হোম কবিতা ‌’সমুদ্রপৃষ্ঠা’ উল্টে দেখা

‌’সমুদ্রপৃষ্ঠা’ উল্টে দেখা

‌’সমুদ্রপৃষ্ঠা’ উল্টে দেখা
305
0

এক দশক আগে প্রকাশিত জাকির জাফরানের প্রথম বই সমুদ্রপৃষ্ঠার প্রথম পাঠপ্রতিক্রিয়ার কথা এখনো মনে পড়ছে—আলাদা আলাদা অনুভবের সেই একক কবিতাগুলো; ব্যক্তিগত দুঃখবোধে আলাদা—খণ্ড খণ্ড; অবশ্য লতায়-পাতায়-জড়ানো একপ্রকার দূরসম্পর্কের অখণ্ডতাও আছে, যার বিষয় : প্রেম।

এই প্রেম কোনোভাবেই পরমার্থ-সন্ধানী নয়, বরং উদ্দিষ্টার বেশ ঠাটবাট আছে, এবং সশরীর। তবু আমার কাছে এ-কবিতার আকর্ষণ প্রেমের জন্য নয়, অন্তরালের কৌতুকের জন্য; এ-কৌতুক হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে খেলা-করবার সাহসী কৌতুক। রক্তপাতের পরে ব্যথিত হৃদয়ে উদ্দিষ্টার সমর্থন লাভের আশায় তারই মুখে সবার পক্ষে একথা কি বসানো সহজ হবে যে : ‘জাকির ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না।’

এছাড়া যখন পড়ি তার অপ্রাপ্তবয়সী প্রেমিকা ‘জাসদের মতো’ দৌড়ে আসে তখন উপমানের যৌথ-স্মরিত অভিজ্ঞতায় না পৌঁছেও কি মনে হয় না যে, এ-ও আসলে কৌতুক, দূরকল্পনা নয়—জাফরানি কৌতুক?

আমার এ ‘দেখা’র নির্ভুলতার প্রমাণ হলো ‘পায়ে বাঁধা দুটি সর্বনাম’ কবিতাটি, যার প্রথম বাক্য ‘নিচু এ কৌতুকে আজ মজে গেছে মন’, বইয়ের নাম শব্দবন্ধ ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ও রয়েছে এ-কবিতায় : ‘চোখ যেন সমুদ্রপৃষ্ঠা’। অন্যত্র সে-ই আবার প্রেমইশকুলে ‘বেদনা বিভাগ’ খুলে বসে আছে, আর তারই আনত ছাত্র, জাকির, অধরা যোনীর নিচে বসে রহস্যনাচ দেখছেন সারারাত…

পাঠক, একবার সমুদ্রপৃষ্ঠা পড়া শুরু করলে দেখবেন এই ব্যথিত ছাত্রের ব্যথায় আপনিও নিরুপায়।

মোস্তাক আহমাদ দীন

কবিতা মূলত মানুষের কাছে জীবনের মুখোমুখি হবার জন্য এক মাধ্যম। কবিতায় জাকির জাফরান সত্য সম্পর্কে  তাঁর একান্ত ব্যাক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা কতটা অন্তরঙ্গভাবে প্রকাশ করেছেন, তারই ছাপচিত্র ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ কাব্যগ্রন্থ। মা’ সম্পর্কিত কবিতায় জাফরান যখন লেখেন, ‘পাত্রে পাত্রে মশলার দ্বীপ—/ আমি ভিজে যাচ্ছি ঘ্রাণে/ আর নৌবহরের মতো ভেসে চলে মা’র চুল/ স্তিমিত বাতাসে; এমন সব চিত্র আর চিত্রকল্পের সরল বুননে জাকির যেন দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে নিয়ে যান পাঠককে। প্রস্তুতিপর্বের কাব্য হলেও ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’য় এমন কিছু কবিতা রয়েছে যা জাফরানের কাব্যভাষাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে, এবং বিস্ময়কর হলেও সত্য যে প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতা থেকেই একজন তরুণ কবি তাঁর নিজস্ব একটা স্বর ও বাকপ্রতিমা নিয়ে দীর্ঘপথ চলার আয়োজনকে চিহ্নিত করেছেন। একটি চিরায়ত বাউল মনও কবিকে তাড়া করে—কবিহৃদয় অগত্যা বলে ওঠে “আর কভু দক্ষিণে যাবো না আমি/ আর নয় করুণ এ সমুদ্রস্নান/ দক্ষিণে মনের কবর/ দক্ষিণে বেদনা জাগে/ তাই দেখো উত্তরাস্য তোমার জাফরান/ উত্তরে প্রেমের পাহাড়/ উত্তরে রোদস্য পাখি/ এই আজ ভালো—/” সত্যিই কবি জাকির জাফরান প্রেমের নদী সুরমা পাড়ের ছেলে। হাছন রাজা আর শাহ আব্দুল করিমের উত্তরসূরি হয়ে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে অন্য এক বাকবিভূতির দেশে নিয়ে যাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

