হোম গদ্য অধুনান্তিক কবিতার ভাষা : কিশোরবেলা—শিখছি আমার ভাষা-১

অধুনান্তিক কবিতার ভাষা : কিশোরবেলা—শিখছি আমার ভাষা-১

অধুনান্তিক কবিতার ভাষা : কিশোরবেলা—শিখছি আমার ভাষা-১
1.12K
0

সতর্কতা : মৌলিক নয়—এটি একটি হাইব্রিড গদ্য

 

ছন্দ

ছন্দ ছিল সেই প্রাচীন ডাইনোসোরদের জন্য
সেই জুরাসিক যুগে উল্কাপাতে হয়েছে ছন্দের মরণ,
এখন ছন্দের ফসিল তুলে এনে আধুনিক
গদ্যের দুনিয়ায় রজীমাদের মতো ছন্দে লেখা যায়?

সত্য হতে পারে, এখন পরাবাস্তব কোয়ার্কের কাল
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নিয়ে বিভ্রান্ত সবাই,
তবে হৃদয়ের লাব-ডাব কিন্তু ছন্দেরই কথা বলে
ছন্দ না জেনে কবিতা ও ধারাপাত বেজায় কঠিন।

ছন্দ ছাড়া অন্ধ অচল, টুংটাং সিঁড়িঘর জীবনের জিন
পথ সব তৈরি হয় হাঁটি হাঁটি পা পা দ্রিম দ্রিম পেড়িয়ে,
আর তাই ক্লাসিক্যাল শব্দনৃত্যবিহীন সৃষ্টিকে বুঝি না
ই ইক্যুয়াল টু এম সি স্কোয়ার গদ্যময় ছন্দের কারুকাজ।

ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ,
পোস্টমডার্ন শব্দ শুনি, খা খা খা, বক্ষিলারে খা।

মঈন চৌধুরী

নব্য আর্যভট্ট

অই যে খোদার খাসির মতো ছুটে আসছেন নব্য আর্যভট্ট
পোঁদ মেরে দেবেন কবিতার। ১৭ রিম কাগজ কেটেকুটে
মহাভারত মৃগয়ার মা-বোন করে বলে দেবেন—ছন্দই কবিতা
বাকিটা লঙ্কা-পেঁয়াজ। রেঁধেছ ভালো; নুনও পরিমাণ
একমাত্র ভুল—পুলিশফাঁড়িতে শবপোড়ায় কুয়াশা ছত্রছান
পথও বাতলে দেবেন মহাত্মা—এই নাও পৌরাণিক ছন্দবিজ্ঞান
এই সেই সুরলহরি যাতে একছাঁচে নাচে হরিণ ও শার্দুল
বলি, আর্যভট্টে এইবার গোটাও তোমার ব্যর্থ হারমোনিয়াম
বন্ধ করো মিথ্যে হালুম। আজ জীবন বললে বোকা দড়াবাজ
বাঘ বলতে কেবলই সার্কাস। মৃত্যুকূপে ছোটাব সাইকেল
________________________ঘুরে আসব দুধের খাঁজ …

—মাজুল হাসান

 

If one writes in free verse–and one should–to subvert Western civilization, surely one should write in forms to save oneself from Western civilization.

Agha Shahid Ali (Agha Shahid Ali was born in Kashmir, and moved to the United States at the age of twenty-five.)

 

[Poetic tourism and deforming form- by Andy Jackson]


অমন বিদ্যুচ্চমকে তো ডিকশান, বাগধারা, ছবি আর আঙ্গিক বেয়েই পৌঁছোতে হবে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কবিতায়, পরম্পরাগতভাবে আঙ্গিকই ছিল পাঠবস্তুর জি-স্পট


ইন্সটিংক্টের উপর কবিতা লেখা :

তবে কি ইন্সটিংক্টের উপর লেখা হচ্ছে সমসাময়িক কবিতা? শ্রদ্ধেয় কবি মলয় রায় চৌধুরী যাকে বলতে চান ‘জ্ঞানচৌতিশা’। জ্ঞানচৌতিশা শব্দটির উদ্ভাবক ষোলো শতকের ভাবুক মীর সৈয়দ সুলতান। হয়তো তিনি উদ্ভাবক নন, তাঁর সময়ে শব্দটির প্রচলন ছিল। তবে, তাঁর পুঁথিতে শব্দটি ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। শব্দটির চৌ্হদ্দিতে তিনি ফিলজফি, থটপ্রসেস, আইডিয়া, স্টেট অব মাইন্ড, প্রবলেম্যাটিক, ফেনমেনলজি, ইনটেলিজেন্স, এথিক্স, উইজডম, যুধিষ্ঠির-কথিত ধর্ম ইত্যাদির সমন্বয়ে গড়ে-ওঠা ব্যক্তি-মনের কথা বলেছেন। চৌতিশা শব্দটির তৎকালীন অর্থ সম্ভবত ছিল চিন্তার ছন্দ। ইংরেজরা যে ভাষাভাবনা আমাদের বিদ্যায়তনিক শিক্ষাজগতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, ছন্দ বলতেই আজকাল শব্দ ও বাক্যের কথা এসে পড়ে। মীর সৈয়দ সুলতানের কালখন্ডে চিন্তার ছন্দ সম্ভব ছিল। নদীর ঢেউয়ে যে ছন্দ তা প্রাকৃতিক, মানুষের জৈব ছন্দ? প্রকৃতি ও জীবনের শৈলী কোড কি ?

সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যের প্রভুদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভাষার কারখানায় অধুনান্তিক কবি সর্বহারা। পুরানো বিষয় এবং তাদের চাকর-মনিব আচরণ আর প্রযোজ্য নয়, পুরানো দক্ষতা কেবল দাসসুলভ নকল, বাকপটুতাপূর্ণ ও জাল, যার অনুসরণ সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদিতা। শব্দের লীলায় মেতে উঠে তাই অধুনান্তিক কবিতা । সামাজিক প্রতিষ্ঠান কবিতার সংজ্ঞা নিরূপণ করতে চায়, কিম্বা সে এমন কবিতা চায় যার সংজ্ঞা নিরূপিত করা আছে। কিন্তু কবিতা কোনো জ্ঞানগর্ভ কিছু নয়, এর কোনো নৈতিক মাপকাঠি নেই। যা দেখেছি তা’ লেখার জন্যে কবিতা লেখা হয় না। কি আছে তা বলার জন্য নয়, কি নেই তা বলার জন্য রিস্কডমে দাঁড়িয়ে লেখা হয় কবিতা। কবিতা রচয়িতাদের কোনো ক্যাননকে আর মান্যতা দেবার দরকার পড়ে না। মোটামুটিভাবে কবিতার মান পরিমাপের একটি ভাসাভাসা সাবকালচার গড়ে উঠেছে আশির দশক থেকে যা বিদ্যায়তনিক ক্যাননকেন্দ্রিক নয়। কবিতার মান পরিমাপের একটিমাত্র মাপকাঠি আর নেই, যে মাপকাঠিগুলো আছে তাও মনে হয় বাতাসের তৈরি। অস্বীকার করা যাবে না যে বহু কবির ক্ষেত্রে কবিতা বেশ এনিগম্যাটিক পাঠবস্তুতে রূপান্তরিত। প্রশ্ন হল মর্মার্থের ক্ষণিক বিদ্যুচ্চমকে পৌঁছোবার ট্রিগারটি কী বা কী-কী। অমন বিদ্যুচ্চমকে তো ডিকশান, বাগধারা, ছবি আর আঙ্গিক বেয়েই পৌঁছোতে হবে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কবিতায়, পরম্পরাগতভাবে আঙ্গিকই ছিল পাঠবস্তুর জি-স্পট।

