হোম গদ্য অপবিরোধ

অপবিরোধ

অপবিরোধ
335
0

ছন্দ। চিত্রকল্প। দুটোই কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ইংরেজিতে ব্যাপারটাকে টোলস বললে আরো ভালো লাগে। প্রসঙ্গ যেটা, ছন্দ আর চিত্রকল্পের কি কোনো বিরোধ আছে? কবিতায় ছন্দ প্রয়োগ করলে, তাতে চিত্রকল্প ব্যবহার করা যায় না, এরকম কোনো একাডেমিক নিষেধ আছে? বা চিত্রকল্পময় কবিতায় ছন্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ? আর চিত্রকল্প মানেই কি দুর্বোধ্য বা পরাবাস্তব কিছু?

মায়ের কপালের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা উৎকণ্ঠাটুকু নিয়ে এসেছি
আমারও নামের পাশে লেখা যেতে পারে ‘সম্ভাবনা’— সম্ভাবনার
যে দ্বার লাঙলের খুলবার কথা—তার দরজায় আজো বসে
আছেন বাবা—যার ঘোলাটে চোখে এখনো থকথক করছে
কাদাপানির সংশয়, আড়ষ্টতা…
আড়ষ্টতার হাত ধরে কতদূর যাবে মায়ের বোবা ছেলেগুলো!
আমারও উদ্দেশ্য ছিল দূর—অথচ, ঘরের কাছেই বুনোফুল দেখে
থমকে দাঁড়াতে হলো—দাঁড়িয়ে আছি
শুনেছি, দাঁড়াতে জানলে সকল দূরই একদিন নিকটে আসে।

[মা প্রজাপতি ও অন্যান্য ছায়া ৫/ আপন মাহমুদ]

অকাল প্রয়াত কবি আপন মাহমুদের এই কবিতাটিতে একাডেমিক কোনো ছন্দ ব্যবহার করা হয় নি। তিনি ফ্রি ভার্সে লিখেছেন। কিছু চিত্রকল্পের ব্যবহার আছে। চিত্রকল্পগুলোই লেখাটিকে প্রাণ দিয়েছে। লেখাটি কি পরাবাস্তব? অবশ্যই না। একাডেমিক ছন্দ ব্যবহার হয় নি বলে কোনো পাঠক কবিতাটিকে বাতিল করে দিতে পারবেন? সম্ভব না।


ছন্দ একটি কাঠামো বৈ কিছু নয়, চিত্রকল্প কবিতার আত্মা।


কবিতার আলোচনায় অনেক কবিকেই বলতে শুনি, ছন্দই কবিতার সর্বস্ব। চিত্রকল্প যেন কবিতায় বোধগম্যতার শত্রু! কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার করলেই যেন তা পরাবাস্তব হয়ে যায়! পরাবাস্তবতা জিনিসটা আসলে কী? যা বাস্তবতার বাইরে বা ঊর্ধ্বে, যা বাস্তবে ভাবাও কঠিন—তাই তো? কারো কারো কাছে পরাবাস্তবতা ইল্যুশন ছাড়া কিছু নয়। চিত্রকল্প সেই জিনিস, কোনো কবি (যে কেউ হতে পারে, যেহেতু কবিতার কথাই বলছি) উপমার প্রয়োগে কোনো দৃশ্য কল্পনা করেন, কোনো বিষয় বা বস্তুর সাথে তার দেখার বস্তুকে কল্পনা করে তা লিখেন। কবির ধর্মই তো সাধারণ মানুষ যেভাবে যা দেখে, তা আলাদাভাবে দেখা বা বুঝতে পারা। সেই দেখা এবং বোঝা নিজের ভাষায় প্রকাশ করা। একজন কবি প্রতিটি বিষয়-বস্তুকে আর দশজনের চেয়ে আলাদা করে দেখেন। তার দেখার চোখ তাকে দৃশ্যের ভেতরে আরো অনেক দৃশ্য দেখায়। প্রত্যেক ভাবেরই আলাদা ভাবনা জন্ম দেয়। আর একাডেমিক ছন্দের কাজ হলো মাত্রা-অক্ষরের গাণিতিক হিশাব যা কবিতার সুর, ধ্বনিময়তা সৃষ্টি করে। এর বাইরেও ছন্দ আছে। ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিক আচরণও নিশ্চয় ছন্দ।

এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ছন্দ আর চিত্রকল্পের কোনোপ্রকার বিরোধ নেই। কবি এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি না করে দিলে কোনো সম্পর্কও নেই। ছন্দ কখনো চিত্রকল্পের জন্য বাধা নয়, চিত্রকল্পও ছন্দের শত্রু নয়। এমননি পরাবাস্তব ব্যাপারটাও এদের শত্রু নয়। কবি চাইলে এরা সকলেই মিত্র, জানের দোস্ত। কবি চাইলে ইমেজকে, পরাবাস্তব লেখাকেও ছন্দের ব্যাকরণে ফেলতে পারেন। এইদিক দিয়ে চিত্রকল্প স্বাধীন। এর উপর কোনো একাডেমিক শাসন নেই। জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, সিকদার আমিনুল হকের মতো বড় কবিরা যেটা করেছেন। দুর্দান্ত সব চিত্রকল্পের সাথে ছন্দ ব্যবহার করেছেন। ২৪, ২৮, ৩২ মাত্রায় জীবনানন্দ দাশ যে-সকল কবিতা লিখেছেন, সেসব কবিতার ঝোঁক অক্ষরবৃত্তে নাকি গদ্যে? একনিষ্ঠ পাঠকমাত্রই তা টের পান। জীবনানন্দেরও বহু আগের চর্যাপদ, সংস্কৃত ভাষার মহাকবি কালিদাস রচিত মেঘদূত-এর কথা উল্লেখ করা যায়। বাংলা কবিতার আদিতেও ছন্দ আর চিত্রকল্পের বিরোধ ছিল না। আমি চর্যাপদ পড়েছি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের অনুবাদে; মেঘদূত বুদ্ধদেব বসুর ভাষান্তরে। মেঘদূত-এ ব্যবহৃত চিত্রকল্পগুলো এই সময়ের পাঠকদেরও সমান আন্দোলিত করে। বোধকরি, একশ বছর পরের পাঠকদেরও করবে। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের অন্যতম সেরা কাজ বাংলার আদিকাব্য চর্যাপদের অনুবাদ। কী চমৎকার তার ভাষা! ছন্দ ছাপিয়ে সেসব কবিতা নিপুণ ভাষা ও চিত্রকল্পময়। মেঘদূত বা চর্যাপদের চিত্রকল্পময়তা বুদ্ধদেব বসু ও সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ সৃষ্টি করেন নি। তাদের অনুবাদ-মাধুর্যে বাংলা কবিতা পাঠকের কাছে সেই অমর সৃষ্টি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।

পৃথিবীর কোনো গ্রেট কবি বলেন নি, ছন্দের সঙ্গে চিত্রকল্পের বিরোধ আছে। বরং তারা দুটোর সার্থক ব্যবহার করেছেন। চিত্রকল্পকে বলা যায় কবিতার ভেতরের পৃথিবী, ছন্দ বাইরের। ছন্দ একটি কাঠামো বৈ কিছু নয়, চিত্রকল্প কবিতার আত্মা। একটা কবিতা পড়া যাক—

বউয়ের অঙ্গজুড়ে পাকা ধান।
তার গর্ভে ধান শুধু ধান।
ধানের গন্ধ আমাকে ঘুমাতে দেয় না।

বউ হাঁটে—
ঝনঝন করে ধান।
বউ নাচে—
ঝরে ঝরে পড়ে পাকা ধান,
উঠানজুড়ে স্তূপ হয়ে ওঠে,
গোলা ভরে ওঠে।

আমার কোনো অভাব নাই—
সারাদিন গাঁথি কথা, সুর দেই, আর গান গাই।

[ধান/ মাহবুব কবির]

কবিতাটি চিত্রকল্পে ভরপুর। সকল চিত্রকল্পই কবি নির্মাণ করেছেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিচিত সব শব্দ ব্যবহার করে। তথাকথিত ছন্দবিশারদরা দাবি করেন, চিত্রকল্প মানেই কষ্ট-কল্পনা। মাহবুব কবিরের ধান কবিতাটি পড়ে কি তা মনে হয়? এই কবিতার মতো বাংলা ভাষায় অজস্র চিত্রকল্প সমৃদ্ধ কবিতা আছে। যেসব কবিতা পড়লে অবাক সব ভাবনার জগৎ উন্মোচিত হয়; কিন্তু অভিধানের কাছে যেতে হয় না। কাজেই চিত্রকল্প মানেই কঠিন কঠিন শব্দের ব্যবহার নয়।


কবিতায় ছন্দ বা চিত্রকল্পের চেয়ে ভাষাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।


একটা প্রশ্ন মনে এল। কবিতার ভিত্তি কী—ছন্দ না চিত্রকল্প? ভাবনার পর মন যে উত্তরটি পেল, এর কোনোটিই না। কবিতার মৌলিক ভিত্তি হলো শব্দ। শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি হয়। হোক তা অর্থবোধক বা অনর্থক। শব্দ না থাকলে কবিতা কেন, কোনো প্রকার সাহিত্যই লেখা হতো না। ছন্দ আবিষ্কার তো বহু দূরের বিষয়। শব্দ না থাকলে কবি চিত্রকল্প ভাবতে পারত ঠিকই, লিখতে পারত না। কিন্তু চিত্রশিল্পী ঠিকই আঁকতে পারত। এই হিশাবে ছন্দের চেয়ে চিত্রকল্পের শক্তি অনেক বেশি। শব্দ থেকেই তো ভাষা। সেই শব্দ বা ভাষা না থাকলে ছন্দের অস্তিত্বই থাকত না। কিন্তু চিত্রকল্প থাকত। কেননা ভাষা না থাকলেও মানুষের ভাবার ক্ষমতা থাকত।

তাই কবিতায় ছন্দ বা চিত্রকল্পের চেয়ে ভাষাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বাংলাদেশে আমার সময়ে যারা কবিতা লিখছেন, তার আগের প্রজন্মগুলোতে যারা লিখেছে, তাদের ভেতর কয়েকটা ভাগ দেখতে পাই। এই মতাদর্শীয় ভাগাভাগির মধ্যে স্পষ্টত ভাগ দুটি। ছন্দবাগীশ এবং চিত্রকল্পপ্রেমী। ছন্দবাগীশরা মূলত ফ্যাসিস্ট। তারা একাডেমিক ছন্দের ব্যবহার ছাড়া কোনো কবিতাকে কবিতা হিশাবে স্বীকার করেন না। উল্লেখ করার বিষয় যেটা, তাদের কেউই নতুন কোনো ছন্দ আবিষ্কার করতে পারেন নি। এক-দেড়শ বছর আগে যেসব ছন্দ ব্যবহার করে কবিতা লেখা হয়েছে, সেসব ছন্দই চর্চা হচ্ছে এখনো। মৃতভাষা সংস্কৃত’র ছন্দ নিয়ে বাহাদুরি করছেন তারা। তোটক, পয়ার, অমিত্রাক্ষর, আর যা যা নাম আছে একাডেমিক ছন্দের—সবই তো পুরনো। আমাদের সময়ে যারা ছন্দে লিখছেন, তারা কিসের ভিত্তিতে তাদের কবিতাকে বিশেষ দাবি করেন? আমি তো পাঠক হিশাবে এ সময়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে পড়তে চাইব না। কবিতা তো সে জায়গায় নেই। নতুন ছন্দ যখন পাচ্ছি না, পাঠক হিশাবে আমি তখন ওই কবির ভাষার কারুকাজে মুগ্ধ হতে চাইব। সেই চাহিদাটুকুও তো খুব একটা পূরণ হচ্ছে না। ছন্দে কি নতুন কবিতা লেখা যায় না? নতুন কবিতা বলতে আমি বুঝি—যে কবিতা পড়ে মনে হবে, আরে এরকম কিছু তো আগে পড়ি নি, আগে ভাবি নি! নতুন কবিতার ক্ষেত্রে অবশ্যই কবির নিজের কাব্যভাষা ও সিনট্যাক্স তৈরির অভিনব স্টাইল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে যদি ছন্দের হারমোনি যোগ হয়, তাহলে তো লা জবাব!

একাডেমিক ছন্দে লিখেও যারা ছন্দের দাস হন নি, বরং ছন্দে থেকেও যাদের কবিতা ছন্দকে হারিয়ে দিয়েছে, তিরিশ-পঁচিশ বছর পরে তারাই পঠিত হচ্ছেন। এদের মধ্যে মাসুদ খান, সুব্রত গোমেজ, ব্রাত্য রাইসু, মজনু শাহ তাদের সময়ে অন্যদের তুলনায় অগ্রগামী। তাদের কবিতার ভাষা ছন্দকে অনুসরণ করে নি। ছন্দ এবং একাডেমিক ভাবনাকে তাদের কবিতা বেশিরভাগ সময় অতিক্রম করে গেছে। উদাহরণ :

ঐ স্তন জেগে উঠেছে চূড়ান্ত—
ডাকো স্তন, হীনম্মন্যদের!

[স্তন কবিতার অংশ বিশেষ/ ব্রাত্য রাইসু]

মজনু শাহর লীলাচূর্ণ এমন এক বই, যে বইয়ে ছন্দ-চিত্রকল্প একাকার। সাম্প্রতিক সময়ে লীলাচূর্ণ বহু তরুণের প্রিয় কবিতার বইয়ের নামে থাকে। একই সঙ্গে ছন্দ আর চিত্রকল্পের সার্থক ব্যবহার আরো অনেকেই করেছেন। সবার নাম নেয়া আমার কর্তব্য নয়। আমার সময় (একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক) বা তার কিছু আগের কবিদের মধ্যে নিজস্ব কাব্যভাষায় ছন্দে দুর্দান্ত কবিতা যারা লিখেছেন, তারা প্রায় প্রত্যেকেই চিত্রকল্পবাদী। মজনু শাহ, ইমতিয়াজ মাহমুদ, আন্দালীব, হাসান রোবায়েতের নাম নেয়া যায়। তারা প্রত্যেকেই চিত্রকল্প সমৃদ্ধ ফ্রি ভার্সে যেমন লিখেছেন, ছন্দেও প্রচুর লিখেছেন। এই তিনজনের ভাষা একেবারেই আলাদা। তারা প্রত্যেকেই ছন্দে কবিতা লিখেছেন নিজস্ব কাব্যভাষায়। একারণেই তারা আলাদা হয়ে উঠেছেন। ছন্দে একটিও কবিতা না লিখে শুধু নিজস্ব বলার ভঙ্গি ও ভাষার কারণে হাসনাত শোয়েব, অনুপম মণ্ডল আর শাহ মাইদুল ইসলাম অন্যদের চেয়ে আলাদা। রোবায়েতের দুটি আলোচিত দীর্ঘ কবিতা (ঘূর্ণ্যমান দেরাজের গান এবং পানাহ্) ছন্দে লেখা। প্রথমটি ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত, অপরটি ৭ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত। কবিতায় ছন্দের যথাযথ প্রয়োগ যেমন আছে, তেমনি দারুণ সব চিত্রকল্পের ব্যবহারও আছে।