শামীম রেজা

যদি বলা হয়, একটি কবিতার জন্যও একটি কবিতার বই কেনা যায়, তাহলে ‘চিঠি’ তেমন একটি কবিতা। যদি বলা হয়, দুইটি কবিতার জন্যই একটি কবিতার বই কেনা যায়, তাহলে ‘চিঠি’ এবং ‘মা’ তেমন দুইটি কবিতা। যদি বলা হয়, তিনটি কবিতার জন্যও একটি কবিতার বই কেনা যায়, তাহলে ‘চিঠি’, ‘মা’ এবং ‘না-বিহঙ্গের আকাশ’ তেমন তিনটি কবিতা। জাকির জাফরানের সমুদ্রপৃষ্ঠার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কবিতার নাম উল্লেখ করলাম। ধারাবাহিকভাবেই এমন অনেকগুলি কবিতার কথা বলা যাবে, যার জন্য এই বইটি পাঠকের সংগ্রহে থাকা উচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠার প্রথম সংস্করণেই জাকির হৃদয় কেড়ে নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় সংস্করণ আসছে, পরিমার্জনাসহ। সুতরাং আরও পরিণত, অবশ্যপাঠ্য একটি বই পেতে যাচ্ছি—সন্দেহ নেই। আরও আনন্দের সংবাদ যে, নতুন কিছু কবিতা যুক্ত হচ্ছে এই বইয়ে। এখন গভীর কিছু রাত আলাদা করে রেখে দেওয়ার অপেক্ষা বইটির জন্য, জাকির জাফরানের জন্য। শুভকামনা।

রাসেল রায়হান

“তোমাকে দেখাবো আজ রাত্রির নাভির নিচে ভাসমান ভোর”

কিংবা

“গোলপুকুরের নিস্তরঙ্গ জলে তুমি ছিলে ঘাই তোলা মীন”

এই রকম পঙ্‌ক্তির মধ্যে চোখ আটকে যায় সমুদ্রপৃষ্ঠা পাঠ করতে গিয়ে। যদিও এই ধরনের বাক্য প্রক্ষেপণ বইয়ের মূল প্রবণতা নয়। কিন্তু এটাই যেন ভরকেন্দ্র। পুরো কাব্যের ভাববলয়কে ধরে আছে পোক্ত করে, আমি এবং তুমির কথোপকথনে যার বিস্তার, শাখা-প্রশাখা প্রসারিত। যদিও উপরিতলে স্বগতোক্তির মতো। কিন্তু প্রচ্ছন্নে অস্তিত্বমান দুটি সত্তা। আপাত একটি সক্রিয়, অপরটি নিষ্ক্রিয়। একজন নিজের সত্তা ও অনুভবকে দৃশ্যমান করে তোলেন ভাষা ও বাক্যের রূপকে। অপর সত্তা সেই প্রকাশের উপায়। যদিও সে কেবল আশ্রয় হিশেবে থাকে না, বর্ণনার মুন্সিয়ানায় তারও একটা অবয়ব তৈরি হয়। তখন মজার কাণ্ড ঘটে। বর্ণনার রেশ কেবল বাক্যের মধ্যে বা বর্ণনাকারীর অনুভবের মধ্যে ফুরিয়ে যায় না, অপর সত্তাকে ধরার আকুলতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এই কাব্যের শেষে ‘প্রিয়ঝু’ শব্দের মধ্যে কবি তাকে মূর্তি দিতে চাইলেও (জাকিরের ভাষায় যে ফার্ন উদ্ভিদের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে), তার আগেই পাঠক নিজের মতো করে তাকে কল্পনা করে নেন। ফলে যা আদতে কবির, কিন্তু তাতে পাঠকের ভাগ বসানোর সুযোগ তৈরি থাকে।

কোনও টেক্সটই মূলত প্রণেতার একার নয়। এর পেছনে থাকে যৌথ অবচেতন। ভাষা জনগোষ্ঠীর আচরণ ও অভ্যাসের বলয়ভুক্ত হয়ে নিজের সাইন বা কোড তৈরি করে নেয়। ব্যক্তিমানুষ ঐ সকল সাইন বা কোডের দ্বারস্থ হন মানুষ এবং ভাষার এক স্বয়ংক্রিয় চুক্তির মাধ্যমে। সেটা ঘটে খুবই স্বতঃস্ফূর্তভাবে। যদিও এটা তৈরি হয় বহুদিনের চর্চার ধীর প্রক্রিয়ায়। ফলে জাকির জাফরানের সমুদ্রপৃষ্ঠায় ভেসে থাকা নুন বা মীন যতই ব্যক্তিলগ্ন মনে হোক খোলা চোখে, সেটা আর জাকিরের থাকে না। জাকির যতই বলুন—

দুটি বাক্য জুড়ে দিও, বলিও তোমার প্রেম
বলিও জাকির জাফরান চিরদিন বৃথা যায়, বৃথা গেল।

এখানে অন্য যে কোনো নাম বসিয়ে দেয়া যায় বা পাঠক নিজের নামটাও বসিয়ে দিতে পারেন। কেননা এই অনুভবের ভাগীদার তিনি একা নন। এটা সমগ্রের। তিনি এর বর্ণনাকারী বা উপস্থাপক মাত্র। ফলে যে ‘সংবেদনার রক্তে’ জাকির জবুথবু হন, তাতে পাঠকও রঞ্জিত না হয়ে পারেন না।

সমুদ্রপৃষ্ঠায় এভাবেই ভেসে থাকে সহস্র অনুভব প্ল্যাঙ্কটন। যেগুলো জন্ম নেয় অতল কোনো মহাদেশের গর্ভে। এখানে সমুদ্র যেন মানব-মনেরই রূপক, যা জাকির কিংবা কেবল জাকিরের নয়।

মিষ্টি সুর ঘন সিরার মতো ঘনীভূত করে বাক্যের শরীর নির্মাণ করেন জাফরান। অল্প শব্দে, ছোট ছোট বাক্যে মিতব্যয়িতাকে আত্মস্থ করে অনুভবের লাগাম টেনে রাখেন তিনি। প্রগল্‌ভতাহীন এই উচ্চারণ মৃদু ও সরস। ফলে কবির মনোজাগতিক ক্রিয়ার স্পর্শলাভের পাশাপাশি আরামপ্রদ পাঠ এখানে বাড়তি পাওয়া।

মোস্তফা হামেদী

‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ থেকে দশটি কবিতা


দুঃখ

রাতের প্রতিভা-কণা তুমি
কত না সহজে তুমি খেয়ে ফেলো ভোর।
ভোরের আলোতে শ্লোক ভেঙে
লোকালয়ে নেমে আসে বাঘ।
দুঃখকে লুকিয়ে রাখি আমি
রক্তের ভিতর,
আর বলে ফেলি, মামা,
আমাদের ঘরে কোনো হরিণ ঢোকেনি।

 

চিঠি

আজ বাবা অঙ্ক শেখাচ্ছিলেন
বললেন, ধরো, ডালে-বসা দুটি পাখি থেকে
শিকারির গুলিতে একটি পাখি মরে গেল
তবে বেঁচে থাকলো কয়টি পাখি?

অঙ্কের বদলে এই মন চলে গেল
বেঁচে থাকা নিঃসঙ্গ সে-পাখিটির দিকে
আর মনে এল তুমি আজ স্কুলেই আসো নি।

 

সংবেদনা

দল বাঁধিয়াছি কালো চোখের অক্ষরে।

পরিচয় দিবসের ঘ্রাণে
সংবেদনার রক্তে আমি জুবুথুব, মহাকাল!
লাজুক ধানের মতো ছাত্রী ভেসে আসে।

বই খাতা হাতে
রুল-করা আকাশের দিকে চোখ, আর,
একটি মাছ ভালোবাসে একটি পাখিকে।

 

স্টেথো

নিজেরই নাভিতে যে এত ঘ্রাণ
হরিণ তা জানে না।
ক্লাস শেষে তোমার ত্রস্ত ছোটাছুটি—
আরজুটা কি চলে গেল!
এস বি স্যার কি রুমে আছে!
অথচ আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, স্টেথো,
তুমি তা দেখেও দেখলে না।
তারপর চলে গেলে তুমি—
তোমার সে প্রস্থান-পোড়া ছাই থেকে
জন্ম নিল পাখি।


