হোম গদ্য অন্ধকারে সাঁতার কাটে নিঃসঙ্গ সোনার হরিণ

অন্ধকারে সাঁতার কাটে নিঃসঙ্গ সোনার হরিণ

অন্ধকারে সাঁতার কাটে নিঃসঙ্গ সোনার হরিণ
264
0

এত এত দিস্তা ছাপা কাগজের পুস্তক, এত যে বৃক্ষনিধনের আয়োজন—এর জন্য কী মূল্যবোধের ডিসকোর্স? মূলা থেকে মূল্যের কী বোধ তৈরি হয় বলো! যে দেশে মূল্যবোধের বোতল থাকে হাতের মুঠোয় বন্দি, সেখানে মদেরও দোকান থাকে! মানুষ সেখানে যায়। দ্রুতগতিতে যায়, আর ফিরেও আসে দ্রুতই। কিন্তু তারা পান করে ধীরে, মন্থরগতিতে। এইসব ঘটনা কত স্বাভাবিক হয়ে গেছে মানুষের কাছে! মানুষ কি মদ নয়? আমি কি মদ নই? তুমিও কি মদ নও? আমার প্রেমিকা কি মদ নয়? মদের ভুবনে কে গো ধ্রুবতারা হয়?

এই শহরের একমাত্র মদের দোকান
রাত অব্দি খোলা থাকে
শহরের সকল রাস্তা দিগ্বিদিক ছুটে গেছে
শুধুমাত্র এই রসাত্মক দোকানের দিকে…
মদের দোকানে যাচ্ছি এই ভাবনাটাই
মনের ভেতর বিপুল আনন্দ ঢেলে দেয়
(মদের দোকান / নাভিল মানদার)

তখন হাসতে হাসতে আমার মনে পড়ছিল সেই যুবকটির কথা, যে মূত্রাগারে ঢুকে সোসাইটির চকমকে মানবতাবাদী মুখগুলো মনে করে মুখসকলকে সারিবদ্ধ করে ‘ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ’ ভাবতে ভাবতে অবিকল্প মূত্রপাত করতে থাকে

২.
একসময় প্রায় প্রতিদিন যে চায়ের দোকানে চা খেতাম, সেই শহিদুল ভাইয়ের ধারণা জন্মেছিল : আমরা কবি। তার এমন ধারণা তৈরির কারণ হলো, আমরা আড্ডা দিলে শিল্প-সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি-সংস্কৃতি নিয়েই বেশি কথা বলি; বই পড়ি, কাব্যপাঠ করি, লেখালিখি করি। উনি এই ধারণা থেকে আমাদের খুব ভালোবাসতেন; কখনো বিনে পয়সায় চা খাওয়াতেন; কবিতাও শুনতেন।

আমাদের কপাল ভালো, শহিদুল ভাই আর্তুর র‌্যাঁবোকে জানতেন না। [এখানে একটি অট্টহাসি]

আমার এক চিকিৎসক বন্ধু ঘোষণা দিলেন, কবিতা হলো ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতন—অর্ধেক বোঝা যায়, বাকিটা তথ্যসূত্র ধরে বুঝে নিতে হয় দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়। যেহেতু স্বাভাবিক বেঁচে থাকার জন্য ঔষধ ও কবিতা উভয়ই কোনো না কোনো মাত্রায় প্রয়োজনীয়; শেষপর্যন্ত সারমর্ম দাঁড়াল, কবিতাও এক ধরনের চিকিৎসা পরামর্শ।
(কবিতা প্রেসক্রিপশন / ভাগ্যধন বড়ুয়া)

৩.
শিল্পকলায় যদি শিল্প না থাকে তবে থাকবে শুধুই কলা। প্রতিষ্ঠানের হুইলচেয়ারে বসে একাডেম তখন কলা ছেলাবেন আর খাবেন, ছেলাবেন আর খাবেন; সেইসাথে ছালগুলো পথে ছুঁড়ে দেবেন; যাতে করে আপনি/আমি কেউ কেউ তাতে আছাড় খেয়ে দাঁতমুখ ভাঙতে পারি।

দেয়ালের ক্যানভাসে তুলির ভাষায় আঁকা রঙের চিত্রন—শিল্প !
দেয়ালের ক্যানভাসে ছোঁড়া, কাদার চিত্রল কথকতা—প্রতিশিল্প !
ভদ্রতার কাদামাখা লোকটাকে দেখে, কে কাকে ছুঁড়ছো কাদা?
দেয়ালের ক্যানভাসে, রঙ ও তুলির চিত্রিত সময়ে ছুঁড়ে মারলাম,
কাদার চিত্রল কথকতা, …
মেয়েটি, ছেলেটিকে ছুঁড়ে মারলো, একমুঠো ভোরের শিউলি,…
(শিল্প, প্রতিশিল্প / আরণ্যক টিটো)

৪.
এইম ইন লাইফ বিষয়ে কথা বলার সময় ছাত্রটি যখন বলছিল আমি ডাক্তার হতে চাই মানুষের সেবা করার জন্য, আর্ত-মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার জন্য, তখন হাসতে হাসতে আমার মনে পড়ছিল সেই যুবকটির কথা, যে মূত্রাগারে ঢুকে সোসাইটির চকমকে মানবতাবাদী মুখগুলো মনে করে মুখসকলকে সারিবদ্ধ করে ‘ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ’ ভাবতে ভাবতে অবিকল্প মূত্রপাত করতে থাকে।

পৃথিবীর যেদিকে যেতে চাও যেতে পারো
হতে পারো নীলাভ পানশালার ঝলমলে পেয়ালা
কিংবা শুধুই পানীয়; কেননা
তোমার সুস্বাদু মাংসের লোভ আমার নেই..
পশ্চিমে আন্দোলিত হৃৎপিণ্ডের ঊর্ধ্বাংশ
আর আমায় কাঁপায় না; কারণ
শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়েও
পাজামার ব্যাপক গিঁট খোলা অনেক বেশি সহজ
(শ্রীমতি শোচনিয়া ব্যাধি / রাশেদুন্নবী সবুজ)

৫.
আঁধারের মাঝে অন্ধের মতো তাকাই যেদিকে, কী যেন এক অস্পর্শ শরীরের মতো অনুভূত হয়, কম্পমান ও নরম। তখন আগুনের বাক্স থেকে আলো বের করি সন্তর্পণে। সীমাহীন আলো ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিক। রাশি রাশি সন্ধ্যাতারার মতো উজ্জ্বল আলো। এ ঘটনা প্রতিদিনের, নিয়মতান্ত্রিক। এটি আসলে মধ্যরাতে যখন বাড়ি ফেরার পথজুড়ে শুধু কুকুর ছাড়া আর কারো দেখা পাওয়া যায় না তখন কুকুর প্রতিরোধে আলো বের করার মাধ্যমে সেভ দাইসেল্ফের গল্প। যখন সামান্য আলোর ফোটাকেই সূর্যালোকের মতো মনে হয়, সেইরকম অন্ধকারে সাঁতার কাটে একাকী সোনার হরিণ।

ফলে যা যা হয় : আমরা একই আকাশের ভেতর শুয়ে পড়ি, পা টানি এবং গান গাই; এমন মানবজমিন রইল… এটুকুতে এসে আমরা পৃথিবীর আরো কার্নিশে এসে পড়ি এবং স্ব স্ব খেলনা হরিণ অভ্যস্ত অন্ধকারের চোখে ছুঁড়ে মারি। অন্ধকার দৃষ্টি পায়। অন্ধকার গতি পায়। অন্ধকার ছুটে যায় নৈঋতে মেঘ রেখে এবং আকাশ হেলে পড়ে।
(খেলনা হরিণ / রাজীব দত্ত)

৬.
অনন্ত রাত্রির কথা ভেবে ঘুমাই নি যেহেতু, তাই ঠিক সময়মতো সকাল হতে দেখে আমার ভালো লাগল। কিন্তু বিছানা ছাড়ার আগমুহূর্তে মনে হলো, রোদটা এতো তীব্র হচ্ছে কেন? কবিতার রোদের মতো একটু নরম কিংবা মিষ্টি হলে কী এমন ক্ষতি হতো শুনি? অন্তত আর কিছুক্ষণ ঘুমভোগ করা যেত; তা আর হলো না। একটা অভিমানী উড়োজাহাজ সাঁই করে চলে গেল; রেখা দেখে ডাকলাম, শুনল না; কফির ধোঁয়া মিশে গেল মেঘপুঞ্জের সাথে।

হে ডেনভার, তোমার উড়োজাহাজ ধার দিবে কি? একটু উড়ব বলে। কবরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে পড়ে নেব সমাধিফলক। পকেটে আছে বন্ধ ঘড়ি। চাবি হারিয়ে ফেলেছি। ফিরিয়ে নিও মাউথ-অর্গান ও ঘৃতকুমারীর ব্লু স্কার্ফ। সেও উড়তে চাইবে। উড়তে পারো, পকেটে বন্ধ ঘড়ি রেখ শুধু।
(ক্ষত ২০ / হাসনাত শোয়েব)