হোম গদ্য অপূর্ব ভাষার ইতিহাস!

অপূর্ব ভাষার ইতিহাস!

অপূর্ব ভাষার ইতিহাস!
564
0

ইতিহাসবিদ নই আমি। নিতান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টোলে ব্যবসায় আর আইনশাস্ত্র নাড়াচাড়া করিয়াছি। জীবনধারণ করিতেছি ভাষা সাহিত্য আর দর্শনশাস্ত্রের বায়ু সেবন করিয়া। ইহাতে হয়তো অর্থ আছে, কিন্তু টাকা নাই। এমন করুণ বায়ু সেবন কম আনন্দদায়ক নহে। কারণ কথা তো এক ধরনের বায়ু। তাহা সেবনে মন আর শরীর ভালো থাকে। তবে বলা যাইতে পারে ভাষা এক ধরনের বায়ুবিদ্যা বটে। একদিন বায়ু সেবন করিতে গিয়া আমার স্নেহভাজন গুরু মাইনুল শাহিদ কহিলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি লইয়া কি করা যাইতে পারে? নানা কথায় কহিলাম, ইতিহাস খতাইয়া দেখা যাইতে পারে। শাহিদ নাছোড় বান্দা। খুঁজিয়া বাহির করিল হুমায়ুন আজাদের একখানা গবেষণা বহি। উত্তম! কেন?

ইহজগতে হাঁটিবার কালে হুমায়ুন আজাদকে দেখিবার সুযোগ হইয়াছিল। মাঝে মাঝে তিনি নানা আড্ডায় যে কথার বায়ু ত্যাগ করিয়াছেন তাহা সেবন করিয়াছি। তো তিনি এই ধরনের বই লিখিয়াছেন আগে কখনো শুনি নাই! কম-বেশি তাহার বইয়ে চোখ বুলাইয়াছি। দুই চারআনা বাংলা ভাষা বিষয়ক বই নাড়াচাড়া করিবার দৌলতে বলিতেছি, এখন নাগাদ এই বাংলাদেশে তাহার ভাষা বিষয়ক সম্পাদনা গ্রন্থ বাঙলা ভাষা শ্রেষ্ঠ বলিয়া প্রতীয়মান। তবে ওই বহিতে হালকা ফাঁকি আছে। মোটের উপর প্রথম বাংলা ব্যাকরণ, রাজা রামমোহন রায় প্রণীত গৌড়ীয় বাঙ্গালা ব্যাকরণ ইহাতে জায়গা মিলে নাই। সেও এক প্রগতিশীল লীলা বোধ হয়!


বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ভাষা বাংলাও ভাগ হইয়া গেল!


তো আজাদের বইয়ের নাম ভাষা আন্দোলন সাহিত্যিক পটভূমি। বহিখানা পহেলা প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে। পরে বাজারজাত হয় আগামী প্রকাশনীর দৌলতে। বহির মুখবন্ধে আজাদ বলিতেছেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ছিল ১৯৪৭—১৯৫১ পর্বের বাংলাদেশের সাহিত্যের সামাজিক ও শৈল্পিক চারিত্র্য অনুসন্ধান, এবং এর মাঝে ভাষা আন্দোলনের কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায় কিনা, তা উদ্‌ঘাটন।’ ভালো কথা। গবেষণাকে চার পরিচ্ছদে ভাগ করিয়াছেন ড. আজাদ। এক পরিচ্ছদে ‘পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্ব : প্রতিক্রিয়াশীলতার বিষবৃক্ষ’, দুই পরিচ্ছদে ‘পাকিস্তানবাদ ও পাকিস্তানবাদ প্রত্যাখ্যান’, তিন পরিচ্ছদে ‘কথা সাহিত্য : দারিদ্র্য ও দুর্নীতির দলিল’, চার পরিচ্ছদে ‘প্রবন্ধ : ব্যাপক প্রতিক্রিয়াশীলতা’।

আজাদের গবেষণায় ঢু মারিবার আগে কিছু জিজ্ঞাসা সামনে হাজির হওয়া দরকার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কি জিনিস? আজাদের গবেষণায় হাল বিষয়ে কোনো রা নাই। একথা সর্বজনবিদিত, ভারত বহু ভাষা, বহু বর্ণ, বহু সম্প্রদায়ের দেশ। ১৯৪৭ সালের আগেও ছিল, এখনও আছে। আরও ছিল ইংরাজ শাসিত উপনিবেশ। ইতিহাস ঘাঁটিলে দেখা যাইবে, ব্রিটিশ বেনিয়া ভারত ছাড়িবার আগে ভারত ভাগ করিয়াছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের কাঁটায়। তাহারা দেশ ভাগে কাজের কাজ করিয়াছে সাম্প্রদায়িক উছিলায়। একদিকে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’, আরেকদিকে ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’। দুই জাতীয়তাবাদের গোড়ায় ছিল দুইটি দল। ভারতীয় কংগ্রেস আর মুসলীম লীগ। ভাগাভাগিতে দুখের দশায় পড়িয়াছি আমরা। বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ভাষা বাংলাও ভাগ হইয়া গেল! বেশিরভাগ বাঙালি হিন্দু থাকিয়া গেল ভারতের সহিত। আর বাঙালি মুসলমান পাকিস্তানে। একটা কথা, ৪৭ সালের বিভাজন না বুঝিলে দুই জাতীয়তাবাদ বুঝিতে মুশকিল হইবে। তো আজাদের গবেষণায় কোথাও এই ব্যাখ্যা পাইলাম না। তাহা হইলে আজাদের পটভূমির পাটাতন কই?

আজাদ বলিতেছেন, ‘বায়ান্নোর ভাষা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুসংহত স্ফূরণ। বাঙলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন ছিল মুখ্যত একটি জাতীয় সংগ্রাম।’ হক কথা। কিন্তু বিশ্লেষণে আজাদ সেই পথে যান নাই। তিনি সাহিত্যে আবিষ্কার করিয়াছেন ‘পাকিস্তানবাদ’। অবশ্য তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র একনম্বর মূলনীতি ‘জাতীয় রেনেসাঁর উদ্বোধক পাকিস্তানবাদের সাহিত্যিক রূপায়ন’ হইতে এই তত্ত্ব হাজির করিয়াছেন। খুঁজিয়া পাইয়াছেন ‘সাম্প্রদায়িকতা’ আর ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’। নিঃসন্দেহে ‘পাকিস্তানবাদ’ তত্ত্বে দুই শব্দ জুতসই। কিন্তু রেনেসাঁ সোসাইটির পাঁচনম্বর মূলনীতি ‘সাহিত্যে হিন্দু ও মুসলমানের আন্তর্জাতিক সমপ্রীতিমূলক আবেদনের রূপায়ন’ ব্যাখ্যা তিনি দেন নাই। ধরিয়া লইলাম, রেনেসাঁ সোসাইটির ‘পাকিস্তানবাদ’ আজাদেরই ‘পাকিস্তানবাদ’। কিন্তু ‘পাকিস্তানবাদ’ তত্ত্বে বাদ পড়িয়াছে ‘জাতীয়তা’ ভাবখানা। আসলে ইহাতে ‘পাকিস্তান জাতীয়তাবাদ’ ভাবতত্ত্ব করিলে গবেষণা বেহতর হইত। অর্থ শাস্ত্র মানিলে ‘জাতীয়’ শব্দের মানে ‘যাহা জন্ম দেয়’। ‘জাতি’ অর্থে ‘জন্ম’ আর ‘ইয়’ অর্থে ‘দেয়’। মানে সাহিত্যে যে জাতিরাষ্ট্র ধারণা জন্ম দেয়, তাহা পরিষ্কার হইত। ফলে আজাদ কথিত ‘পাকিস্তানবাদ’ কি করিয়া বুঝিব?

