি ভীত-সন্ত্রস্ত। সবকিছুতেই আমি ব্যর্থ। কোনো কিছু হওয়ার সাহসই আমার হয় নি; এমনকি কিছু হওয়ার চিন্তা আমার স্বপ্নেও ছিল না। কারণ এমনকি আমার স্বপ্নে―নিছক স্বাপ্নিক হিশেবে আমার দূরদর্শী মানসিকতায়―আমি বুঝি জীবনের জন্য আমি ছিলাম অনুপযুক্ত।’―তখন আমরা বুঝি জীবন সম্পর্কে তাঁর বৃদ্ধিমান বিরক্তি, যা ব্যর্থতারই অপর অন্তর্লেখকে উপস্থাপন করে। অন্তর্লেখ কেননা তাঁর জীবনকে বোঝা যায় শুধুই তাঁর লেখা দ্বারা যা সংশয়ার্তভাবে হলেও ব্যাখ্যা করেছে তাঁর যাপিত জীবনকে, যে জীবন কোনো তত্ত্ব বা সূত্র ছাড়াই একেবারে ছিল অন্তর্গূঢ় এবং অন্তর্নিবিষ্ট। তাঁর সব ধরনের লেখায় তিনি তা বলেছেন মুহুর্মুহুভাবে; উদ্বেগ-পুস্তক-এর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় এই সুর বিরামহীন এবং  অন্তর্ভেদী দগ্ধতায় উন্মোচিত যা পুনর্ব্যক্ত করে এক ধরনের ন্যূনতাবাদী পরাতত্ত্ব, বাসনাহীন মনস্তাপ আর অপার নিরাসক্তিকে:

সে-ই সুখী মানুষ জীবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা দেয় তার চেয়ে যে বেশি কিছু চায় না, বেড়ালের প্রবৃত্তি দ্বারা যে ব্যক্তি নির্দেশিত যা সূর্যের ঋতুতে সূর্যালোক খোঁজে আর যখন সূর্য থাকে না তখন খোঁজে উত্তাপ, যেখানেই তা পায় না কেন। সুখী সেই জন যে কল্পনাপ্রতিভার জন্য নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিহার করে আর অন্যের জীবন নিয়ে ভাবতে পুলকিত হয়, সব উপলব্ধিকে অভিজ্ঞতায় এনে নয়, বরং সব বাহ্যিক লক্ষণীয় উপলব্ধিকে অভিজ্ঞতায় এনে। আর চূড়ান্তভাবে সে-ই সুখী মানুষ যে সবকিছুকে পরিহার করে, নেওয়ার মতো যার কাছে কিছুই নেই, কিছুই নেই কমানোর মতো।

সাদাসিধে, উপন্যাস-পাঠক, তপস্বী―তারাই জীবনে সুখী, কারণ এই তিন ধরনের মানুষই পুরোমাত্রায় তাদের ব্যক্তিত্বকে বর্জন করে: একজন করে কারণ সে বাঁচে প্রবৃত্তি দ্বারা, যা নৈর্ব্যক্তিক, অন্যজন করে কারণ সে সৃজনীকল্পনার দ্বারা বাঁচে, যা বিস্মরণময়, আর তৃতীয় জন করে কারণ সে বাঁচে না, শুধু (যেহেতু সে এখনও মরে নি) ঘুমায়।

কিছুই আমাকে তুষ্ট করে না, কিছুই আমাকে প্রবোধ দেয় না; যা কিছুই রয়েছে বা নেই সবকিছুই আমাকে অবসন্ন করে। আমি আমার আত্মাকে পেতে চাই না আর তাকে পরিহারও করতে চাই না। আমি চাই তাকে যাকে আমি চাই না আর বর্জন করি তাকে যা আমার নেই। আমি হতে চাই না-কিছু না সবকিছু: যা আমার নেই আর যা আমার দরকার নেই―এই দুয়ের মাঝে আমি এক সেতুবন্ধন।

তাঁর উদ্বেগ-পুস্তক পড়লে যে বইটির কথা মনে আসে তা হলো আমিয়েলস জার্নাল যা তাঁরও পড়া বই ছিল। আমিয়েলের সুরেই তিনি লিখেন, ‘জীবন ছাড়া আর সব কিছুই অবহনীয় হয়ে পড়েছে আমার কাছে। অফিস, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট―এমনকি তাদের বিপরীতগুলোও―যদি তা আমার নিয়তিও হয়―আমাকে গ্রাস করে এবং নিপীড়ন করে।’ কবিতা লিখেছেন নিজ আত্মার সুরে, এজন্যই তিনি বলেন, ‘পর্তুগিজে আমি লিখি না। আমি লিখি আমার আত্মসত্তায়।’ তাঁর হতাশা, ভঙ্গুরতা, মানসাঘাত, তাতে পৃথিবীর সাথে তাঁর ব্যক্তিসম্পর্কের প্রতিচরিত্র প্রকাশিত হয় যা আসলে বিবিক্ততা এবং জীবন সম্পর্কে এক ধরনের অবরোধভীতি আর এজন্যই তিনি বলতে পারেন, জীবন এক অপ্রশমিত জ্বর, এক অনিবারিত তৃষ্ণা।


রাতে হাঁটতে ভালোবাসতেন, বলেওছেন যে দিন হলো অর্থহীন সব তৎপরতায় পূর্ণ আর রাত অর্থহীনভাবে এই তৎপরতা থেকে মুক্ত; বলেছেন, ‘দিনে আমি কিছুই না, রাতেই আমি আমি’।


