হোম কবিতা হাওয়া উৎসর্গ করো

হাওয়া উৎসর্গ করো

হাওয়া উৎসর্গ করো
546
0

সালাম বাঙলা
❑❑

সালাম বাঙলা, তোমাকে নিয়েছি গুপ্ত ডালিমে
স্কুলের টেবিলে, গোসলের অতি গরম পানিতে।
জনকলরব, লোহার পাথর, খানসেনা আর
পলাশী সিরাজ, ইমাম হোসেন কারবালা খঞ্জরে!
যেন-বা  আমার কলিজা তোমার
যেন-বা তোমাকে দিয়েছি হাজারো পানিপথ!
তোমার শুধুই জয় হোক—ওগো অক্ষয় হিমালয়!

তুমি কি শুধুই সীমানা ছাড়াবে—রক্ত-লেগুনে?
কী চাও শিকারি ভাষায় গোলাপ গোকুলে
সবুজে পতাকা পেরিয়ে পাগল কিশোরে?
আমাকে কী দান করবে বলো এ ছিন্ন সকালে?
তামার পাত্র গলিয়ে সাজাবে মনসার বিষ?
নাকি ফেলে যাবে ভারতবর্ষ, নো-ম্যানস ল্যান্ডে?
শরীরে আমার জমেছে খণ্ড বরফ এবং পিপাসার আলো
হাঁটছি রায়টে, বোমারু বিমান, ঘুমন্ত ঘোড়াশালে!
সালাম বাঙলা, আমাকে শুইয়ে ধরো তুমি গোপন পাতালে
আমার জানালা বন্ধ! বন্দি আমি রাক্ষসের দখলে!


ভাষাপ্রিয়দের সাথে
❑❑

ভাষাপ্রিয়দের সাথে বসে থাকি।
শিস দেই, লেজ নাড়ি। দেখি সীমানা বিস্তৃত।
দেখি—লাখো মুখোশের বার্বি, ব্লাকহোল।
তাদের সিনায় রাক্ষসের ভাষালিপি—ম্যাজিক অক্ষর। 

যেন তিতির মরণ শেষে—দাঁতে দাঁতে মাংস।
আর আগুন ফাটছে জানালায়—
লম্বা তাদের জাহিম, যেন বাগান ছিল না কোনোদিন
ছিল না ময়ূর যে হামদ করে রাখবে।
তার চেয়ে রক্ত ঝরল নিমপাতা, দুধ সরোবর!

তুমি সেই চোখ চাও? যা কোনোদিন ফুটবে না!
তাহলে ভাষাপ্রিয়দের সাথে ঝুলে থাকো
লিখো নিঝুম ঠিকানা—কয়েদিদের গ্রামে
আর কবরের গান গাও।

ভাষাপ্রিয়দের সাথে বসে থাকি। শিস দেই, লেজ নাড়ি।
দেখি শত্রু  নামছে এয়ারগান নিয়ে, দেখি বুক ছিঁড়ে
কাবিলের মুখ
দেখি ভাষাবাহিনী ড্রিল করে আনে লোহার কফিন।


আপনজনদের কবরে নামাতে গিয়ে
❑❑

আপনজনদের কবরে নামাতে গিয়ে ইয়া আল্লাহ
আমি ইন্না লিল্লাহ—আমি কুল্লে নাফসিন জায়াকাতুল মওত।
আমি ঘোর কিরাতের ভেতর দুধ-কবুতর
যেন পাখনা মেলে ডুবেছি হিম সাগর
আমি হায় হোসেন—আমি কারবালা কারবালা
আমার দুই চোখে নেমেছে মেঘনা যমুনা
নেমেছে ইস্রাফিলের শিঙা
ভাঙছে চীনের প্রাচীর ভাঙছে ওপেরা ওপেরা
হিমালয় খণ্ড বিখণ্ড—উড়ছে বুদ্ধের প্রতিমা!

আপনজনদের কবরে নামাতে গিয়ে ইয়া আল্লাহ
আমি দেখছি আমার আম্মা—
দেখছি রেহেল ঘেঁষে দূত-ফারিস্তা
তার বিশাল কারিশমা আমার জান নিকলে যায় ইয়ার।
আমার দারুণ শহিদি নেশা—করুণ লাল কালো বর্ষা
যেন নূহ নবীর বন্যা যেন কুল্লু মাখলুকাত ফানা ফিল্লাহ।
গুপ্ত হিজাজের গলি—লুকিয়ে থাকে ছুরি ও তরবারি
যেন জিহবা থেতলে যায় পাথরে আর আগুন লাগে
খুলি ও তন্দ্রা—পুড়ে খাক খাক গুল গুলিস্তা।
উড়ে টন টন ছাই যেন ট্রয়ের মৃত সব ঘোড়া
আমার কলিজা শুকিয়ে যায় ইয়া আল্লাহ
জানালা ঘেঁষে কবরের প্রিয়জন ডাকে আয়
আয় আমাদের ঘরে আয়—আয় নিরালা নিরালা
আমি কিভাবে দূরে থাকি কিভাবে রেললাইন মেপে
তেপান্তরে যাই—আপেল বাগানে আপেল পাড়ি
আর বন্দাই বিচে জেলিফিশ ধরি!


