হোম গদ্য অল্পলাল ভাষা

অল্পলাল ভাষা

অল্পলাল ভাষা
979
0

সে দিন একটা আড্ডায় কী নিয়ে যেন কথা হচ্ছিল।  তো, হঠাৎ একজন  বলে উঠলো, ‘কুকুরের বাচ্চা’।  দলমত নির্বিষেশে সকল বাংলাভাষীই চেনেন এই সুস্বাদু স্ল্যাংটিকে। বিস্ফোরণটা ঘটে তার কিছু পরেই, যখন এই বাক্যই একটু ঘুরিয়ে বলা হলো, ‘বাচ্চা কুকুর’। একেবারে  দুই সমকোণে বেঁকে গিয়ে যে ইমেজ তৈরি হলো তা তো আগে কখনোই ভাবি নি। এই যে তুলতুলে নাদুস-নুদুস একটা আদুরে ছবি ভেসে উঠল—আলবৎ সেইটা নতুন।

ভাবছিলাম, এইভাবেই ধীরে ধীরে ভাষার অ্যাপ্রোচ বদলে যায়। বদলে যায় তার ভাবনারীতি। এই নিরীহ গল্পটি যে জন্য বলা, এবার না হয় সেইখানে ফিরি। বাংলা কবিতার ঠিকুজি ঘাঁটলে নানান সময়ে বাক্যের থ্রোয়িং-এ যে বিবর্তন ঘটেছে সেই স্রোত ধরেই এগিয়েছে আমাদের কবিতা। এর বাইরে যে স্রোতটি অবিবর্তনহীন অবস্থায় থেকে গেছে, সেই স্টাইলেও লেখা হয়েছে অজস্র কবিতা কিন্তু সেসব ক্লিশে। নতুন কোনো উদ্দীপনা নিয়ে বয়ান করতে পারে নি এই অঞ্চলের কবিতাকে।

যেকোনো ভাষা-ভঙ্গির জন্যই সে ভাষার সিন্ট্যাক্স খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষারও রয়েছে একগুচ্ছ সিন্ট্যাক্স-প্যাটার্ন। আদিকাল থেকেই সেইসব ব্যবহৃত হয়ে আসছে লেখায়। কিন্তু নতুন কবিতার জন্য এই সিন্ট্যাক্স কতটুকু সাহায্য করতে পারে? কারণ, ভাষা নতুন না হলে কবিতাও নতুন হবে না। কেবল আইডিয়া দিয়েই কবিতাকে নতুন করা যায় না বলেই আমার ধারণা। এইখানে একটা প্রস্তাব রাখতে চাই আমি, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষাভঙ্গি বিভিন্ন রকম, এমনকি তাদের ব্যবহৃত পদক্রমেও বিপর্যয় ঘটে মাঝে মধ্যেই; ব্যাপক নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এইসব থ্রোয়িং-স্টাইল আসতে পারে বাংলা কবিতায়।


বিশেষণের অভাবিত ব্যবহারকে কবিতার শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করতে চাই আমি।


এমনকি বর্তমান লেখ্যরীতিতে যে সিন্ট্যাক্স আমরা পাচ্ছি সেটাকেও ভাষা-ল্যাবে তোলা উচিত। দেখা দরকার তার কলকব্জা কিভাবে ফাংশন করে। এর আগে এমনটা হয় নি আমি তা বলবো না, তবে সংখ্যায় সেটা নেহায়েতই মামুলি।

বিশেষণের অভাবিত ব্যবহারকে কবিতার শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করতে চাই আমি। একটা বিশেষ্য অধিকাংশ সময়েই শাদামাটা, নিরুজ্জ্বল। ধরা যাক, পাণ্ডুলিপি শব্দটা।  একলা ইনি যুক্তবর্ণের জন্য উচ্চারণে সুন্দর। কিন্তু যখনই ধূসর শব্দটা এল, কী অসাধারণ একটা ইমেজ, একটা হাজার বছরের অচেনা প্রতিবেশ তৈরি হলো। তারপর, পড়া যাক সুধীন্দ্রনাথ দত্তের এই চার লাইন—

একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী
একটি নিমেষ দাঁড়ালো সরণী জুড়ে
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি

চূড়া শব্দটা কী অভাবনীয় বিশেষণে বিশেষায়িত হচ্ছে! ‘দ্বিধাথরথর’। ঠিক এইভাবেই একজন কবি তার কল্পনাকে প্রাণ দেন নতুন চিন্তাপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

