হোম কবিতা হাসান রোবায়েতের দীর্ঘকবিতা : পানাহ্‌

হাসান রোবায়েতের দীর্ঘকবিতা : পানাহ্‌

হাসান রোবায়েতের দীর্ঘকবিতা : পানাহ্‌
2.71K
0

পানাহ্

(সোহেল হাসান গালিব ভাই-কে)
.

পানাহ্ এই রাত, কণ্ঠহীন আলো—
পানাহ্ এই চোখ, অস্তমান শামা—
বালির তরঙ্গে যে বাঁশি নিভে গেছে
অর্থময় খাদে সৌরকণিকায়—
প্রতিটি ফুল তার বক্রতায় ফুটে
বাতাসে ছুড়ে দেয় ঘ্রাণের জটিলতা
তবুও অন্ধেরা শূন্যে চিরকাল
তিলোত্তমা ভেবে শুনেছে নির্বাণ
তাদের তন্দ্রায় একটি বৃশ্চিক
হাঁটছে মিউকাসে, পোড়ায় মেমব্রেন

কেন যে পাতাগুলো কাঁপছে চোখ-ভরে
প্রতিধ্বনি ক্ষয়ে পাথরে যায় দিন—

লাকুম দিনুকুম ওয়ালি ইয়া-দিন—

পানাহ্ এই হাওয়া, ঘূর্ণিসমবায়—
পানাহ্ এই বন, মর্মপরিধির—
নৈশ-মালগাড়ি কাউকে ডাকে দূরে
গূঢ় তুমি আজ লোহায় টানো ঢেউ
ফেনায় সম নীল ফুঁসছে পৌরুষ—
অদূরে ট্রেনগুলো বিষণ্নতা ঘিরে
ছড়ায় রাত্রিতে ড্রাগন এক ঝাঁক
নিরুত্তর বন পাতার অস্ফুটে—
হাঙরে আধ-খাওয়া জোছনা-মাছটিকে
বিঁধছে শিকারিরা অমৃত বর্শায়
মৌন ব্যাধ শুয়ে এ মাঠে দহলিজে
ভাবছে ধমনীতে সাঁতরে যায় মীন—

লাকুম দিনুকুম ওয়ালি ইয়া-দিন—

পানাহ্ এই মুখ, মলিন আশরীর—
পানাহ্ এই স্মৃতি, রেণুর মর্মর—
অহেতু এইখানে মৃত্যু-সংঘের
প্রতিটি হাসি যেন ব্যক্তিগত ছাঁচ
ঘাসেরা টের পায় হরিণ শুয়ে আছে
অনেক কাল ধরে ছায়ার ঈর্ষায়—
কিছুটা পাখি তুমি কিছুটা তনুভরা
দিঘির কূট জলে নিভৃতে সন্তাপ
ব্যাকুল দীপাবলি নিভছে সৌরভে
একটি ঘোড়া এসে দাঁড়িয়ে পড়ে রোজ
পেছনে সূর্যেরা তামাটে বিস্ময়ে
গলছে গমক্ষেতে অন্ধ-অবলীন—

লাকুম দিনুকুম ওয়ালি ইয়া-দিন—

পানাহ্ এই প্রাণ প্রবল বর্তুল—
পানাহ্ এই নীল শীর্ষে উড্ডীন—
ঝঞ্ঝা-আপ্লুত তৃণের ক্রন্দন
লৌহ-দ্বার ভেঙে তারায় সারারাত
পাঠায় সাইরেন মূকাভিনয় ধরে
সেসব আলোঝড়, হরিণ-পোড়া শিঙ
স্বপ্নে ভেসে আসে গভীরতর স্রোতে
শূন্যে নাবিকের ডুবছে পাটাতন—
হে ঢেউ-কারাগার, নিরর্থের স্মৃতি
তোমার অধিমূলে এ কোন মনীষায়
বাতাসে শিলীভূত তারায় আজো দেখি
মৃত্যু ভেঙে যায় পরম্পরাহীন—

লাকুম দিনুকুম ওয়ালি ইয়া-দিন—

পানাহ্ এই জিভ মাংস-অভিশাপ—
পানাহ্ এই ভোর নীরব রেণুটির—
কেন যে বনতল নপুংসক ফুলে
সৌরকাল-দূরে ভাষায় সঙ্কেতে
জেগেছে বিস্মৃত শূন্য পরাদিঘি—
যেন সে মল্লিকা ঘামের বহুদূরে
সন্ধ্যা-কলোনির বাইরে ফুটে আছে—
গমের ক্ষেত ঘেঁষে তারার জলাশয়ে
তুমিও দেখেছিলে অস্ত-বিকিরণ
সে ছায়া বাঁশবন হারিয়ে চলে যায়—
তাদের ধূলিকণা সহিস পিঠে নিয়ে
লুপ্ত মর্মরে ছড়ায় মরফিন—