হাওয়া উসর্গ করো
❑❑

হাওয়া উৎসর্গ করো। এ দেশ আমার নয়।
হাজার হাজার মেষপাল ছেড়ে
বাংলা বিহার উড়িষ্যা-পাখি অধিপতি।
আমার শুধুই লাল মোরগের ঝুঁটি
যেন পতাকা উড়ানো লালকেল্লা
মসজিদ মসজিদ। 

আমি সব পথ ঘোড়া করে নিয়েছি।
তুমি স্বাধীনতা করো, ঠোঁটে নিয়ে আসো
ক্ষুদিরামের ফাঁসি। ওহো ওহো
যেন আহ্বান করে ছুটে আসছে বল্লম, তির।
চারদিকে অপার বাজুকা ধ্বনি—
নাচ করে মাছ মাছ, মাছের শিকারি। 

হাওয়া উৎসর্গ করো—ছাতিমের বাংলা
আমি তাকে আরবি নেকাবে নিম করে নিই।
বাজো বাঁশি, বাজো আকাসিয়া ব্লু-গামের ডালে
দেখো—উপত্যকা দিয়ে দৌড়ায় হারানো চিঠিমেয়ে
তাকে আমি জুলেখা করে পাই সিনানের পথে।
যেন তার আঙুলে ইউসুফ ইউসুফ রব
যেন একটি কলিজা কাপে ভেলবেট ওড়নায়!

জনপথ থামো। থামো উড়ন্ত ডানার নিচে
গোত্তা মারা মেঘপীর।


বাদ ইশা
❑❑

কী রকম ঘোর লাগে বাদ ইশায়। আশ্চর্য! সব রাস্তা নদী হয়
ডানা পায় চন্দ্রজীবী নারী মৎসকুল। দুচোখ আন্ধার হয়
দেখি লক্ষ ঝাড়বাতি কল্বের ভেতর।
আল্লাহ আল্লাহ রব-বেমালুম ভুলে যাই নাম ও সাকিন!
দরুদে প্রহর কাটে—প্রিয় নবী মোহাম্মদ—রাহমাতুল্লিল আলামিন।
ফুলে ফুলে মা চাই, মায়ের নামে পাঠশালা খোলা
শত মক্তবের আরবি অক্ষর।
আমি শূন্য আমি ধন্য অসীমের মাঝে। যেন গাছপোকা
নিজেরে হারিয়ে খুঁজি কালো সব গোবরের পাঁকে।
সাত আসমান জোড়া লাগে, সিরাজ সিরাজ করে বৃষ্টিভেজা
পলাশী প্রান্তর। তুমি থাকো দূরে, তবু খোলে চোখ যেন
মাঠে মাঠে নেচে ওঠে হিরামন কইতর।
কে পাগল কেবা নিরঞ্জন
কার আছে সোনা রুপা ভাড়াটিয়া কবি?
সবই হাজির হয়—রেকাবে কাবাব পুড়ে
জলপাই পাতা জানে মাংস পোড়ার খবর।

কিরকম ঘোর লাগে বাদ ইশায়। আশ্চর্য! কাকপক্ষি কথা বলে
ঠোঁট মেলে কাছে আসে লাল-নীল বট বল্কল।
ভাইবোন বাতি ধরে—তাদের কবরগুলি দুধশাদা ঘর!
নিজের ভেতর নিজে জ্বলি—যেন সারা গ্রাম জ্বলছে পিপাসা-ধূপে
তুমি নাই আমি নাই, ঘর করে জিন পরি, পিঁপড়া সকল।


পুরস্কার
❑❑

পুরস্কারের কথা বলব না আমি।
তোমরা এই হাতিগাছ নিয়ে চলে যাও
পলাশীর আম্রবাগানে।
দেখো লর্ড ক্লাইভ কিভাবে কাছে টানছে—
রাজা রায়দুর্লভ।
দেখো একটি ভাঙা নৌকা আর
সিরাজের পরিত্যক্ত জুতাখানি।
আর শোনো মর্মাহত মুর্শিদাবাদ,
তার দেয়ালের প্রতিধ্বনি
হায় সিরাজ হায় সিরাজ!

