হোম কবিতা হুজাইফা মাহমুদের কবিতা

হুজাইফা মাহমুদের কবিতা

হুজাইফা মাহমুদের কবিতা
453
1
11045702_910545772323878_1175589692_o
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

শালবন

অশ্রুত এক গান যেন, খেলা করে আমার হৃদয় নিয়ে
শ্রুত কিংবা অশ্রুত এক গান, যেন ঘুমন্ত আত্মাকে নিয়ে
যায় ধূসর আয়নার দেশে,
আর সেইসব তন্দ্রাচ্ছন্ন কাঠের জানালার পাশ দিয়ে
আমি কখনো যাই নি দুপুরের শালবনে
যেসব জানালা প্রায়শ কপাট ঝাপটে উড়ে যায় বিগত হেমন্তের দিকে
যেখানে আমাকে নিয়ে এক অনর্থক হাসিবোধ ছড়িয়ে পড়েছে
অনূঢ়া পাখিদের মুখে মুখে, যেহেতু তারা ভাবছে
বিকেলের লেবুবাগান এক সুগন্ধি কৌ্তুক বৈ কিছু নয়।

অথচ আমি জানি না তাদেরও মেঘভর্তি এক স্নানঘর আছে,
পশম তোলার মরশুম, হাওয়ায় ফুলে ওঠা দিনে,
পশম-সম্ভবা ভেড়াদের গ্রামে যাই,
আর নাশপাতি বনে, নিমগ্ন যে বেহালা বাদক,
তাকে ঢেকে দিচ্ছে দীর্ঘ কাজু বাদামের ছায়া।


পালকের
ব্রিজ

আরও দূর, ওই উদ্বাস্তু পাখিদের পালকের ব্রিজ
ডুবে গেছে সূর্যাস্তের নিচে, তারও নিচে মেঘস্তূপ,

পৃ্থিবীর সব কাচঘর একযোগে সন্ধ্যা হয়ে গেলে
যেন মৃতদের শহরে জেগে ওঠে এক বিষণ্ন আর্তনাদ,
আমরা তাই ভাবছি, যা ছিল আমাদের উত্তর সমাধির
এপিটাফ লিপি, একজন শববাহক যা ভাবে, ধূপগন্ধ।

আর অর্ধবৃত্তের ভিতর বিলীন বিন্দুর একাকিত্বে
ফুঁপিয়ে কাঁদছে একটি অসুস্থ নারী-জেব্রা
তার দীর্ঘ অনিদ্রা থেকে জন্মানো ক্ষতে জমে আছে
চাঁদডোবা রাত্রির হলাহল, তিনটি অন্ধ প্রজাপতি,
তাদের বিকল ডানার ঝাপটায় দুলে উঠছে
আমার মনস্তাপ, অবিশ্বাস একটি আঁধার জড়ানো তুঁতগাছ।


বোধ
বসন্ত

যেদিকে ইঙ্গিত করে বিকল কম্পাসকাঁটা,
সেদিকে হারানো সরাইখানা, পরিত্যক্ত আস্তাবল
কালো টাট্টু সমেত উপনীত হই যবে ধূসর কমলাভূমিতে
ততদিনে ম্লান হয়ে গেছে তোমার শ্বেতপুষ্পের বাগান, মর্মর প্রাসাদ,
পথে পথে নির্জন তুলাবন, হর্ষনাদ,

কত ভঙ্গিমায় ওড়ে উদ্যানের পাতা
বিভিন্ন পবনের গতি, দুলে উঠে ছায়াবৃক্ষের ডালপালা
যেন পাহাড় পেরিয়ে আসে চার্চের ঘন্টারোল
যেন হৃদপিণ্ড একটি ঘুমন্ত ঘড়ির পেন্ডুলাম
এ কেমন বায়বীয় সু্র্যের দিন
ফুলে ওঠে পৃ্থিবীর স্তন
নীল রেকাবির ঘোটকী, সরিষা খেতের পাশে,
তার দেহ জুড়ে ছড়িয়েছে সোনাচূর্ণ রোদ
তার খসেপড়া ছায়া ঢেকে যাচ্ছে এলম পাতার নিচে
আহা, কী অন্যমনস্ক ঘোটকী তুমি
তোমার তন্দ্রাচ্ছন্ন সংজ্ঞার ভেতর
ঢুকে পড়ে কয়েকটি চড়ুই… অসংখ্য চড়ুই তোমার নিদ্রার ভেতর।


কারো জন্য এলিজি

তার হলুদ হৃৎপিণ্ড ঘিরে নৃ্ত্যরত লেলিহান শিখা,
আহা কী লাস্যময় আগুনের রূপ!
আর এক আহত বাঘিনীর পিঠে চেপে
প্রতিদিন ময়ূরের বনে সূর্য ডুবে যায়,
পৃ্থিবীতে নেমে আসে রবিবার রজনী,
ঘন তমিস্রার ভিতর কেঁপে ওঠা আঁখিপল্লব
গূঢ় অতীন্দ্রীয় ইশারা যেন,
রজঃস্বলা হরিণী ছুটে গেছে উপচানো প্রপাতের দিকে
পুনরায় ফিরে আসে পরাজিত রাজন্যের ঘোড়া
একাকী, আর অবসাদে নুয়ে-পড়া মাথা নিয়ে,
আর কী বিবর্ণ মৃত্যু নেমে আসে শ্বেত-পাথরের বাগানে,
কেঁদে ওঠে ঝরাফুল, শ্বেতগোলাপ

হিমাঙ্কের নিচে শোণিতে ছড়িয়ে পড়ে এক শীতল স্তব্ধতা,
আর ক্রমশ একটি গুঞ্জনরত বরফকল
হারিয়ে যাচ্ছে স্নো-ফলের ভিতর।


জাদুর
বেড়াল

যেন উল্টানো তাসের নিচে এক অচিন উদ্যান
সেথায় জ্যৈষ্ঠের রোদ গায়ে মেখে খেলা করে জাদুর বেড়াল,
আধো নিদ্রার ছায়ায় বেড়ে উঠছে বাদাম বৃক্ষ
আর উইন্ডমিলের পাখা চূর্ণ করে অমৌসুমি ফুলের ঘ্রাণ।

দেখো, এমত উতাল বাতাসে আমাদের হৃদয় বিকল হয়ে পড়ে,
খসেপড়া চোখ উড়ে যায় ঘ্রাণের উৎসের দিকে,
আমি পুনরায় আত্মার অভিমানের কথা বলি।
পুনরায় কান পেতে থাকি

প্রতিধ্বনিত বাতাসে তোমার কোনো উচ্চারণ খুঁজে পাই নি
কেবল ইন্দ্রিয় জুড়ে গজিয়েছে লাইলাক লতা।

 

হুজাইফা মাহমুদ

জন্ম ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৩। হবিগঞ্জ।

কবি। মাদ্রাসায় অধ্যায়নরত।

ই-মেইল : hujaifa.mahmud@gmail.com