হোম গদ্য অনন্ত নার্সিশাস ও ভুভুজেলা

অনন্ত নার্সিশাস ও ভুভুজেলা

অনন্ত নার্সিশাস ও ভুভুজেলা
594
0

সারা রাত ধরে শোনা যায় তার শব্দ। আমাদেরই মস্তিষ্কে চেতনায় বেজে চলেছে নিরন্তর সেই নিঃশব্দ করাতকল। এক অপ্রতিরোধ্য ছুতার, আমাদের সম্বিৎ ফিরিয়ে আনে সে। বুঝিয়ে দেয়, সে  আছে। সারাদিনের কাজে, চলাচলে, ওঠাপড়া আর ভাঙাগড়ায়, বোঝা যায় নি তার উপস্থিতি, সম্ভাষণ। তার চিৎকার ও জিগির, আমন্ত্রণ ও আর্তনাদ।

খোলা জানালা দিয়ে দূর অন্ধকার থেকে হাওয়া আসে নদীবাহিত। আসে সারাদিনের খণ্ডিত ছবি, শব্দমালা, গান। যা সারাদিন জড়িয়ে থাকে আমাদের রক্তবাহী শিরাগুলো। ফার্নেসে, স্টক-হাউসে, চিমনিতে। কপিকলে, আনন্দ-পাঠশালায়। ক্রমে রাত বাড়লে দরজাগুলো ছোট হয়ে আসে। নুয়ে পড়ে চিমনিগুলো একে একে, আর ভাঁজ হয়ে আসে লোহার রেলিং সিঁড়ি ব্যালকনি মন্দির-গেট। ন্যূনতম জানালাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। বেত পড়ার সপাং শব্দে কুঁকড়ে ওঠে নর্দমাগুলো, তাদের চামড়া ফেটে বেরিয়ে আসে গলিত ধাতুমল ও তপ্ত জলবাষ্পের তীব্র হুইসিল। ক্রমে ড্যান্সবারে পানশালায় পরিত্যক্ত ট্রামডিপোয় আর কবরখানার ওপরে আকাশে চাঁদ উঠলে সম্বিৎ ফিরে আসে আমাদের, তখন শোনা যায় সেই শব্দ। সারারাত। সেই এক অপ্রতিরোধ্য ছুতার; বেজে চলেছে নিরন্তর তার করাতকল, সমস্ত ঘুমের ওপরেই তার নিষেধাজ্ঞা। সারারাত করাত ও চাবুকের শব্দ, আর বাষ্পীয় হুইসিল।


আমাদের জন্মদিন ও মৃত্যুদিনগুলো নাবিকের দিন ও রাতের মতোই অনুজ্জ্বল, বিশেষত্বহীন।


আমরা চেয়েছিলাম সেই প্রশান্তি যা হ্রদের অতলে, ফলপাত্রে, মহাদ্রুমে, শাঁসের অন্তস্থ বীজের গভীরে, সুগন্ধে, গর্ভকেশরে, ক্যানভাস ও দেওয়ালের মধ্যবর্তী অন্ধকার ফ্রেমে। আমাদের ব্যক্তিগত ব্রডব্যান্ড ও অটুট দূরবীক্ষণ। আমরা যারা সঙ্গহীন একাকী, দলছুট। আমরা যারা নিষেধাজ্ঞা মানি না, যারা জন্ম নিয়ে গর্ব করি নি, কিন্তু চেয়েছি আরও দূরগামী ও বিন্দাস।

এখনও যারা অশালীন থুতু ছুঁড়ছে বোতল ভাঙছে, সারাদিন বাজিয়ে চলেছে তাদের সম্মিলিত ভুভুজেলা। কেননা তাদের ভালো লেগেছিল অশ্লীল ও কর্কশ শব্দ; পতাকার শ্রমে পুরস্কৃত তাদের ছক্কা ও পাঞ্জা।

