হোম গদ্য আজকাল যেভাবে আবদুল মান্নান সৈয়দ পড়ি

আজকাল যেভাবে আবদুল মান্নান সৈয়দ পড়ি

আজকাল যেভাবে আবদুল মান্নান সৈয়দ পড়ি
1.10K
0

আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রেমে পড়েছিলাম সেই প্রথম যৌবনে। তখন কতই-বা আর বয়স হয়েছে। ষোল-সতের। নতুন ঢাকায় এসেছি। সাহিত্য-টাহিত্য পড়ি। সব কিছুকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। দৈনিকের সাহিত্যপাতাগুলো সপ্তাহান্তে হাজির হয় আল্লাহ’র খাস রহমত পাওয়া একগুচ্ছ মানুষের আসমানি বাণী নিয়া। আমি যা পড়ি তাতেই মুগ্ধ হই। বৃহস্পতি আর শুক্রবারে ঘুরে ঘুরে দেয়ালে টানানো পত্রিকার সাহিত্যপাতা পড়ি। সাহিত্য ‘করে’—এ রকম কাউকে চিনি না বলে, পত্রিকার পাতা থেকেই একটা ধারণা নিজের মতো বানিয়ে লওয়ার চেষ্টা করি। এ সময় মান্নান সৈয়দরে পেয়ে যাই হাতের কাছে। আমি যেমন বাচবিচারহীনভাবে যা-তা পড়ি, মান্নানও তেমনি লেখেন বাচবিচারহীনভাবে—প্রায় সব পত্রিকায়, সাহিত্যের প্রায় সকল বিষয় নিয়া। আমার ভালো লাগে। লাগতে থাকে। একটা সময়ে সেই সব পত্রিকাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যেগুলা মান্নানের লেখা ছাপে। তৈরি হয় মুগ্ধতা, মোহাবেশ।


শিল্পসাহিত্য সম্পর্কে আমার বর্তমান ধারণা মান্নানের ধারণার প্রায় বিপরীত।


অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে, মান্নান সৈয়দকে দেখার লোভে আমি হাজির হয়েছি খ্যাত-অখ্যাত বহু সাহিত্যসভায়। বেটাও একখান। উঁচা-লম্বা। সুপুরুষ। লম্বা চুল। চকচকে জামাকাপড়। পরে তাঁর এক গল্প পড়েছিলাম—সম্ভবত সিলেটে মাস্টারির অভিজ্ঞতা নিয়া লেখা। লিখেছেন, রীতিমত কলেজ-পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের সাথে পাল্লা দিয়া তিনি—ঐ তরুণ শিক্ষক—কাপড়চোপড় পরতেন। ঐ গল্পে বর্ণিত সময়ের অনেক পরে তাঁকে যখন দেখি তখন মনে হলো, কথা সত্য। রঙচঙে পোশাক পরার এই ঝোঁক তাঁর শেষ বয়স পর্যন্ত ছিল। তো, আমি তাঁর কথারও প্রেমে পড়েছিলাম। সাহিত্যের পুরা ইতিহাসের উপর বিলক্ষণ অধিকারের একটা অকথিত ইশারা তাঁর সমস্ত উচ্চারণে এমনভাবে প্রকাশিত হতো যে, একটা প্রত্যয়জাত বাড়তি সৌন্দর্য বক্তৃতা থেকে ঠিকরে পড়ত। লম্বা চুলগুলা হাতের বাহারি ভঙ্গিতে একবার কাঁধের বামে আরেকবার ডানে চারিয়ে দেয়ার অভ্যাস ছিল তাঁর। আমার ভালো লাগত সেই ভঙ্গিটাও। হতে পারে মান্নান আমার কাঁচা বয়সের আবেগটা কোনোভাবে শুষে নিতে পেরেছিলেন বলেই এতটা আকর্ষণের উৎস হয়ে উঠেছিলেন। হয়তো মান্নান এত আকর্ষণীয় নন। আমি নিজেও এর প্রমাণ পেয়েছি। শিল্পকলা একাডেমির এক সেমিনার হলে একবার গিয়েছিলাম ‘ব্র্যান্ড’ নাটকের উদ্বোধনী শো দেখতে। শুরুতে আলোচনা। দেখলাম মান্নান সৈয়দও আছেন আলোচকদের মধ্যে। আমার একটু অন্য রকমের আগ্রহ হলো। অনেকদিন তাঁর কথা শুনি না। মনোযোগ দিয়ে লেখাও পড়ি না। আবেগ বোধ করি না। দেখি, এখন তাঁর বক্তৃতা কেমন লাগে। তো, তাঁর বক্তৃতা শুনে হতাশ হয়েছিলাম খুব। তাঁকে সভার সাদামাটা বক্তাদের মধ্যেও বেশ পলকা লাগছিল। দেখলাম, ইবসেনের উপর তাঁর তেমন কিছু বলার নাই। কথার পুরানা ঝাঁজও আর অবশিষ্ট নাই। আমার মায়া লাগল। কেবল তাঁর জন্য নয়, আমার নিজের জন্যও বটে। তাহলে মান্নানের প্রতি আমার এককালীন পক্ষপাত কি কেবলই প্রথম যৌবনের আবেগ? অনভিজ্ঞ তরুণের মূল্যহীন শ্রদ্ধাঞ্জলি? না। এরকম সিদ্ধান্ত কখনো নিতে হয় নি। এখন আমার মোটামুটি বয়স হয়েছে। শিল্পসাহিত্য সম্পর্কে আমার বর্তমান ধারণা মান্নানের ধারণার প্রায় বিপরীত। তাঁর প্রতি আমার এককালীন আবেগের স্মৃতিটাই কেবল বাকি আছে। কিন্তু এখনো সবসময় মনে হয় : আবদুল মান্নান সৈয়দ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকই কেবল নন, শিল্পসাহিত্যের জগতে ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্বও বটে।


আমাকে অবাক করত তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রাচুর্য। কী বিপুল শ্রম, সময়, মেধা যে তিনি লেখার কাজে লাগিয়েছিলেন, তা আমার মতো অলস-অল্পপ্রাণ সাহিত্যকর্মীর পক্ষে বুঝি ভাবাও কঠিন। বিস্মিত হতাম ফি হপ্তায় তাঁর লেখা পেয়ে। একই সাথে এত বিচিত্র ধরনের লেখার ক্ষমতার কথা ভেবে। কোথায় পেতেন এত উৎসাহ-উদ্দীপনা? এটা ঠিক, সাহিত্য করে সাহিত্যিক মহলে এবং তরুণতর লিখিয়েদের কাছে মান্নান যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিলেন। কিন্তু যাকে বলে জাগতিক উন্নতি, একটা বয়সের পর ‘এতকাল সাহিত্য করে কী পেলাম’ গোছের কথাবার্তা বলে আমাদের সাহিত্যিকদের অধিকাংশই যে দিকে ধেয়ে যান, সে লাইনে মান্নান খুব একটা সুবিধা করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। মান্নানের লিপ্ততাকে বিরল প্রজাতির সাহিত্যপ্রেম দিয়েই কেবল ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সাহিত্যপ্রেম জিনিসটা খুব ভালো, এবং কারো মধ্যে এটা থাকা খুব উচ্চপ্রজাতির গুণ নির্দেশ করে—এমন কোনো অনুমান থেকে কথা বলছি না। শুধু বলছি, মান্নান সৈয়দ সারাজীবন সাহিত্যের ঘোরের মধ্যে ডুবে থাকতে পেরেছিলেন। সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি এই ডুবে থাকাটাই তাঁর বিপুল রচনার উৎস। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মান্নান সৈয়দ ছিলেন তীব্রভাবে উৎপাদনশীল। শেষদিকে লিখছিলেন পত্র-প্রবন্ধের ধাঁচে লেখা এক ধরনের মিশ্র গদ্য। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কল্পনা, সমালোচনা মিলিয়ে সে লেখাগুলোও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকেই বারবার নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ করে যাচ্ছিল। যখন তাঁর মৃত্যু-সংবাদ পেলাম, তখন ঘটনাক্রমে বিনয় মজুমদারকে নিয়ে তাঁর একটি লেখা পড়ছিলাম। প্রচুর ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতির প্যাঁচালের মধ্যেও সে লেখায় ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল বিনয় মজুমদার নামের এক কবি, যে কিনা লিখেছে আধুনিক বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতার মধ্যে নিজের বিশিষ্টতায়। বিনয়ের আর্থ-সামাজিক প্রতিবেশটা সেখানে ছিল না। ছিল না আরো অনেক কিছু, যা অন্য অনেকের লেখায় থাকে। কিন্তু, ঐ যে বললাম, আধুনিক জমানার বাংলা কবিতার ইতিহাস, এবং তার ধারাবাহিকতার মধ্যে একজন কবির যথাসম্ভব যথাযোগ্য স্থাননির্দেশ—তা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। ঠিক এ জায়গাটা ছিল সেই প্রথম যৌবনে মান্নানের সমালোচনা লেখালেখির প্রতি আমার আকর্ষণের প্রধান কারণ। মান্নান সৈয়দের মৃত্যুর পর পাবলিক লাইব্রেরিতে তরুণ সাহিত্যিকরা যে আলোচনা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, তাতে অনেক আলোচক তাঁর সমালোচনা-প্রবন্ধের এই বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছিলেন। চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য। যাকে আমরা আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলে সম্মান ও সমীহ করে থাকি, তাতে মান্নানের বিলক্ষণ অধিকার ছিল। অন্তত চল্লিশের দশক পর্যন্ত কলকাতার সাহিত্যকর্ম এবং আশির দশক পর্যন্ত ঢাকার সাহিত্যকর্মে তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়। তাঁর যে কোনো লেখায় তিনি এর ছাপ রাখতে জানতেন। বলা দরকার, এই ছাপ বাইরের বা আলঙ্কারিক উপাদান হয়ে আসে নি। এসেছে লেখার মর্মবস্তু আকারেই। তিনি আসলে তৈরি করতেন ম্যাপ। সাহিত্যের মানচিত্র। তারপর বা সাথেসাথেই আলোচ্য সাহিত্যিককে এঁকে দিতেন সেই মানচিত্রে। সেই অনতিতরুণ বয়সে সাহিত্যজগৎ সম্পর্কে আমার চেতনায় পয়লা ছবিটি মান্নানের লেখা পড়েই তৈরি হয়েছিল। অনুমান করি—অনুমানই-বা বলি কেন—টের পাই, আরো অনেকে উঠতি যৌবনে পড়েছিলেন মান্নানের খপ্পরে।

আমাকে আরো আকর্ষণ করেছিল তাঁর আমূল সৃষ্টিশীলতা। এ সম্পর্কে পরে একবার বলব। আপাতত বলি তাঁর বই আর প্রবন্ধ-গল্পের নামের কথা। কী সব নাম! জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, সত্যের মতো বদমাশ, মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা, করতলে মহাদেশ, দশ দিগন্তের দ্রষ্টা, দরোজার পর দরোজা, কালো সূর্যের নিচে বহ্ন্যুৎসব, মাতৃহননের নান্দীপাঠ ইত্যাদি আরো কত কী! আমার সে সময়ের অনুভূতি ছিল বিস্ময়ের। এসব নাম আর শব্দ আমার অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল না। কল্পনার সীমায়ও নয়। আজকাল অবশ্য বিস্ময়ের বদলে ঈর্ষা হয়। যখন নিজের লেখার জন্য একটা কাজ-চলতি শিরোনাম হাতড়িয়ে মরি, তখন মান্নানের কথা মনে পড়ে। তাঁকে এড়াতে পারি না।


মান্নান সৈয়দের প্রতিভা ঠিক ঔপন্যাসিকের প্রতিভা ছিল না।



আবদুল মান্নান সৈয়দকে এড়িয়ে আরো বহুদিন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আলোচনা সম্ভব হবে না। সৃজনশীল সাহিত্যে এত এত কাজ করে রেখেছেন তিনি, মেরে-কেটে হিশাব করলেও তার তালিকাটা ইয়া বড় হতে বাধ্য। কয়েকটা উপন্যাস লিখেছেন। বেশ কিছু। আমার ধারণা, তাঁর উপন্যাস হয় নাই। মানে ভালো হয় নাই। মান্নান সৈয়দের প্রতিভা ঠিক ঔপন্যাসিকের প্রতিভা ছিল না। বড় আকারের কাহিনি দাঁড় করানোর মতো ছিল না। সে চেষ্টাও করেন নি। ছোট পরিসরের মধ্যে কিছু মজার কাজ আছে। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে শ্রাবস্তীর দিনরাত্রি নামের এক নভেলের কথা। সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র রচনা। তৎসমবহুল গতিশীল গদ্যে বিলাস-ব্যসন আর যৌনতার বর্ণনায় প্রাচীন ভারতের এক বিশিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমিতে সত্যের জয় ঘোষণার কাজটি ভালোই জমেছে। কথাগুলো অনেকদিন আগে পড়ার স্মৃতি থেকে লিখলাম। এ ধরনের কাজ হয়তো আরো কিছু আছে। কিন্তু মান্নান সৈয়দকে ঔপন্যাসিক হিশাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় নি কখনো। কোনো অর্থেই। তাঁর নাট্যগুচ্ছ কখনো মঞ্চস্থ হলে সেগুলোর নতুনতর সম্ভাবনা দেখা দিলেও দিতে পারে। আপাতত আমি এই নাটিকাগুলোকে কবিত্বের বিকল্প উৎসারণ হিশাবে ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কিন্তু কবিতা আর ছোটগল্প—এ দুই মাধ্যমে মান্নানের কাজ সাধারণভাবে বাংলা সাহিত্যের এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের সাহিত্যের আয়তনে বিচারের প্রায় যেকোনো মাপকাঠিতেই গুরুত্বপূর্ণ।

গুরুত্বের কতগুলা জাহিরি কারণ আগে বলে নিই, পরে বাতেনিটা বাতলানো যাবে। প্রথমত, মান্নান লম্বা সময় ধরে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। সাহিত্যিক মহলে তাঁর খ্যাতি ছিল, প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। স্বভাবতই প্রভাবিত হয়ে এবং প্রভাবিত করে সমকালীন কবিতা ও গল্পের ধারায় একটা পারস্পরিকতা তৈরি হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যের রূপ-স্বরূপ ও ধারাবাহিকতার অঙ্গ হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, বহু গৌণ-অনুল্লেখ্য লেখা লিখলেও তাঁর ‘ভালো’ রচনার পরিমাণ অন্য অনেক লেখকের চেয়ে বেশি। তৃতীয়ত, সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি বরাবরই আগ্রহী ছিলেন। তাঁর অতি বড় শত্রুও এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করবেন বলে আশা করা যায়। আসলে সাহিত্যের প্রগতি বলতে তিনি এই পরীক্ষা-নিরীক্ষাকেই বুঝতেন। যেমন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ব্যাপারে বারবার লিখেছেন, ওয়ালীউল্লাহর ব্যর্থ রচনাও মূল্যবান; কারণ, তিনি বরাবরই নিরীক্ষাপ্রবণ বলে পরবর্তী সাহিত্যধারার জন্য তা সবসময়ই নতুন ইশারা রেখে গেছে। কথাগুলো মান্নান সৈয়দের ক্ষেত্রেও সত্য। চতুর্থত, মান্নান বেশ কিছু রীতি বা ধারা কবিতা ও গল্পে নিয়ে এসে ঢাকার সাহিত্যমহলকে হতচকিত করেছেন। আজ চার/পাঁচ দশক পরে এগুলো হয়তো তত তাজা মনে হবে না। কিন্তু ষাটের গোড়ায় যখন এসব লেখার কোনো কোনোটি অবিরল সহজতায় বের হচ্ছিল, তখন তার নতুনতা খুব উল্লেখযোগ্য বলেই মনে হয়েছিল। তখনকার এবং পরেকার বহু আলোচনা-সমালোচনায় সেই স্বীকৃতি পাওয়া যায়।

