হোম গদ্য অনুপমের কবিতা : অবাক-সংবেদন

অনুপমের কবিতা : অবাক-সংবেদন

অনুপমের কবিতা : অবাক-সংবেদন
582
0

বাংলা কবিতায় বিশেষ একটি প্রবণতা জেঁকে বসছে দিন দিন, অ্যাবসার্ড ও অ্যাবস্ট্রাক্টের যূথতায়। এই অ্যাবসার্ডকে উদ্ভট না বলে বরং অদ্ভুত নামে ডাকা যাক। তেমনি অ্যাবস্ট্রাকশনকে বিমূর্ততার বদলে বিচূর্ণতা। এ দুয়ের সংশ্লেষে যা দাঁড়ালো, এক কথায় তাকে আর প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেই এবার কিছু কথার পাঁয়তারা।

বহুযুগ ধরে সাহিত্যে আমাদের ‘দেখা’টাকে তুলে ধরা হয়েছে দর্পণের আলেখ্য হিশেবে। দর্পণে যা বিম্বিত হয়, তা যে কেবল উল্টো তাই নয়, তাতে আকার ও রঙের নানা প্রসরণ-বিসরণও ঘটে। তাই তাকে আমরা আর বিম্ব বলি না, বলি প্রতিবিম্ব। যে কারণেই হোক, আজ সেই দর্পণ চূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে ঐ দর্পণচূর্ণে বিম্বিত বিশ্বই এখন মেলে ধরছে আমাদের দেখার জগৎ—এক নতুন বিন্যাসে।

‘চেতনা’ বলে যে একটি বিষয়কে আমরা সমগ্র বা অখণ্ডরূপে কল্পনা করি, তা কি মনিটরে দুলে ওঠা সেই চলমান ছবিটির মতো নয়—যা অসংখ্য আলোকবিন্দুর সমাবেশ মাত্র? সেইসব বিন্দু যখন আজ বিশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছে, তাকে যেন আমরা ঠিক চিনতে পারছি না। অথচ, মানুষ ক্রমেই আরও সূক্ষ্মতারই প্রয়াসী।

সূক্ষ্মতর সেই বিন্দু-অভিসারী কবিমন যে সব নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে, তা প্রকাশের জন্য সম্ভবত আরও নবীন এবং অপরিচিত ভাষার দাবি প্রবল হয়ে উঠছে। কবি তার আত্মচৈতন্যের অনুকূলে যে একটি ভাষা অনুসন্ধান করছেন, সেই ভাষাটি একান্তই সংবেদনের বার্তাবাহী। অর্থের ভার কিছুমাত্র নেই তাতে। তাই এই কবিতাকে, কবির এই ভাষাকে বলতে চাই অবাক-সংবেদন।

অনুপম মণ্ডলের কবিতা সেই অবাক-সংবেদনের ভাষায় রচিত। যেন একে সে এনেছে ‘গানের জরায়ু ছিঁড়ে’। তাই একটি অস্ফুট মিউজিক্যাল আউটলাইন তার কবিতাকে বেঁধে রাখে। এবং কবিতায় বেঁধে রাখে পাঠককেও।


অনুপম মণ্ডলের কবিতা

ডাকিনীলোক থেকে


একটা তুলোর বল নিয়ে

খেলছে কেউ

লালচে-বেগুনি

সন্ধ্যায়

ঝরনার খোপ

ঢালু প্লাটফর্ম

অথবা নির্জন পার্কের বেঞ্চি

যেইখানে আসলে লেখা থাকে

কোনো ডাইনি শিকারির

টুকরো বিষাদ

নিভে যাওয়া বাতি

শুভ্র অন্ধকার এসে দোল খায়

সেইখানে

ডুবুরির পোশাকের মতোই ঝরে পড়ে

জলপাই

দমকলের শব্দ

 

***

কেনবা অসমাপ্ত ব্যথাটুকু বয়ে চলে বিহ্বল ফলরাশি। ওই নক্ষত্রের স্ফীতমান কোনো অস্থিরতা, তারা  বুঝে নিতে চায়। তৃষ্ণার উপকূলে এসে, দেখি থামে সেই দাঁড়। থেমে যায়, অস্ফুট ধ্বনির দিকে কোনো অস্তরাগ।

কত বিগ্রহ, বিমিশ্র লহরী খুঁড়ে উন্মাদের অবয়ব আমরা চিনে নিই।

কত অপাঠ্য গুঞ্জন রাত্রির বাগানে। সুরভির স্তনভার, ভাসে আয়ত ভুজে।

বুঝি নি যদিও, দিনশেষে তারা ছিল ধীর কোনো নৃত্যগুচ্ছ। দাস। অনিদ্রিত ওই কারাগার মুছে যাওয়ার পর, ফুলে ওঠা প্রতিটা লাবণ্যগান্ধার।

 

***

ওই খণ্ড সুর, নিঃসৃত কোনো নৈঃশব্দ্যের বিবমিষা ভেদ করে আছড়ে পড়ছে। সেইখানে, ক্রমবিলীন সমস্ত ধ্বনিপ্রবাহ, একটা মলিন ফলের ভেতর প্রতিসারিত।

হয়তো কোনো কোনো ক্রোধ আজ সন্ত্রস্ত সন্ধ্যার দেশে বিলীয়মান।

কোনো পাপ বাঈজি ঢলের মতো বাঁকহারা।

আমরা তাই ব্যক্তিগত পাথর-হৃদয়ের পাশে রেখে আসি সমস্ত তিরস্কার। অনেক গানের জরায়ু ছিঁড়ে। যারা আজ মৃদু শোভা থেকে যেন জন্ম নেয়া। যারা, নূপুরের হাড়ের মতন তির্যক।

***

সেইখানে, করধৃত উরুর ফাঁকে কারো শীতল নিঃশ্বাস, জিহ্বার অনালোকিত ছায়ায়, নেচে নেচে ওঠে। রূপের ছাল ছাড়িয়ে, জেগে থাকে কোনো নির্ভার লুব্ধতা।

আর, তার ক্রন্দনের ওপর থেকে, ওই আলোকপরিধির দিকে সরে যায় কেউ।

হয়তো গানের ঘুমন্ত চত্বর থেকে, কারা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেয়, তার শান্ত পদক্ষেপ। মৃতের শত শত মৌন আর্তিগুলি ভেসে আসে। বহু ভাঙা কবর খুঁড়ে, ওই সবুজ আপেলটিই কেবল দুলতে খাকে। দুলতে খাকে, অচিহ্নিত কোনো উপকূলে।

***

তারপর, বিস্মৃতির অভিমুখে যেতে যেতে সে দেহ! ছিন্ন সুষমার মতোই ফণা তুলে, দেখে নেয় নক্ষত্রের পরিসর। ওই ঋজু আভায়, দেখে নেয়, চরাচরে গুমরে গুমরে ওঠা কোনো রিক্ত, ব্যর্থ আর্তনাদ।

***

এই প্রণতি; পরিহাস; প্ররোচনা—দিগন্তে ছড়ানো আর অর্ধবৃত্তাকার সে ধাতুর আয়তন; নড়ছে; একা একাই; হয়তো তারার দিকে; অন্ধকারে।

***

আন্দোলিত কোনো তরঙ্গের ঝাপটা পড়ে আছে। এইখানে, তারাদের মাঝে অন্ধকার ভাসমান। নীরক্ত সন্ধ্যার ডালা থেকে মৃদু কোনো প্রভা; পৌঁছাতে চাইছে, ধ্বনিময় কোনো ক্রন্দনের নিকটে।

পিপাসার পরিখায়, জাগ্রত নরখাদকের গুহায়, ধরি তারাই আজ প্রার্থনারত।

অস্তোন্মুখ এক ডালিমের স্বপ্নে গম্ভীর নিস্বন।

রাক্ষস জাতক যেন। ছিন্ন কোনো অক্ষপরিধি থেকে জেগে ওঠে। অথবা, অনালোকিত একটা নাদের কাছে তারা মুছে যেতে চায়।

***

বাদামি এই ঢেউ, নিথর তৃষ্ণা ছেনে নেমে আসে শিলার পাঁজরে। আর, অদেখা সেই বেশ্যাটির শাপ এসে যেন লাগে। তীরে। হালকা হিমের মতোই শান্ত, মূঢ় ওই নাভি। বুঝে নেয়, আধো খসা তার রাগ। অঝোর জবার তরঙ্গ।

আর যে ছোবল, স্বনিত কোনো ডালিমের ওপর হালকা আন্দোলিত। তির্যক তার আভায়, অন্ধ এক ব্যাধের স্তব্ধ শোচনাটুকু শুধু চিনে নেয়া যায়। থেকে থেকে পশুর ওই দ্বিধাহীন গান, কোনো এক সুরহীনতার দিকে, তারা ফিরে যেতে চায়।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব