হোম কবিতা হিমালয় জানার কবিতা

হিমালয় জানার কবিতা

হিমালয় জানার কবিতা
652
0

হারানো জন্তুরা

সে আজও বিস্ময় দিয়ে কী বানায়: পাখি

পাখিরা ঘড়ির মধ্যে থাকে

পাথরে, জলের নিচে, ছোটো ছোটো পঙ্‌ক্তি ঘুমোয়

বর্শার ছায়ায় তারা জেগে ওঠে উড়ুক্কু ধমনী

 

আমার ঘরের জন্তু। ঠিকানার ভুলে

চিঠির জাহাজ তাকে
ঘড়ির রসদ আর তুলো ভরে জনহীন
এক দ্বীপে নামিয়ে দিয়েছে

সে ঘুমের বৃষ্টিচ্ছায়া
অঞ্চল পেরোচ্ছে একা, চার হাতে-পায়ে…

আর আমি জেগে উঠছি বৃষ্টির ভেতর

 

সমস্ত না-লেখা চিঠি তার কাছে যায়

টিলার ওপরে উঠে
সূর্যাস্তের আগে

সেই সব চিঠি খুলে পড়তে পড়তে তার
শরীরের বড় বড় লোম

শান্ত ও কোমল হয়ে আসে

সন্ধ্যার তারাটির মতো

 

হাতে কোনো জন্তু নেই

মুঠোর ভেতরে
তুমুল হাওয়ার কিছু রাশ

পুরোনো জলের মতো চোখে কে তাকাল

শীতকাল: সন্ধে হচ্ছে

ফিরতে হবে কুয়াশা পেরিয়ে
এক মাঠ, এক ছেলেবেলা

 

বিকল হওয়ার ভয়
তাড়া করে, থেমে থেমে ডাকে,
দূর কোনো গলির ভেতরে
ঘুমন্ত বাড়ির নীল
ছায়া মেখে যন্ত্রের বিষাদ
হাতে উঠে এসে আর
নামতেই চায় না, কোন দিকে
আমাকে যে নিয়ে যাচ্ছে
ভেঙে-পড়া অতিকায় সব
টাওয়ার পেরিয়ে
খাঁ-খাঁ মাঠে
হারানো জন্তুরা

 

রোগা রোগা বাচ্চাদের
ঘুম জ’মে খিদের পাথর

কী সব ছত্রাক তার গায়ে
কত সব পোকা

সরাতে পারছে না কেউ
নড়াতে পারছে না এক চুলও

দিনদুপুরে রাস্তার ওপর

 

পুরোনো লোহার রঙ ঘাসে ঘাসে।

তন্দ্রাভূমি, জন্তুরা ঢুকেছে
কালো কালো পাইপের ভেতর।

বন্ধ কারখানার শেড। সারি সারি বিফল যন্ত্রের
স্তব্ধতার মধ্যে ওরা
কী শুঁকে বেড়াচ্ছে, দূরে
ওয়াচ টাওয়ার থেকে কেউ লক্ষ করছে না, কেবল
কেঁপে কেঁপে উঠছে মাটি বাষ্পচাপে, পেকে-ওঠা

অব্যবহারের ফল—ভেতরে জমাট-বাঁধা
মানুষের রক্ত, নীল শিরা-উপশিরা।

 

সে-সব পায়ের টুকরো
কুয়াশায় বনদেবীদের

তাঁদের জন্তুরা বাঁশপাতায় বরফ

শুঁড়িপথে টুপ টুপ লালা ঝরে পড়ে, সন্ধেবেলা

জঙ্গলের ধারে কাঠুরের
একমুঠো গ্রামে

তখন চুল্লির ধোঁয়া
পাকিয়ে উঠেছে সবে ছোটো ছোটো বাড়ির মাথায়…

 

লোহালক্কড়ের খেত পার হয়ে এসো

যেখানে ঘড়ির পাপড়ি ভেসে থাকে জলে
হাওয়া দেয় বিরামরঙের

কবেকার ভেঙে-পড়া যুদ্ধবিমানের পেটে
বাচ্চারা চোরপুলিশ খেলে

একটাই প্ল্যাটফর্ম
সারাদিন রোদ্দুরে ঝিমোয়

রাতের থ্রু-ট্রেন এলে জন্তুর সবুজ ক্ষত নড়ে…

 

১০

ব্যথার সপাং থেকে পাখিরা ছিটকোয়

পড়া-না-পারার শাস্তি এই
জ্বলন্ত জ্বলন্ত পাখি

আগুনের সামনে হাত, পাতা

পটপট শব্দ ক’রে কুঁকড়ে যায়,
ধোঁয়ার ভেতরে

দেখি আবছা, কাঁপা-কাঁপা,

আয়ুরেখা নেমে যাচ্ছে জল খেতে ঝকঝকে লেগুনে

 

১১

কিছু তো লেখার নেই, আঙুলে বৃথাই ছটফট

দুপুরের ভাতঘুম সেরে

আলো-কমে-আসা একটা ঘড়ির ওপর
রুমালচোরেরা আড্ডা দেয়

ঘাসে ঘাসে যে বিকেল গড়িয়ে গিয়েছে তার
গা থেকে জন্তুর লোম বাছে

হিসি করতে উঠে গিয়ে কেউ কেউ ফেরেও না আর

 

১২

তার লেখা শেষ হল রোদফুলে ভরা একটা মাঠে।

আঙুলের ফাঁকে কাঁপছে লুকোচুরি খেলার বাড়িটা,
আব্বুলিশ কাঠের জানালা…

দু’এক মুহূর্ত। ঘাসডগা
কেঁপে উঠবে, ফাঁকা, তারপর

পড়ে আসবে বন্ধুদের ছায়া দূরে দূরে…

 

১৩

সে আজও ফুলের কাছে প্রাণভিক্ষা করে,
পাতাদের মর্মর কুড়োয়

রোদ থেকে ঝরে পড়া রাশি রাশি বিয়োগফলের
ভেতরে চুপচাপ শুয়ে থাকে

মেয়েরা ঝুড়িতে ভরে সেই সব ফল নিতে এসে
ভাবে কোন গাঁয়ের ছেলেটা…

পাহাড়ি ঝরনার নিচে, সেই কবে, স্নান করতে নেমে
হারিয়ে গিয়েছে তার নাড়ি

হিমালয় জানা

জন্ম ১৯৮২, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর, ভারত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম ফিল। পেশা অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
ভূতের শহর থেকে [কবিতা, সপ্তর্ষি প্রকাশন, ২০১০]
ভুলে যাওয়ার আগে [কবিতা, সপ্তর্ষি প্রকাশন, ২০১৪]

ই-মেইল : himaloy.jana@gmail.com

Latest posts by হিমালয় জানা (see all)