আঙ্গিক আর সারবস্তুর মাঝে জটিল খেলায় আর পাওয়া যাবে না কোনো পাঠবস্তুর কবিতা হয়ে ওঠার সূত্র; তা কারোর কারোর কবিতায় কাজ করেছে আশির দশকের আগে পর্যন্ত। অবশ্য আশির দশকেও কেউ-কেউ কবিতাকে চরিতার্থ করে তোলার শৈলী হিসেবে উপাদান দুটির উদ্ভাবনী-বৈশিষ্ট্যকে স্বকার্যে লাগিয়েছেন। সেগুলো ম্যানসার্ড পঙ্ক্তি দিয়ে গড়া হয়েছে, ঠিক যেমন ম্যানসার্ড ছাদে ওঠার জন্য নিচের সিঁড়িগুলো দুরারোহ হয়। কবিতা রচিত হচ্ছে আভাসিক ছন্দের মাধ্যমে, বা গদ্যে, কবির বাচনিক প্যাটার্নিং, ধ্বনিসাদৃশ্য, বাকচাঞ্চল্য, অনুপ্রাস, কিংবা বারংবার একটি শব্দ বা তার সঙ্গে ধ্বনিগত মিল আছে এমন শব্দ ব্যবহার করে। এইভাবে কবিতা রচিত হলে তা সামাজিক ‘কন্সট্রাক্ট’ হয়ে দেখা দেয়, মনগড়া ব্যক্তিক কন্সট্রাক্টরূপে নয়। আভাসিক ছন্দে থাকছে সন্মোহনী সংবেদনের বৈশিষ্ট্য। কবিরা ধ্বনিব্যঞ্জনা, আঙ্গিক, ছবিগঠন আর ডিকশানের নিজস্বকৌশলে মন দেয়া আরম্ভ করেছিলেন নব্বুই দশকের আগেই, তার কারণ অপসৃয়মান আত্মার বোধকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা উদ্দেশে টেকনিক ও ডিভাইসের অপ্রচলিত বিস্তারের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলেন প্রায় সকলেই।

পরিবর্তনের পটভূমিকায় নব্বইয়ের এই প্রবণতা কবিতার স্বাভাবিক বিবর্তন থেকে কিছুটা সরে আসে। নন্দনের ব্যাপক ইলিউশন হাজির হয় কবিতায়। মূলত নব্বইয়ের পর থেকে বাংলা কবিতার প্যাটার্ন বদলে যেতে থাকে খুব দ্রুত। প্রথম দশকে প্রত্যাশিত পরিবর্তনের আবহাওয়া দৃশ্যমান হলে, বিমূর্ততার জমাট বরফের চাঁই গলতে শুরু করে, ধীরে ধীরে তা পাঠকদের ভেতরেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। কবিতা উপস্থাপনের নতুন অলিগলিতে স্নিগ্ধতা বিরাজ করতে থাকে। এই স্নিগ্ধতার ভেতর দিয়েই কাব্যবাগানে ঢুকে পড়ে ২য় দশক। বৈশ্বিক জটিলতা তথা বিশ্বসভ্যতায় সম্পর্কের টানাপোড়েনের চিত্র অঙ্কন করতে করতে ১ম দশকের শেষের দিক থেকে ২য় দশকের কবিদের ভেতর নির্মাণের যে মধু জড়ো হতে থাকে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

সমকালীন কবিতা হয়ে উঠেছে বহুরৈখিক ও বহুবর্ণিল। কেবল বৃন্তচ্যূত কুঁড়ির পতনোন্মুখ প্রবণতাই কবিতার মৌল প্রেরণা কিংবা বৈশিষ্ট্য নয়। শুধু বিচ্যুতি ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ও ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার বিকৃতি সমকালীন কবির মানস গঠনে ভূমিকা পালন করেনি; সঙ্গে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের প্রভাব এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক অনুষঙ্গও ভূমিকা পালন করেছে। সমকালীন কবিতা ভূঁইপোড় কিংবা বায়বীয় কোন বিষয় নয় যে, এ বস্তু প্রথম দর্শনেই পাঠককে সহসা সচকিত করে তুলবে।


অধুনান্তিকদের মতে, প্রতিটি মার্জিত উচ্চারণই কবিতা। কবি একটি বিশেষ ভাষা ও কাঠামো ব্যবহার করে তার মনের সাথে কথা বলেন। এ কথাগুলো তার একান্তই নিজস্ব


বাংলা কবিতার শরীর ইউরোপের বটানিকাল রোমান্টিসিজমের প্রভাবে রাক্ষসসুলভ মায়াবী লিরিসিজমের ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল দীর্ঘ সময়,  অধুনান্তিক কবির পক্ষে তাই নিখুঁত ছন্দে কবিতা লেখা সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। কবিতার লাইনগুলোয় থাকছে ব্যাখ্যার গোপন পরম্পরাপন্নতা, আঙ্গিককে মুক্ত করে ফেলার প্রয়াস। অবস্থাপন্ন ছবি আর প্রতিদিনের বাগধারা প্রয়োগ করে কবি গড়ে তুলছেন নিজস্ব প্যাস্টোরাল পরাবাস্তব জগত।। ব্যাকরণ ভাঙার জটিল মারপ্যাঁচের নয়, বরং তা উপলব্ধির প্রতিদানমূলক কাঠামো, যেটা নিজেই নিজেকে পরতে-পরতে মেলে ধরতে চাইছে । প্রতিটি কবিতায় কবিকে নতুনভাবে বাস্তবজগতে প্রবেশ করতে হচ্ছে; ধ্বনি আর অনুভূতির নবীকরণ করতে হচ্ছে। চলছে শৈলী আর ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা এবং বিভিন্ন মাত্রার আঙ্গিকে ব্যক্তি অনুভূতির জটিল ও দুর্বোধ্য প্রবণতাকে ভাষার মানচিত্রে শব্দের গাঁথুনিতে অঙ্কিত করা ; কবিতাগুলোকে ভেঙে ফেললে পাওয়া যাবে – একাকীত্বের, নিঃসঙ্গতার, বিশ্বাসঘাতকতার, মৃত্যুবোধের অপরিমেয় যন্ত্রণার, বিচ্ছিন্নতাবোধ, সংযোগচ্যুতি, ছিন্নসম্পর্ক, স্বাতন্ত্র্য, পৃথগন্ন ব্যক্তিএকক এর মতো নতুন নতুন  ট্রমা এবং উপমা থেকে যাপনের দৃশ্যবিস্তার, ভিন্নধর্মী ভাব, ভাষা, অলংকরণ ও শব্দের সুনিপুন সন্নিবেশ ও বিচিত্র উপস্থাপনের নানা স্থানিক প্রয়াস। কবিতায় গতি এবং শব্দের পরিমিতি বোধ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শব্দের নিপুন ব্যবহারের পাশাপাশি বিশ্বমণ্ডলের পরিচিত অপরিচিত উপকরণেরও সার্থক প্রয়োগ রয়েছে।

আজকের কবি শব্দকে বক্তব্য প্রকাশের বাহন করে তুলেছেন। তারা যে সব অনুষঙ্গ ব্যবহার করছেন তার সঙ্গে বস্তুর রূপ-রস-গন্ধ-ধর্মের বৈচিত্র্য বর্ণনাই শেষ নয়; যোগ হয়েছে সমকালীন রাজনীতি, সমাজ, সমাজ ব্যবস্থা, সমাজের কাঠামো ও রুচিগত পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষের মনোবৈকল্য  কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। কবিতায় ভৌগোলিকচেতনা জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির বিপুল পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষের আচরণে স্বাভাবিক পরিবর্তনের মানচিত্র আঁকতে গিয়ে কবি সংশয় প্রকাশ করেন। এ সময়ের কবিতার শব্দসমবায় বিচারে এবং নির্বিচারে দেশি-বিদেশি শব্দের মিথষ্ক্রিয়ায় ঋদ্ধ হয়ে ওঠে।

অধুনান্তিকদের মতে, প্রতিটি মার্জিত উচ্চারণই কবিতা। কবি একটি বিশেষ ভাষা ও কাঠামো ব্যবহার করে তার মনের সাথে কথা বলেন। এ কথাগুলো তার একান্তই নিজস্ব। নিজের মনের সাথে সকল মানুষই কথা বলেন। কিন্তু এগুলো কবিতার আকার ধারন করে না। কবির ব্যক্তিগত কথা ভাষার জামা পরিধান করে কবিতায় রূপান্তরিত হয়। এখানে পার্থক্যটা কোথায়? পার্থক্যটা হচ্ছে ভাষা এবং বাকবিন্যাসের। সাধারণ কথা এবং কবিতার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হলে আমাদের কান এবং মনকে জাগ্রত করতে হয়। কান এবং মনই কবিতার আসল বিচারক।


এমন একটা জিভ যে হাতকে আদেশ করছে? কে দিচ্ছে আদেশ? কিসের আদেশ


কবিতার মিথ :

একটি মিথ, কবিতায় ছন্দ থাকতেই হবে। না, এমন কোনও ধরাবাঁধা নিয়মই নেই কবিতায়। ছন্দ, মাত্রা ইত্যাদি থাকলে ভাল – এই যা। তবে সব নিয়মেরই আছে ব্যতিক্রম।

আরেক মিথ, কবিতার সুনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য থাকতে হবে। না, এমন কিছু সুনির্দিষ্ট করা নেই। কবিতা একটি মাত্র অক্ষরে লেখা যায়, কোটি-কোটি শব্দেও লেখা যায়।

তৃতীয় মিথ, কবিতা কোনও কিছু না ভেবে, কোনও কিছু না চিন্তা করেও লেখা যায়। না, তা যায় না। সকল শিল্পের মতো কবিতাও চিন্তাশীল মানুষের সৃষ্টি। কেউ-কেউ হঠাৎ করে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো কবিতা লিখে ফেলতে পারেন—এটা সত্য, কিন্তু সবাই কি পারেন? লেখার আগে ভাবতে হয়, যা নিয়ে লেখা তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়, তারপর সম্পাদনা করতে হয়, তারপর আরও কাটাকুটি করতে হয়—যোগ-বিয়োগ করতে হয়।

চতুর্থ  মিথ, আচ্ছন্ন অবস্থায় ভাল কবিতা লেখা যায়। না, এ কথা সবসময় সত্য নয়। কেউ-কেউ অবশ্য প্রেমাচ্ছন্ন অবস্থায় ভাল কবিতা লিখেছেন। যেমন, রুমি।

কবিতার দুর্বোধ্য হওয়া চলবে না। এ মিথের ব্যাপারে বলতে হয়, বোধ্য হওয়াই বেশির ভাগ ধারার কবিতার লক্ষ্য। ‘দাদা’ কবিতায় এ সব নেই। এ কবিতা ইচ্ছাকৃত দুর্বোধ্য।

কবিতা ব্যাকরণ মেনে চলবে। না, কবিতা ব্যাকরণ ভেঙেও চলতে পারে।

সপ্তম মিথ, কবিতার ভাষা হবে শব্দাড়ম্বরপূর্ণ। মোটেও না, অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া ভারি-ভারি শব্দ ব্যবহার না করাই ভাল।

সবশেষে কবিতা ও মিথ নিয়ে মার্কিন কবি, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সমালোচক রবার্ট পেন ওয়ারেন (১৯০৫- ১৯৮৯)-এর একটি মন্তব্য – “ The poem is a little myth of man’s capacity of making life meaningful. And in the end, the poem is not a thing we see, it is a light by which we may see an what we see is life.

ব্যাকরণ, ফার্সিতে একে বলা হয় ‘Dasture zabaan’, যার আক্ষরিক অর্থ ‘the order of tongue’. অর্ডার? এমন একটা জিভ যে হাতকে আদেশ করছে? কে দিচ্ছে আদেশ? কিসের আদেশ? ব্যাকরণ তো একটা মরাল কনস্ট্রাক্ট একটা নৈতিক কাঠামো, কি করা যাবে আর কি করা যাবে না— আগে থেকে ঠিক ক’রে দেওয়া এরকম একটা তালিকা থেকে যা ভবিষ্যতের ভাষাকে নির্ধারণ করে। কিন্তু কবিতা আর কবি থাকেন সেই আদেশ ও আদেশের ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করতে, তাকে দুনিয়া থেকেই সরাতে, ভাষার একটা নতুন বাক সৃষ্টির জন্য। তবুও, বিপজ্জনক কবির জন্য ভাষা শুধু একটা উপায় বা কোনো মাধ্যমমাত্র নয়, ভাষা তার কাছে পুরোটা, এবং তার কাজের মূল লক্ষ্যবস্তু।

 

ম্যাকগাইবারের হাতিয়ার :

  • Authorial Inclusion – The Poet Appears as a Character or Even a  Suspect :  কবিতা ভিতর কবি নিজেকে স্থাপন করেন। বয়ানকারী বা চরিত্র হিসেবে হাজির হয়েও পাঠকের কাছে ধরা দিতে পারেন যেমনটা দেখা যায় বাউলগানে বা বয়াতী গানে। বিট জেনারেশনের কবি গীনস্‌বার্গ এ ধরনের কবিতা লিখেছেন।
  • Chinese – Box Words / Metalepsis / Circularity : কবির ভিতর কবি/কবিতার ভিতর কবিতা/স্বপ্নকল্পের ভিতর স্বপ্নকল্প পরস্পর অন্তপ্রবিষ্ট বয়ানের মালা যার শীর্ষ আর প্রান্তের মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। Borges’ famous short story ‘The Circular Ruins’ suggest that we are all just dream-images in another narrator’s dream who is in turn being dreamed by another dreamer and so on up (and down) the chain. The poets think with things, not about them – concept of an endless cycle: there are no full stops, no periods. On this cycle of the organic and inorganic. They are not to be stacked on top of one another as if they are stanzas of a single continuous poem.

এ সংক্রান্ত প্রাথমিক নিরীক্ষা জীবনানন্দের কবিতায় পাওয়া যায়। জীবনানন্দের বহু কবিতার শিরোনাম কবিতাটির প্রথম একটি – দু’টি শব্দ দ্বারা চিহ্নিত। যেমনঃ সেদিন এ ধরণীর, ধান কাটা হয়ে গেছে, আমাকে তুমি, হাজার বছর শুধু খেলা করে, হায় চিল, একটি নক্ষত্র আসে, সময়ের কাছে, এইখানে সূর্যের, মানুষের মৃত্যু হলে, স্থান থেকে, পৃথিবীতে এই। শিরোনামটি এক্ষেত্রে প্রস্থান-শব্দ, কবির একজিট। যৌগটি নির্মাণের পর ওই প্রস্থান দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেছেনে এবং সেখান দিয়েই পাঠককে প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছেন। যে মুড থেকে কবিতাটি শুরু হয় শেষ হয় একই জায়গায়। অর্থাৎ কেন্দ্র এবং প্রান্ত বলে কিছু থাকে না বা শুরু বা শেষ বলে কিছু নেই, যদিও গঠনে মনে হয় পুনঃপুনঃ ফিরে আসছে, কিন্তু বদ্ধ সমাপ্তির কবিতা নয়, উন্মুক্ত।

  • Crossover Forms -There’s No Mystery Here! : উঁচু-নীচু/ ভালো-মন্দ যুগ্ম বৈপরত্যের সীমানা ভেঙ্গে মানবিক গুণাবলীর শ্রেণী মর্যাদা (hierarchy)-র উগ্র বিচ্যুতির বিনাশের জন্য প্রথাগত ফর্মের ভিন্ন ফর্মের কবিতা। অণুকাব্য, আলফা মেইল পোয়েট্রি, মাইক্রোকবিতা, ন্যানোকবিতা বা অনিশ্চিত লাইনভেঙ্গে মুক্ত ফর্মে লেখা কবিতা অথবা ফর্মের সমন্বয়ে ভিন্ন ফর্ম।
  • Intertextuality : কবিতার ভিতর অন্য কবিতা/কবিতাংশ বা গান (টেক্সট) বা কোন পরিচিত চরিত্রের উপস্থাপন/অন্তর্ভুক্তি। The acknowledgment of previous literary works within another literary work.

Since postmodernism represents a decentered concept of the universe in which individual works are not isolated creations, much of the focus in the study of postmodern literature is on intertextuality : the relationship between one text and another or one text within the interwoven fabric of literary history. Critics point to this as an indication of postmodernism’s lack of originality and reliance on clichés. Intertextuality in postmodern literature can be a reference or parallel to another literary work, an extended discussion of a work, or the adoption of a style.

  • Magic Realism : যে কোন ‘Simulacra’র সম্ভাবনা নস্যাৎ করার জন্য অবাস্তব বা অসম্ভব বিষয়কে যাপিত জীবনের মধ্যে বাস্তবতার মতো উপস্থাপন। জাদু বাস্তবতা কোন  চূড়ান্ত  বা শ্রেয় ইন্টারপ্রিটিশনকে প্রত্যাখান করে, যেহেতু কোন কিছুর মানে নির্ণয় করা যায় না। উপরি তলের media-like image ব্যবহার যাদের নিজেরা ছাড়া কোনো রেফারেন্স নেই (স্বয়ংম্ভু)। জীবন ও শিল্প-সাহিত্য উভয়ই যেহেতু ফিকশন বা উভয়ের মিশ্রণ। কাজেই কবিতায় এদের ভেদ থাকে না যা জাদুবাস্তবতা বা বহুসীমায় শেষ হয় ।

[ Fabulation : Fabulation is a term sometimes used interchangeably with metafiction and relates to pastiche and Magic Realism. It is a rejection of realism which embraces the notion that literature is a created work and not bound by notions of mimesis and verisimilitude.]

  • Pastiche – The Hybrid Muse : নতুন শৈলী নির্মাণের জন্য পূর্ববর্তী লেখক/কবিদের বিভিন্ন আইডিয়া ও সাহিত্য শৈলী কবিতায় ব্যবহার। জাতিগত, লিঙ্গ এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্যের প্রতিরোধ হিসাবে একই কবিতায় বিভিন্ন স্টাইলের সমন্বয়ে সংকর বা হাইব্রিড কবিতা নির্মাণ । By mingling different styles, typefaces, narratorial voices, settings, themes and histories ‘within one text’, the poet in defeating the possibility of interpreting the text in any one way.

 


হাংরি আন্দোলনের পরের প্রজন্মগুলোয় গালাগাল, খিস্তি, স্ল্যাং নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে লেখালিখিতে, পড়তে আক্রমণাত্মক লাগলেও, সেগুলো স্রেফ নব্যালঙ্কার হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে


সাখাওয়াত টিপুর কবিতা :

পাঠিকারা মনে রাইখেন।।

সাধারণ লোক প্রচলিত মতের দ্বারাই প্রভাবিত হয়

—রাজা রামমোহন রায়

 তারো পর পর হয়ে
সে যেন অপর জ্ঞানে
নব বিদ্যা নব ধ্যানে
পাঠিকারে জাগিয়ে তোলে।

পাঠিকারে পাঠিকা মোদের রক্ত থিকা
……………………..ভাষার জীবন।।

 (কার্ল মার্কসের ধর্ম, পৃঃ ১৩)

মলয় রায় চৌধুরীর কবিতা :

প্রতিদিন : একটি পোস্টমডার্ন কবিতা

( জীবনানন্দের ‘আটবছর আগের একদিন’ কবিতার প্যাশটিস )

শোনা গেলো লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে, আর তার বউ ও শিশুকে
কাল রাতে—ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন ভাঁড়ারে আর একদানা চাল নেই
বধূ-শিশু খুন করে মরতে বাধ্য হলো ।

বধূ শুয়ে ছিল পাশে—শিশুটিও ছিল
প্রেম ছিল, ছিল নাকো কিছুই খাবার—জ্যোৎস্নায়—তবু সে দেখিল
ক্ষুধার প্রেতিনী ? ঘুম তো আসে না রাতভর
কেননা ক্ষুধার্ত পেটে হয়নি ঘুম বহুকাল—লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার ।

এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি !
বিষ-গ্যাঁজলা মাখা ঠোঁটে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে তিনজন খালি পেটে ঘুমায় এবার
কোনোদিন এই পরিবার জাগিবে না আর
খালি পেটে গাঢ় বেদনার
অবিরাম অবিরাম ক্ষুধা
তিনজনে সহিবে না আর—
এই কথা বলেছিল তারে
চাঁদ ডুবে চলে গেলে—বুভুক্ষু আঁধারে
যেন তার মেটেল দুয়ারে
মোটরসাইকেলবাহী ধর্ষকেরা এসে

তবুও তো নেতা জাগে
লুম্পেনেরা এসে ভোট মাগে
আরেকটি নির্বাচনের ইশারায়—অনুমেয় উষ্ণ হুমকি দিয়ে

টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে র‌্যাশনের ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা ;
নেতা তার আরামের সঙ্ঘারামে নেশা করে বুকনি ঝাড়তে ভালোবাসে।

শ্রম ঘাম রক্ত চুষে আড্ডায় ফিরে যায় নেতা
অবরোধ-করা মোড়ে অ্যামবুলেন্সে কান্না দেখিয়াছি।

কাঠফাটা খরা নয়—যেন কোনো চালের ভাঁড়ার
অধিকার করে আছে ইহাদের ভাব
দলীয় গুণ্ডাদের হাতে
বধূটি প্রাণপণ লড়িয়াছে
চাঁদ ডুবে গেলে পর নিরন্ন আঁধারে তুমি বউটিকে নিয়ে
ফলিডল খেয়েছিলে, শিশুটির গলা টিপে মেরে
যে-জীবন ফড়িঙের দোয়েলের
তা তোমার শৈশব থেকে ছিল জানা।

পেটের ক্ষুধার ডাক
করেনি কি প্রতিবাদ? ডেঙ্গুর মশা এসে রুক্ষ চামড়ায় বসে
রক্ত না পেয়ে দেয়নি কি গালাগাল?
জোয়ান লক্ষ্মীপেঁচা চালাঘরে বসে
বলেনি কি : ‘সংসার গেছে বুঝি দারিদ্র্যে ভেসে?
চমৎকার!
হাড়গিলেদের ঘরে ইঁদুরও আসে না ?’
জানায়নি পেঁচা এসে এ তুমুল ক্ষুব্ধ সমাচার ?

জীবনের এই স্বাদ—সুপক্ক ধানের ঘ্রাণ
কতোকাল পাওনিকো তুমি
মর্গে আজ হৃদয় জুড়োলো
মর্গে—শীতাতপে, তিনজন
ফলিডলে গ্যাঁজলা-ওঠা ঠোঁটে!

শোনো এ তিন মৃতের গল্প—ফিবছর ধান
কেটে নিয়ে চলে গেছে গাজোয়ারি করে
বি পি এল কার্ডের সাধ
মেটেনি বউকে পাঠিয়েও
দরবারি নাশকতা নিচে টেনে বধূ
মধু – আর মননের মধু
যাপনকে করতে পারেনি ক্ষুধাহীন
হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে
সইতে হয়েছে প্রতিদিন;
তাই
লাশকাটা ঘরে
তিনজন শুয়ে আছে টেবিলের পরে।

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা,
জোয়ান লক্ষ্মীপেঁচা চালাঘরে বসে
চোখ পালটায়ে কয়, ‘সংসার গেছে বুঝি দারিদ্র্যে ভেসে?
চমৎকার!
হাঘরের মেটে ঘরে ইঁদুরও আসে না।’

 

হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার?
স্বাধীনতার সত্তর বছর পর!
সকলে তোমার মতো সুযোগ সন্ধানী আজ—বুড়ি চাঁদটাকে ওরা
আদিগঙ্গার পাকে করে দিলে পার;
যারা আসে তারাই শূন্য করে চলে যায় টাকার ভাঁড়ার।

  • Puns and Playing/ IRONY and SATIRE – Estrangement : ভাষা এবং আইডিয়ার আহ্লাদ/থ্রিল যোগান শ্রেষ (Puns), বিদ্রুপ (Parody) বা ব্যঙ্গের (Humour) মধ্য দিয়ে লীলা খেলে পাঠককে শিকড়হীন করা (Alienate) । পাঠককে ছাঁচে ফেলা থেকে বিরত রাখতে উদ্ভটত্ব বাড়ানো হয় পরিহাস, বিদ্রূপ ও কৌতুকপূর্ণ শব্দ লীলায় ।
  • Pluralism/Indeterminacy – Lack of Closure (BROTHERLY LOVE & UNITY IN DIVERSITY : শব্দকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তিকতায় পৌঁছে দেয় এবং জ্ঞান ও যুক্তির এলাকা থেকে মুক্ত করে বহুরৈখিক অর্থের (meaning) দিকে চালিত করে লোকায়াত সংস্কৃতির বহুত্বকে স্বীকৃতি জানায়। আধুনিকতার নির্ণয়তাকে (determinacy/ Single direcetion)/ দিশাকে – যেমন বৃক্ষের থাকে দিশা, অতিক্রম করে অনির্ণেয়তার (Indeterminacy)/বিদিশায় – যেমন ঘাসের থাকে বিদিশা (Multidirection), দিকে যাত্রা। জীবনানন্দের ‘কমলালেবু’ কবিতায় যেমন ‘আমি’ হল বহুর স্বরূপ, সীমানা বর্জিত, যৌগ, পরিবর্তনশীল, সংজ্ঞায়নের অতীত :

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোনো এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষু’র বিছানার কিনারে।

অধুনান্তিক কবি এমন গঠনে কবিতা রচনা করতে চান যাতে সম্ভাবনা, পছন্দ আর নির্বাচনের দুয়ার উন্মুক্ত থাকে। শব্দ/নিঃশব্দের বদ্ধ রূপক-অলঙ্কার ছিঁড়ে পূর্ব-নির্ধারিত বা রীতিসিদ্ধ পদ্ধতি পরিহার করে বুদ্ধিবৃত্তিক বুননের ক্রমসম্প্রসারণের জায়গাগুলো তৈরি করেন, যেহেতু এই মহাবিশ্ব ক্রমসম্প্রসারণশীল।

  • Metonymy (লক্ষণালঙ্কার) : ‘অক্সি মোরন’ (বিরোধাভাস), ‘সাইনেক ডোকি’ (প্রতিরূপক) এবং স্ল্যাঙালঙ্কারের ব্যবহার। দেশ পত্রিকার ২৬.১২.১৯৯৮ইং সংখ্যায় ক্লিনটন বি সীলি তাঁর ‘রৌদ্রের অন্ধকার-এ দাঁড়িয়ে’ নিবন্ধে জীবনানন্দের অত্যধিক অক্সিমোরন বা বিরোধাভাসমূলক শব্দবন্ধের প্রয়োগের কথা বলেছেন;  সাতটি তারার তিমির, সূর্যতামসিক, অনন্ত রৌদ্রের অন্ধকার, অফুরন্ত রৌদ্রের তিমির, উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খলা, সৎ অন্ধকার নিষ্ক্রমণ, সচ্ছল কঙ্কাল ইত্যাদি। শ্যামাপদ চক্রবর্তী প্রণীত ‘অলঙ্কারচন্দ্রিকা’ গ্রন্থটি থেকে জানা যায় যে, বাংলায় ‘সাইনেক ডোকি’ বা প্রতিরূপকের প্রচলন থাকলেও, অক্সিমোরন বা বিরোধাভাসমূক শব্দবন্ধের প্রচলন জীবনানন্দের আগে ছিল না। হাংরি আন্দোলনের পরের প্রজন্মগুলোয় গালাগাল, খিস্তি, স্ল্যাং নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে লেখালিখিতে, পড়তে আক্রমণাত্মক লাগলেও, সেগুলো স্রেফ নব্যালঙ্কার হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে :

১.
ট্যাকা কি গাছের গুডা?
নাকি গাঙের জলে ভাইসা আইছে?
এই খানকি মাগীর ঝি,
একটা টাকা কামাই করতে গিয়া
আমার ‍গুয়া দিয়া দম আয়ে আর যায়।

(লিপিস্টিক, নির্মলেন্দু গুণ)

২.
রাইত অইলে অমুক ভবনে বেশ আনাগোনা
আমিও গ্রামের পোলা চুতমারানি গাইল দিতে জানি

(যার যেখানে জায়গা, হেলাল হাফিজ)

  • Interlocking and Serial form : কবিতায় অজস্র অনুস্তর (মাইক্রোলেভেল) ভাবনার ইন্টারলকিং বা অন্তর্বয়ন থাকে যেখানে পঙক্তিগুলো ঘাসের মতন একে আরেকের মধ্যে নানা রঙের সুতোর মতো বোনা, গাছের ডালের মতন ইন্টারলিংকড বা আত্মসংলগ্ন নয়। জীবনানন্দের কবিতার মাঝখান থেকে একটা-দুটো লাইন সরিয়ে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু আধুনিক কবিতার ইন্টারলিংকড বা আত্মসংলগ্ন পঙক্তির বেলায় তা করতে গেলে পুরো কবিতাটাই ধসে পড়বে, কেননা সাধারণতঃ তা একটি ম্যাক্রোলেভেল বা নিখিলস্তর ভাবনার সাহায্যে গড়ে ওঠে। প্রতিটি অনু-আকার (মাইক্রোফর্ম) অনুশাসন, প্রণালী, মানক, অনুষঙ্গ যে কোন অভিঘাতে কম ব্যাহত হয়। হয় বলে, সেগুলো বাঁধনহীন আন্তঃসম্পর্ক গড়তে পারে। তা নিখিল-আকার (ম্যাক্রোফর্ম) থেকে সেহেতু উৎকৃষ্ট।

[Postmodern poetics respond to the condition of the world. In an age of instant telecommunications and metropolitan life, the postmodern serial and procedural forms attempt to accommodate the overwhelming diversity of messages and the lapse of a grand order that is replaced by an arbitrary personal order.]


মানবিক চিন্তন-ক্রিয়ায় ‘অহং – ‍উপস্থিতি’ থাকার কারণে মানুষ সবসময় তার পছন্দমতো একটি কেন্দ্র বা centre নির্ধারণ করেই চিন্তা-ক্ষেত্রে এগুতে চায়। একজন মানুষ যখন তার জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কিছু চিন্তা করে, ঠিক তখনই তার চিন্তার কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থান নেয় ‘আমি’ এবং ‘আমি কেন্দ্রিক’ কিছু ধারণা বা centre, যাকে কোনো অবস্থাতেই অহং- অস্তিত্বের বাইরে রাখা সম্ভব নয়


মহাকাব্য নয়, অধুনান্তিক কবি লিখছেন সিরিয়াল ফর্মে সিরিজ কবিতা। সিরিজ কবিতা পাঁচ মিশালী মাল মশলায় তৈরী, কোনো সমগ্র নয় আবার একক কবিতাও না; বলা যেতে পারে এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, পাঠক যে কোনো ফ্ল্যাটেই ইচ্ছে করলে প্রবেশ করতে পারে।

[The serial form in poetry is one of those works, as Barthes puts it, whose fabrication, by arrangement of discontinuous and mobile elements or their resistance to a determinate order:

  1. The series does not aspire to the encompassment of the epic; nor does it allow for the reduction of its materials to the isolated perfection of the single lyric. The series demands neither summation nor exclusion. It is instead a combinative form whose arrangements admit a variegated set of materials.
  2. The series is an open form in large part because it does not require the mechanic imposition of an external organization. It is not, however, an organic form.
  3. In a series the reader is encouraged to select any of these passages as an entrance.]
  • Fragile Images / Kinetic Images : কবিতার চিত্রকল্প হয়ে গেছে ভঙ্গুর। তার কারণ বাস্তবজগৎ থেকে প্রতিমায় ঠাসা সংকেত অত্যন্ত দ্রুত বেগে একের পর এক এসে আছড়ে পড়ছে কবির পঞ্চ ইন্দ্রিয়ে। প্রতিমা বহনে সক্ষম উদ্দীপকগুলোকে ঘন ঘন সক্রিয় হয়ে উঠতে হচ্ছে। মডার্ন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের রচনার সঙ্গে পোস্টমডার্ন কবি উৎপলকুমার বসুর পাঠকৃতি তুলনা করলেই টের পাওয়া যাবে ব্যাপারটা। সমাজ যেমন-যেমন ছড়িয়েছে, তেমন-তেমন বেড়েছে কোডেড সংকেত সংখ্যা, আকৃতি, প্রকৃতি, চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ, ক্ষমতা। এতো বেশি সংখ্যায় আসছে কোডগুলো যে অনেক সময় তা ভাসিয়ে দিচ্ছে অভিব্যক্তির কূল-কিনারা। বিপুল বার্তা বিস্ফোরণের চাপ সামলে পোস্টমডার্ন কবিকে নিজের মস্তিষ্কে নথিভুক্ত করতে হচ্ছে হাজার হাজার কোড। মানুষ কতোটা নিতে পারে তা বৈজ্ঞানিকদের এখনও জানা নেই। পোস্টমডার্ন কবিতাকে নিতে হচ্ছে। ফলত ভঙ্গুর হয়ে উঠছে পোস্টমডার্ন কবিতার চিত্রকল্প। এই চিত্রকল্প, যা মডার্ন কবিতার চিত্রকল্প থেকে একেবারেই আলাদা, তাকে বলা হচ্ছে ‘দি কাইনিটিক ইমেজ’। তার কারণ মডার্ন কালখন্ডটির তুলনায় আমাদের উত্তর ঔপনিবেশিক কালখন্ডে সমগ্র জ্ঞানজগতে চলছে ভয়ঙ্কর উত্থালপাতাল। যে প্রতিবর্তী ক্রিয়া ও সংকেত-ভাঁড়ের সাহায্যে কবি চিন্তা করেন, তাতে এক-একটি তথ্য বেশিদিন ধরে রাখা আর সম্ভব না।
  • Nihilistic & Existential : অস্তিত্ববাদী বা শুন্যবাদী বিষয় থাকবে কবিতায়। যদিও পোস্টমডার্নিজম ও অস্তিত্ববাদ সমার্থক নয়, তবু তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। এই ধরনের কবিতা ধারণা দেয় যে, জগৎ ও জীবন অর্থহীন অথবা মানুষ যে উদ্দেশ্য বা অর্থ আরোপ করে জগৎ জীবনের প্রতি তা বর্জন করে। মূলতঃ এটা করা হয় পাঠককে বিষন্ন করতে নয়, বরং তার স্বস্তির কেন্দ্রকে নড়িয়ে দিতে এবং জগৎকে নতুনভাবে বিবেচনা করতে। 
  • Deconstruction : বিনির্মাণ কোনো ‘টেক্সট’ যদি পেঁয়াজ হয় তবে তার প্রতিটি স্তর তুলে দেখার প্রক্রিয়া। সচেতন এই প্রক্রিয়াটি করা হয় কোনো ‘টেক্সটের’ প্রতিটি কোণার তথ্য তল্লাশি করে উদ্ধার এবং আলাদা করার জন্য, ফুকো উদ্ধারকৃত তথ্য ভান্ডারকে বলেছেন ‘Episteme’. সনাতন ভারতীয় দর্শনেও শব্দের অর্থকে বলা হয়েছে ‘contextual’.

What this means is that every text at any given period of time is conditioned by a network or web of relations that in turns affects the meaning of that text. Therefore a text has no ‘once and for the all time’ meaning. Thus ‘deconstruction categorically asserts the absolute impossibility of attributing to any text one single ultimate meaning’.

 

মানবিক চিন্তন-ক্রিয়ায় ‘অহং – ‍উপস্থিতি’ থাকার কারণে মানুষ সবসময় তার পছন্দমতো একটি কেন্দ্র বা centre নির্ধারণ করেই চিন্তা-ক্ষেত্রে এগুতে চায়। একজন মানুষ যখন তার জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কিছু চিন্তা করে, ঠিক তখনই তার চিন্তার কেন্দ্র বিন্দুতে অবস্থান নেয় ‘আমি’ এবং ‘আমি কেন্দ্রিক’ কিছু ধারণা বা centre, যাকে কোনো অবস্থাতেই অহং- অস্তিত্বের বাইরে রাখা সম্ভব নয়। আসলে মানবিক চেতনা-কাঠামো সবসময় অহংকেন্দ্রিক বিভিন্ন যুগ্ম-বৈপরীত্য বা binary opposition-কে কেন্দ্র করেই তার অনুভূতি ধারণার বৃত্ত রচনা করতে চায় । ভালো/মন্দ, দেহ/মন, সত্য/মিথ্যা, ঈশ্বর/মানব, ঈশ্বর/শয়তান, মানুষ/পশু, শুরু/শেষ ইত্যাদির মতো অহংকেন্দ্রিক যুগ্ম-বৈপরীত্যসমূহকে বাদ দিয়ে কিছু চিন্তা করতে গেলে, অহং নিজেই ‘অস্তিত্ব/অনস্তিত্ব’ যুগ্ম-বৈপরীত্য নিয়ে হয়ে উঠে অস্তিত্বের প্রধান কেন্দ্র বা পরম সত্তা। অহংসহ যে-কোনো সত্তার চরম ও পরম অস্তিত্ব শুধুমাত্র উচ্চারিত শব্দেই পাওয়া সম্ভব, মানুষের সহজাত এই ধারণার ওপর নির্ভর উচ্চারিত মৌখিক ভাষা সবসময় লিখিত ভাষার ওপর প্রাধান্য পেয়েছে। ‘মৌখিক ভাষা/লিখিত ভাষা’ – এই যুগ্ম-বৈপরীত্যের শ্রেণীমর্যাদা বা hierarchy নির্ধারণ করলে মুখের ভাষার স্থান প্রাধান্য পেয়ে অহং-অস্তিত্বের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে logocentric বা স্বনকেন্দ্রিক চিন্তার মাঝে phonocentricism বা ধ্বনিকেন্দ্রিকতাই হয়ে ওঠে মুখ্য। ধ্বনিকেন্দ্রিকতার ওপর প্রাধান্য দেওয়ায়, যে কোন রকম লিখিত ভাষা দূষিত বলে গণ্য হতে পারে, কারণ মৌখিক ভাষার অবস্থান থাকে মানবিক চিন্তার খুব কাছাকাছি।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের অনন্যসাধারণ সৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ এ বিনির্মাণের উদাহরণ হিসেবে খুবই উল্লেখযোগ্য। মেঘনাদবধ কাব্য রামায়ণের কিছু অংশকে কেন্দ্র করে লেখা, যেখানে ধ্রুপদী বিশ্বাসের অন্তর্গত ‘রাম/রাবন’ ‍যুগ্ম-বৈপরীত্যের বিনির্মাণ করা হয়েছে নতুনভাবে। বিনির্মাণতত্ত্বের উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ক্ষুদে কাব্যনাটক ‘গান্ধারীর আবেদন’- কে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ‘গান্ধারীর আবেদন’ কাব্যনাট্যে ’মহাভারতের’ খন্ডাংশকে বিনির্মাণ করা হয়েছে সুখ/দুঃখ, জয়/পরাজয়, হিংসা/অহিংসা, ধর্ম/অধর্ম, প্রশংসা/নিন্দা, ঔদার্য্য/হীনতা ইত্যাদির মতো মানবিক গুণাবলী কেন্দ্রিক যুগ্ম-বৈপরীত্যের শ্রেণী-মর্যাদার উগ্র বিচ্যুতি ঘটিয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ঈশ্বর/মানুষ এই যুগ্ম-বৈপরীত্যকে প্রচন্ডভাবে বিনির্মাণ করেছেন, যেখানে ‘আমি’র অস্তিত্ব/অনস্তিত্বের পাশাপাশি ঈশ্বরের অস্তিত্ব/অনস্তিত্বও ছায়ারূপে অবস্থান নেয়।

দেরিদার বিনির্মাণ দর্শন অনুযায়ী যে-কোনো সাহিত্য কর্মের ব্যাখ্যা অসীমের দিকে প্রবাহিত, যাকে text-এর free play বা মুক্ত ক্রীড়া বলে আখ্যায়িত করা হয় । দেরিদার deconstruction-এ বিশ্বাসী আমেরিকান ডিকন্সট্রাকশনিস্ট পল দ্য মান, হেডেন হোয়াইট, হ্যারল্ড ব্লুম প্রমুখ সাহিত্যে বিনির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন যা Theory of trope বা গূঢ়োক্তিতত্ত্ব দ্বারা বিশ্লেষণযোগ্য এবং এ ধরনের বিনির্মাণে ব্যাজস্তুতি (irony), আংশিক উপস্থাপন (synecdoche), লক্ষণালঙ্কার (metonymy), অতিশয়োক্তি (hyperbole), রূপকালঙ্কার (metaphor) এবং রূপান্তর (metalepsis) কাজ করে। বিনির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হল কোনো হল কোনো এক বিশেষ কেন্দ্র বা centre সৃষ্টিকারী অর্থ বা Meaning এর উপস্থিতিকে (Presence) শব্দের পেছন থেকে সরিয়ে অধিবিদ্যার অবসান ঘটানো। অধিতাত্ত্বিক উপাদানকে বিনির্মাণের একমাত্র উপায় হল গভীর ও তীব্র মনোযোগ সহকারে পাঠ এবং পাঠের সময় আমাদের মনে রাখা উচিত দেরিদার সেই বিখ্যাত বাক্যটি ‘ There is nothing outside text’.

বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যেও আমরা বিনির্মাণের উপাদনা খুঁজে পাব। জসীমউদ্দীনের কাব্য/কাব্যদর্শনের বিনির্মিত উপাদান পাওয়া যাবে আল মাহমুদে, আবার আল মাহমুদের কাব্যের বির্নিমিত উপাদান চিহ্নিত করা যাবে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কাব্যে কিংবা আশি ও নব্বই দশকের কোনো কোনো কবির কবিতায় । শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘ স্বাধীনতা তুমি’ রজার ম্যাকগাফের ‘ What you are’ নামক কবিতার বির্নিমিত প্রতিরূপ। আড্রিয়ান হেনরির ‘Without you’ শিরোনামের কবিতার বিনির্মিত রূপ আমরা পাই শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ ও নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় । ভাষার মুক্তক্রীড়াকেন্দ্রিক এ ধরনের বির্নির্মাণ অযৌক্তিক নয় যদি তা চৌর্যমূলক অনুকৃতি না হয় ।

 

[Deconstruction Techniques :

Step 1 – Select a work to be deconstructed. This a called a “text” and is generally a piece of text, though it need not be. It is very much within the lit crit mainstream to take something which is not text and call it a text. In fact, this can be a very useful thing to do, since it leaves the critic with broad discretion to define what it means to “read” it and thus a great deal of flexibility in interpretation. It also allows the literary critic to extend his reach beyond mere literature. However, the choice of text is actually one of the less important decisions you will need to make, since points are awarded on the basis of style and wit rather than substance, although more challenging works are valued for their greater potential for exercising cleverness. Thus you want to pick your text with an eye to the opportunities it will give you to be clever and convoluted, rather than whether the text has anything important to say or there is anything important to say about it.