লাকুম দিনুকুম ওয়ালি ইয়া-দিন—

পানাহ্ এ-স্তন সমূহ মৃদু তিল—
পানাহ্ এই কূট সুগোল প্রতারণা—
তীক্ষ্ণ রাত্রির গভীর বল্লমে
যে বিষ দুরারোহ অহেতু বাঙ্ময়
শঙ্খচূড় সেই আমূল সাপিনীরা
ছোবলে হেলে দেয় গরল পরাভব
অথচ অশ্বেরা হ্রেষায় উদগ্রীব
বোঁটায় ফুলে ওঠে হেঁয়ালি-চিৎকার
দৃশ্য ভরা এই প্লাবিত করপুট
দু’মুঠ খুললেই হরিণ দৌড়ায়
তবুও ধ্যান তুমি ব্যাপক প্রজননে
শুনেছ রৌদ্র ধাতুর অমলিন

লাকুম দিনুকুম ওয়ালি ইয়া-দিন—

পানাহ্ এই ঘাম গোলক রসাতল—
পানাহ্ এই রুহ-চূর্ণ ধুপছায়া—
কতটা কাছে এসে একাকী জংশনে
দেখেছি রাশি রাশি মৃত সে সাইরেন
উড়ছে আঙুরের দৈব-বিভ্রম
এ কষ-রসায়ন কেন্দ্রাতিগ টানে
সহসা লুপ ঘুরে শীতের অবকাশে
বাঁচার ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা ভাঁড়ামোয়
তুমিও পেয়ে যাবে ডাউন ট্রেন একা
বিকেলে একদিন গূঢ় বন্দরে,
কোমল ঝুলে থাকা আত্মহত্যায়—
আদতে ফুলগুলো বাতাসে ভালগার

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ পদধূলি তীর্থযাত্রীর—
পানাহ্ কার্পাস হাওয়ায় ফুলে ওঠা—
তুমি কি আমাদের পত্রঝরাকাল
অ্যাসিডে দ্রবীভূত নীলিমা-আকরিক!
একদা হুইসিল ঘুঙুরবন হয়ে
পায়ের অনটনে বেজেছে সন্ধ্যায়
একটি ফাঁকা রোদ গানের কণ্ঠতে
নির্বিকারভাবে ঢুকছে প্রতিদিন—
সুপেয় খাঁড়ি বেয়ে ঘোড়ারা সহসাই
উড়ায় পাটাতনে তন্তু-হ্রেষা তার—

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ লুব্ধক নীলিয়মান ছায়া—
পানাহ্ সিম্ফনি ব্যাপ্ত নীহারিকা—
তারার ধারণায় ঘুরছে টায়ারেরা
বাতাসে জাফরান ছড়ায় বার্নিশ—
ভাষার প্রত্যাশা থেকেও কিছু ফুল
অন্যভাবে ঝরে তখন হিংসায়—
এ চোখ শব্দের বাজায় সোনাঝুরি
যে পথ ধরে তুমি আসতে চেয়েছিলে
সেখানে কণীনিকা রোদের টুকরায়
হাস্নাহেনা ফোটে গ্র্যাভিটি-কম্পনে
আকাশে দমকল রোদের অচেতনে
বাড়ায় মেশিনের জন্ম-চিৎকার—

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ আসমান ও তার ফ্যালকন—
পানাহ্ ঘোর রোদে হেলানো কচুফুল—
দুপুর ঝুলে আছে বিদ্যুতের তারে
সূর্যপশুদের আবিল অঞ্চলে
তন্দ্রা-উড্ডীন দুরূহ বাইসন
নেমেছে উপকূলে লুপ্ত বহুকাল—
এখনো সেইসব পাথর-অশ্রুত
রশ্মি ছুড়ে দেয় কেন্দ্র-নীলিমায়—
ছোবলে সমুদ্র ফুটছে মাশরুমে—
প্রাকার-বিস্মিত তুমিও হে নাবিক
ফেনাকে ভুল করো ডানার বিশ্রামে
ভাঙছে নীরবতা অলস প্রোপেলার—

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ এই শিস পাতায় টলমান—
পানাহ্ এই শাদা ধ্বনিত কার্পাস—
তুমিও কত দিন মেহেদি ঝরা বনে
হারিয়ে একাকিনী একটি পাশা-চাল
পাতার ঝরে পড়া সহসা ভায়োলিনে
নাচের মুদ্রা ও আধুলি ডুবে যায়—
অসুখ আমাদের বাসের খোলা সিটে
বিষণ্নতা ছাওয়া দারুণ ভেক্টর—
একাকী মথ কাঁপে আকাশগঙ্গায়
তুমিও এসো এই ঘামের টোল বেয়ে
অদূরে ভেসে যায় শিমুল-পারাপার—

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ এই নাচ আর্ত খনিজের—
পানাহ্ এই হেম সান্দ্র বনবিভা—
কোথাও মহিষেরা সূর্যরশ্মিকে
তাড়িয়ে নিয়ে যায় প্রখর প্রান্তরে
বন্য রাত্রিরা পাহাড় বেয়ে নামে
দোলায় কেশরের ছিন্ন হাহাকার—
তবে কি বল্লম আত্মভেদ ক’রে
পৌঁছে যাবে দূরে ডানার তন্দ্রায়
ভাষাও সন্দেহ—আস্থাহীন সাঁকো:
অপব্যায়বোধে কাঁপছে মোহনায়
তবুও ফিরে এসো স্রস্ত খনিতটে
ফেনায় ভেসে যায় ভৌত-শীৎকার