এবার আসা যাক বাতেনি কারণগুলোতে। এগুলোকে বাতেনি বলার অর্থ এই নয় যে এগুলা পাঠকের চোখ এড়িয়ে যায় বা যাবে। আসলে সম্ভবত বেশির ভাগ পাঠক মান্নানের গল্পে-কবিতায় এগুলোই পড়েন। এগুলো ভিতরের বৈশিষ্ট্য। মান্নানের শিল্পীসত্তার প্রধান অবলম্বন। অন্তত আমার তাই মনে হয়।

মান্নান তাঁর লেখায় আমদানি করেছেন একরাশ অপরিচিত উপাদান। ঢাকার সাহিত্যে এ বস্তু ছিল খুবই বিরল। তাঁর কবিতায় অব্যবহিত প্রাত্যহিকতার বদলে পাই দূরবর্তী বস্তুজগৎ। যেখানে খুব দূরবর্তী নয়, সেখানেও অপরিচিতির হরেক রকম রঙ-রূপ মেখে রহস্যময় সুদূরতার আবেশ তৈরি করেছেন তিনি। অন্তত প্রথম দিকে, অনেকদিন। গল্পের ক্ষেত্রেও অন্তর্জগতের মিঠাকড়া বা ধূসর আবহ তৈরি করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন তিনি। ফলে পরিচিত মাঠঘাট আর ইটপাথর-গাছগাছালির মধ্য দিয়ে গেলেও তাঁর লেখা পাঠককে নিয়ে যায় এক অচেনা জগতে। যাকে আমরা হরহামেশাই শিল্পীর নিজস্ব জগত বলি, মান্নানের ক্ষেত্রে সে জগৎটি খুব ব্যক্তিগত আর বিশিষ্টই কেবল নয়, বিস্ময়করভাবে নতুনও বটে। আমরা যে আগে বলেছি, তাঁর প্রতিভা ঠিক ঔপন্যাসিকের প্রতিভা নয়, তার মূল কারণ এটাই। পরিচিত দিনযাপন আর ঘটনাপ্রবাহের ঋণ না নিয়ে উপন্যাসের বড় পরিসর তৈরি করা তো সম্ভব নয়। কিন্তু কবিতা আর গল্পের ছোট্ট পরিসর সম্ভব। অন্তত মাঝ বয়স পর্যন্ত মান্নান অত্যন্ত সাফল্যের সাথে এ কাজটি করতে পেরেছেন। ফর্মালিস্টরা যে-অর্থে ও যেভাবে অপরিচিতকরণকে শিল্পের প্রধান গুণ হিশাবে দেখতেন, সেই বাটখারায় মাপলে বাংলাদেশের সাহিত্যে তাঁর স্থান হবে অনেক উচুতে।

এ প্রসঙ্গেই বলতে হয় কল্পনাপ্রতিভার কথা। আমাদের শিল্পসাহিত্যের অঙ্গনে এ বস্তুর উচ্চ মহিমা জাহির আছে। আমার প্রায়ই মনে হয়, এই মহিমা ঔপনিবেশিক আমলের অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত। সেকালে রোমান্টিসিজম, অতীতপ্রীতি, রোমান্স ইত্যাদির ব্যাপক আদর-কদরের মধ্যে বর্তমানকে পাশ কাটিয়ে যাবার একটা চেতন-অচেতন ঝোঁক বোধ হয় কাজ করে গেছে। পরবর্তীকালেও যাপিত জীবনের তুলনায় কল্পিত জীবনকে মহিমান্বিত করার রেওয়াজ আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে খুবই সুলভ। এ সব কথা মাথায় রেখেও বলা যায়, শিল্পসাহিত্যের সাথে কল্পনাপ্রতিভার একটা গোড়ার যোগ আছে। সম্ভাব্যকে হাজির করা, আকর্ষণীয় রূপকল্প তৈয়ার করা, নিজস্ব জগৎ গড়ে তোলা—এসব যেহেতু সাহিত্যের গোড়ার জরুরত, সেহেতু কল্পনার গীত না গেয়ে উপায় নাই। মান্নানের ক্ষেত্রে এর একটা বাড়তি দরকার বোধ-হয় ছিল। একথা বলছি দূরবর্তী এক অনুমান থেকে। আর এ ক্ষেত্রে শওকত ওসমানের উদাহরণ আমাকে প্ররোচিত করছে। শওকতের প্রথম উপন্যাস ‘জননী’ তাঁর গ্রামের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশুদ্ধ বাস্তববাদী ভঙ্গিতে লেখা। ঢাকায় হিজরত করার পর এ ধরনের লেখা কিন্তু তিনি আর লিখতে পারেন নি বা লেখেন নি। তখন তাঁর অবলম্বন হয়েছে রূপকের জগৎ। নতুন জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে একাত্ম হতে না পারাই হয়তো তাঁর বহু লেখার বেখাপ্পা বয়ানরীতির উৎস।


বিশুদ্ধ ব্যক্তিনির্ভর গল্প লেখার ক্ষেত্রে মান্নান সৈয়দ বাংলাদেশের সাহিত্যে একেবারেই অনন্য।


মান্নানের লেখায় ঢাকার পারিবারিক-সামাজিক জীবনের অপ্রতুলতার কারণ কি ঐ একই ইতিহাস? নিশ্চয় করে বলা কঠিন। তবে এটুকু বলা বোধ-হয় অসঙ্গত হবে না, তাঁর লেখায় বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। এই ঘাটতি তিনি পুষিয়ে নিয়েছিলেন কল্পনাপ্রতিভায় ভর দিয়ে। শুধু ঘাটতিই পূরণ করেন নি, অজস্র ফুলও ফুটিয়েছেন। তাঁর লেখায় রাস্তা, দোকান, পুলিশ সবকিছুকে একসাথে নক্ষত্র হয়ে উড়ে যেতে দেখে; কিংবা দোকানদার খরিদ্দারের মুণ্ডু কেটে নেয়ার পর টপাটপ রক্ত ঝরতে দেখে; কিংবা তিন স্তনের রমণীকে তেড়ে আসতে দেখে; কিংবা বোধ-বোধিকে মাছ হয়ে অ্যাকুরিয়ামে বা রাস্তায় ঘুরাঘুরি করতে দেখে আমাদের কল্পনার পালেও হাওয়া লাগে। আমরাও কালবিলম্ব না করে বেরিয়ে পড়ি তাঁর সাথে, তাঁর বর্ণবিপুল কিন্তু অপরিচয়ের কুয়াশায় ঘোর-লাগা অচিন দেশে। দেখাতেই চেয়েছেন মান্নান; এঁকেছেন অসংখ্য অভাবিত ছবি। এসব ছবি আমাদের বাইরের চোখের হর্ষোৎফুল্ল সম্মতি আদায় করে মনের চোখে টুংটাং ভাসতে থাকলে বুঝি : কল্পনার অনাচার এ নয়, বরং জীবনানন্দকে উদ্ধৃত করে বহুবার মান্নান নিজে যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, এ হলো সেই ‘প্রকল্পনা’।

