হোম গদ্য অলৌকিক ট্রেন

অলৌকিক ট্রেন

অলৌকিক ট্রেন
560
0

জনভর্তি সাত বগি নিয়ে ইঞ্জিনটা ঝনঝন শব্দ তুলে হোঁচট খেতে খেতে ফতুল্লা থেকে এগিয়ে আসতে পোস্তগোলা মোড়ের কাছে ট্রেনের সম্মানে পুবে-পশ্চিমে দাঁড়িয়ে পড়া গাড়িবহর থেকে যাত্রী কেউ কেউ ভেবেছে ট্রেনটা বুঝি প্রচণ্ড জোরেই ছুটছে; আর ঠিক তখন তখনই মোড়ের বাম পাশের জনপ্রিয় খাবার হোটেলটার রোঁয়াওঠা আত্মীয় কুকুরটি কেন যেন বার দুই ঘেউ শব্দ করে এপাশ থেকে ওপাশ হলো সহসা; আর এতে দুর্ঘটনার সমূহ আশঙ্কা ছিল বৈকি, কিন্তু কুকুরের হঠাৎ এহেন আচরণে দুই পাশের উৎসুক সবাইকে ভাবিত করল যেমনটা হোটেলের কর্মচারী আর স্থানীয় ফুটপাতের অনেকের কাছেই কুকুরটির হাল আমলের আচরণ সন্দেহের উদ্রেক করছে, এ জন্য যে, কোনো কারণে কুকুরটির মনে কি তবে আত্মহত্যার প্রবণতা জেগে উঠল, তার প্রশ্ন উঠছে।


ঘরের দরজা ভেজিয়ে তালা লাগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কামিজ থেকে কী যেন ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে রাস্তায় উঠে আসতে থাকা মেয়েটি দীর্ঘাঙ্গী, শ্যামবর্ণ, চেহারায় গুটিবসন্তের পুরনো দাগ বলেই কিনা জানি না একটু উদ্ধত তবে কেমন যেন ব্যাখ্যাতীত লাবণ্য মেশানো তাতে।


কুকুরটিরকে সম্ভবত লক্ষ না-করেই রেলপথ ধরে একটি মেয়ে হাতে ঝলসানো-নীল রঙের ব্যাগ নিয়ে নিকটবর্তী গেণ্ডারিয়া স্টেশনের দিকে মিনিট পনেরোর পথটুকু একাকী হাঁটছে, যেখানে ট্রেনটার আপাত গন্তব্য; আর প্রচণ্ড শব্দ তুলে বগিগুলো একে একে ধীর ও অনিবার্য গতিতে এগিয়ে যেতে লাগলে তরসর করে সটকে পড়ল রেলপথে বসা জুরাইনের কাঁচা-বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা; বাজার আর রেলপথ ঘেঁষা মাজারের সবচেয়ে উঁচু কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে অনিশ্চিত বিরতি দিয়ে নিঃশব্দে বৃন্ত থেকে ঝরে পড়ছে এক-কি-দুই পাপড়িমঞ্জরি; আর পশ্চিমে তার কিয়ৎ দূরে নগরের অন্যতম বড় আর সেরা কবরস্থানে সান্ত্রির মতো দাঁড়ায়ে থাকা বৃক্ষরাজিতে সন্ধ্যা নেমে আসছে শত্রুর মতো তীক্ষ্ণ ও দৃপ্ত পায়ে; আর বগিগুলোর পাশাপাশি পুব-দক্ষিণ কোণ থেকে একদল কালো টিয়ে ট্টিক ট্টিক শব্দ তুলে গোরস্থানের পেয়ারা বাগানের দিকে উড়ে গেলে গতিজড়তার কারণে কিনা জানি না, সবুজ টিয়েগুলোকে আসলে সত্যি সত্যি এখন কালোই দেখাল; আর হুইসেলের তীক্ষ্ণ শব্দ যেন ডানপাশে বর্ষা-আহূত জলে চরের মতো ভেসে থাকা মিরহাজিরবাগের থোক থোক আবদ্ধ ঘন কচুরিপানার ঝাড়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়ল; আর ভূমিউচ্চতার ফলে নাকি জলসঞ্চালনের অভাবে পশ্চিমটা বেশ শুকনোই থাকে ফি-বছর তাই বর্ষায় পশ্চিমের তুলনায় পুবটা যেন কেমন পাণ্ডুর আর বিষণ্ন; আর পুবের জলাভূমির ওধারে দক্ষিণ মিরহাজিরবাগের চারতলাবিশিষ্ট আলিয়া মাদ্রাসার প্রান্তভাগটা শেষ বিকেলের ন্যুব্জ আলোয় অস্পষ্টভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে; আর মাদ্রাসার সর্বোচ্চ তলার পশ্চিম দেয়ালে সাঁটানো সোনালি করোগেটেড টিনে তৈরি আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’ ক্যালিগ্রাফিটি এখন আগুনের শিখা হয়ে একটা রক্তিম ক্ষতের মতো জিভ মেলে দিয়েছে পার্শ্ববর্তী দীর্ণ পাঁশুটে অনুচ্চ বাড়ি-কতেকের দিকে; আর পেছনে সপ্ত-আসমানে মিলিয়ে যাচ্ছে শ্যামপুরের ইটভাটার ক্রমশ সরু হয়ে ওঠা চিমনির ধোঁয়া।