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ এ দুপুর তসবি গণমান—
পানাহ্ জংশন খালাসি-চিৎকার—
তুমিও কতদিন এখানে গান ফেলে
হঠাৎ চলে গেছ সৌর-স্নান গেয়ে
কাঁকরে শ্যাওলায়, গলানো ফ্যানভাতে
পরিত্যক্ত সে নিদ্রাহীনতায়—
তরঙ্গের মৃত, ফেনা এ সৈকতে
জাগায় দ্রাক্ষার মিথুন-প্ররোচনা
কতটা বালিঘোর টিকিটে ডুবো-ট্রেন
শিশুরা হাত রাখে স্তনের ধারণায়—
পথ কি দেয় শুধু, নিয়েও চলে যায়
বাতাসে বাজে ধুধু শূন্য রাংতার—

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ দহলিজ কাঠের গান ভরা—
পানাহ্ কড়িকাঠ গর্ভলীন ধুলা—
সূর্যে উন্মূল কাঁপছে মার্কারি
বর্গাকার রোদে একটি পিস্টন
দেখছে সাপিনীর ছোবলে কালো শিস
ফুটছে করবীর গর্ভাশয় বেয়ে—
তুমি কি ফিরবে না তুমুল শঠতায়
আহত ফলটির পচার অধিকারে
অথবা কসমস ফুলের যৌনতা
অহেতু ভেসে যায় যুদ্ধ-প্রস্তাবে—
হ্রদের তলে একা সৌম নীল ঘোড়া
উড়ছে মৃদু ঢেউয়ে শান্ত কেশ তার—

ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার—

পানাহ্ বাতাসের কেশর-ভঙ্গিমা—
পানাহ্ কিংশুক ক্ষীপ্রগতি বাজ—
ঘাসের রুহ থেকে অন্তরীপ ছেড়ে
মেরুর উজ্জ্বল সারস ডুবে যায়
আমরা পেয়ে যাবো কীর্ণ বীতশোক—
পুরনো গির্জার শান্ত চৌকাঠে
একটি বুনোফুল ভাবছে কূটাভাস—
গোধূলি লাল বল শিশুরা কোলে নিয়ে
হয়তো উড়ে গেছে না ফেরা দ্রাঘিমায়
কেউ কি আমাদের করবে জিজ্ঞাসা—
‘এখানে যাত্রীরা উইন্ডমিল ধরে
গমের ক্ষেত দিয়ে কোথায় চলে যান’

অ্যাওমা তামুরুস-সামায়ু মাউরান—

পানাহ্ এই ভাষা জন্ম-সয়ম্ভু—
পানাহ্ এ আয়াত আরক্তিম বাঁশি—
এ মাঠে কান্তারে যে তির সহোদর
কে তাকে তুলে নেবে পরাঙ্মুখ স্রোতে
একটি মাছ এসে ক্রন্দসীর নিচে
দেখছে রেণুওড়া পানির আত্মায়
দুপুর ভরা ধুধু প্রগল্ভতা নিয়ে
পাতারা মনগড়া উড়ছে পরিখায়
তবুও এসো তুমি শুশ্রূষায় ভিজে
পাকছে জলপাই ঊষার আলো লেগে—
আমরা এইভাবে নিহিলিজম ধরে
ভাবছি প্রতিদিন অহেতু নির্বাণ—

অ্যাওমা তামুরুস-সামায়ু মাউরান—

ফাইন্-না মাআল উসরি ইউসরা
ফাইন্-না মাআল উসরি ইউসরা

 


  • লাকুম দিনুকুম ওয়ালি ইয়া-দিন  [সুরা কাফিরুন, আয়াত ৬]
    অর্থ— তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমার ধর্ম আমার।
    .
  • ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার  [সুরা কাউসার, আয়াত ৩]
    অর্থ— যে তোমার (মুহম্মদ) শত্রু, সেই তো লেজকাটা, নির্বংশ।
    .
  • অ্যাওমা তামুরুস-সামায়ু মাউরান   [সুরা আত-তুর, আয়াত ৯]
    অর্থ— সেদিন আকাশ প্রকম্পিত হবে মুহুর্মুহু।
    .
  • ফাইন্-না মাআল উসরি ইউসরা  [সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত ৫]
    অর্থ— নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।
হাসান রোবায়েত

হাসান রোবায়েত

জন্ম ১৯ আগস্ট ১৯৮৯, বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী আযিযুল হক কলেজ; বগুড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই : ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [কবিতা, ২০১৬, চৈতন্য]

ই-মেইল : hrobayet2676@gmail.com
হাসান রোবায়েত

Latest posts by হাসান রোবায়েত (see all)