১.
চলে গেলে শুধু পাল্টে যায় একই জুতোর ঠিকানা—
পুরনো টেবিল ক্লথে বহুদিন আজন্ম সন্তাপ
ছেঁড়া সুতা কতবার নকল করেছে মনোযোগ—

শহরের ওপাশে যে রঙ তার প্রতিক্রিয়া হলো
কিছুতে মিমিক করবে না হাওয়া। ছাতিম, কেবল
একটি ফুলের গাছ; আপামর মাধবী খুনের।

[‘ঘূর্ণ্যমান দেরাজের গান’ এর অংশ বিশেষ/ হাসান রোবায়েত]

২.
একটি মাছ এসে ক্রন্দসীর নিচে
দেখছে রেণুওড়া পানির আত্মায়
দুপুর ভরা ধু-ধু প্রগল্‌ভতা নিয়ে
পাতারা মনগড়া উড়ছে পরিখায়
তবুও এসো তুমি শুশ্রূষায় ভিজে
পাকছে জলপাই ঊষার আলো লেগে—
আমরা এইভাবে নিহিলিজম ধরে
ভাবছি প্রতিদিন অহেতু নির্বাণ—

[‘পানাহ্‌’ এর অংশ বিশেষ/ হাসান রোবায়েত]

যাদের নাম নিলাম, তারা কেউ ফ্যাসিস্ট নন। কারণ তারা ছন্দবিরোধী নন। এটা একটা লক্ষণীয় বিষয় যে, ছন্দবাগীশরা প্রায় প্রত্যেকে চিত্রকল্পবিরোধী। কিন্তু চিত্রকল্পবাদী কাউকে ছন্দবিরোধী পাওয়া যায় না।


ছন্দ শিখতে কবি হওয়া লাগে না। চিত্রকল্প নির্মাণ শেখা যায় না। সেটার জন্য ভাবনা ও দেখার ক্ষমতা থাকতে হয়।


ইমতিয়াজ মাহমুদ এ সময়ের বেশ জনপ্রিয় একজন কবি। তার আলোচিত এবং জনসমাদৃত কবিতাগুলো কিন্তু একাডেমিক ছন্দে লেখা নয়। জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদের অনেক জনপ্রিয় কবিতা চিত্রকল্প আর ছন্দের সমমেলে লেখা। আল মাহমুদ কখনো বলেছেন, চিত্রকল্পের কবিতা কবিতা নয়? বা ছন্দই কবিতা! একাডেমিক ছন্দের বাইরে গিয়ে বা চিত্রকল্পনির্ভর কবিতা যদি কবিতা না হয়, তাহলে তো জীবনানন্দ, মাসুদ খান, ইমতিয়াজ মাহমুদরা কেউ কবি নয়!

দ্বিতীয় দশকের তিনজন কবির কবিতা পড়া যাক—

১.
তার অন্তিম কালের স্বর; দু’একটি কথা, বুঝিবা আকাশ আশ্রয় করে ধ্বনিত হলো। অগ্নিকে মনে পড়ে। ক্রমে, আঁখিনীর তার শুকিয়ে গিয়েছে। আপন রুধিরস্রোত এমন ভাবে রেখেছে ঢেকে, নিজ হাতে। যেন মেঘগম্ভীর ধ্বনি মধ্যে কেউ অকাতরে নিদ্রা যাচ্ছে। যেন ‘সে আকাশ রুদ্ধ হলে সকলি আকাশ’।

[অহম ও অশ্রুমঞ্জরী ২১/ অনুপম মণ্ডল]

২.
তোমার খিদে পেলে মা, আমি এলাম—আর তুমি বিস্ময়ে
চুরমার হতে হতে আমাকে নিলে

[আমার মা/ শাহ মাইদুল ইসলাম]

৩.
বাবা আমাকে নরকের সাতটি দ্বার এক এক করে দেখিয়ে বললেন—কোনটা ভালো লাগে দেখ। জীবনে কোনো কিছুই তো দেখে-শুনে নিতে পারলি না। এখানে যেন ভুল না করে বসিস। আমি অনেক চিন্তা-ভাবনার পর প্রজাপতির সৌন্দর্যতত্ত্ব দিয়ে বানানো নরকটিকে বেছে নিলাম। বাবা হতাশ হয়ে বলল—নরকেও তোর বিলাসিতা গেল না। আমি কিছু না বলে হাসলাম।

আমি আর কনক একই ঘরে থাকতাম। দুজনেরই শাস্তি হয়েছিল বিগত প্রেমিকাদের স্মৃতি এবং স্বর্গীয় পিতামহের অহংকার। এইসব শাস্তিতে বিষণ্ন আমার চোখে কনক হাত রেখে বলত—প্রিয় মৌমাছিরা জানে, ফুলের গভীরে ছুঁয়ে থাকা ভালোবাসা কিংবা যন্ত্রণার কথা। অতঃপর আমাদের ঈশ্বরের মুখোমুখি করা হলে কনক ঈশ্বরের দিকে হেসে বলল—সদাপ্রভু আপনি কি জানেন পৃথিবীতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া জুতোদের বেদনার কথা?

ইশ্বর উত্তর দিলেন— আমি বস্তুত যেকোনো ঘ্রাণেন্দ্রিয় থেকে দূরে অবস্থান করি।
—তবে নিশ্চয় আপনি জানেন না বন্ধ ঘড়িরা তাদের ডায়েরিতে মৃত্যু বিষয়ক যা লিখেছিল তা।
—আমি বস্তুত সেইসব ঘড়ি হয়ে ডায়েরি লিখেছিলাম।
—সদাপ্রভু ঘড়িদের তবে কে বন্ধ করে দিয়েছিল?
—নক্ষত্রে মুখ হারিয়ে ফেলা শিশুরা।

[মৌমাছি কিংবা ঈশ্বরের জবানবন্দি/ হাসনাত শোয়েব]

তিনটি কবিতার একটিতেও ছন্দের ব্যবহার নেই। কিন্তু কবিতা পাঠকের পাঠ কি তাতে আটকে যাচ্ছে? এই ভাষা, অপূর্ব সিনট্যাক্সকে কি অস্বীকার করা যায়?

কাউকে কাউকে বলতে শুনি, চিত্রকল্প নির্মাণ করা খুব সহজ, কিন্তু তারা লিখেন না। দুটোই খুব হাস্যকর কথা। কেউ ছন্দে লিখবে না ফ্রি ভার্সে লিখবে, সেটা সম্পূর্ণই তার নিজের পছন্দ। কিছু লোক আছেন, কেউ ছন্দে না লিখলেও বলবেন, লিখতে জানে না। আবার লিখলে বলবেন, তাদের সময়ে অন্য কারো ছন্দ নিয়ে লেখা বা কথা বলার কিছু নেই! ব্যাপারটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এবং হাস্যকর। যারা বলেন, চিত্রকল্পে লেখা খুব সহজ, তারা নিজের কবিতায় ছন্দের সঙ্গে চিত্রকল্প ব্যবহার করেন না কেন? সেটাই ভাবি! ছন্দ আর চিত্রকল্পের সার্থক ব্যবহার করতে পারেন বড় কবি। গুরু বা একাডেমিক্যালি কারো কাছ থেকে ছন্দ শেখা যায়। ছন্দ শিখতে কবি হওয়া লাগে না। চিত্রকল্প নির্মাণ শেখা যায় না। সেটার জন্য ভাবনা ও দেখার ক্ষমতা থাকতে হয়। সেই ক্ষমতা সবার থাকে না। কবি আর শিল্পীর থাকে। তাই বলি, ছন্দ এবং চিত্রকল্পের বিরোধ নিয়ে যেসব প্রচারণা, তার পুরোটাই চাতুর্য এবং অক্ষম আস্ফালন।

রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়

Latest posts by রুহুল মাহফুজ জয় (see all)