ইঞ্জিনটা শিস দিতে দিতে এসে গেণ্ডারিয়া স্টেশনে থামলে ঝিমুতে থাকা ধাড়ি কুকুরগুলো ত্রস্ত উঠে দাঁড়াল। একদা প্রাচ্যের ডাণ্ডি হিশেবে যার খ্যাতি জুটেছিল সেই নারায়ণঞ্জ থেকে এখন আর তেমন পণ্য এ-পথে আসে না, কুলির প্রয়োজন তাই ফুরোচ্ছে, তবুও লাল কোর্তা পরা জনাতিনেক কুলি এখনও অবশিষ্ট আছে এখানে; আর তাদেরই একজনকে এখন দেখা গেল কোত্থেকে যেন ছুটে এল কুকুরের চেয়েও দ্রুত গতিতে। নিভন্ত প্রদীপের মতো জেগে থাকা স্টেশনের অনতিদূরের একদা উপমহাদেশের বিখ্যাত আয়ুর্বেদিক ওষুধ কোম্পানি ‘সাধনা ঔষধালয়’-এর কিছু কাঁচামাল এখনো মাঝেসাঝে আসে এ-পথে; আর কমলাপুর হয়ে দর্শনা থেকে দেশি মদের সরকারি চালানও আসে নারকোটিস অধিদপ্তরের স্থানীয় গেণ্ডারিয়া গোডাউনে, আসে হোসিয়ারি গার্মেন্টেসের ঝুট; কিন্তু মোটরচালিত পরিবহনের আধিক্যে ক্ষেপ মেলে না তেমন, তাই বেশিরভাগ সময়ই স্টেশনের কুলিরা স্টেশনের আত্মীয় কুকুরগুলোর মতোই শুয়ে বসে ঝিমোয়; আর এদিকে ট্রেনটি প্লাটফর্মে ভেড়া মাত্রই যারা নামার তারা দ্রুত নেমে পড়ল, যারা ওঠার দ্রুত উঠে পড়ল তারাও। কেউ একা বা কেউ দল বেঁধে গন্তব্যে ফিরছে ছায়ার মতো; আর মলিন বেশের অনেকেই পেছন যাচ্ছে যে-পথ দিয়ে ট্রেনটা সবে এসেছে; আর নিকটবর্তী দীর্ণ লোকালয়টিই তাদের গন্তব্য; আর ঐ দিকে পুবপাশের জলাভূমি দখল-বেদখল হয়ে জলের ওপর মাচা বেঁধে বাঁশের তৈরি কলোনি বানানো হয়েছে; আর সেখানে সারিসারি ঘর; আর একা বা পরিবার নিয়ে নিচু আয়ের অনেকের বাস সেখানে; আর যা হয়ে থাকে সাধারণত এই দেশে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে এইসব কলোনির কর্তৃত্ব স্বত্বও সরলসূত্রে এখন ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের হাতে।

