হোম গদ্য আমার ৯০ বর্ষী প্রেমিকা মেরাতুন

আমার ৯০ বর্ষী প্রেমিকা মেরাতুন

আমার ৯০ বর্ষী প্রেমিকা মেরাতুন
585
0
11225615_993071030733747_2099198067_n
মেরাতুন্নেসা; স্কেচ : গোলাম উল্লাহ নিশান

দুই আর দুই কত? সবার মতোই জুবেল বলে, চার। কিন্তু মেরাতুন্নেসার দৃষ্টিতে এই হিসাব শুধু অঙ্কের। তবে অঙ্কটা বড্ড সরল। দুই আর দুইয়ের আসল যোগফল ভিটামাটি। মানে স্বামী+স্ত্রী+দুই সন্তান=ভিটামাটি। এই অঙ্কের ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে ঢুকে গেছি মানুষটার ভেতরে। তাঁর মর্ম ছুঁয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছি, কত বড় মেরাতুন্নেসার পৃথিবী। তিনিই আমাকে শিখিয়েছেন, কথার দুই মাথা। একটা জনে জনে, আরেকটা মনে মনে। এক সময় আমি মনে মনের কথা জনে জনে বলতাম। এখন বলি না।

ফেইসবুকে কবি জুয়েল মোস্তাফিজের লেখা ধারাবাহিক গদ্যে মেরাতুন্নেসার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। মেরাতুনের পৃথিবী ও জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে মুগ্ধ করে, আমি এই নব্বই বর্ষী রমণীর প্রেমে পড়ে যাই! কত জনের প্রেমে যে পড়লাম জীবনে, হিসাব কষে দেখি নি! সে সব প্রেম তো শুধু রমণীর রূপ-গুণের প্রতি প্রেম। কোনো নারীর কথা বলা আর দার্শনিকতার প্রেমে পড়া এই প্রথম। কবি জুয়েল মোস্তাফিজের নানি এই মেরাতুন্নেসা।

মেরাতুন্নেসা মনমহাজনের কথা বইটি প্রকাশের আগে ফেইসবুকে কয়েকটি লেখা নোট আকারে দিয়েছিলেন কবি। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে চৈতন্য থেকে বইটা প্রকাশ হয়। বইমেলার তৃতীয় শুক্রবার সন্ধ্যায় কবিবন্ধু শিমন রায়হানের সঙ্গে শাহবাগের দিকে হাঁটছিলাম। কথার ফাঁকে ‘আস্তে কইরা মাইরবো মাধব, জোরে জোরে কাইন্দো’ এইটুকু গানের মতো করে উচ্চারণ করি অজান্তেই। শিমন হঠাৎ বলে ওঠে, এক সপ্তা ধরে বইটা শিয়রে রেখে ঘুমাতে যাই। চারপাশ শুনশান হবার পর বইটা পড়ি। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বই। আমি বলি, কোন বই? ও বলে, মেরাতুন্নেসা। তার মানে শিমন আমার আগেই বইটা পড়ে ফেলছে। আমি ওইদিনই কিনেছি। তবে যেটুকু গানের মতো করে উচ্চারণ করেছি, ওই লাইনটা ফেইসবুকে পড়ার পর হৃদয়ঙ্গম হয়ে ছিল। আমি শিমনকে জিজ্ঞেস করি, বইটা তোমার কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে? ও মুহূর্তের মধ্যেই উত্তর দিয়েছে, ‘আমাদের বাঙলার যে সাংস্কৃতিক রূপ, নারীমননের যে বিশালত্ব, মেরাতুন্নেসার মাধ্যমে তার অনেকখানি পাওয়া যায়’। গত তিন মাসে বইটা আমি দুবার পড়েছি। শিমনের মতের বিরোধিতা করতে পারি নি। বরং মেরাতুনের দর্শনের প্রতি আমার প্রেম বলুন বা অনুরাগ—জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। শুনেছি এই নারী এখন স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না। পারবেনই বা কিভাবে! জুয়েল মোস্তাফিজের বড় কবি, মনমহাজন মেরাতুন্নেসা নব্বই বসন্তকে তাঁর পাকা চামড়ায় ভাঁজ করে রেখেছেন। মনের মহাজন মেরাতুনের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, কিন্তু নাতির কল্যাণে তাঁর পুরনো চোখ দিয়ে, দেখার চোখ তৈরি করে নিচ্ছে কত-শত নাতি-পুতি!

জুয়ার আসরে কোন আঙুলই মিথ্যা নয়, ভাতের ভূগোল, দুধের পুকুরে ভাসছে কফিন—এই তিনটি কাব্যের পর মেরাতুন্নেসা কবি জুয়েল মোস্তাফিজের প্রথম গদ্যের বই। নানিকে নিয়ে কোনো সাহিত্যের বই বাংলা ভাষায় এর আগে হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। মেরাতুন্নেসা মনমহাজনের কথা বইটি অবশ্যই নানি ও নাতির ব্যক্তিগত আখ্যান। তবে ব্যক্তিসীমানা ছাড়িয়ে মেরাতুন্নেসা হয়ে উঠেছে প্রাচ্য দর্শনের মুখ। কেউ যদি গ্রন্থটির সীমানা ‘মেরাতুন-জুবেল’ ফ্রেমে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করেন, সেটা হবে কূপমণ্ডুকতা। ঈর্ষাপরায়ণতাও হতে পারে। কেন না, এ রকম বই বছর বছর রচিত হয় না।

বইটি উনিশটি অধ্যায়ে ভাগ করা। একেকটি অধ্যায়ে রয়েছে গল্পের ডালপালা, কথা-উপকথার সমাহার। মেরাতুন্নেসাকে সুখপাঠ্য করেছে কবির লেখনিশক্তির সঙ্গে গল্পের আকারে দর্শনের উপস্থিতি ও কাব্যময়তা। অসময়ে ঘুম ভেঙে গা মোচড় দিয়ে মেরাতুনের বিছানা ছাড়ার দৃশ্যকে তুলনা করা হয়েছে বৃদ্ধ ঘোড়ার কাঁপুনি দিয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে। ছিয়াত্তর পৃষ্ঠা জুড়ে অসংখ্য চিত্রকল্প আছে, যা গদ্যগুলোকে করেছে কাব্যিক। আর আবহমান বাংলার দর্শনকে গল্পের ছলে এমনভাবে জায়গা করে দেয়া হয়েছে, ইয়স্তন গার্ডারের সোফির জগৎ পাঠ মনে পড়েছে আমার। প্রথম অধ্যায় দুই আর দুই ভিটামাটি শুরুর আগে গোলাম উল্লাহ নিশানের আঁকা মেরাতুনের পোর্ট্রেটে চোখ আটকে যায়। কোনো পাঠকের সাধ্য নেই, সেই মুখকে এড়িয়ে যাবে। স্কেচটার নিচে লেখা,‌ ‘জুবেল, সন্তান হইল কলিজার পোকা। কলিজা ফাইড়া বাহির হয়। সন্তান মইরা গেলে কলিজা ফুটা হয়ে যায়। সন্তান যখন বড় হয়, তখন সে হয় মায়ের লাঠি। ভিটা-মাটিতে সাপ ব্যাঙ ঢুকতে পারে না’। এই উক্তির মাধ্যমে বইটি পড়া শুরুর আগেই দার্শনিক মেরাতুন্নেসার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে। পরে জানা যায়, এই নারীর কলিজা চার বার ফুটা হয়েছে।

যে কোনো দর্শন, হোক প্রাচীন অথবা অধুনা, পাশ্চাত্য বা প্রাচ্য—মেরাতুন্নেসা সকল দর্শনকেই প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। সন্তান মরে গেলে যে মায়ের কলিজা কানা হয়, সন্তান যে মায়ের লাঠি, তা পৃথিবীর কোন সমাজে নেই? তাই মেরাতুন উপমহাদেশের, ল্যাটিনের, ইউরোপের…সবখানের। হাজার বছর ধরে বাংলার মায়েরা যেসব জীবন দর্শনের ছড়া/কবিতা/গান মুখ থেকে মুখে বয়ে বেড়াচ্ছেন, আধুনিক শহুরে সাহিত্য-পণ্ডিতরা তার মূল্য খুব কমই দিয়েছেন। জুয়েল মোস্তাফিজ দিতে পেরেছেন। মেরাতুন্নেসাও ওই সকল মায়ের প্রতিনিধি। তিনিও আবহমান বাংলার ছড়া/কবিতা/গান নিজের ভেতর ধারণ করেছেন। এই মেরাতুন্নেসারাই কিন্তু সাহিত্যসৃষ্টির আকর। তাঁর আলকাপ গানের আয়োজন, গুনগুন করে গান গাওয়ার কথা এসেছে বইটিতে; সেরকমই একটি গান—

11355614_993070964067087_613162434_n
প্রকাশক : চৈতন্য প্রকাশনী

বুকের বল না করে ছল
খাদ থাকে না খাঁটিতে
কোখের ধন হইল বাতি
সাধের ভিটামাটিতে…

ছোট্ট জুবেলের দাঁত পড়বে। নড়বড়ে সেই দাঁত উঠিয়ে ইঁদুরের গর্তে ফেলে, সুন্দর নতুন দাঁত চাওয়ার ওই অংশটুকুতে আমি আমার শৈশবে ফিরে গেছি। সেখানে আমি আর আমার নানি। আমি আমার দাঁত তুলে ফেলেছি। নানী বলছেন, মজি মুন্সির ঘরের কোনায় ইন্দুরের গাতা আছে, ওইখানে ফালাই দিয়া আয় দাঁত। দাঁত ফালানোর সময় কবি ‘ও ইন্দুর, ইন্দুর রে, আমার পঁচা দাঁত নিয়া সুন্দর শক্ত দাঁত দে। তিন বার কবি কিন্তু!’ নানির কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সে কী শান্তি! শুধু আমি কেন, গ্রামে বড় হয়েছেন এমন প্রায় সবারই পড়া দাঁত আর ইঁদুরের গর্ত নিয়ে গল্প আছে। দুই গাছের এক গাছে আম পচে যাচ্ছে, আরেকটায় বেশ ভালো অবস্থা আমের। যে গাছটার আম পচে যাচ্ছে, ওই গাছকে যা তা রকমের বকা মেরাতুনের! আবার মুখ ছোট-বড় হওয়া নিয়ে, মুখের ওজন বাড়ানোর জন্য জুবেলের মুখে কালি লেপ্টে দিচ্ছেন আমার নব্বই বর্ষী প্রেমিকা। এ সবের নিশ্চয়ই কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই। মেরাতুন্নেসারা শুধু যুক্তিশীল দর্শনই ধারণ করে না, অযৌক্তিক-অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কারও বয়ে চলেন। জুয়েল মোস্তাফিজ চাইলেই সেসব কুসংস্কারকে এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি এড়িয়ে যান নি। নিজের প্রতি, মেরাতুনের প্রতি, লেখার প্রতি শতভাগ সৎ থেকেছেন। সততা নিশ্চয়ই একজন লেখকের বড় গুণ। আমার মনে হয়, কিছু কিছু কুসংস্কার শেষ পর্যন্ত আর কুসংস্কার থাকে না; হয়ে যায় আঞ্চলিক ঐতিহ্য। তিনিও সেসবকে ঐতিহ্য হিসাবেই লালন করেছেন। মেরাতুনের ভাষ্যমতে, আয়নাতে দেখা মুখ কোন মুখ না। দাঁড়াতে পারলে মুখ দেখা যাবে।’ সেই আয়না নিশ্চয়ই নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সৎসাহস। সততাকে লালন করে খাঁটি মানুষই কেবল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশান্ত চিত্তে নিজের মুখ দেখতে পারে। আমার এই প্রেমিকা, নব্বই বর্ষী প্রেমিকা মেরাতুন বেশি বেশি কাশতে বলেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে কাশি মানে জীবন। যতক্ষণ কাশি আছে, ততক্ষণ বোঝা যাবে জীবন আছে। দম যদি জীবন হয়, কাশির সঙ্গে দমের একটা দহরম-মহরম সম্পর্ক আছে বটে!

মেরাতুন বড্ড সরল। রেডিওর নাটকে গণ্ডগোল শুনে সে উদ্বিগ্ন হয়, পুরো পাড়া মাতিয়ে তোলে। পাড়ার সকলে সমান উদ্বেগ নিয়ে চলে আসে মেরাতুন্নেসার কাছে। সে ওই গণ্ডগোল করা মানুষগুলোকে খোঁজে। জুবেলের চুল ফেলে আসে নীল বড়ি গাছের তলায়, কাঠকে দিয়ে দেয় নাতির জ্বর। সেই মেরাতুনই বলে, মানবের নাড়ি প্রার্থনা করে মাটি, মানুষ যেন মৃত্তিকারে বুকে করে রাখে। নাড়ি যেমন মাটির হক, তেমনি কবর হইল মাটির ফোঁড়া। নাড়ি আর মাটির সম্পর্ক নিয়ে জুবেলকে বলা তাঁর উক্তি, ‘দুনিয়া দেখলে নাড়ি কাটতে হয়। এই যে তুই জন্মাইলি, তোর জীবনের দেনা মাটির কাছে দিয়েছি আমি। এই নাড়ি জন্মের সুতা, ছিঁড়িস না রে ভাই…’নাড়ি শুকিয়ে গেলে জীবন হয় শুকনো লতা। এই ধ্রুব সত্যিও মেরাতুনের উচ্চারণ। আহা! জীবন হইলে খান খান, নাড়ি ধইরা মারো টান। জমি, পা আর জীবন—এই ত্রয়ীর যে সম্পর্ক মেরাতুন্নেসা বর্ণনা করেন, তেমন কথা বলে যেতে পারেন নি জগৎখ্যাত দার্শনিকরাও। সেই সম্পর্কের ব্যাখ্যার শেষাংশ এরকম, ‘পা হইল মানুষের দুঃখ, মুখ হইল মানুষের সুখ। পায়ের দিক ঠিক না থাকলে মুখের দিক ঠিক থাকে না। তখন মুখ ছোট-বড় হয়।’

11358908_993070830733767_46553624_n
মেরাতুন্নেসা; স্কেচ : গোলাম উল্লাহ নিশান

একটু বেশি ঘুমানো আমার অভ্যাস। ঘুমকাতুরেই বলা যায় আমাকে। এই বেশি ঘুমানো নিয়ে যথেষ্ট যন্ত্রণাও সইতে হয়েছে। জীবন থেকে জীবন হারায়েছি ঘুমের কারণে। ঘুমের আলসেমি আর নির্ঘুম থাকা দুটোই বিরাট সমস্যা। পরিমিত ঘুম জীবনের তেল। এ কথা আমাকে কেউ বলে নি আগে। মেরাতুন্নেসা আমাকে শিখিয়েছে, ‘চেরাগের তেল আলো দেয়, জীবনের তেল দেয় অন্ধকার। চেরাগের তেল শেষ হলে নিভে যায়, জীবনের তেল ফুরালে জেগে উঠে।’ মেরাতুনকে সামনে পেলে জিজ্ঞেস করতাম, যে জীবনে কোনো তেলই নাই, তার তো ফুরাবার প্রশ্ন আসে না। সে কী করে জাগবে? আমার এই নব্বই বর্ষী প্রেমিকা গোসল করতেন গায়ে এঁটেল মাটি মেখে। সেই দৃশ্যের বর্ণনা পড়ে টিয়ার মা নানিকে মনে পড়ে যায় আমার। তাঁর সত্যিকার নাম কী ছিল, তা কখনো জানা হয় নি। পাড়ার মানুষ ডাকত টিয়ার মা। তিনি আমাদের সময়ে ওই নামেই বেঁচে ছিলেন। টিয়ার মা নানিকে স্নান করার সময় মাথায় কখনো সাবান বা শ্যাম্পু দিতে দেখি নি। পুকুরে গোসল করার সময় লাল এঁটেল মাটি মাখতেন চুলে। শ্যাম্পু করার মতো করে চুলে যত্ন করে মাটি মাখাতেন। অল্প ফেনা হতো। নানিরে জিগাই, ও নানি, মাটি দিয়া মাথা সাফ হয়? নানি কয়, দুনিয়ার সাফ! মাটিই খাঁটি রে নাতি…মাটিই খাঁটি। নানির কথা শুনে আমিও একদিন চুলে মাটি মেখেছিলাম। নতুন স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে ভেজা পায়ে হাঁটলে যে রকম কচকচ শব্দ হয়, মাটি মেখে গোসল করার পর ভেজা চুল ধরে টান দিলে ঠিক সেরকম শব্দ হয়েছিল। আহা! মেরাতুন আমাকে বারবার শৈশবে নিয়ে যান! যে মানুষ গায়ে মাটির স্পর্শ পায় নি, সে কী করে বুঝবে মাটির মানুষ কারে কয়? মেরাতুন আমার মাটির মানুষ।

খুব ছোট ছোট অনেক ঘটনা ঘটে যায় জীবনে। সেসব ঘটনার পরম্পরায় জীবনের কোনো একটা প্রান্তে এসে একবার হলেও প্রতিটি মানুষ মৃত্যুকে অনুভব করে। সেই অনুভবটাকে মেরাতুন আখ্যা দেয় জীবনের মোচড় হিসাবে। সেই মোচড়টা প্রাণেরই দেয়া। সে যে দেহের ভেতর আছে, তার অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্য এই মোচড়। প্রাণ আছে বলেই তুমি ভাত খাও, তোমার বুকে ভাত আটকে কষ্ট হয়। এরকম ঘটনায় যেন জীবন কথা বলে চলে জীবনেরই সাথে। মেরাতুন বলেন, জীবন যার সাথে থাকে, তার সাথে কথা বলে। জীবনের সাথে কথা বলার সকালটি ‘ডুমুর’ সকাল। সেইসব ‘ডুমুর’ সকালগুলো পার হতে হতে আমাদের চোখের জাম পাকে। চোখের জাম ভালো করে না পাকলে বড় বিপদ। কেমন বিপদ, তা মেরাতুনই বলুক, ‘চোখের জাম ভাল কইরা না পাকলে ওই চোখের দৃশ্য পাকে না। দৃশ্য না পাকলে দেখার নামে সেই চোখ কিছুই দেখে না।’ জুবেলের চোখ নিশ্চয়ই পেকেছে। না হলে কী আর কবিতা লেখা হয়!

বৃটিশ মুদ্রায় লর্ডের ছবিকে মেরাতুন পরিচয় করিয়ে দেয় অনেক দিনের ঘামাচি বলে। আহারে আমার প্রেমিকা! দুইশ বছরের ঘামাচি চেনে সে। সেই মুদ্রা দিয়ে আবার নাতির ঘামাচি গেলে দেয়। সে জানে, জানালা-দুয়ার ঘরের নাকমুখ। তাই তো সব কটা জানালা খুলে রাখে, প্রাণভরে দম নেয়। আর জীবনের লীলাখেলার সঙ্গে নুনের মতো মিশে থাকে সে, ভেসে থাকে না। আসমান-জমিন কিভাবে একসাথে দেখা যায়, সেই অনুশীলন করাতে গিয়ে জুবেলকে নানি বলেন, ‘মন বেড়ি না থাকলে মুখ পালিয়ে যায়। মুখ পালিয়ে গেলে গলার উপর চোখ থাকে, ঠোঁট থাকে; কিন্তু মুখ আর থাকে না। মন বেড়ি না থাকলে আকাশ আর মাটি একসাথে দেখা যায় না। এ দুনিয়াতে কত মানুষ আছে যারা কেবল আসমান দেখল, জমিন দেখল না। কেউ জমিন দেখল, আসমান দেখল না।’ আমিও আসমান-জমিন একসাথে দেখতে চেষ্টা করেছি। এখনও পারি না। আঁশ ছাড়া মাছ মানুষের বয়স যত হয়, তার চোখের বয়স তত হয় না। জন্মানোর সময় থেকে মানুষের বয়স। কিন্তু চোখ যেদিন থেকে দেখে দেখে মনে রাখতে শিখেছে, সেদিন থেকে চোখের বয়স। মেরাতুনের এ তত্ত্বের পর নিজের চোখকে প্রশ্ন করি, এই চোখ! তোদের বয়স কত? চোখ দুটো বলে, অনেক অঙ্ক আছে। ভালো করে প্লাস-মাইনাস শিখে নাও। তুমি নিজেই পেয়ে যাবে। এখন একটু বিশ্রাম দাও বাপু!

10410437_10203881246329473_3230435910534018634_n
জুয়েল মোস্তাফিজ

চোখের নামে যা দেখলি
দেখা কিন্তু তা নয়
চোখ তাকায়, মন দেখে
দুনিয়া তাতে কথা কয়…

মেরাতুন গান ধরে। এই সরলা রমণীর গান-কথায় আমরা ধীরে ধীরে জেনে যাই, মানুষের দেহখানা কখনো একলা নয়। এই দেহের ভেতর লেগে আছে ‘আমি-তুমি-সে’। দেহখানা একখান ‘আমরা’। ভালবাসা কী রূপে মিঠা ও মজবুত হয়, মেরাতুন্নেসার সেসব ব্যাখ্যা খুবই সরল; কিন্তু মন উচাটন করা। মন শব্দ ছাড়াই কথা বলে। তবে শোনার সময় শব্দ করেই বলে। এই চিরন্তন সত্যিটা নতুনভাবে উপলব্ধি করার উৎস হয় মেরাতুন। এই যে শব্দ ছাড়া কথা বলা, আর শোনার সময় শব্দ করে বলা—এই পরিস্থিতিকে তিনি নাম দিয়েছেন একা একা!

দার্শনিক দিকগুলো ছাড়াও একজন পাঠক মনোগ্রাহী সব গল্পের জন্যও মেরাতুন্নেসা মনমহাজনের কথা  বইটা পড়তে পারেন। অদ্ভুত মেনিপাড়ার গল্প, সেই মেনিপাড়ায় গুমানির ট্র্যাজেডি, ভাতারমারি বিলের ট্র্যাজেডি, দুই সই মেহের নিগার আর সৈয়দার জীবন দেয়া-নেয়ার গল্পগুলো ‘সম্পর্ক’ অনুধাবন করার গল্প। মেনিপাড়ায় প্রত্যেক ঘরেই সন্তানের নাম আছে, কিন্তু সন্তান নেই। গুমানির সন্তানের নাম সেতার। সেই সেতার ছেলে না মেয়ে, কেউ বলতে পারে না। ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’— তারচেও বড় ‘সন্তান’। এই সত্যটুকু অনুধাবন করি আরো একবার।

মেরাতুন মানুষের গোপন নাম দেন বিচ্ছেদ। একজন মানুষকে কতবার, কতভাবে বিচ্ছেদের ভেতর দিয়ে চলতে হয় তা মেরাতুন্নেসার জবানে, জুয়েল মোস্তাফিজের কলমে উঠে এসেছে। জীবনের ভেতরের ভেতর কোনোখানে সব সময় দিন, কোনোখানে সব সময় রাত। কোন জায়গায় না রাত, না দিন। জুবেলকে করা মেরাতুনের প্রশ্ন—এক মানুষ সমান কয় বিচ্ছেদ? ছুটির জার্নাল-এর পাঠকদের জন্য প্রশ্নটা রেখে, আমি এক ব্যক্তিগত দুঃখের বারান্দায় পায়চারি করতে গেলাম।

নানি আমেনা বেগমকে হারানোর সময় আমার বয়স মোটে বারো। এক বছর বয়স থেকে ওই বারো অব্দি কেটেছে তাঁর কোলে-পিঠে। এই অভাগার কপাল বিলের মতো বড় হবে না, তাতে বিছন ছিটাবে না নানি আমেনা; এই দুঃখ নিয়েই একদিন আমি মরে যাব। জুয়েল মোস্তাফিজ, আপনার নানিভাগ্যকে আমি ঈর্ষা করি।

 

মিরপুর

২০.০৫.২০১৫

রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়