কতদিন তোমাকে দেখি না! স্টেথো, এতদিন
পরে তুমি এলে! মিথ্যে এ চাঁদের নিচে
তুমি ছাড়া কেউ নেই, কেউ নেই,
একটি শালিখে ডুবে আছে দেহ,
আজ ফার্ণ উদ্ভিদ সেজে বসে থাকা ভালো।
ব্যথিত বাক্পুঞ্জের দেশে
পঞ্চমী-চাঁদের রক্তে দেখা হলো ফের,
এসো তবে, নিশীথের নিচে
কিছুক্ষণ পা বাঁচিয়ে খেলি। তারপর একটু একটু করে
পরস্পরকে ঘৃণা করতে শিখি।

মনে পড়ে?
তোমাকে স্পর্শের আলো একদা ছড়িয়ে পড়েছিল জলে
ফার্ণ উদ্ভিদে আর থানকুনি পাতার সমাজে। মনে পড়ে?
আজো দেখো, কোনোদিন চিঠি না-আসা দ্বীপের মতো
জেগে আছে চোখ

নিষ্ঠুর সূর্যাস্তে বুঝি মুখ বদলেছ তুমি।

 

পায়ে বাঁধা দুটি সর্বনাম

নিচু এ কৌতুকে আজ মজে গেছে মন

বিস্তৃত অনাগ্রহের প্রতি উড়ে এল মেঘ
তোমাকে জড়িয়ে ধরে মনে হলো ধান
মনে হলো উৎসব : জন্ম ভেঙে
                           দূর দূর অন্ধ দ্রাঘিমায়

নিচু ক্লাসে পড়ো! আহা!
চুলে এত রৌদ্র-কুমকুম, চোখ যেন সমুদ্রপৃষ্ঠা,
টেনে নাও আমাকে তোমার ছত্রে ও ছায়ায়

পায়ে বাঁধা দুটি সর্বনাম, পাখি উড়ে যায়…

 

একদিন আমি আর মফিজ

এমনভাবে তাকালো মফিজ
যেন প্রস্তরযুগ ফিরে এল পৃথিবীতে,
যেন তার যুদ্ধ-দেখা চোখ মানুষ চেনে না।
আমি বললাম ভালো করে চিন্তা করো তো মফিজ,
ভাবো তো মশারির ভিতর মশা ও মানুষ।
সঙ্গে সঙ্গে মুখ বদলালো মফিজ
তার মুখে ফুটে উঠল চিন্তার রেখা
ভাবতে লাগল সে—মশারির ভিতর মশা ও মানুষ,
মশাটি মুখ রাখছে শরীরে
আর প্রতিটি রক্তাক্ত চুম্বনের পর জেগে উঠছে মানুষটি।
কিন্তু এ কী! আজো দেখি সেই রক্ত মোছে নি ভালোবাসা।

 

জল

আয় পাখি, পাখি আয় যুদ্ধংদেহী,
হৃদয়-চূর্ণের প্রতি আয়।
বলেছি সমুদ্রে সমর্পিত আমি, তবু
সুদূরের জল সংগোপনে আমাকেই খায়।

মিথ্যে এ চাঁদের দেশে, চন্দ্রঘুঘু জানে
কতটা হৃদয় মরে গেছে, কতটাবা অবিনাশী,
তোর চোখে কোনো অক্ষর নেই
রক্তে নেই কোনো নিঃসঙ্গ ঘটনা
তবু বারবার, অকারণে, আমি তোকে ভালোবাসি।

 

দ্বিরালাপ

রাত্রি গাঢ় হলে
তোমার শরীর নিয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করি
আর বলি, তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে রাত,
চুল খোলো রাত্রি-পরিখা
যুদ্ধক্ষেত্র প্রসারিত হোক।

পরে তুমি ডানা মেলে দিলে
আমি তাতে মুখ গুঁজে থাকি
যেন মেঘের ভিতর ঢুকে গিয়েছে বিমান বাংলাদেশ।

 

অস্তিত্ব বিষয়ক

এসেছি শিরস্ত্রাণ পরে, দুটি চোখে পাখি,
চেনা যায়?
—কে গো তুমি?
আমি জাফরান, তোমার পশ্চাদভূমি
—কেন এলে?
আয়ুর কৌটায় দাঁত বসাতে এসেছি
—কিন্তু দাঁত তো ফেলে এসেছ বেদেনির ঘরে

 

বিয়ে, প্রীতিধারা

মেঘে মেঘে সংঘর্ষের কালে, কোথা ছিলে?
কোথা ছিলে, সব ধান খেয়ে গেল বরিষণ।
দূরের মহিলা এসে দেখে গেছে—
ছেলে ভালো, প্রভাষক,
মনে শুধু ব্যথার কঙ্কণ।