আমাদের জন্মদিন ও মৃত্যুদিনগুলো নাবিকের দিন ও রাতের মতোই অনুজ্জ্বল, বিশেষত্বহীন। দূরে দূরে লাইটহাউস আর ঢেউ ভেঙে উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠছে ডলফিনগুলো। জল এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে স্টারবোর্ডে।

রক্তের সজ্ঞান ঝাঁজ আর নিরন্তর অসংখ্য প্রশ্নগুলোই আমাদের প্রাইম মুভার। আমরা একে একে খুঁজে নিচ্ছি উত্তর, আর একপ্রান্তে ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনছি প্রশ্নমালা। অনন্ত আলোকবর্ষব্যাপী চিরকালীন অফুরন্ত প্রশ্ন সকল, ওরা যেন হ্যাড্রন কোলাইডার। ওরা যেন ভাসমান বয়াগুলো, আছে তাদের আলোক-নম্বর, দুলে উঠছে জল-কুয়াশায়, ঢেউয়ে।

আমরা সাজিয়েছি আমাদের ঘর-দুয়ার, নিকনো উঠোন। আমাদের রাজপথ আর গদি। দোলনায় রাধাকৃষ্ণ, জারদৌসি কলমকারি। আমাদের বাইসেপস্ আর সিক্স-প্যাক্ অ্যাবস্। আমাদের অশোকচক্র, কাস্তে-হাতুড়ি, পোডিয়াম, আর গ্যালোজ। রক্তের লোহিত কণিকারা। আমরা চেয়েছি রোজউড্ ফ্রেম, মরক্কো-বাঁধাই, আর বেলজিয়াম গ্লাস। জরিপাড়, কার্নিশ। কতভাবে সাজিয়ে বাঁধিয়ে রেখেছি, আর চেয়ে আছি নির্নিমেষ নিজেরই দিকে নার্সিশাস। অপলক চেয়ে আছে সূর্য-চন্দ্র-ধরিত্রী-প্রকৃতি-দেবতামণ্ডলী, আমাদেরই দিকে। আমাদের জলদেবী ও পবন দেবতা, আমাদের প্রতিধ্বনি, অনন্ত নক্ষত্র-নীহারিকা-ছায়াপথ-কোয়াজার-মহাকাশ-অন্ধগহ্বর, দেখছে আমাকেও। আর কোনও কাজ নেই, কোনও মহৎ তত্ত্ব নেই। শুধু হয়ে থাকা। শুধু চেয়ে থাকা অপলক, নির্নিমেষ, নিজেরই ভিতরে। শুধু নিজেরই সাথে অনর্গল কথা বলা।

অলিম্পিয়ার রাজার রাজত্বে পাহাড়-জঙ্গল-নদী-ঝর্নার দেশে জন্ম হয়েছিল বালক নার্সিশাসের। এক নদী-দেবতার সাথে এক নীল জলপরীর প্রেম থেকেই তার জন্ম। ছোটবেলায় এক গণৎকার জানিয়েছিল নীল পরীকে, যে তার সন্তান অনেক বছর বাঁচবে। অন্তত যতদিন না সে চিনতে পারছে নিজেকে, বা দেখছে নিজের মুখ। ক্রমে সে বালক দিনে দিনে বেড়ে উঠল, আর তার রূপ দেখে প্রেমে পড়ল পাহাড়-নদী-অরণ্যের সকল দেবতা ও পরীরা। সেরকমই এক জলপরী যার নাম ইকো (প্রতিধ্বনি), অসম্ভব সুন্দরী ও গরবিনী ছিল সে। কিন্তু তারও ছিল অভিশপ্ত জীবন। দেবতার অভিশাপে সে হারিয়ে ছিল তার নিজের কণ্ঠস্বর। শুধু কোনও চিৎকৃত আওয়াজের শেষ অংশটুকু পারত সে উচ্চারণ করতে। এই মতো তার লিমিটেশান! সেই ইকো একদিন নার্সিশাসকে দেখে প্রেমে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। মাথায় তার নীল পালক, তীক্ষ্ণ নাক। বাঁকা সরু সুঠাম নিষ্পত্র ডালের মতো তার আঙুল। কিন্তু নার্সিশাস, যে বহু পুরুষ ও নারীকে আগেই প্রত্যাখান করেছে, ইকোর প্রতিও ভীষণ নির্দয়। হলো বিচ্ছেদ । সেই থেকে অপমানে মনঃকষ্টে ইকো বহু দূরে দূরে পাহাড়ে উপত্যকায়, একা একা। আর পাহাড়ে জঙ্গলে উদ্ভ্রান্ত একা নার্সিশাসও।