আজাদ বলেন, ‘পাকিস্তানবাদী সাহিত্যসৃষ্টির প্রত্যক্ষ প্রেরণা ছিল পাকিস্তান প্রস্তাব; এবং যারা এতে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশ সৃষ্টিশীল লেখক ছিলেন না। কেউ ছিলেন সাংবাদিক—সাংবাদিক ছিলেন অধিকাংশ, কেউ রাজনীতিক বা রাজনীতিপ্রবণ, কেউ প্রাবন্ধিক; এবং তাদের পরবর্তী জীবন প্রমাণ করেছে তারা সবাই ছিলেন প্রগতিবিমুখ।’ এইখানে আজাদের চিন্তা বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, ‘সৃষ্টিশীল লেখক’ সমপ্রদায়ের তালিকায় ‘প্রাবন্ধিক’ নাই। এহেন ক্যাটাগরির ফাঁদে আছে ‘কবি’, ‘গল্পকার’ আর ‘ঔপন্যাসিক’। এটা সাহিত্যে এক ধরনের সংকোচনবাদী ধারণা। মনে হয়, তিনি ভাবিবার ফুরসত পান নাই। কেননা দুনিয়ায় যেইসব তত্ত্বের উপর সাহিত্য অগ্রসর হয় তাহা কি কম সৃষ্টিশীল? যদিও আজাদ তাহার বহিতে ‘প্রবন্ধ’-কে আলাদা সাহিত্য ‘সৃষ্টিশীল’ মূল্য দিয়াছেন।

ড. আজাদ সামপ্রদায়িক আর প্রতিক্রিয়াশীলতার ধরন হিশাবে হাজির করিয়াছেন বেশ কিছু উপাদান। চিকনদাগে উপাদানগুলির ভিতর (১) ‘ভাষায় উর্দু, ফার্সি, আরবি শব্দের অবাধ মিশ্রণ’, (২) ‘শৈল্পিকভাবে এ-সাহিত্যতত্ত্ব আধুনিক ও উর্বর ছিল না, (৩) ‘পুঁথি সাহিত্যকে ঐতিহ্য হিশাবে গ্রহণ’, (৪) ‘মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলনে বিশ্বাসী এ-সাহিত্যতত্ত্বের প্রচারকেরা ভূমিকা পালন করেছিলেন পাকিস্তানি রাজনীতির প্রচারকের’, (৫) ‘সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা’ ইতি আদি উল্লেখযোগ্য। তিনি গবেষণায় তির্যক মন্তব্যে পাকিস্তানবাদকে নাকচ করিয়াছেন।

দর্শনশাস্ত্র বলিতেছে, আইনের গঠন মানে ক্ষমতার গঠন। রাষ্ট্র জন-সংস্কৃতি, সাহিত্য আর জনগণকে তাহার এখতিয়ারেই রাখিবে। সেই এখতিয়ারে একাডেমি আর সাহিত্য উৎপাদনকাঠামোকে তোতাপাখির মতো বুলি শিখাইবে, ইহা আর নতুন কি! তাহার এই দেখার ভিতর তুলনামূলক সাহিত্য বিচার কম। আছে মন্তব্য। মানিতেছি, প্রতিক্রিয়াশীলতা গোঁড়া মুসলমানের ছিল। কিন্তু গোঁড়া হিন্দুরা অসাম্প্রদায়িক বা উদার ছিল কি? উত্তরে লা জবাব! তবে আজাদের তুল্যমূল্য মন্তব্য, ‘পাকিস্তানি আবহাওয়ায় পাকিস্তানবাদবিরোধী বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ বিশেষ ছিল না, সাহসের অভাব ছিল’। সমস্যাটা ‘সুবিধাবাদী’ চরিত্রের সমস্যা। আদতে পাকিস্তান আমলে যাহারা সাহিত্য এস্তেমাল করিতেন তাহারা প্রায় মধ্যবিত্ত সমাজের লোক। যে সময়কালের গবেষণা আজাদ করিয়াছেন, সেই সময়কে বুঝিবার ক্ষমতা কম লেখকেরই ছিল। এহেন বিকালে প্রশ্ন জাগিতেছে, ‘সাহস’ না থাকিলে ভাষা আন্দোলন কি করিয়া হইল?


বাংলা ভাষা আন্দোলন বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে সামনে আনিয়াছে।


তৎকালের কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের নাম না লইলাম। লইলে কড়ায়-গণ্ডায়-দেখা মিলিবে, কি কবিতা কি গল্প কি উপন্যাস কি প্রবন্ধে তাহাদের বেশিরভাগই আরেক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের বন্দনাই করিয়াছেন। পাঠক বহিতে মিলাইয়া দেখিলে ভালো হয়। আজাদ লিখিয়াছেন, ‘১৯৪৭-এ পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় কোনো সাহিত্য পত্রিকা ছিল না, গ্রন্থ প্রকাশের ধারাও সৃষ্টি হয় নি। তাই সাহিত্য স্রোত নিরুদ্ধ হয়ে পড়ে।’ তবে তাহার গবেষণার ভিত ‘মোহাম্মদী’, ‘সওগাত’, ‘মাহে নও’, ‘কাফেলা’, ‘নওবাহার’, ‘দিলরুবা’, ‘ইমরুল’ আর সরদার ফজলুল কবির সম্পাদিত ‘পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য’ বহি অবলম্বনে। তাহার মতে, এই সব পত্রিকায় সমাজের মুসলমান প্রগতিশীল অংশের উপস্থিতি ছিল ক্ষীণ।

সাম্প্রদায়িকতা আর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপরীতে তিনি প্রগতিশীলতা হাজির করিয়াছেন তিরিশি আধুনিকতা। কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে, তিরিশি আধুনিকতা কি মাল? ইহা তো অপরাপর বিদেশি প্রভুর মন আর চিন্তার আরেক ঔপনিবেশিকধারা। অপরের আধুনিকতা দিয়া কখনো আধুনিক হওয়া যায় কি? যে চিন্তা অন্যের চিন্তা আর ধ্যানধারণা বহন করিয়া চড়িবে তাহাই ঔপনিবেশিক চিন্তা। কোনো সমাজ আধুনিক হইবার লক্ষণ তৈয়ার হইতে হয় আপন সমাজের ভিতরেই। হুমায়ুন আজাদের চিন্তারকাঠামো কবি কায়কোবাদের চিন্তার কাঠামোর সঙ্গীন। কায়কোবাদ ‘মুসলমান হইয়াই’ও লেখক হইবার বাসনায় সংস্কৃত শব্দ বেশি-বেশি ব্যবহার করিতেন। আর হুমায়ুন আজাদ ‘আধুনিক’ হইবার লাগিয়া বেশি-বেশি ‘পশ্চিমানবিশ আধুনিকতা’র শরণাপন্ন হইয়াছেন। দুখের মধ্যে এই যা, ‘সংস্কৃত’ শব্দের স্থলে ‘আধুনিকতা’ বসাইলে হয়।

গবেষণাখানা বিশেষ উত্তম নহে, আবার অধমও নহে। রচনাপঞ্জির তুলনায় বিশ্লেষণ কম। তবে ইহা ভবিষ্যতে যাহারা গবেষণা করিবেন তাহাদের সহায় হইবে। গবেষণার বাহিরে পরিশেষে এই কথা বলিব, বাংলা ভাষা আন্দোলন বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে সামনে আনিয়াছে। এই জাতীয়তাবাদের শেষ পরিণতি ঘটিয়াছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভবের ভিতর দিয়া। এই জাতীয়তাবাদ তখনই প্রগতিশীল বলিয়া বিবেচিত হইবে যখন অপর জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে সমান মর্যাদা দেওয়া যাইবে। তখনই বাংলা ভাষা অপূর্ব ইতিহাসে টিকিয়া থাকিবে।

সাখাওয়াত টিপু

সাখাওয়াত টিপু

জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। লেখক ও চিন্তাবিদ।


প্রকাশিত বই :
কাব্যগ্রন্থ—
১. এলা হি বরষা
২. যাহ বে এই বাক্য পরকালে হবে
৩. শ্রী চরণে সু
৪. বুদ্ধিজীবী দেখ সবে
৫. কার্ল মার্কসের ধর্ম


সম্পাদনা ও গবেষণা—
১. জাতীয় সাহিত্য (ভাষা ও দর্শনের কাগজ)
১. চাড়ালনামা (নাসির আলী মামুনসহ যৌথ)


ই-মেইল : shakhawat.tipu@gmail.com
সাখাওয়াত টিপু