আমার আন্দাজ, এই কল্পনার তেজ কমে যাওয়ায় মান্নান সৈয়দের দ্বিতীয়ার্ধের কবিতা-গল্প অনেকটা শাদামাটা বয়ানে নেমে গেছে। কল্পনার জোর ছাড়াও লেখকদের হাতে অনেক ধনরত্ন থাকে। তিনি সেসব লাইনেও কিছু হেঁটেছেন। কিন্তু খুব সুবিধা করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। টানা গদ্য আর চিত্রকল্পের মিছিল ছেড়ে অনেকবার গেছেন ছন্দ-মিলে। সকল প্রশংসা তাঁর এবং নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা বই দুটোতে হাজির হয়েছেন অন্য রকম ভাব আর ভঙ্গি নিয়ে। কিন্তু কোনো তুরীয় লোকে পৌঁছেছেন বলে মনে হয় নি। গল্পের ক্ষেত্রেও ঢাকার নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক বাস্তবতা নিয়ে লেখা তাঁর বহু রচনা কখনো কখনো এমনকি পুরানা জৌলুশের স্মৃতিও জাগায় নি।

এ দিক থেকে তাৎক্ষণিক দরকারে মান্নান সৈয়দের কবিতা-গল্পকে ভাগ করতে চাই দুই ভাগে। এক ভাগ কল্পনাপ্রবণ সৃষ্টিশীলতায় মুখর, আরেকভাগ কবিতার ক্ষেত্রে গেছে কিছু ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক বোঝাপড়ার দিকে, আর গল্পের ক্ষেত্রে গেছে দিনযাপনের বাস্তবতায়। এর মধ্যে প্রথমটিই মান্নানীয় এবং মূল্যবান। এ মন্তব্য করার সময় বারবার মনে পড়ছে সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দকে, যিনি সাহিত্যিককে সামগ্রিকভাবে পড়ার উপর জোর দিতেন। জানি, তাঁর এ পদ্ধতি কোথাও কোথাও খুবই কাজের হয়েছে। তবু আমরা এখানে তাঁর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমগ্রের বদলে বেছে নিলাম প্রথমাংশ।

মান্নানের সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মের আরেক বড় বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিভজনা। তাঁর কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘আমি’—প্রায় আক্ষরিক অর্থেই ব্যক্তি-লেখক। কোনো কোনো লেখকের ‘আমি’ দশের ভাব-স্বভাব চুরি করে হয়ে ওঠে সমষ্টির আয়না। কখনো কখনো ব্যক্তি তেজে-প্রভায়-বৈভবে দশকে ছাড়িয়ে গেলেও প্রভাবশালী হয়ে জড়িয়ে থাকে দশেরই সাথে। মান্নানের ক্ষেত্রে এর কোনোটাই হয় নাই। বরং তিনি যখন কবিতা লিখেছেন একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে, কিংবা গল্প লিখেছেন দাঙ্গার মতো সামষ্টিকতা নিয়ে, তখনো ভিড়ভাট্টা ঠেলে একজনই বেরিয়ে এসেছে ইচ্ছা-প্রবৃত্তি বা আবেগ-অনুভূতি সমেত। এ দিক থেকে মান্নান ঢাকার সাহিত্যের প্রধান প্রবণতা থেকে পৃথক। তাঁর চরিত্রগুলো প্রায়ই বিচ্ছিন্ন। অনেকের সামাজিক সংশ্রব তো দূরের কথা, পারিবারিক বন্ধনও নাই। তাদের অনেকেই রুগ্‌ণ, অব্যবস্থিত, প্রবৃত্তিচালিত, প্রবৃত্তিকাতর। এ ধরনের সম্পর্ক ও দায়দায়িত্বহীন ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত —সাহিত্যিক অর্থেই—কতটা কাজের, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। উঠাই উচিত। কিন্তু এ প্রশ্ন মুলতুবি রেখে যদি এগিয়ে যাই গল্প পর্যন্ত, যদি মনে করি যে, সাহিত্যের ধারাক্রমের মধ্যে গল্প হয়ে ওঠাটাই মূল কথা, তাহলে হলফ করে বলা যায় : বিশুদ্ধ ব্যক্তিনির্ভর গল্প লেখার ক্ষেত্রে মান্নান সৈয়দ বাংলাদেশের সাহিত্যে একেবারেই অনন্য। সত্যের মতো বদমাশ পড়ার অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে। মনে আছে, ‘মাতৃহননের নান্দীপাঠ’ গল্পে ঐ একজনই যে চায়ের দোকানে টেবিলের দুপাশে দুভাগ হয়ে বসে কথা কাটাকাটি করছে, এটা বুঝতে বেশ সময় লেগেছিল। আমোদ পেয়েছিলাম অন্তর্লীন সংলাপে নিষ্পন্ন এই গল্পটির শরীরী প্রতিভা আবিষ্কার করে। ‘চাবি’ গল্পের অনুসন্ধানকে বেশ মূল্যবান মনে হয়েছিল, আর নানান ঘরের বারোরকম মানুষের মধ্যে ঐ লোকটির অস্থির একাকিত্ব কেমন কেটে কেটে বসে যাচ্ছিল বুকের মাঝ বরাবর। বিস্ময় মেনেছিলাম কিছু পরে লেখা ‘রাস্তা’ গল্প পড়ে—গল্পটির চিক্কণ শরীর আর ততোধিক সূক্ষ্ম থিমে। এ ধরনের কিছু গল্প পড়েই একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম : সৈয়দ শামসুল হক আর শহীদুল জহিরের মতো আবদুল মান্নান সৈয়দও লিখেছেন ‘গল্পের জন্য গল্প’। অর্থাৎ, অন্য কোনো কিছু দেখানোর বা বুঝানোর জন্য নয়, স্রেফ গল্পের একটা কাঠামো বা শরীর তৈরির খায়েশ থেকেই এ গল্পগুলো লেখা হয়েছে। মান্নানের সাথে অবশ্য এ দুজনের অমিলই বেশি।


মান্নান সৈয়দের গল্প একরৈখিক—ডালপালামুক্ত, স্লিম, আর বেশ টানটান।


যাই হোক, বলছিলাম মান্নানের গল্পের ব্যক্তি-নির্ভরতার কথা। ব্যক্তির ইচ্ছা, সুখ-দুঃখ, পলায়নপরতা আর কল্পনাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন বলে নতুন অনেক টেকনিক বা আইডিয়াও পাওয়া গেছে তাঁর গল্পে। পুরানা প্রেমিকার সাথে গপসপ করতে গিয়ে প্রেমিকার স্বামীর হাতে নাকাল হওয়ার পর তাঁর প্রেমিকপুরুষটি সম্মুখ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় না; বরং ডুব দেয় লেকের পানিতে। না, মরতে নয়; লেকে প্রেমিকার বাড়ির যে ছায়া পড়েছে, সেই ছায়া-বাড়িতে প্রেমিকার সাথে নিভৃতে মিলিত হতে। অন্য এক গল্পে চিত্রকর মশায় ভেজাল এড়াতে সটান ঢুকে পড়ে নিজের এক শিল্পকর্মে, যেখানে এক চালু ট্রেন নিঃশব্দে চলছিল পলায়নের বাহন হয়ে। আরেক গল্পে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা চাপা অসন্তোষকে আকার দিতে হাজির হয় ঝাঁক ঝাঁক মাছি। বাইরের সক্রিয়তা বা সম্পর্কের তুলনায় অন্তর্জগতের তুলনামূলকভাবে অচেনা আকুলিবিকুলিকে অবয়ব দিতে চেয়েছেন বলে তাঁকে এসব—এক-অর্থে আজগুবি—কৌশল আমদানি করতে হয়েছে। তবে এই ব্যক্তিনির্ভরতার সবচেয়ে ভালো ফল ফলেছে তাঁর গল্পের কাঠামো বা অবয়বে। মান্নান সৈয়দের গল্প একরৈখিক—ডালপালামুক্ত, স্লিম, আর বেশ টানটান। ‘ধনুকের ছিলার মতো টানটান’ কথাটা তাঁর নিজের খুবই প্রিয়। সে কথাটাই তাঁর গল্পের ক্ষেত্রে—অন্তত নির্বাচিত বড়সড় এক গুচ্ছ গল্পের ক্ষেত্রে—অনায়াসেই ব্যবহার করা চলে।


মান্নান সৈয়দের লেখালেখিতে ঝাঁজ ও চমক যথেষ্ট পরিমাণে আছে। একটা লম্বা সময় ধরে আমি তাতে বুঁদ হয়ে ছিলাম। ঘোর কাটার পর, ভালো হয় বললে, শিল্পসাহিত্য আর জীবন-জগৎ সম্পর্কে নিজের অন্যরকম কিছু ধারণা জন্মানোর পর, সেই মোহজাল থেকে মুক্ত হলাম। সম্ভবত মুক্ত হয়েছি। কিন্তু তখন আবার তাঁর সাথে নতুন করে জড়ালাম দরকারের তাড়ায়। বাংলা বিভাগের ছাত্র হিশাবে, কিংবা বলা উচিত, বাংলা সাহিত্যের ছাত্র হিশাবে বারবার ফিরে যেতে হলো তাঁর রচনাসম্ভারে। এ হলো সমালোচক ও গবেষক মান্নান সৈয়দ। এ সৈয়দ তথ্য আহরণে ক্লান্তিহীন, প্রধান-অপ্রধান নির্বিচারে অজস্র লেখকের ব্যাপারে সমানতালে আগ্রহী, বুঝতে ও বুঝাতে অকুণ্ঠ, আর বিচিত্র তথ্য-উপাত্তের সুপাঠ্য মিশেলে গদ্য রচনায় দারুণ পারদর্শী। আধুনিক বাংলা সাহিত্য তাঁর বিচরণক্ষেত্র। এক লহমায় বেছে নেন জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ইসলাম, রোকেয়া, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, ফররুখ আহমদের মতো বিপরীত ভাব-স্বভাবের কবি-লেখক। ক্লান্তিহীনভাবে লেখেন বহুল-চর্চিত তিরিশি কবিদের নিয়ে। আবার দশকের পর দশক লিপ্ত থাকেন শাহাদৎ হোসেনের মতো সব অর্থেই অ-মেইনস্ট্রিম সাহিত্যিকের পুনর্বিবেচনায়।

সাহিত্যের গবেষক হিশাবে সৈয়দ সাহেবের শ্রম-নিষ্ঠা ও লিপ্ততা বাংলাদেশে অতুলনীয়। এর ধারাবাহিকতায় করেছেন বিস্তর সম্পাদনার কাজ। এই বহু বিচিত্র কাজের মধ্যে অন্তত দুই ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আরো বহুকাল তাৎপর্যপূর্ণ থাকবে বলে আমার ধারণা। একটি হলো বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যকর্ম, অন্যটি বাংলাদেশের সাহিত্য। দুটি ক্ষেত্রই কলকাতার সুদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত। এক্ষেত্রে মান্নান সৈয়দের কৃতিত্ব হলো অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয়গুলোকে প্রবলভাবে সামনে আনতে পারা। আর ব্যক্তি লেখকের ক্ষেত্রে অনেকের উপর পৃথক গ্রন্থ প্রণয়ন করলেও—আমার ধারণা—ফররুখ আহমদ এবং কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কিত কাজের জন্য তাঁর উপর আমাদের আরো অনেকদিন নির্ভরশীল থাকতে হবে।

আবদুল মান্নান সৈয়দের গবেষক ও সমালোচক প্রতিভার যৌথতার মোক্ষম ফল ফলেছে ফররুখ আহমদ বিবেচনায়। অন্য অনেকের ক্ষেত্রে তাঁর কাজ মূল্যবান হয়তো, কিন্তু অপরিহার্য নয়। যেমন, জীবনানন্দ দাশের উপর তাঁর কাজ বিপুল ও বিচিত্র। ঢাকায় জীবনানন্দের এরকম সুখপাঠ্য কাব্যসমগ্র যে বেরোতে পারল, কিংবা প্রকাশিত হলো সমীহ জাগানো নির্বাচিত জীবনানন্দ সঙ্কলন, বা ‘রূপসী বাংলা’ বা চার দশক আগেই জীবনানন্দের কবিতার আকর্ষণীয় শরীরী বিশ্লেষণ যে সম্ভবপর হলো এই ঢাকায়, তার জন্য মান্নান সৈয়দের বিকল্প বোধহয় এখানে ছিল না। এখনো সম্ভবত নাই। এসবের মধ্য দিয়ে এই মহাকবি আমাদের সামনে নিত্য নতুন রূপে হাজির হয়েছেন, পষ্ট হয়েছে তাঁর কোনো কোনো আবছা এলাকা। কিন্তু একথা বোধ হয় বলা যাবে না, মান্নান সৈয়দের কাজ ছাড়া জীবনানন্দ আমাদের কাছে অচেনা থেকে যেত। বলা যায়, পাঠকের চেনা জীবনানন্দকে তিনি আরো ভালোভাবে চিনিয়েছেন। একই কথা বলতে চাই তাঁর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা রোকেয়া বিষয়ক কাজ সম্পর্কেও। কিন্তু ফররুখ আহমদ সম্পর্কিত কাজের তাৎপর্য, আমাদের বিবেচনায়, খানিকটা আলাদা।

ফররুখ আহমদ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। একাডেমিক ও সাহিত্যিক এলাকায় এবং রাজনৈতিক পরিসরেও। ঢাকাই সাহিত্যের প্রথম পর্বের কবি হওয়ায় এবং তাঁর তহবিলে কিছু দুর্দান্ত কবিতা জমা থাকায় তাঁকে এড়ানো যায় নি। আবার মওকা মতো পেয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কোনো কোনো পক্ষ তাঁকে ব্যবহারের পাশাপাশি অপব্যবহারও করেছে। এসবের মধ্য দিয়ে এই কবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এক সঙ্কীর্ণ এলাকায়—‘পাকিস্তানবাদী ধারার প্রধান কবি’, ‘ইসলামি রেঁনেসার কবি’ ইত্যাদি অভিধায়। এসব পাঠে সত্যতা আছে। আংশিকভাবে। আগেই বলেছি, আবদুল মান্নান সৈয়দ সাহিত্যিকের পূর্ণায়তন পাঠে উৎসাহিত করতেন। ফররুখ আহমদের ক্ষেত্রে তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গির সুফল ফলেছে। তাঁর পাঠে ফররুখ তুলনামূলকভাবে সামগ্রিক আয়তনে উপস্থাপিত হয়েছেন। আমরা পেয়েছি গল্পকার ফররুখ আহমদকে। পেয়েছি প্রেমের সনেট সিকোয়েন্সে রচিত ফররুখের পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ। নিজের স্বভাবমতো মান্নান সৈয়দ আধুনিক বাংলা কবিতার মানচিত্রের মধ্যে স্থাপন করেছেন এই কবিকে। দেখিয়েছেন : বিচিত্র  ফর্মে গতায়াত ও অপরাপর নানা ক্লাসিক বৈশিষ্ট্যে ফররুখ আহমদ মাইকেল মধুসূদন দত্তের অনুগামী। এরই অংশ হিশাবে গুরুত্বের সাথে আমলে এনেছেন সনেটে ফররুখের ক্লান্তিহীন পদচারণার খবর। গবেষকের চোখে লক্ষ করেছেন, ফররুখের প্রথম ও শেষ কবিতা, কাব্যগ্রন্থগুলোর উৎসর্গপত্র, বহু কার্যকর ব্যঙ্গকবিতা, আর তাঁর সফলতম রচনার একটা বড় অংশই সনেটে রচিত। সমালোচকের সাথে একজন গবেষক যোগ দিলেই কেবল এ রকমটা সম্ভব। আর ফররুখের খাঁটি সমালোচক হিসাবে মান্নানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বোধ করি ‘বন্দরে সন্ধ্যা’, ‘কাঁচড়াপাড়ায় রাত্রি’ ইত্যাদি বেশ একগুচ্ছ কবিতা সামনে নিয়ে আসা, যেখানে প্রচলিত ভাবমূর্তির বাইরে অন্য আরেক শক্তিমান কবি অপেক্ষা করে আছেন পাঠকের নতুন পাঠের জন্য।