কিন্তু মুশকিলটা আসলে অন্য জায়গায়। এবং এর আসানও এত সহজ নয়। নতুন ধরনের ব্যবহার ছাড়া এই বিশেষণই কবিতাকে খুন করতে পারে হাসতে হাসতে। যেকোনো অভিনিবেশী পাঠককে পরিয়ে দিতে বিরক্তির কণ্টকমুকুট। সত্যি বলতে, বিশেষণের ক্লিশে ব্যবহার দিয়ে যে নতুন কবিতা হবে না এটা বুঝতে মহান কুতুব হবার দরকার নেই। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, অ্যাভারেজ কবিতাগুলোয় একজন নতুন কবি অবলীলায় পূর্ববর্তীদের ব্যবহৃত টেকনিকেই তার নিজের বিশেষণটি ব্যবহার করছেন। একজন আর্টিস্টের কাজ আসলে নতুন কিছু আবিষ্কার করা। দেখায়। ভাবনায়। এবং দেখানোর পদ্ধতিতে। যেকোনো অনুষঙ্গেরই রয়েছে অসংখ্য প্রোবাবিলিটি। রয়েছে অজস্র দৈবচয়ন। অথচ সেইসব অজস্রতার ভেতর থেকে বেছে নিতে হবে অদ্ভুত কম্বিনেশন। যা-কিছু প্রেডিক্টেবল তা দেখানো এটলিস্ট কবির কাজ না। ভাবা যাক, আল মাহমুদের এই লাইনটা—

‘চতুর্দিকে খনার মন্ত্রের মতো টিপ টিপ শব্দে সারাদিন
জলধারা ঝরে!’

বৃষ্টি ঝরার যত উপায় থাকতে পারে তার সমস্ত অভিজ্ঞতাকেই ছাপিয়ে যায় কেবল খনার মন্ত্রের জন্য। এমন তো আরও অনেক উজ্জ্বল পঙ্‌ক্তিই দেখানো যেতে পারে যা বাংলা কবিতার বহুল চর্চিত মনোটোনির বাইরে রচিত হয়েছে অজস্র সম্ভাবনা নিয়ে। যার শুরু ৩০-এর কিংবা তার পরবর্তী সময় থেকে নয়, বরং চর্যাপদ থেকে আজ অব্দি। তাই নতুন কবিকে কল্পনার সমস্ত র‍্যান্ডম সিলেকশন নিয়ে ভাবতে হবে।


বাংলা কবিতার অজস্র অপচয় ঘটে গেছে এই সম্বন্ধ-পদের ব্যবহারে।


আরেকটা ব্যাপার নিয়েও এক সময় খুব ভাবতাম। সম্বন্ধ পদ। ‘র’ বা ‘এর’—এর ব্যবহার। পুরনো টাইপের কবিতায় সবচে বিরক্তিকর হতে পারে এই ধরনের বাক্য। বাংলা কবিতার অজস্র অপচয় ঘটে গেছে এই সম্বন্ধ-পদের ব্যবহারে। দু-একটা উদাহরণ দিচ্ছি— বিচিত্র সব মনোটোনাস বাক্য পাওয়া যাবে একটু খুঁজলেই। ঘুমের ফুল, মৃত্যুর গন্ধ, কান্নার রোল, আঙুলের ফুল ইত্যাদি। এই ধরনের সম্বন্ধ পদের ব্যবহার  যুগপৎ মনোটোনাস ও ক্লিশে।

নতুন কবিতায় অবশ্যই এমন সম্বন্ধযুক্ত বাক্য ব্যবহৃত হবে যা কল্পনাকে সমৃদ্ধ করবে। এমন অনুরণন তুলবে যা আগে কখনোই ঘটে নি। অবাক স্পার্কে ভাসিয়ে দেবে নিউরন। উদাহরণটা জীবনানন্দের থেকেই নিই—‘ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল’ । এই যে রৌদ্র আর গন্ধের মধ্যে সম্পর্ক-সূচক যে বাক্যটি তৈরি হলো ‘এর’-এর সাহায্যে তা কি ইন্দ্রিয়-বিপর্যয়কারী একটি লাইন নয়! যদি রৌদ্র শব্দটিকে খুব ক্যাজুয়াল বা পরিচিত আবহের কোনো শব্দ দিয়ে রিপ্লেস করা হতো তবে এই অবাক করা লাইনটি হতে পারত না।

আসলে, নতুন কবিতা লেখার চ্যালেঞ্জটা কিঞ্চিৎ কঠিনই। এই অর্থে যে, কবিকে তার পূর্বলব্ধ সমস্ত অভিজ্ঞতা—টেক্সট, টেক্সচার, ভাষিক-প্রথা ইত্যাদি সব কিছুকেই অতিক্রম করতে হয়। প্রচলিত ধারণাকে, স্ট্যাব্লিশড নলেজকে অতিক্রম করতে হয় নির্মমভাবে। মূলত এই নির্মমতাই তাকে পরবর্তিতে সাহায্য করে নতুন লিখতে। যে অ্যাপ্রোচ, অনুষঙ্গ এতদিন যাবৎ বাংলা কবিতায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে সেসব এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে অনায়াসে সেই আগের ভাবনাকাঠামো দিয়েই। এবং তৈরি হচ্ছে বিরক্তিকর প্রতিবেশ। ঠিক এই জায়গায় নতুন কবিকে ভাবতে হবে নিজের সাথেই। এই দ্বৈরথের মূল যোদ্ধা তো কল্পনা আর তার ভাষা। এবং কিভাবে বাক্য থেকে বাক্যে প্রতিষ্ঠা পাবে প্রাণ, তার সাধনা।

আচ্ছা, নতুন কবিতা বলতে আমি কি শুধু তার অবকাঠামোর কথা ভাবছি? মোটেও না। কবিতার অন্তর্জগতও আবিষ্কারের বিষয়। তার ভাবসমগ্র বিমূর্ত থেকে মূর্ত হতে থাকে মূলত একজন নতুন কবির ভিন্নতর কাজের মধ্য দিয়ে। সেটা হতে পারে ভার্সে, ফ্রি ভার্সে, টানাগদ্যে এমন কি ছন্দেও। নতুন আসলে শুধু চেহারা-নির্ভর নয়, বরং অনেকটাই অন্তর্জগৎ-নির্ভর।


যে অজস্র ভালো কবিতা দুনিয়াতে লেখা হয়ে গেছে সেসবের মতো আরেকটা ভালো বাংলা কবিতা দিয়ে আদতে কিছুই হবে না।


এইসব বিষয়ে একজন নতুন কবিকে খেয়াল রাখতে হয় তার ভাষার অন্তঃসুর, মেলোডি, টিউনিং। মাথায় রাখতে হয় কিভাবে একটা শব্দ কতটা স্পেস তৈরি করে অন্য আরেকটি শব্দকে তার পাশে বসতে দেবার জন্য। কিভাবে তা গড়তে পারে সমমেল। এইভাবে টিউনড হয়ে আসে কবির নিজের ভাষা। এগুলো যেমন হতে পারে প্রথাগত ছন্দে তেমনি সমস্ত অর্থোডক্সের বাইরে গিয়েও কবি গড়ে নিতে পারেন তার নিজের হারমোনি। এমনকি টেক্সটের জঁর হতে পারে যেমন খুশি তেমন। লিনিয়ার, সাররিয়াল, অ্যাবস্ট্রাক্ট, ন্যারেটিভ, ছন্দে দুলে ওঠা কোনো ফর্মের মতোও। যা ইচ্ছা তাই। আদতে, নতুন কবিতার কোনো দায় নেই বিশেষ কোনো জঁরের প্রতি। কেননা তা নাজিল হয় নি ‘হুদাল্লিল মুত্তাকিন’ বা কোনো বিশেষ পাঠকগোষ্ঠীকে প্রীতিপ্রদর্শনের জন্য। আদতে কোনো নির্দিষ্ট  ঘরানাতেই আটকে থাকবে না নতুন কবিতা।

যে অজস্র ভালো কবিতা দুনিয়াতে লেখা হয়ে গেছে সেসবের মতো আরেকটা ভালো বাংলা কবিতা দিয়ে আদতে কিছুই হবে না। এমন কিছু লিখতে হবে যা পাঠকের অভিজ্ঞতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়, বিব্রত করে তার স্ট্যাব্লিশড নলেজকে। কিন্তু তেমনটা খুব একটা ঘটতে দেখা যায় না। কেন? আমার ধারণা, এর পেছনে কাজ করে দ্রুত কবি হবার লোভ। হ্যা—লোভই। কেননা ঐসব ভালো কবিতা পাঠকের প্রশংসা পেয়ে আসছে এতদিন ধরে। নতুন কবি হয়তো ভাবেন এমন লিখলে তার টেক্সটিও সেলিব্রেটেড হবে দ্রুত। এই দ্রুত সেলিব্রেশনের আকাঙ্ক্ষাই তাকে বিচ্যুত করে তার নিজের টেক্সট লিখতে।  আর সে জন্যই মনে হয় প্রচুর খারাপ কবিতা লেখা উচিত আগে—যে লেখাটা কবির নিজের। এই ধ্যান ও পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে যেতে যেতেই একদিন কবি লিখে ফেলবেন তার ইউনিক কবিতাটি, যা তার নিজের সিগনেচারে বিশিষ্ট।

যে কবিতাটি যুগপৎ নতুন এবং ভালো তা একটি কাল তৈরি করে, তৈরি করে মাইলস্টোন। এমন উদাহরণ কবিতা-জগতেই তো প্রচুর। তাই কবিকেও খুঁজতে হবে সেই নতুন ভাষা, নতুন থ্রোয়িং—যার ইমেজ, যার হারমোনি একান্ত তার। এবং অবশ্যই সেই স্টাইলকে হতে হবে স্মার্ট। তবে, ভাষার স্মার্টনেস নিয়ে তর্ক হতে পারে। সে প্রসঙ্গে এই গদ্যে আর ওকালতি না করি, ওই মামলা তোলা রইল অন্য গদ্যের জন্য।


শিরোনাম-ঋণ : ‘নতুন জিভের মতো অল্পলাল ভাষাটা আমাকে দাও’—স্বদেশ সেন
হাসান রোবায়েত

হাসান রোবায়েত

জন্ম ১৯ আগস্ট ১৯৮৯, বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী আযিযুল হক কলেজ; বগুড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই : ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [কবিতা, ২০১৬, চৈতন্য]

ই-মেইল : hrobayet2676@gmail.com
হাসান রোবায়েত