ট্রেনটা এখন যেখানে থেমেছে তার শেষ বগির প্রান্তভাগ ছুঁয়েই ঘরটি; আর রেলপথের পাশে যৎকিঞ্চিত কঙ্কর বিছানো পথের ধাপ-তিন নিচে টিনের চালার এই ঘরটি যেন ট্রেনের ভয়ে হাঁটুমুড়ে বসে থাকে সর্বদা; আর সতেজ এক ঝিঙা গাছ ওই বাড়ির মুলিবাঁশের পাচিল পেরিয়ে ট্রেনের সিগন্যাল পুলকে জড়িয়ে ধরে এমন উদ্ধত ভঙ্গিতে লতিয়ে উঠেছে যেন ওটাকে এখনই টেনে নামিয়ে ফেলবে; আর ঐ ঝিঙাগাছঅলা বাড়ির মুরগির খোঁয়াড় আর ওটিকে আবডাল করে রাখা বসত ঘরের মাঝের ফাঁকা জায়গা থেকে নিচু হয়ে ঘরের দরজা ভেজিয়ে তালা লাগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কামিজ থেকে কী যেন ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে রাস্তায় উঠে আসতে থাকা মেয়েটি দীর্ঘাঙ্গী, শ্যামবর্ণ, চেহারায় গুটিবসন্তের পুরনো দাগ বলেই কিনা জানি না, একটু উদ্ধত তবে কেমন যেন ব্যাখ্যাতীত লাবণ্য মেশানো তাতে। মসৃণ কালো কেশ বেশ বিন্যস্ত পিঠময়। খানিকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রেলপথ মাড়িয়ে এগিয়ে চলা শীর্ণন্যুব্জ মানুষগুলোকে লক্ষ করল সে। তারপর মুখ ফিরিয়ে পা বাড়াল স্টেশনের দিকে। মুখটা যেন শান্ত, দৃঢ় আর মোহভঙ্গিজনিত হতাশার ক্যামোফ্লেজ। পুত্রের নাম ধরে ডাকল; কোনো সাড়া এল না; কিয়ৎ পরে ফের ডাক অধিকতর স্বচ্ছ ও দীর্ঘ স্বরে ‘রাসেল, কই তুই?’

—‘এই তো।’ বস্তির পেছনটার এঁদোডোবা আর মানকচুর বহর থেকে জবাব এল বিরস এক শিশুকণ্ঠে। টলটলে সন্ধ্যায় সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটি।

—‘ঐদিকে কী করোছ?’ ঝাঁঝাল স্বরে প্রশ্ন করে সে। কুকুরের মতো সজাগ বাচ্চাটা জবাবের বদলে নিজেই এসে হাজির হলো। ছিপছিপে দুরন্ত চেহারার বছর সাতেকের ছোট্ট ছেলেটি একেবারে স্থির কিন্তু অবাধ্যের মতো এসে দাঁড়িয়ে রইল মায়ের সামনে। মা তার ছোট্ট হাতটি ধরে সামনে এগুতে গেলে শিশুটি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নির্বাক কিন্তু ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে অন্ধকারেই স্লিপার লাফিয়ে লাফিয়ে মায়ের আগে আগে চলল। পরনে ওর চেয়ে বড় এক গেঞ্জি হাফপ্যান্টটা প্রায় ঢেকে ফেলেছে তার। যেতে যেতে হঠাৎ করে রেলপথের একখণ্ড ঢিল নিয়ে অন্ধকারেই বস্তির পুব দিকে কী যেন লক্ষ করে ছুঁড়ে মারল; আর ঢিলটা যেখানে পড়ল আন্দাজ হয় সেখান থেকেই একটি কী দুটি খোঁয়াড়মুখী মুরগি তার স্বরে চেঁচিয়ে উঠল।


মেয়েটি ফের লাইনের ওধারে তাকাল। রেললাইন আর বগিগুলোর ওপারে এখন অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠেছে। ধূসর ছায়ামূর্তির মতো বিষণ্ন মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল সে। সে কি বিশেষ কাউকে খুঁজছে এইসব পাণ্ডুর মুখের জনস্রোতে!