দৈনন্দিন জীবন থেকে সমগ্র জীবন, যা-ই আমরা দেখি, মনে হবে একটি নিপাট ব্যর্থতা; একটি প্রচ্ছন্ন মগ্নতার ভেতর তিনি রয়ে গিয়েছিলেন সারা জীবন। প্রচ্ছন্ন মগ্নতা, কেননা বাহ্যিক যাপনও একে সমর্থন করে, ইউরোপে জন্মে বলতে গেলে পারিবারিক সূত্রে আফ্রিকার ব্যাপারটা বাদ দিলে, লিবসনে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের সমগ্র সৃষ্টিশীল সময়। এই অবস্থানের সাথে তাঁর চৈতন্যের বোধিত অবস্থার মিল রয়েছে: তিনি স্থান পরিবর্তনে আগ্রহী ছিলেন না, ছিলেন না স্থানমাহাত্ম্যেও। এজন্যই বলতে পারেন যে অপরিবর্তনশীলতার প্রতি তাঁর অপরিবর্তনীয় ও মৌলিক প্রেম রয়েছে। তিনি বলেছেন, জীবনের নতুন পথ এবং অপরিচিত স্থানকে তিনি ঘৃণা করেন। শুধু তা-ই নয়, আরও অগ্রসর হয়ে বলেছেন যে, ভ্রমণের ভাবনা তার গা গুলিয়ে দেয়, আপাতবিরোধছলে বলেছেন: ‘যা কখনও দেখি নি তা ইতোমধ্যেই দেখে ফেলেছি। যা দেখার বাকি, তা-ও ইতোমধ্যে দেখে ফেলেছি।’ তাঁর কবিতাও যে-অতিকথা বলতে চায়, তাও আসলে এই মগ্নতার  ভেতর থেকে যেন  জেগে ওঠা কোনো মানুষের ভাবগ্রাহিতা। কোনো এক প্রণোদিত নির্জনতাই যেন ছিল তার বন্ধু যা বাতিল করে দিয়েছে আর-সব মানবিক বন্ধুত্ব। তিনি বলেছেন, তিনি ব্যর্থ, কিন্তু ঠিক এভাবে নয়, আরও মানসিক দৃঢ়তায় নিজেকে অনুমোদন করে বলেছেন, ‘আমি জানি, আমি ব্যর্থ। এই অস্পষ্ট ইন্দ্রিয়সুখকর ব্যর্থতাকে উপভোগ করি আমি, যেমন একজন চরম অবসাদে, জ্বরে শয্যাগত হয়ে সেই জ্বরেরই গুণগান করে।’ বলেছেন, ‘বন্ধুত্বের জন্য নিশ্চয়ই কিছু প্রতিভা আমার ছিল, কিন্তু কখনোই আমার কোনো বন্ধু ছিল না, হয়ত বা কারণ ছিল তারা সত্যিকার অর্থে দৃষ্টিগোচর হয় নি, অথবা এজন্যই যে,  আমি যে বন্ধুত্ব কল্পনা করেছিলাম  তা ছিল আমার স্বপ্নের ভুল। সবসময় একা থেকেছি আমি, এবং চিরকাল একা যাতে আমি হয়ে উঠেছি অতিমাত্রায় আত্মসচেতন।’ এ স্বীকারোক্তি কোনো অভিমানাহত উক্তি নয়, বরং তাঁর যাপিত জীবনেরই সম্পর্কবন্দী ঘটনা। এ নিরর্থকতাকে সদর্থক করে হয়ত বলা যায়, তিনি সার্থক হতে চান নি, চান নি থিকথিক বন্ধুত্ব, কারণ এগুলোই ছিল তাঁর আড়াল যা তাঁর প্রতিভার জ্বালানি ছিল।

দীর্ঘজীবন পান নি, মদ্যপান ছিল তাঁর যাপনেরই এক দিক। রাতে হাঁটতে ভালোবাসতেন, বলেওছেন যে দিন হলো অর্থহীন সব তৎপরতায় পূর্ণ আর রাত অর্থহীনভাবে এই তৎপরতা থেকে মুক্ত; বলেছেন, ‘দিনে আমি কিছুই না, রাতেই আমি আমি’। সমগ্র শহরতলি তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরতেন শুঁড়িখানা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতেন মদ, হয়ত এটা ছিল তাঁর আত্মসম্ভোগের এক উপায়, কিন্তু টলতেন না কস্মিনকালেও, যেন ধারণ করতে চাইতেন একই সাথে নিজেকে এবং পৃথিবীকে, আর এক অন্তহীন অজানাকে। মদ হলো প্রাচীন দাওয়াই যা জ্ঞানীকে স্থির রাখে আর নির্বোধকে মাতাল করে মারাও যান মদেরই ক্রিয়ায়। একটি কবিতায়, যা তিনি লিখেছিলেন মৃত্যুর কিছুদিন আগে―উনিশে নভেম্বর ১৯৩৫ সালে,  শেষ পঙ্‌ক্তিতে বলছেন তিনি, ‘আমাকে  বেশি করে দাও মদ, কারণ জীবন কিছুই না।’ হয়ত এই উক্তিটিও ছিল সম্ভাব্য অস্তিত্বের বিরুদ্ধে নিশ্চিত অনস্তিত্বের এক নিগূঢ় অভিমানী উচ্চারণ।


পড়ুন : ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী