হোম গদ্য অতল ঘুমের ভেতর

অতল ঘুমের ভেতর

অতল ঘুমের ভেতর
170
0
11103513_922605221117933_106193906_o
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

কাছে গিয়ে বললাম, আমি জীবনানন্দ দাশের দেশের লোক। কবি। নাম শুনেছেন

কোথায় যেন হাঁটছি। ঝিরিঝির বৃষ্টি হচ্ছে। আমার সঙ্গে আরো তিন জন। সবার সঙ্গে ছাতা আছে। না ছাতা, না রেইনকোট, আমার কিচ্ছু নেই। ওদেরকে আমি চিনি না। রাস্তা সব অপরিচিত। বুঝতে পারছি, রাত নেমে এসেছে পুরো তল্লাট জুড়ে। ছিমছাম সব, বাড়িগুলো যেন ঊনিশ শতকের। ল্যাম্পপোস্টগুলোর বাতি সাপের ফেলে যাওয়া ত্বকের মতো, খুব বেশি উজ্জ্বল নয়। আমরা হাঁটছি। চার জন। কেউ কোন কথা বলছে না।

অপরিচিত তিনজনের মধ্যে আরো দুটি মিল খেয়াল করলাম। সবার চুল ব্যাকব্রাশ করা। ফর্সা শরীরের উপর কালো স্যুট পরা। না-আলো না-আঁধারের রাত্রিতে ওদেরকে আমার মনে হচ্ছে ফ্রানৎস কাফকার স্বপ্ন থেকে উঠে আসা বাস্তবতা। হাঁটতে হাঁটতে একটা ক্যাফের দেখা মিলল। ওরা তিনজন ক্যাফেতে ঢুকে গেল। বুঝলাম, ওরা একে অপরকে চেনে। কৌতুহলে আমিও ঢুকে গেলাম ক্যাফেতে, যদিও আমার পকেট ফাঁকা। একদম গড়ের মাঠ। মাসের শেষ দিন।

কোণার একটা টেবিলে বসেছে ওরা। লোকে গিজগিজ করছে না ঠিক। কিন্তু ক্যাফেতে নিশিকাতর মানুষ কমও না। তিনজনের একজন বলছেন, কবিতা কেবল আবেগ নয়, এক প্রকার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়া কবি একটা পৃথিবী গড়ে তোলেন, আমরা অজ্ঞাতেই তার দিকে এগিয়ে যাইতাঁর কথাটা আমার ভালো লেগে গেল। কাছে গিয়ে বললাম, আমি জীবনানন্দ দাশের দেশের লোক। কবি। নাম শুনেছেন? জীবন বাবু লোকটা বড় কবি। লোকটা তাঁর কবিতা দিয়ে একটা পৃথিবী গড়ে তুলেছিলেন। আমরা সেই পৃথিবীর দিকে ক্রমশ ধাবমান, পড়েছেন তাঁর কবিতা? ওই যে! যিনি লিখেছেন, ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন‘। পড়েছেন কখনো?

ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। বুঝতে অসুবিধা হলো না, ‘বোধ’-এর কবিকে এরা পড়ে নি। ওদের একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করল, কবিতায় ‘আমি’ ব্যাপারটা কি অদৃশ্যের যাজক হতে পারে? তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমি’ কবিতাটা। আমারই চেতনার রঙে পান্না লো সবুজ/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে/ আমি চোখ মেললুম আকাশে,/ জ্বলে উঠল আলো/ পুবে পশ্চিমে আহ! কি পঙক্তি! এর চাইতে ‘আমি’ আর অদৃশ্যের যাজকতা কি আছে? তাই আমি আগ বাড়িয়ে বলে ফেললাম, অবশ্যই। পৃথিবীর সকল কবি—সে হোক যত বড় বা পাতি কবি, অদৃশ্যের যাজক হয়ে প্রচুর কবিতা লিখেছেন। সবাই স্বীকার করে নিল কথাটা।

কবি ও কবিতা নিয়ে আড্ডা ক্রমশ জমে উঠল। ওদের একজন বলল, সবার থেকে সরে এসে, নিজেরও থেকে সরে এসে, নিজেকে আমি মুক্ত করতে চাই একান্ত মনে, আর রাত্রির এই নীরব বিজনে নিজেকে নিয়ে গর্বও করি একটুকজন সঙ্গী আছেন। তবু তার কাছে রাত্রি বিজন। হয়তো প্রত্যেক মানুষই এমন। অনেকের সঙ্গে থেকেও নিজের ভেতরে একা থাকে। সেই বিজনে চলে নিজেকে ভাঙা-গড়ার খেলা, মুক্তির উৎসব আর সৃষ্টির উল্লাস। কথায় কথায় জানতে পারলাম, লোকটার নাম মাল্টে।

ফ্রানৎস কাফকাই তো! আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাচ্ছি

ইনি কি রাইনার মারিয়া রিলকের মাল্টে? রিলকে যার ভেতর নিজেকে ভাঙচুর করেছেন। আর লিখেছিলেন, হে আমার ঈশ্বর! দাও আমাকে এমন কয়েকটি মহৎ কবিতা লিখবার প্রসাদ, যাতে নিজেকে আমি বোঝাতে পারি, আমি ন্যূনতম মানুষ নই, যাদের ঘৃণা করি তাদেরও চেয়ে নিচু নই আমি এই লোকটাকে তো অনেকে ঈশ্বর মানেন, কবিতার অন্যতম ঈশ্বর! তাঁর সঙ্গে দেখা হলো আমার? শরীর থরোথরো কাঁপছে আবেগে আর অবিশ্বাসে।

লোকে তাহলে এখানে বাঁচবার জন্য আসে? আমি বরং ভাবতাম যে মৃত্যুর জন্যই এখানে আসে তারা আহা! মাল্টের সেই কথাটা, সেই প্রশ্নটা আমি কতবার করেছি নিজেকে! আর উত্তর পেয়েছি, লোকে পৃথিবীতে আসে বেঁচেবর্তে মরে যেতে, মরে যেতে যেতে বাঁচার আফসোস সঙ্গী করতে।

বিজনে নিজেকে নিয়ে মাল্টের গর্ব করা আর আত্মমুক্তির বক্তব্য শুনে ওদের একজন বলে উঠলেন, নিজেকে খুলে দাও তবে বেরিয়ে আসুক মানুষটা শ্বাস নাও বাতাসে আর নীরবতায় আরে! এ কথা তো কাফকা ছাড়া আর কেউ বলে নি! হ্যাঁ, ফ্রানৎস কাফকাই তো! আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাচ্ছি। এবার যেন অবিশ্বাসে বরফের মূর্তি হবার যোগাড়।

এক সময় ক্যাফে থেকে বের হয় ওরা। তিন জন চলে যাচ্ছে তিন দিকে। একজনের পিছু পিছু হাঁটছি আমি। সেদিকে ওর কোন বিকার নেই। সে হঠাৎ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। তখনো বৃষ্টি ঝরছে। দাঁড়িয়ে লোকটা নিজেকেই যেন বলল, আমারই দেখায় তুমি দেখো, আমারই শোনায় তুমি শোনো ওহ মাই গড! এ যে ওয়ালেস স্টিভেন্স!

হঠাৎ আমার শরীর কেঁপে উঠল! ত্বকে কে যেন দিয়ে গেছে মাঘের শীতানুভূতি, চোখ মেলে দেখি রাত তিনটা। বাইরে বৃষ্টির শব্দ। এর আগে আমি জেন কেলির ‘আই য়্যাম সিঙিং ইন দ্য রেইন…জাস্ট সিঙিং ইন দ্য রেইন…হোয়াট অ্যা গ্লোরিয়াস ফিলিং…আই য়্যাম হ্যাপি অ্যাগেইন…’ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম; তখন জানালার বাইরে উন্মত্ত হাওয়ার হাসি…

 

৩০.০৪.২০১৫
রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়

Latest posts by রুহুল মাহফুজ জয় (see all)