প্রবাহিত জলপ্রপাত, ক্ষীণস্রোতা নদী, সবই গিয়ে মিশেছে যে সাগরে, শোনা যায় তার শঙ্খরব। দূরে দূরে লাইট হাউস আর কোস্টগার্ড। আমরা যারা বেরিয়ে পড়েছি জাহাজ নিয়ে। স্যান্ডহেড-এ নোঙর ফেলেছি, আর অপেক্ষায় আছি পাইলটের। আমরা আছি লঞ্চ-প্যাডে শ্রীহরিকোটায়, বৈকানুরে। কালো ঘোলা পাংশুবর্ণ কর্দমাক্ত আঁশটে জলের স্রোত নেমে আসছে গঙ্গোত্রী থেকে। তারই নীল আত্মা এসে ঝলসে দিচ্ছে সমুদ্র-ফসফরাস। মোহনায় অন্ধকারে আপার-গ্যাস্পারে, বয়া দুলে উঠছে। দুলে উঠছে প্রজাতন্ত্র, শস্যভাণ্ডার, ট্রজান ভাইরাসগুলো।

আমাদের আই.ডি ছিল ‘দুঃসাহস’, আর শুরুতে পাসওয়ার্ড ছিল ‘প্রেম’। কিন্তু ক্রমশ তারা জটিল, কেননা পাসওয়ার্ড পাল্টাতে হয় প্রতিনিয়ত, তার চাই কমপক্ষে আটটি অক্ষর যার মধ্যে অন্তত দুটোকে হতে হবে অব্যবহৃত কোনও বিশেষ চিহ্ন, যেমন পানপাতা, রক্তবমি, অথবা একটি বিষধর সাপ, যা কাল্পনিক। যা কিছু সুন্দর, যেমন কচি তামা-রঙ অশত্থ পাতা, ফাঁকা সূক্ষ্ম স্টেনলেস টিউব, মোটা টার্কোয়াজ শিট-গ্লাস, কদম্ব ফুল, দক্ষিণাবর্ত শাঁখ, প্রাইম নাম্বার্স, বা ফিবনাচ্চি সিরিজ। সেইসব বাক্য যা ক্রিয়াপদ-বর্জিত। সেইসব বিশেষণ যার কোনও সরলার্থ হয় না, যেমন শোকস্তব্ধ ট্যুইটার।


‘কমপ্লেক্সিটিজ অফ প্রস্টিটিউশান’, অথবা ‘পারফিউম অফ কমপ্লেক্সিটিজ’! জটিলতার এই সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে।


একদিন ঘটল সেই অঘটন, গণৎকার যেমন বলেছিল। পাহাড় থেকে নেমে আসা এক স্বচ্ছ জলের স্রোতা যেখানে পাথর-চট্টানের প্রান্তে থেমে স্বচ্ছ স্থির, সেখানে তৃষ্ণার্ত নার্সিশাস। হঠাৎই সে লক্ষ করে জলের ভেতরে তার রঙিন কম্পিত ছায়া। সেই  অপরূপ সুদর্শন যুবককে দেখে তখুনি সে তার প্রেমে পড়ে গেল। সেই থেকে সব কাজ ভুলে সারাদিন শুধু জলেরই দিকে তাকিয়ে থাকা। জল থেকে জলে পাগলের মতো ছুটে বেড়াল সে, ওই বিম্বিত সুন্দরকে পাওয়ার জন্যে। তারপর হতাশায় ক্ষোভে একদিন নিজেই নিজেকে ছুরিকাঘাত করে আত্মহত্যা করল। পাহাড়ের কোলে কোলে, সুঁড়িপথে উপত্যকায়, জলে-ভেজা ঘাস জমিতে তার প্রবাহিত রক্তের স্রোত। ক্রমে শীত শেষে সেই রক্তে ভেজা পাথুরে মাটিতে ফুটে উঠল অনেক শাদা ফুল, যার ভেতরটায় বেগুনি রঙের আভাস। সেই ফুলের নাম নার্সিশাস।

চার্লস বার্নস্টেইন, ভাষাকবিতার গুরু, লিখেছেন তার ব্লগ ২০০৭-এ, ‘কমপ্লেক্সিটিজ অফ প্লেজার, অ্যান্ড প্লেজার অফ কমপ্লেক্সিটিজ’। এখানে প্লেজার শব্দের বদলে ‘কেওস’ (chaos), অথবা ‘সম্পর্ক’ (relationship)-ও বসানো যায়। অথবা বসানো যায় কোনও কিছু যা অদৃশ্য, যেমন পারফিউম। বা কোনও আদিম মহাদেশ, যেমন আফ্রিকা। অথবা কোনও পেশা, যেমন প্রস্টিটিউশান। ‘কমপ্লেক্সিটিজ অফ প্রস্টিটিউশান’, অথবা ‘পারফিউম অফ কমপ্লেক্সিটিজ’! জটিলতার এই সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে। শিল্পে সাহিত্যে জীবনে জটিলতাই তার সৌন্দর্য। কিন্তু তার ব্যঞ্জনা প্রকাশের সারল্য-ই ‘সমমর্মী মানুষের মন মজায়।

সমস্ত ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও অব্যয় শেষ হয়ে গেলে পড়ে থাকে সম্পর্কের শুদ্ধরঙ, আর শুদ্ধস্বর। সরগমের রাগরূপ ও মূর্ছনা। তার স্পর্শ গন্ধ সময়। সেই আদি দ্রুম, যা ডালপালা ছড়িয়ে রাখে চেতনায়, প্রবাহে। যেন সেই নদীর নাম নর্মদা, মন্দাকিনী। নদীর নাম যেন জাম্বেজি, আমাজন। সে যেন উগান্ডা অ্যাঙ্গোলা মোজাম্বিক। যেন সে মাতুঙ্গা-মাহিম-লোনাভালা, গাদিয়াড়া, মন্দারমণি। এই সব ফুল ফোটে প্রতিদিন, ঝরে পড়ে, শুকোয়। তার বীজ পড়ে থাকে চেতনায়, একফোঁটা জল পাবে বলে। পড়ে থাকে পাখির পালকগুলো।

এক ঝাঁক নীল পাখি উড়ে যাচ্ছে। বাগানবাড়ি।
উড়ে যাচ্ছে ফুলওয়ালিরা; তাদের চুলে গলায় উন্মুক্ত কোমরে রাতের বেগুনি আঁচড়।
এত নিচ দিয়ে ছায়া ফেলে উড়ে যাচ্ছে পাখিরা ।
মন্দিরে হাসপাতালে রাইফেল ক্লাবে ফেলে দিচ্ছে ফুলের সাজিগুলো, ফুল;
ওরা ছড়িয়ে পড়ছে দূরে, ময়দান পেরিয়ে পাউরুটি ও মাখন পেরিয়ে
ভোরবেলার প্রথম আগুনের আগে। গত রাতের সমস্ত প্রার্থনা ও গান
ওদের মনে পড়েছে কুয়াশায়। প্রপাতের দিকে ছুটে যাচ্ছে ফুলওয়ালিরা।
বাগানে আবার অতিথিরা ভিড় করে এসেছে।