রেলপথ ধরে হেঁটে এসে প্লাটফর্মে পা দিতেই মেয়েটির সাথে যে মানুষটির দেখা হয়ে গেল তিনি তার বাবা, যিনি সম্প্রতি দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন আর এজন্যে মেয়ের মনে ঘৃণা জন্মালেও লোকটির জন্য ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় নি—কেননা হাজার হোক সে তার জন্মদাতা পিতা, এই কথা উথলে ওঠে সব ছাপিয়ে আর তখন তখনই ম্রিয়মাণ হয়ে ওঠে পুঞ্জীভূত ঘৃণা। মানুষটা দ্বিতীয় বিয়েটা চুপিসারে সারলেও সম্পর্কের বিষয়টা অবগত ছিল অনেকেই। দুই সন্তানের জননী নসিবুন নেসার সাথে তার যখন লদকালদকি তখন এই নিয়ে প্রথম স্ত্রী রবেদা খানম প্রতিপক্ষ ভাবী সতীনের সঙ্গে বেশ কয়বার তুমুল ঝগড়ায় মত্ত হয়েছিল কিন্তু অবশেষে যখন বিয়েটা হয়েই গেল তখন তার স্বীকৃতি না-দিয়ে রবেদা খানম পারেন নি, যেমনটা পারে নি তার একমাত্র কন্যা রাহেলা আক্তার পাখি, মায়ের পক্ষ নিয়ে বাবার সাথে সেও প্রমত্ত ঝগড়ায় প্রবিষ্ট হয়েছিল বারকয়েক, কিন্তু বিয়ের পর নতুন মাকে প্রথমে তাকেই নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে হয়েছে এবং ফেরার বেলা জনিপ্রিন্টের গ্যারান্টেড সিল মারা একটা বারোহাতি কাপড়ও তাকে পড়িয়ে দিতে হয়েছে—যার জন্য চিনজান কাপড়আলি মহিলার নিকট থেকে তাকে বাকি রাখতে হয়েছে একশ তিরিশ টাকা।

মানুষটি প্রথম মাসে দ্বিতীয় বউকে পৃথক রাখলেও এখন দ্বিতীয় বউয়ের আগের ঘরের দুইটি নাবালেগ পুত্রসন্তানসহ দুই স্ত্রীকে নিয়ে এক ঘরের নিচে একত্রেই থাকছে তারা স্টেশনের উত্তর-বস্তিতে। দ্বিতীয় বউ আগের থেকেই আগরবাতি বানাত। তার ছেলে-দুটি ক্রোশখানিক দূরে নগরের প্রধান বইপাড়া বাংলাবাজার থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহ করে আনে প্রেসের ব্যবহৃত কালি। সেই কালি আর স’মিল থেকে নামমূল্যে কেনা কাঠের গুঁড়া সহযোগে তৈরি হয় আগরবাতি; আর রেললাইনের দুই স্লিপারের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে সেই আগরবাতি শুকোয় তারপর প্যাকেটবিহীন অবস্থায় তা পৌঁছে দেয় মহাজনের কাছে; আর মহাজন তাতে সুগন্ধি জুড়ে দিয়ে তার নিজস্ব প্যাকেট-বন্দি করে পৌঁছে দেয় খোলাবাজারে।

মেয়েটি ফের লাইনের ওধারে তাকাল। রেললাইন আর বগিগুলোর ওপারে এখন অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠেছে। ধূসর ছায়ামূর্তির মতো বিষণ্ন মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল সে। সে কি বিশেষ কাউকে খুঁজছে এইসব পাণ্ডুর মুখের জনস্রোতে! সংক্ষিপ্ত বিরতি নিয়ে দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে পুলি-ইঞ্জিনগুলো। হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটি ফের সামনের স্টেশনের দিকে এগুনো শুরু করতেই সম্বিৎ এল মেয়েটিরও। ট্রেনের এগিয়ে চলার সাথে সাথে সেও পা চালানো শুরু করল; আর ট্রেনের শেষবগিটা যখন স্টেশন-লাগোয়া মসজিদের দক্ষিণপ্রান্তটা ছেড়ে যাচ্ছে তখন তখনই সে দেখল রঙজ্বলা নীল রঙঅলা ব্যাগের ক্লান্ত এক মেয়ে প্লাটফর্মে এসে পা রাখল; আর মেয়েটাকে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে তার; আর মেয়েটা যখন মসজিদের দেয়াল ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়া বড় রাস্তাটার বাঁকে হারিয়ে গেল ঠিক তখন তখনই তার মনে হলো তার নিজের স্বামীর সাথেই একদিন মনে হয় এই মেয়েটিকেই সে দেখেছে মিলব্যারাকে মোতালেব মামুর বাজারের ওরসে গত কার্তিকের শেষে।

