হোম কবিতা হোসেন দেলওয়ারের সাতটি কবিতা

হোসেন দেলওয়ারের সাতটি কবিতা

হোসেন দেলওয়ারের সাতটি কবিতা
650
0

পেশায় চিকিৎসক। দশকের হিশেবে তিনি আশির দশকের কবি।
লেখালেখিতে ফিরেছেন একটা দীর্ঘ মধ্যবিরতির পর। সম্পাদনা করছেন ‘কবিতাপত্র’ নামে একটি নান্দনিক সাহিত্যপত্রিকা। কবিতার কাগজগুলির মধ্যে এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে নিয়মিত। এবং জনপ্রিয়ও বটে। সাহিত্যে প্রত্যাবর্তনের পর এ যাবৎ তাঁর প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি। 

আজ ৩০ এপ্রিল ২০১৬, কবি হোসেন দেলওয়ারের বয়স ৫৩ বছর পূর্ণ হলো। ‘পরস্পর’-এর পক্ষ থেকে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। পাঠকদের জন্য তাঁর সাতটি কবিতা…


অভিষেক

মনে হয় পুষ্পভারে আছি
.                        জগৎ-জঞ্জাল
প্রজাপতি শীর্ষরোদে রেখে
এইমাত্র যে পাখিটি উড়ে গেল
তার ঠোঁটে শুরুর সঙ্গীত
তার ছায়া উড়ে উড়ে ছায়াহীন হয়ে গেলে
মেঘদ্রাঘিমায় জলের সংকেত খুঁজে পায়
তবু জল ছুঁয়ে যে বালক তৃষ্ণা-তির ছুড়ে দেয়
নির্বাণের আগে তার চোখে খেলা করে অলৌকিক রোদ

তখন নবীন কোনো কাকতাড়ুয়ার
.                       অভিষেক-ঘণ্টা বেজে ওঠে

 

মায়াঝিল!

যমুনা!
যমুনা!!
কেউ বলে বাসনার ঢেউ…

এই দেহ জলের মন্দির—অর্ধেক ডুবে থাকা হিজল ফুলের পাশে লিখে রাখে ডাকনাম—পেতে রাখে ছায়াছিপ—ভুলে যায় ফেউ—ফাৎনা তার ভেসে যায় ঢেউয়ে…

কলাপাতা, ছেঁড়া তাবু—যাতনাজারুল

এই তবে জলের ঝরোকা—মেঘশীর্ষে ঝুলে থাকা রোদে জলের বুদ্বুদ মাখে হাওয়াই-ফড়িঙ। এই ঝিল পেরোলেই হলুদের বন—শেষ বাঁকে তার নবজাতক এক সাপকে পাহাড়া দেয় সহস্র ময়ূর—মমতা-উল্লাসে কোথাও নাচমহল জেগে ওঠে—হাওয়ায় হাওয়ায় নাগিনীর শিস শোনা যায়…

হারানো নথের খোঁজে এই ঝিলে কেউ কেউ আসে—ফিরে আসা বালিকারা কোনখানে খুলে রাখে পায়ের নূপুর?

 

ভাইফোঁটা

আবার আসবো কিনা ভেবে দেখা যাক। কতদূরে যাওয়া তবে সংশয়-ফাৎনা ফেলে রেখে দ্বিধাহীন এই আসমুদ্র দোলাচলে

দোলপূর্ণিমার রাতে চুপিসারে ফোটে যে দোলনচাঁপা তার আরতি কতটা আকুল শুকনো পাতা ঝরে পড়বার আগে লিখে রাখে তা। কোথাও বজ্রপাত হয়—সহসা বৃষ্টির ছাঁটে বাদামের ডালে লুকিয়ে থাকা বাঁকানো ফিঙের লেজে কতটা জল চুইয়ে চুইয়ে পড়ে এই দৃশ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বৃক্ষের কোনো অভিযোগ নেই

বেদুঈন মাছি কেবল পরিহাসপ্রিয়। শীতঋতু চলে গেছে কতদিন দেখা নাই তার সাথে। হলুদ শস্যের ক্ষেতে এলিয়ে পড়া ঢেউ তবে কার প্রতীক্ষা করে?

খড়কুটো নয় ভাইফোঁটা ঠোঁটে নিয়ে উড়ে আসে কোন পাখি?