টেবিলের চারদিকে গোল করে সাজানো চেয়ার, মোম গলে পড়ে আছে টেবিলে
কার্পেটে লিনেনে সারি সারি প্রশ্ন চিহ্ন; কাল সারারাত প্রশ্ন হয়েছিল মোমের আলোয়।
আজ আবার নতুন করে টেবিল সাজাবে স্টুয়ার্ড। নতুন সস্ ও সুগার কিউব।
একটা চোদ্দ তলা বাড়ি। আজ সারাদিন সে কখনো জানালা খুলবে না,
কাল রাতের গান তাকে মূর্ছিত করেছে।
পড়ে রয়েছে ফাঁকা ফ্রুটবোল, উচ্ছিষ্ট কাবাব,
চিঠির বাক্সগুলো ফুলে উঠেছে চিঠিতে, আর সারাদিন
বাথরুমে একটানা জল পড়ার শব্দ।

যা কিছু পতনশীল, তারা নেমে আসে নিচের দিকে তীব্র বেগে। পাইপে জল, আকাশের উল্কা, উড়ন্ত পাখির বিষ্ঠা, গাছের ফল, ড্রেনপাইপে মূত্রস্রোত।

ক্রমে সন্ধ্যা নামে। চোদ্দ তলা বাড়িতে, রাজপথে কাদায় কুয়াশায়। ধীরে আস্তে ক্রমে তীব্র হয়ে, কুকুরীর খিদের মতন, শহর সাজিয়ে দেখছে নিজেকে। ক্রমে গতি বাড়ে। বৈদ্যুতিন পোশাকের নিচে বেলি-বাটন আর হাই-হিল, ন্যাপথালিন, জুঁই-মালা আর ভাজা ডিমের গন্ধ। পায়ে পায়ে পেরিয়ে যাচ্ছে হামদম্ জেব্রা-ক্রসিং, আর গাইছে তারা দমতারা-দমতারা-মস্ত্ মস্ত্ তারা…, আর সহসা বিস্ফোরণে শহরের উন্মুক্ত নাইকুণ্ড কেঁপে উঠছে সন্ধ্যায়। আর্তনাদে রক্তপাতে অপ্রেমে। ক্যানভাসে, সংক্রমণে, শিলহিউটে।


ভেসে যাচ্ছে এক রাতজাগা পাগল, তার হাতে-ধরা-মোমবাতির-শিখা তখনো কম্পমান!


এক মুহূর্ত চমকে থেমে পুনরায় কর্কশ বেজে উঠছে তারা, মান্ডেন ও মনোটনাস, অপদার্থ, আহাম্মক, কাণ্ডজ্ঞানহীন। গ্যালারিতে ফুটপাথে মাঠে অ্যাকাডেমিতে সর্বত্র বাজছে তারা, তাদের কুযুক্তি ও কোঁদল। তাদের খোলামকুচির জয়গান, বিকারগ্রস্ত ভেঁপুর সিমপ্লিসিটি অফ প্লেজার।

একা পাগল জলের ধারে বসে কাগজ পড়ছে। পড়ে নিচ্ছে জলে নামার আগে গত রাতের হত্যাগুলো। সহসা সে-ই ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রচণ্ড ঘূর্ণিজলে। কুয়াশায় ফেনায় তাকে মনে হচ্ছে যেন সদ্যপ্রসূত। আর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে কাগজের নৌকোয়।

কোথাও কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই, তাই নৌকো ভেসে যাচ্ছে। হাল ও মাস্তুলহীন নিউজপ্রিন্ট। পাড় ভাঙছে, আর ভেসে যাচ্ছে চিরহরিৎ বনের সর্বস্ব। দিগন্তে রামধনুর দিকেই প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে চিতার কাঠ আর জবাই করা রক্তাক্ত খাসির মুণ্ডগুলো। ফেনিল জলে ভেসে যাচ্ছে টাইপরাইটার, ফ্যাক্স মেশিন। টিম্বার আর রড-আয়রনের রেলিং। কয়েকটা উদবিড়াল। ভেসে যাচ্ছে সলমা-জরি-পাটকাঠি-গর্জনতেল-ত্রিশূল ও শোলার মুকুট। ফাঁকা ফ্রুটবোল, উচ্ছিষ্ট কাবাব।

ভেসে যাচ্ছে বর্ষাতি-পরা শিশুরা, তাদের হাতে ধরা কদমফুল। কয়েকটা চিঠি-ভর্তি লেটারবক্স। কয়েকটা পুতুলের গায়ে লেখা HIV-স্টিকার। ভেসে যাচ্ছে ব্যবহৃত কনডোমগুলো, ছাড়ানো মহিষের চামড়া, পেন্ডুলাম ঘড়ি, একটা বেজে-যাওয়া স্যাক্সোফোন। ভেসে যাচ্ছে কার পরচুলা ও পৈতে, ভাঙা বেহালার কাঠ আর শরীরী কবিতার আধপোড়া জ্বলন্ত পাণ্ডুলিপি।

ভেসে যাচ্ছে প্রবল ঢেউয়ের ওপরে সেই কাগুজে নৌকো। ভেসে যাচ্ছে এক রাতজাগা পাগল, তার হাতে-ধরা-মোমবাতির-শিখা তখনো কম্পমান! ক্রমে তারা ভেসে যাচ্ছে বহুদূরে, ট্রলি-ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের রেঞ্জের বাইরে। জলে ভেসে যাচ্ছে কাদামাখা একরাশ শাদা নার্সিশাস ফুল, আর পড়ন্ত আলোর ক্রিমসন বলগুলো ।

সহসা অন্ধকার নেমে আসছে, আর চাঁদ উঠলে চাবুকের তীব্র সপাং শব্দে সম্বিৎ ফিরে আসছে আমাদের।

এই সেই আদিম গন্ডোয়ানা ল্যান্ড; তার লাভাস্রোত, জলোচ্ছ্বাস ও গর্জ। অনন্ত নার্সিশাস, ও অবিরাম ভুভুজেলা।

শংকর লাহিড়ী

জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫০, জামশেদপুর। তৎকালীন বিহার, এখন ঝাড়খন্ড।

শিক্ষা : শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়, কলকাতা। রিজিওনাল এঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, দুর্গাপুর।

পেশা : পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। জামশেদপুরে টাটা স্টীল ইস্পাতপ্রকল্পে ৩৭-বছর কর্মজীবনের শেষে অবসরজীবনে এখন কলকাতায়।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
শরীরী কবিতা (১৯৯০, কৌরব প্রকাশনী)
মুখার্জী কুসুম (১৯৯৪, কৌরব)
উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ (১৯৯৬, কৌরব)
বন্ধু রুমাল (২০০৪, কৌরব)
কালো কেটলি (নির্বাচিত কবিতা, ২০১২, ৯’য়া দশক প্রকাশনী)
সমুদ্রপৃষ্ঠাগুলো (কবিতাসমগ্র, ২০১৪, কৌরব)

গদ্য—
মোটরহোম (২০০৩, কৌরব)
কোরাল আলোর সিল্যুয়েট (নির্বাচিত গদ্য, ২০১২, কৌরব)

তথ্যচিত্র (রচনা, প্রযোজনা ও পরিচালনা) :

১. ‘রাখা হয়েছে কমলালেবু’
–কবি স্বদেশ সেনের সময়, জীবন ও কাব্যভাবনা নিয়ে ২০১৫ সালে নির্মিত ১২৭ মিনিটের তথ্যচিত্র।

২. দ্বিতীয় ছবি ‘উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ’। কবিতাকে আশ্রয় করে, কবিদের নিয়ে, কবিদের জন্য ২০১৬ সালে নির্মিত ১৩২ মিনিটের তথ্যচিত্র। এতে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলা ভাষার নয়জন নবীন ও প্রবীণ কবি, যাঁদের মধ্যে আছেন কবি মণীন্দ্র গুপ্ত, সমীর রায়চৌধুরী ও আলোক সরকার।

ই-মেইল : slahiri4u@gmail.com