Step 2 – Decide what the text says. This can be whatever you want, although of course in the case of a text which actually consists of text it is easier if you pick something that it really does say. This is called “reading”.

Step 3 – Identify within the reading a distinction of some sort. This can be either something which is described or referred to by the text directly or it can be inferred from the presumed cultural context of a hypothetical reader. It is a convention of the genre to choose a duality, such as man/woman, good/evil, earth/sky, chocolate/vanilla, etc. In the case of our example, the obvious duality to pick is homosexual/heterosexual, though a really clever person might be able to find something else.

Step 4 – Convert your chosen distinction into a “hierarchical opposition” by asserting that the text claims or presumes a particular primacy, superiority, privilege or importance to one side or the other of the distinction. Since it’s pretty much arbitrary, you don’t have to give a justification for this assertion unless you feel like it. Programmers and computer scientists may find the concept of a hierarchy consisting of only two elements to be a bit odd, but this appears to be an established tradition in literary criticism. Continuing our example, we can claim homophobia on the part of the society in which this sentence was uttered and therefor assert that it presumes superiority of heterosexuality over homosexuality.

Step 5 – Derive another reading of the text, one in which it is interpreted as referring to itself. In particular, find a way to read it as a statement which contradicts or undermines either the original reading or the ordering of the hierarchical opposition (which amounts to the same thing). This is really the tricky part and is the key to the whole exercise. Pulling this off successfully may require a variety of techniques, though you get more style points for some techniques than for others. Fortunately, you have a wide range of intellectual tools at your disposal, which the rules allow you to use in literary criticism even though they would be frowned upon in engineering or the sciences. These include appeals to authority (you can even cite obscure authorities that nobody has heard of), reasoning from etymology, reasoning from puns, and a variety of word other games. ]


  • Technoculture and hyperreality :  সব বার্তা, চিত্র আর চিহ্ন যেহেতু মিডিয়ার মধ্যস্থতায় নির্মিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়ে কোডেড প্রক্রিয়ায় আমাদের কাছে পৌঁছায় কাছেই সমস্ত চিহ্নই এখন বিনিময় হয় শুধু চিহ্নের সাথেই যেখানে বাস্তবতা অনুপস্থিত যাকে বলা যায় ‘অতি-পরাবাস্তব‘ (Hyperial)। প্রযুক্তির সোনার খাঁচায় বন্দি কবি তাই বাস্তবতার কবিতা আর লিখছেন না, চিহ্নের প্রতিমূর্তি (Simulacrum) চিহ্নই উৎপাদন করে পাঠককে জানান দেয় বাস্তবতার অনুপস্থিতি। ইতিহাস আর সরলরৈখিক নয়, আর ইতিহাস নামে এতদিন যা বুঝাতো তার সব হয়ে গেছে ‘Live Show`, হাই টেক সময় বাস্তবতায় রুচি ও মনন তৈরী করছে ক্ষমতার কেন্দ্র। কবিতায় কেবল তাই চিহ্নের সাথে চিহ্ন বদল চলছে।

Fredric Jameson called postmodernism the “cultural logic of late capitalism”. “Late capitalism” implies that society has moved past the industrial age and into the information age. Likewise, Jean Baudrillard claimed postmodernity was defined by a shift into hyperreality in which simulations have replaced the real. In postmodernity people are inundated with information, technology has become a central focus in many lives, and our understanding of the real is mediated by simulations of the real.

Hyperreality is the result of the technological mediation of experience, where what passes for reality is a network of images and signs without an external referent, such that what is represented is representation itself. The real has become an operational effect of symbolic processes, just as images are technologically generated and coded before we actually perceive them. “From now on, ” says Baudrillard,  ” signs are exchanged against each other rather than against the real”, so production now means signs producing other signs. The system of symbolic exchange is therefore no longer real but “hyperreal”.

  • Diaspora : আমাদের খুব কাছের সময়ে আর এক ধরনের দেশত্যাগী সাহিত্য তৈরি হচ্ছে যাকে অনেক সময় কমনওয়েলথ বা দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যও বলা হয়ে থাকে। এই কবিতাগুলো এক ধরনের দেশত্যাগী সাহিত্য, যেহেতু এই কবিতাগুলি পূর্ব-বাসভূমির স্মৃতি বা সেই স্মৃতিকে বর্তমান ধরে নিয়ে বিবৃত। একটু বেশি পেছনে তাকিয়ে দেখলে এঁদের লেখার গোত্র সেই পশ্চিমি ডায়াস্পোরিক সাহিত্য বা অনেকটাই লালিত হয়েছিল সাম্রাজ্যের সাহিত্যের অনুপূরক হিসেবে। বাংলা ভাষায় প্রবাসী কবিরাও এখন লিখছেন ডায়স্পরা কবিতা।

পুলিপোলাও ৩

এই ফাঁকা পথগুলি ভারি ভালো লাগে :
কুলকুল দুই কূল ছুঁয়ে-ছুঁয়ে ইছামতি নদী
যেন বয়। বার বার মনে হয়, আরবার যদি
ফিরে যেতে পারি আমি মরণের আগে!

যদি ফিরে যেতে পারি ফের,
ফিরে যেতে পারি আমি ও-ধূলিখেলায়,
ঐ গাঢ় স্বস্ত্যয়নে, স্বপ্নসাৎ গোধূলিবেলায়—
তাই এই ঘন রাতে এসব পথের

অনির্বচনীয়তার হাতে করি আত্মসমর্পণ।
এ-ছাড়া কী আর আছে, এত কাছে, এই এত দূর?
কী আর রয়েছে এত রিরংসাবিধুর,
এমন রোমাঞ্চকর? এমন গোপন

কোথায় বা বাজে আর বাতাসে শানাই?
কেঁদে কেঁদে ফেরে হুহু, যা রয়েছে, র’য়ে গেছে, যা ছিল, যা নাই?

 —সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

 

দোহাই :
THE SHIFT FROM MODERNISM TO POSTMODERNISM (http://www.hku.hk/english/course/03354/figitne3.htm)
মিথ কবিতাঃ সাযযাদ কাদির (http://blog.priyo.com/sazzad-qadir/2011/06/06/2929.html)
মলয় রায় চৌধুরী (অন্তর্জাল)
মঈন চৌধুরী প্রবন্ধ সংগ্রহ
কাব্য বিশ্লেষণ : ‘উত্তরাধুনিকতা জফির সেতুর কবিতাঃ মুনশি আলিম (ডেইলি সিলেট ডট কম :: প্রকাশিত হয়েছে : নভেম্বর , ২০১৪)

** Post modernity (উত্তরাধুনিকতা) আর অধুনান্তিকতা একগোত্রের ডিসকোর্স কিন্তু এক নয়। মডার্ন ভাবুকরা জ্ঞানকান্ডকে যে নিক্তি দিয়ে মাপতেন ‘সময়’ পোস্টমডার্ন ভাবুকরা সেটি খারিজ করে ব্যবহার করছেন ‘স্থান’। ’অধুনান্তিকতা’ পাশ্চাত্যের পোস্টমডার্ন ডিসকোর্স বা প্রতর্কের বাংলার স্থানিক কাউন্টার প্রতর্ক (অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ডিসকোর্সের পরিভাষা ’জ্ঞানভাষ্য’ প্রস্থাব করেছেন)।