মায়ের কাছ থেকে নাতিকে ছাড়িয়ে নিয়ে নানা তার হাত ধরে উল্টোপথে এগুতে থাকে। দ্বিতীয় বউয়ের ছোট ছেলেটি এখনও বেশ অবুঝ থাকায় মানুষটিকেই ও তার নতুন বাবা হিশেবে সহজভাবে মেনে নিয়েছে; আর আব্দারও করে। বড়টি সহজে কাছে ভেড়ে না। দূর থেকে দেখতে পেয়ে ছোটটি এসে নানা-নাতির কাতারে সামিল হলে পরে তখন মানুষটা এক হাতে তার নাতি আর অপর হাতে নাতির বয়সী সৎ ছেলেটাকে নিয়ে এগুতে থাকে; আর তারা তিনজনে মিলে এসে ঢোকে একটি খুপরি দোকানে; আর রেলপথকে বায়ে ফেলে অত্র এলাকার প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার এক সরু গলির মুখেই দোকানটি; আর নাতি আর ছেলেকে কিছু খাওয়াবে এই তার নিয়ত। দোকানটা ছোট। বাইরে একটা বেঞ্চ, ভেতরে আরেকটা। বাইরের বেঞ্চে উঠতি ছোকরা স্টেশনের পাতি-রংবাজ ছমির বসে আছে দোকানটিকে পশ্চাৎদেশ দেখিয়ে। মানুষটার দুই হাতে ধরা দুই পিচ্চিকে দেখে অনুচ্চ স্বরে কী যেন বলল ছোকরাটা; আর মানুষটা ভ্রুক্ষেপ করল না তাতে। তারা গিয়ে বসল ভেতরের বেঞ্চে। দোকানটির মালিক বৃদ্ধ রাহাতনি বেগম। নিজের হাতেই দোকানটির তদারকি করেন। এমনিতে সবই ভালো। শুধু মাঝে মধ্যে এই ছমিরগো লাহান পোলাপানগুলাই একটু নটখট করে বৈকি। মানুষটি একটি নির্দিষ্ট বয়ম থেকে এই দোকানের সবচেয়ে দামি তিনটা বিস্কিট নিয়ে নাতি আর ছেলের হাতে হাতে দিয়ে নিজেও একটা নিলেন; আর বিস্কিটটা নিজে মুখে পোড়ার আগেই কী মনে করে তিনজনের জন্য তিনটা চায়ের অর্ডারও দিলেন। স্টোভের আগুনের তাতে লাল হয়ে আছে ছোট্ট এই দোকান ঘর। ঘরের মধ্যে প্রাণ বলতে যা কিছু আছে, তা সবই ঐ উষ্ণ স্টোভ আর টিনের বেষ্টনীটার মধ্যে, যার গায়ে ফুটে উঠেছে আগুনের লালচে প্রতিফলন; আর তারই ফাঁকে ছায়ার আঁধারে গরম চায়ের কাপগুলো চিকচিক করলেও চায়ের রঙটা কেমন যেন ফিকে আর রহস্যময় ঠেকল।

পেছন দিকে সিঁড়ির নিচের দিককার ধাপগুলো যেখানে ঘরে এসে ঢুকেছে, ঐখানেই গতকাল ছেলেটি বসে বসে ছুরি দিয়ে একখণ্ড কাঠ কাটার চেষ্টা করছিল। ছায়ার মধ্যে প্রায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল ছেলেটি। দরজার পাশ দিয়ে চোরের মতো চুপিচুপি কাঠ কাটাতে ব্যস্ত ছেলেটার জেদি মুখের দিকে তাকিয়ে মা পাখির মনে হয়েছিল, বাপের মতো ছেলেটাও নিজের বিষয় ছাড়া অন্য সমস্ত ব্যাপারে নির্বিকার; কিন্তু আজ স্বামীর চিন্তাতেই মগ্ন হয়ে আছে মেয়েটি। বাড়িতে ঢোকার আগে মাইজভাণ্ডারীর আখড়ার টানে মানুষটা হয়তো নিজের বাড়ির দরজা সবেগে পেরিয়ে চলে গেছে; আর এদিকে অপেক্ষায় থেকে থেকে নষ্ট হচ্ছে তার রাতের খাবার। সোকেজের উপরে বাঁশের ঘুঁটির সাথে টাঙানো এক সিমেন্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেয়া লিল্লা পাওয়া ঘড়িটির দিকে এখন ঝলক তাকিয়ে, কড়াই থেকে সেদ্ধআলু আগলে রেখে পাত্রটা থেকে কায়দা করে জল ছেঁকে ফেলার জন্য উঠোনে চলে এল মেয়েটি; তখন রেলপথ আর ওধারের অনতিদূরের গোরস্তানের মাঠে অনিশ্চিত অন্ধকার। ডানপাশে বায়িং হাউসের গরম জলের ধোঁয়াওঠা নালাটা পেছনে রেখে সে যখন কড়াইটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল, দেখল, রেলপথ আর মাঠটা পেরিয়ে যেখানে নতুন সড়কটা পোস্তগোলার মোড়ে গিয়ে মিশেছে সেখানে হলদে বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে; আর এশারের আজানের সময়েই শিকারের কাছেপাতে বাঘের মতো ওৎ পেতে থাকা হঠাৎ কিন্তু ক্ষণিকের সঘন বৃষ্টিতে ছন্দপতন ঘটল; আর ঘর-ফিরতি মানুষগুলোকে আরও একবার লক্ষ করল সে; আর ক্রমশ ওদের সংখ্যা কমে আসছে; এখন আরও কম; বৃষ্টিউত্তর নিন্মগামী রাতটা এখন যেন সুনসান আর ভুতুড়ে।


গোরস্তানে এক শিশুকে বলাৎকার-উত্তর শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে একদল পুলিশ একজনকে তাড়া করে ফিরছে; আর লোকটি ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রাণপণ দৌড়াচ্ছে; আর পুলিশও মরিয়া; ভালো করে সে তাকিয়ে দেখে লোকটির পরনে কোনো বস্ত্র নাই, একদম নাঙ্গা…


ঘরের অগোছালো অবস্থার দিকে তাকিয়ে মেয়েটি অপ্রসন্ন মুখে বসে থেকে দরজার কোনায় ইতস্তত ছড়ানো পুত্রের রেখে যাওয়া জুতো-জোড়ার রঙ আর ডিজাইন নিয়ে যখন ভাবতে থাকে ঠিক তখন তখনই উঠোনে মানুষটির পায়ের শব্দ শোনা গেল; আর ‘এহনো আহে নাই।’ কোনো রকম সম্ভাষণ না জানিয়ে, সম্ভ্রম আর সহানুভূতির সুরে করা মানুষটার প্রশ্নে মেয়েটি কোনো জবাব না দিলেও মানুষটার বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, যার আসার কথা সে ইঙ্গিত করছে আসলেই সে ফিরে নাই, কেননা মেয়ের মুখটা তার জানা আছে, আর এই হেতু মেয়েটার জন্য এখন মনটা তার খারাপ হলেও ফিরে যেতে যেতে বিড়বিড় করে কী যেন বলল সে, মেয়েটি বুঝল না, বোঝার চেষ্টাও করল না, কেননা মেয়েটির মন আজ উচাটন, কেননা আজ ছেলেটাও কাছে নেই, সেই যে স্টেশনে নানার সাথে দেখা হওয়ার পর তার পিছু নিয়েছে আর ফিরে নাই; কেননা ফিরতে চাইলে নানার সাথে এখন তাকে দেখা যেত, মেয়েটি নিজেও পুত্রের কথা এখন আর জিজ্ঞেস করল না, ভাবল থাকুক না-হয় আজ রাত নানির সাথে, কিন্তু আগপিছ ভাবনা আর ঘরের শূন্যতা মেয়েটিকে কেমন যেন উথালবিথাল করে তুলছে; আর স্বামী মানুষটার জন্য ঘৃণা ক্ষোভ রিরংসা ভালোবাসার মিশেলে তার যেন কী হচ্ছে ভেতর ভেতর; কেননা সন্ধ্যার আগে আগে সে যখন বেরিয়েছিল তখন ঘুণ্টিঘরে একসময়কার প্রতিবেশী শরু খালার বাসা থেকে কী যেন সে শুনে এসেছে আর তখন থেকেই মেয়েটির ভেতর একটা তীব্র অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে; কেননা স্বামী মানুষটার নিচু আয় আর তার মাইজভাণ্ডারীর মুরিদ হওয়া নিয়ে সে কোনোদিন কথা বলে নি; কিন্তু এ কী কথা আজ সে শুনল তার স্বামী সম্পর্কে; বিস্ময়ে বিতর্কে তার গা যেন গুলিয়ে আসছে, মনে হচ্ছে পেট নিঃসাড় করে বমি হবে; আর এ মুখ সে কী করে মানুষকে দেখাবে; আর স্বামী মানুষটাই-বা কোন মুখে তার সামনে এসে দাঁড়াবে; আর শুধু স্বামী নয় নিজের জন্মদাতা পিতাকেও এখন তার ভয়ঙ্কর কুৎসিত কোনো ইতর প্রাণিবিশেষ মনে হচ্ছে; আর পরক্ষণেই কখনো স্বামী আবার কখনো পিতার জন্য আঁজলাভর্তি করুণা উথলে উঠল তার; আর আবার যেন রাশিরাশি ঘৃণা জন্মান্ধ কোনো পোকার মতো কিলবিল করে পায়ের বুড়ো আঙুলের নখের ভেতর দিয়ে ঢুকে মেয়েটির শরীর বেয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে উপরের দিকে উঠে আসছে; আর পোকাগুলো যখন তার উরু বেয়ে উঠে এসে যৌনাঙ্গের আর্দ্র আর সরু পথ দিয়ে ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে চাইছে ঠিক তখন তখনই তার মনে হলো ছেলেটিকে এখনই ফেরত আনতে হবে; এবং ছেলেটিকে তাই তার নিজের পিতার কাছ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য মনস্থির করল; আর ঠিক তখন তখনই সেদিনকার শেষ ট্রেনের হুইসেল কানে আসতেই মেয়েটি হাতে ধরা কী যেন ফেলে রেখে আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে উত্তরের জানালাটার ঢাকনাটা সরিয়ে কান পেতে ট্রেনটার দূরত্ব বোঝার চেষ্টা করল; আর এ সময় উঠোনে সরসর শব্দ শুনে নিয়মমাফিক চমকে ওঠলেও সে জানে এসব ইঁদুরের কাণ্ড; তাই দ্রুত পায়ে সে অন্ধকারে বাড়ির বাইরে বেরুতে গিয়ে নরম কিসের উপর যেন পা পড়ল; আর মনে হলো বাম-পাটা কিসের আঁচড়ে চিরে গেল বুঝি; কিন্তু তা উপেক্ষা করে দেখল ট্রেনটাকে যতটা দূরে সে ভেবেছিল আসলে তার চেয়ে অনেক কাছেই চলে এসেছে ওটা; আর মেয়েটা প্লাটফর্মের দিকেই এখন এগুচ্ছে, ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে একবার যেমন সে গিয়েছিল কিন্তু এখন যেন পা-টা কেমন ভারি আর নিঃসাড় মনে হচ্ছে; আর যে আতঙ্কটা মেয়েটিকে এই অব্দি নিয়ে এসেছে, এবার যেন তা কুঁকড়ে উঠল; আর হঠাৎ কী মনে করে সে দাঁড়িয়ে পড়ল; ট্রেনটা দ্রুতই তেড়ে আসছে; আর মাথার উপর সাপের মণির মতো জ্বলজ্বল করছে সার্চলাইটের বাতি; কিন্তু মেয়েটিকে পেয়ে বসেছে কী এক অমোঘ দুর্লঙ্ঘনীয় অস্থির ভাবনায়; আর ঐদিকে শিকারির ধূর্ত চোখে কে যেন তাকে খুব কাছে থেকেই লক্ষ করছে তা মেয়েটি ঠিক এইমাত্র বুঝতে পারলেও অন্ধকারে আর তার নিজের অস্থিরতায় বুঝতে পারে নি যে লোকটা এতটা কাছেই আছে তার; আর চকিত কোনো অজানা উৎস থেকে আগত পলকের আলোয় মানুষটাকে কেমন জানি তার পিতা আবার পরক্ষণেই স্বামীর মতো মনে হলো মেয়েটির; আর ইত্যপলকে খুব কাছে চলে এসেছে ট্রেনটি; আর হুইসেলও বাজাল; আর এপাশে, যেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে সে, জায়গাটা ভাঙা আর গর্তের কারণে সরু আর বর্ষার বাড়ন্ত জল টইটই বলে পানিতে পড়ে যাবার আশঙ্কা থেকে মেয়েটি একবার এগুতে চাইল, আবার হঠাৎ করেই দৌড়ে লাইনের ওপারে চলে যাবার কথা ভাবল; আবার ভাবল না; কিন্তু কেমন যেন লাগছে তার; মাথাটা সাপেকাটা রুগির মতো ঝিমঝিম করছে; আর শরীরটা গুলিয়ে আসছে; মনে হচ্ছে এইবার সত্যি সত্যি বমি হবে হড়হড়; যেন পোস্তগোলা মোড়ের কুকুরটার মতো তার উপরেও গোরস্তানের কোনো অতৃপ্ত আত্মা ভর করেছে আজ; আর কবরস্থানের বখাটে কুকুরগুলো কেন এমন অস্থির ছোটাছুটি আর উচ্চ নিনাদে ডেকে  উঠছে থেকে থেকে এখন তা ভাবতে না-চাইলেও মেয়েটা কিন্তু প্রাণপণ চাইছে যেন ট্রেনটা দ্রুত তাকে ছেড়ে যায়; আর ঠিক তখনই পেছন থেকে পিঠের ডান পাশে কে যেন সজোরে ধাক্কা মেরে উঠল; এত জোরে ধাক্কা কোনো মানুষের পক্ষে দেয়া সম্ভব কিনা সে বুঝে উঠতে পারল না; কিন্তু ঠিক তখন তখনই কোটি কোটি মৌমাছির গুঞ্জন আর কোটি কোটি জোনাকপোকার আলোর মাঝে মেয়েটির মনে হলো পাখির মতো তার ডানা গজিয়েছে; আর সে উড়ে চলছে অলৌকিক এক ছুটন্ত ট্রেনের সাথে সাথে; আর আশ্চর্য, নিজেকেই তার একটি ট্রেন মনে হচ্ছে; আর হঠাৎ নিচে তাকিয়ে মেয়েটি দেখতে পেল দিন তিনেক আগে গোরস্তানে এক শিশুকে বলাৎকার-উত্তর শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে একদল পুলিশ একজনকে তাড়া করে ফিরছে; আর লোকটি ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রাণপণ দৌড়াচ্ছে; আর পুলিশও মরিয়া; ভালো করে সে তাকিয়ে দেখে লোকটির পরনে কোনো বস্ত্র নাই, একদম নাঙ্গা; আর পলায়নপর লোকটি ঊর্ধ্বমুখে হাত বাড়িয়ে করুণ আর আর্তস্বরে অনবরত ডেকে চলছে কোনো অতি প্রিয় নামে যেন শেষাবধি ভুবনচিলের মতো ছোঁ মেরে শূন্যে তুলে নিয়ে পাখিটি তাকে উদ্ধার করবে; আর চাঁদের আবছা আলোয় চিতার ক্ষিপ্রতায় দৌড়তে থাকা লোকটিকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে সদ্য ডানাগজানো উড়িষ্ণু মেয়েটির।