 

শীত ও শীৎকার

সমুদ্রের নাভি ছিঁড়ে জন্ম নেয়া এই ঢেউ অস্ফুট আক্রোশে আছড়ে পড়ে তীরে যেন স্বরভঙ্গ কোকিলের শোকে মাতৃহারা পাখিটির কামনাক্রন্দন; নিরুত্তাপ বেলাভূমি। লগ্ন পার হয়ে গেলে আলগ্ন পিপাসা তুলে মৃৎপাত্রে পড়ে থাকে জল

প্রথম মৃত্যুর শেষে আদিম রাত্রির রেশ হাবিলের চোখে, যখন ঘুম না আসে ক্লান্তির সফেদ জুঁইফুল ঝরে অগোচরে, বিভ্রমের নেশা তুলে বয়ে যায় আয়ুষ্মান পাখিদের নদী।

ভিজে যাই দীর্ঘ স্রোতে— নখশীর্ষ ছুঁয়ে ধীরে ধীরে উঠে আসে শীত ও শীৎকার

 

ঘাম

বুঝি দ্বিমাত্রিক দাহ           রন্ধ্রমূলে ফুটে থাকো
রোদের উৎসবে
নুনসাগরের জলে ভাসমান রুদ্রাক্ষের পুতি

ধমনীর ভিত ছুঁয়ে তার অনাদি ভ্রমণ
রক্তস্বল্পতায় কাতর জমিন
তবু প্রাণপনে অম্লজান নেয়ার আশ্বাসে
মুখোমুখি অস্তিমান দ্রোহ

রোদফুল তুমি ফুটে থাকো রন্ধ্রের বাহিরে—
ভেতরে উল্লাসধ্বনি
ভেতরে ভাঙচুর
অবিরাম ভাঙনের স্রোত নিয়ে নিরন্তর বয়ে চলে
.                                  রক্তের জলধি—
আর তুমি প্রস্বেদনে পরিশ্রুত করে দিয়ে মানবজমিন
.                                  যেন পর্ণমোচী জলজ-উদ্ভিদ
রক্তদানা থেকে শুষে নিয়ে বিষবালি
নীরক্তের শীর্ষে বসে থাকো         মেঘবিরহের মালী

 

জ্বর

.
Just we want the moon
.            And
there is no bird
.

জ্বর নেমে যায়
কিভাবে নামে
ভেজা পারদের গায়ে লেগে থাকা
ছোপ ছোপ ঘামের উত্তাপে নামে

চন্দ্রসন্ধ্যা পাখিহীন মৌন অবসরে
ছিপি খুলে নিলে যেটুকু তরল
আচম্বিতে পড়ে যায়
দীর্ঘশ্বাসে তা লুফে নেয় অপ্রস্তুত মাটি
যেন মশরুর ব্যাবিলন নগর ছেড়ে নেমে আসে পরাগের নদী

ফলে ভাসমান শূন্য হতে এ ভূমি রোদে পুড়ে যায়

 

সাঁতার জানে না নদী

পলাতক পাখি পালকে কুয়াশা ভরে নিলে
উড়ে যায় দিগন্তের চিল
নিশিস্রোতে ভেসে যায় দীর্ঘ সব মাতাল দেবদারু

দূর বনগ্রামে বনময়ূরের ডাকে জমা হয় মেঘ

প্রতিটি বৃষ্টির পর পরিত্যক্ত জলে
পিঁপড়ের আশ্রম ভেঙে গেলে গাঢ় হয় রাত
জাহাজডুবির পরে জেগে থাকে শুধু ঝিঁঝিঁর সাম্রাজ্য

জল ডাকা রাতে                      সাঁতার জানে না নদী

হোসেন দেলওয়ার

হোসেন দেলওয়ার

জন্ম ৩০ এপ্রিল ১৯৬৩, ঝালকাঠী। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক এবং নিপসম থেকে পরিবেশ-স্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর। শিশুস্বাস্থ্যে DCH। পেশায় চিকিৎসক।

প্রকাশিত বই :
হরিণনিদ্রার নাচ [কবিতা, ২০১১, কবিতাসংক্রান্তি]
অন্তরীক্ষে রোদের বাগান [কবিতা, ২০১৩, অগ্রদূত]
কাচঘরে বিষাদজোনাকি [কবিতা, ২০১৩, কবিতাপত্র]

সম্পাদনা : কবিতাপত্র [ছোটকাগজ]

ই-মেইল : delwarkabita@yahoo.com
হোসেন দেলওয়ার

Latest posts by হোসেন দেলওয়ার (see all)