ষোল আনা ইমান রেখে মান্নান সৈয়দ সাহিত্যসেবা করে গেছেন মৃত্যু অবধি।


আবদুল মান্নান সৈয়দের নজরুলচর্চার সাথে আমার পরিচয় অনেকদিনের। জানি, তাঁর নজরুল বিষয়ক বিশেষজ্ঞতা বেশ দরকারি ভূমিকা পালন করেছে নতুন করে নজরুল রচনাবলি সম্পাদনায়। ‘বিদ্রোহী’-র ছন্দবিশ্লেষণ কেবল তাঁর নিজের কব্জির জোরই চিনিয়ে দেয় নি, বাংলা কবিতার ছন্দবিশ্লেষণের ঐ আচ্ছাদিত বারান্দাকে কার্যকরভাবে আলোকিতও করেছে। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত নজরুল ইসলাম : কবি ও কবিতা বই পড়ে বিস্ময় মেনেছিলাম কবিতার শরীরী ব্যবচ্ছেদে তাঁর নিষ্ঠা ও ধৈর্যে। তথ্য উদ্‌ঘাটন আর সেই তথ্যকে নিপুণভাবে ব্যবহারের দারুণ উদাহরণ ঐ পুস্তকটি। পরবর্তী বই নজরুল ইসলাম : কালজ ও কালোত্তর আমার পঠিত সুখপাঠ্য সামালোচনাগুলোর একটি। এভাবে নজরুল বিষয়ক মান্নানের বহু কাজের সাথে আমার লম্বা দিনের পরিচয়। কিন্তু সম্প্রতি নিজের কাজে ব্যবহার করতে গিয়ে একে আবিষ্কার করলাম নতুন করে। আমার লেখার বিষয় ছিল : ‘আধুনিক’ বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলামের স্থান বিচার’। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম, বাংলা কবিতার ইতিহাসে নজরুলের যথাবিহিত মূল্যায়ন হয় নাই। আর এ না-হওয়ার প্রধান কারণ প্রভাবশালী নন্দনতত্ত্বের সাথে নজরুল সাহিত্যের গোড়ার বিরোধ। আমি নজরুল পাঠের জন্য সুবিধাজনক কিছু নন্দনসূত্রও প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু তার আগে আমাকে দেখতে বা দেখাতে হয়েছিল, নজরুলপাঠের বিদ্যমান পরিস্থিতি কী। নজরুল নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ। বলা যায়, দরকারের তুলনায় বেশি গ্রন্থ। এদের অধিকাংশই সাহিত্যিক নজরুলের তুলনায় অধিক লিপ্ততা দেখিয়েছে সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায়। যাঁরা সাহিত্যিকভাবে নজরুল পাঠ করেছেন, তাঁদের অধিকাংশের অবস্থাই শোচনীয়। এর একটা কারণ সাম্প্রদায়িক। বাংলা সমালোচনাসাহিত্যের মূল চর্চা কলকাতাতেই হয়েছে। প্রধান সমালোচকদের প্রায় সবাই হিন্দু। তাঁদের প্রায় কেউই নজরুলকে নিয়ে দু-চার কলমের বেশি আগ্রহ দেখান নি। সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া একে অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। যাই হোক, আমার জন্য অপেক্ষা করে ছিলেন মান্নান সৈয়দ। তাঁর কাছেই আমি পেয়ে গেছি সেই সব সূত্র, যাতে ভর দিয়ে প্রচলিত নন্দনতত্ত্বে বাংলা কবিতার ধারায় নজরুলকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে চিনে নেয়া যায়।

এভাবে, তাঁর মোহমায়া অতিক্রম করার অনেকদিন পরও, আমাকে ফিরে ফিরে যেতে হলো তাঁর দরবাররে—গবেষণায়, সম্পাদনায়, সমালোচনায়, এবং অবশ্যই নির্বাচিত একগুচ্ছ কবিতা-গল্পে।


অথচ একটা সময়ের পর আমি তাঁকে এড়াতেই চেয়েছিলাম। সৃজনশীল সাহিত্য ও সমালোচনার বিপুল সম্ভারে মান্নান চর্চা করেছেন ‘আধুনিকতা’র। বুদ্ধদেব বসু এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মিলে বাঙালি মধ্যবিত্তকে নন্দনতত্ত্বের যে সবক দিয়ে গেছেন, তাতে ষোল আনা ইমান রেখে মান্নান সৈয়দ সাহিত্যসেবা করে গেছেন মৃত্যু অবধি। কোনো প্রকার সন্দেহে না ভুগে। বাঙালির উনিশ শতকীয় রেনেসাঁসে তিনি দৃঢ়মূল বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন এর যাবতীয় গালগল্প সমেত। তিরিশি ‘আধুনিকতা’র সার্বিক অর্জনের ব্যাপারেও ছিলেন প্রশ্নহীন। আর আমি উনিশ শতকের কলকাত্তাই জাগরণে দেখি ঔপনিবেশিক আমলের নানান অসঙ্গতি, আলোর পাশে দেখতে পাই অন্ধকারের গুচ্ছ গুচ্ছ পদচারণা। তিরিশি কবিদের অর্জনের কোল জুড়ে বসে থাকতে দেখি জনবিচ্ছিন্ন আর বড্ড একচোখা নন্দনতত্ত্বের পাপ। তাই দূরত্ব বাড়তে থাকে। সাহিত্যশিল্প সম্পর্কিত ধারণায় আমি ক্রমশ যেতে থাকি মান্নানের একেবারে উল্টা দেশে।

‘আধুনিক’ শব্দটি মান্নান সৈয়দকে কী ভীষণভাবেই না প্রতারিত করেছে। প্রতারিতই বলব। অপেক্ষাকৃত গৌণ কবি আবুল হোসেনের বন্দনা করেছেন তিনি জীবনভর। কারণ, আবুল হোসেন বাঙালি মুসলমানের প্রথম ‘আধুনিক’ কবি। জসীমউদ্‌দীনকে ‘আধুনিক’ বানাতে গিয়ে খেয়ালই করেন নি যে, জসীম আরো দশ কারণে গুরুত্বপূর্ণ, যার যে কোনোটি ‘আধুনিক’ হওয়ার চেয়ে মূল্যবান। এমনকি আল মাহমুদের আলোচনায়ও তিনি এই ভেবে সুখ বোধ করেন যে, মাহমুদ কবিতা লিখতে শুরু করার সময় থেকেই আধুনিক হয়ে ওঠেছেন। এই উদ্ভট আকাঙ্ক্ষার দায়দায়িত্ব অবশ্য মান্নান সৈয়দের একার নয়। তাঁর কালে, সেই ষাটের দশকে, যাঁরা শিল্পসাহিত্য করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর যাঁরা ভোক্তা হিশাবে সেই কাফেলায় শরিক ছিলেন, তাঁরা মূলত ‘আধুনিক’ই হতে চেয়েছিলেন। আহমদ ছফা বা ফরহাদ মজহার বা বদরুদ্দীন উমর বা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো স্পষ্ট ব্যতিক্রম সত্ত্বেও আলোচনা-সমালোচনার আসল নিক্তি হিশাবে ‘আধুনিকতা’রই জয়জয়কার দেখেছি। যদিও এর সংজ্ঞা বা পরিধি সম্পর্কে কারো কোনো স্পষ্ট লেখালেখি পাওয়া যায় না। কলকাতায় রণজিৎ গুহ কিংবা পার্থ চট্টোপাধ্যায় বা দেবেশ রায় যেমন ‘আমাদের আধুনিকতা’ বলে এক চিজ প্রস্তাব করেন, তেমন বা তার কাছাকাছি কিছু এ বঙ্গে ঘটে নি। অবশ্য মনে রাখা দরকার, বাস্তব আন্দোলন-সংগ্রাম আর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের চাপে ঢাকার সাহিত্যকর্ম কিছুতেই ‘আধুনিকতা’র সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে থাকে নি। কিন্তু পাঠের বা বিবেচনার ভাষা রয়ে গেছে সেইরকম। শামসুর রাহমানের মধ্যে এই বাস্তবতার কৌতুককর উদাহরণ দেখেছিলাম। আমার ধারণা, শামসুর রাহমান বড় কবি। এই বড়ত্বের ক্ষেত্রে তাঁর কবিতার ‘আধুনিকতা’ এমনকি গৌণ কারণও নয়। বস্তুত, পশ্চিমা বা তিরিশি কবিদের নিক্তিতে মাপলে রাহমান গৌণ কবি হিশাবেই গণ্য হবেন। এ নিক্তিতে মেপেই অনেকে তাঁকে ‘অগভীর’ বা ‘উপরিতলের’ কবি হিশাবে সাব্যস্ত করেন। তাছাড়া, প্রথম দশকের পর রাহমানের কবিতা কোনো অর্থেই তিরিশি কবিদের দেখানো পথে থাকে নি। তা সত্ত্বেও হুমায়ুন আজাদ রাহমানকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিরিশি ‘দেবদূত’দের বাচ্চা হিশাবেই; আর মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রাহমানের নিজের ধারণা ছিল, তিনি ‘আধুনিক’ কবিতাই লিখেছেন। নিজেকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখা কি ঔপনিবেশিক হীনম্মন্যতা?  নাকি এর অন্য ব্যাখ্যা আছে?

যাই হোক, ষাটের দশকের গোড়ায় যখন মান্নান সৈয়দরা ঝাঁক-বেঁধে লিখছিলেন আর প্রকাশিত হচ্ছিলেন, তখন এই উন্মাদনা ছিল প্রবল। তাঁরা বোধ করি লেখালেখি করেই এলিট হতে চেয়েছিলেন। এলিট হওয়ার সরল উপায় জনবিচ্ছিন্ন হওয়া। কাজে কাজেই দুর্বোধ্য হওয়া। গরিব হলে যা হয় আর কি। নিজের বলবার কথা থাকলে বোঝানোর কসরতও থাকে। ষাটের গোড়ায় এ কসরত ছিল কি? তাঁদের গদ্য দেখে তো মনে হয় না। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যে গদ্যসঙ্কলন করেছিলেন সত্তরের মাঝামাঝি, তার ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘কণ্ঠস্বর’-এর প্রধান অবদান এর গদ্য। কোন গদ্য? যে গদ্যের প্রধান পীর সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। হাতের কাছে চোস্ত ‘আধুনিক’ বুদ্ধদেব বসু থাকতে এঁরা দল বেঁধে সুধীন দত্তের মতো গরিব গদ্য লেখকের মুরিদ হতে গেলেন কেন? কষ্টার্জিত দুর্বোধ্যতা হাসিল করা ছাড়া এঁরা এ থেকে আর কী পেয়েছেন? বলা মুশকিল। সুখের কথা, তাঁদের কেউ কেউ পরে বাঁকা পথ ছেড়ে ফিরতে পেরেছেন সোজা পথে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন নিষ্ফলা মাঠের কৃষক বা ভালোবাসার সাম্পান-এর মতো সুখপাঠ্য বই। ফিরেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দও। অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করে আর বাক্যের গড়নে অকাজের প্যাঁচ কষে পাঠককে ঘাবড়ে দিয়ে সমীহ আদায় করার দুর্বুদ্ধি ছেড়ে ফিরেছেন ‘সত্য কথা সোজা করিয়া বলার’ লাইনে। মধ্য আশির পরে লেখা মান্নানের অনেক প্রবন্ধে আমরা তার সুফল পেয়েছি।


বাংলাদেশের সাহিত্যের—বিশেষত গল্প-কবিতার—একজন জরুরি ভাষ্যকার তিনি।


মান্নান সৈয়দ আরো অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর পূর্বতন অবস্থা থেকে সরে এসেছেন। সরে এসেছেন পরিস্থিতির চাপে, কাণ্ডজ্ঞান থেকে, আর উপলব্ধির প্রতি সৎ থাকতে গিয়ে। ‘আধুনিকতাবাদী’ ফতোয়া হুবহু অনুসরণ না করে নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন অনেক ‘গৌণ’ সাহিত্যিককে নিয়ে। রোকেয়ার ক্ষেত্রে বা নজরুলের ক্ষেত্রে নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে ব্যবহার করেছেন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক উপাদান। গদ্যের কথা আগেই বলেছি। সৃষ্টিশীল লেখালেখিতেও তাঁর চোখে পড়ার মতো বিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও তাঁর অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই। নিজের অবস্থান, বিশ্বাস ও চর্চা সম্পর্কে কোনো প্রকার তাত্ত্বিক-দার্শনিক মোকাবেলায় তাঁকে লিপ্ত হতে দেখা যায় নি। সারাজীবন কাজ করে গেছেন সাহিত্যের বা শিল্পের স্বতন্ত্র ইতিহাসের ধারণা মাথায় রেখে। সেই ইতিহাস যে জড়ায়া-প্যাঁচায়া থাকে যাপিত জীবনের নানান সুতায়, এবং যাপিত জীবনের সূত্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাজির না থাকলে সাহিত্যের স্বতন্ত্র ইতিহাস যে ঝুলতে থাকে হাওয়ায়, সে সত্য মান্নান কখনো বুঝতে চাইলেন না, যেমন বুঝেন নি তাঁর কলকাত্তাই ওস্তাদরা। ‘আধুনিক’ সাহিত্য তাঁদের কাছে হাজির হয়েছে ইতিহাসের এক তুঙ্গ মূর্তিরূপে। পরম প্রণম্যরূপে। কোনো জিজ্ঞাসা ছাড়াই তাঁরা এর ভজনা করেছেন। এর সুফল ফলেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু প্রথম ষাটে মান্নানদের চর্চায় দেখতে পাচ্ছি, কুফলের কমতি নাই। একটা উদাহরণ দিই।

আধার ও আধেয় শব্দ দুটি চালু করার পাশাপাশি সুধীন বাবু আধারের মহিমাও চাউর করেছিলেন। তিনি অবশ্য এ বস্তু আমদানি করেছিলেন পশ্চিমা ওস্তাদ এলিয়টের কাছ থেকে। পশ্চিম থেকে কলকাতা ঘুরে ষাটের দশক অবধি ঢাকায় এ সংবাদ পৌঁছালে চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যায়। ‘পেয়েছি’ বলে যাঁরা আঙ্গিককে সাহিত্য বলে বুঝার ও বুঝানোর ব্রতে নেমে গেলেন,  তাঁদের মধ্যে মান্নানও ছিলেন। মান্নান অবশ্য রেফারেন্সটা ধার করেছিলেন পশ্চিমের অপেক্ষাকৃত অচেনা কুতুব লুই আরাগোঁর কাছ থেকে। বহুবার আঁরাগোর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, কবিতার ইতিহাস টেকনিকের ইতিহাস। আর এ বিশ্বাসে মৃত্যুতক অনড় থেকে সারাজীবন করে গেলেন কবিতার শরীরী ব্যবচ্ছেদ। তাঁর সময়ের আরো অনেকে, যেমন হুমায়ুন আজাদ—পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে করে গেছেন তালিকা। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, রূপকের। কবিতার শরীর থেকে আলাদা হয়ে, প্রাণ থেকে আলগা হয়ে বহু যত্ন ও পরিশ্রমে জড়ো করা এসব উপাদানকে নিষ্প্রাণ পড়ে থাকতে দেখে মায়া হয় এসব সমালোচকের জন্য। মান্নান সৈয়দের জন্য এরকম অনেকবার হয়েছে। এঁরা এমনকি কবিতার শরীর আর প্রাণকে একাকার করে দেখার জরুরতও কদাচ বোধ করেছেন। অথচ ঘোরতর ‘আধুনিক’ এরকম সমালোচনার উৎকৃষ্ট নমুনা হাতের কাছেই ছিল। সৈয়দ আলী আহসান তো শুধু ঢাকার নয়, পুরা বাংলা সাহিত্যেরই অন্যতম প্রধান কাব্যসমালোচক। ছিল হাসান হাফিজুর রহমানের অসামান্য উদাহরণও, যিনি ঠিক আধুনিকতাবাদী নন, কিন্তু সমসাময়িক পশ্চিমা কাব্যতত্ত্বের আওতার মধ্যেই লিখেছেন। আমাদের ষাটের দশক ‘আধুনিকতা’ শিখেছে কলকাতা থেকে, সরাসরি পশ্চিম থেকে নয়; যেমন বোদলেয়ার পড়ার জন্য তাঁদের অপেক্ষা করতে হয়েছে বুদ্ধদেব বসু পর্যন্ত। তাঁরা ইংরেজি পড়তে পারতেন না বা পড়েন নি—এরকম বলছি না। তাঁরা নিশ্চয়ই পড়েছেন। সাক্ষী-সাবুদ থেকে মনে হয়, আমাদের একালের তুলনায় পশ্চিমা সাহিত্যে তাঁদের গতায়াত অনেক ভালো ছিল। কিন্তু তিরিশি কবিদের প্রচণ্ড প্রতাপের মধ্যে, বলা যায়, তাঁরা গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা দেখাতে পারেন নি। মান্নান সৈয়দদের ক্ষেত্রে এর ফল হয়েছিল প্রায় কুসংস্কারের মতো। টেকনিকের গোলামি করে তাঁরা পার করে দিয়েছেন দশকের পর দশক। অন্য অনেক মিঠাইমণ্ডা থেকে নিজে বঞ্চিত হয়েছেন, আমাদেরও করেছেন।

পাটাতন বাদ দিয়ে সাহিত্যের ধারাক্রমের মধ্যে সাহিত্য পাঠ করতেন বলে মান্নান সৈয়দ বাংলাদেশের সাহিত্যের কোনো সংজ্ঞায়নে যেতে পারলেন না। বাংলাদেশের সাহিত্যের—বিশেষত গল্প-কবিতার—একজন জরুরি ভাষ্যকার তিনি। বিরামহীন লিখে গেছেন ব্যক্তি কবি-লেখক বা ধারা-উপধারা সম্পর্কে। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্য কি শুধুই একটি স্থানিক-কালিক ক্যাটাগরি, নাকি এর কোনো ভাবগত বিশিষ্টতা আছে—এ ধরনের কোনো বিবেচনা তাঁর কাছে প্রশ্ন আকারেও হাজির হয় নি। তিনি মেনে নিয়েছেন এ গল্প যে, বাঙালি মুসলমানের বিলম্বিত জাগরণ হয়েছে, তারা বিলম্বে আধুনিক হয়েছে, আর ক্রমশ আত্মস্থ করেছে আধুনিক লেখালেখির কৃৎকৌশল। তাই বাংলাদেশের কোন কোন লেখক ‘আধুনিক’ কোন কোন লেখকের অনুকরণ করতে পেরেছেন, তার তালিকা তৈরি করেছেন বহুবার। ঠিক যেমন কলকাতার সমালোচকরা—যেমন দীপ্তি ত্রিপাঠি বা অশ্রুকুমার শিকদার—তিরিশি কবিদের বাহবা দিয়েছেন পশ্চিমা কবিদের অনুকরণ করতে পারায়। এ যেন সাফল্যের সাথে দ্বিতীয় দফা দাসত্ব বরণ করতে পারায় উল্লাস প্রকাশ করা। মান্নান সৈয়দের বিপুল লেখালেখিতে তাই বাংলাদেশের সাহিত্য বলে কোনো ক্যাটাগরি প্রতিষ্ঠিত হয় নি।

ফর্মের উপর অন্যায্য জোরারোপ আর যাপিত জীবনের সাথে সৃষ্টিশীলতার মেলবন্ধন ঘটাতে না পারা মান্নানের গল্প-কবিতারও প্রধান সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এ বাবদ তাঁকে বিশেষভাবে দায়ী করব না। কারণ, ঢাকার মেইনস্ট্রিম সাহিত্য-আসরে এই মতের অনুসারী এখনো নেহায়েত কম নয়।


আমি আজকাল মান্নান সৈয়দের সাথে যে প্রধানত বিরোধসূত্রেই যুক্ত তার প্রধান কারণ নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে আমার বর্তমান অবস্থান। তাঁর কাছে নন্দনতত্ত্ব রাজনীতির বিকল্প। আর আমার কাছে খোদ নন্দনতত্ত্বই রাজনৈতিক। এবং নন্দনের সাথে রাজনীতির পৃথক্‌করণ এক প্রকার রাজনৈতিক পক্ষপাতই বটে। তাই মান্নানের সাথে আজকাল আমার প্রাণের যোগ নাই, যদিও নানা দরকারে তাঁর কাছে হাত পাততে দ্বিধা করি না। আর এ-ও জানি, এক জীবনের সাধনায় মান্নান সৈয়দ সেই পুঁজি সঞ্চয় করে গেছেন, যার জোরে বহু লেখক-পাঠকের প্রাণের মানুষ হয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন আরো বহুকাল।


সংশ্লিষ্ট পোস্ট : আবদুল মান্নান সৈয়দের বাছাই কবিতা
Mohammad Aza

মোহাম্মদ আজম

জন্ম ২৩ আগস্ট ১৯৭৫, হাতিয়া, নোয়াখালী। এম এ বাংলা, ঢাবি, পিএইচ ডি, ঢাবি। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাবি।

প্রকাশিত বই :
বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ [আদর্শ, ঢাকা, ২০১৪]

ই-মেইল : mazambangla1975@gmail.com
Mohammad Aza

Latest posts by মোহাম্মদ আজম (see all)