তার চেয়ে আমি বাদ মাগরিব এইসব পেস্তা বাদাম
আর মাঠভরা খরগোশের রূপ নিয়ে বসে থাকব।
দেখব অরহর পাতার শিস
দেখব একটি কপিফুলের তন্দ্রা ছিড়ে
নেমে আসছে হাজার হাজার মৌ-দরবেশ।
আমি শুধু সারি সারি সবুজ চাই
চন্দ্রচোরদের তরমুজ বাগানে।
যেখানে লাল নিয়ে নৃত্য করছে
এতিম পিঁপড়েদের দল।


দেয়ালের পাশে
❑❑

১.
মেলেছে উলু খেলা শান্ত পৃথিবীতে।
কিসব কাফির ভাষা, রক্তবুলি প্রজাদের দ্বীপে!
আমাকে কাটে নিরিবিলি সাপ আর নেওলে।

২.
দুধারে কি ফুটছে হামিশ?
শীতে লিখে রাখি হুদ পাখির নাম।
যেন গলা চিনে আনে
সুলায়মান পয়গম্বর!

৩.
হায় আল্লাহ আমি কী করি এখন?
তামাম আমি ডাকছি মায়ের দুপুরে!
কিভাবে তোমার স্মরণ কাটে
কিভাবে অকৃতজ্ঞ থাকে মাটি ও মানুষ!
তাই এবেলায় আর না ঘুমাই। চলি
ঘাস বিচালি গালিচার নাপাক থেকে
দূর পাল্লার জাহাজে!

৪.
বেহায়া করেছ মুখোশ। তার গুলচিরাগ থেকে শুধু দুশমনের রঙ।
যেন মেয়েদের ঠোঁট। লাল করে আনছে আদিম ছেলেদের পিস্তল।

৫.
হায় তোমাকে দেখে নি মুজতাবা! আমি পিরহান খুলে
ঘুমিয়েছি শত্রুদের কোলে। দেখেছি পাথরগাছ, দেখেছি—
হাঁ করে মুখ খুলছে ঢাক ঢোল, মাটির পিঞ্জর।


জালিম
❑❑

খুশবু জানিয়েছ দূরে, হাওয়াপীরে
নামে ধীরে বসন্ত-মুরশিদ।
মুখ থেকে লাখো শব্দ-সুলতান
আমাকে কেটেছে শত ঝুল
ঝুলন্ত কালাম!
একটা মায়াহারমোনিয়াম করেছ গান
শত গোলাপের কোরাস তোমার নাম।

জালিম।

ঠোঁট থেকে শিস বাজে
জল জুলেখার গন্ধপাখি তিরতির!
যেন একশ একটা শিকারি দৌড়ায়
উড়ছে ময়ূরের রক্ত রঙিন।
চোখ দিয়েছ পিপাসার আগুন
না পারি বলতে, না পারি ডাকতে

ফুটেছ জুই, জামরুল, লাল কামিজের বনে।
আমার কলিজা কাটা জলে
আজ ডালিমের বাগানে পড়ে আছে আঙুল।

জালিম। 


বাজি
❑❑

কবিতাই তো লিখব। খুন তো করব না!
তাই তাক করেছি ইশক-ক্যালিবার বুক বরাবর।
নাও দিল দস্তানা, নাও আর গুলি করো গোলাপের
পাপড়ি দিয়ে। আমি গন্ধ শুনে আজান দেবো
বেগানা সব পাথর ও পথিকে। যেন তারা
আগুয়ান এক হাতিসেনা—পলকে নিহত করেছে
নিজেদেরকেই। তার চেয়ে তুমি
শুয়ে থেকে পীর-মাছেদের মাস্তানা দেখ।
তোমার নাম শুনে
ফুটে তারাবাতি, ফুটে কাফ্রি কালোদের পাখি।
উড়ে যায় কলহঘুঘু, পায়রা ও নিষাদ।


রোজেনা রেডরোজ
❑❑

এত সুন্দর চোখ! সুবহানাল্লাহ
সব নদী জমে যায়।
মাছের প্রেমিক মাছ—সব কার্ফু, যুদ্ধ, সুলতান।
চোখ এসে চোখে সকাল দুপুর রাত
তাকানোর ভেতর তিতির, মুগ্ধ তাজ জাহাজ।
কে এল লাল পরে? কে তুলল মুখ
পিউ কাহা রব? যেন ভরা গোলাপের গুলিস্তা,
দিল, দোস্ত-দুশমন, প্রেম গুলি একাকার।

আমি দূরদরবেশ, ফুটি ডালিমদানা
যেন তার হাতের আংটি,
চিনা বাদামের লজ্জা, রাগ পরাগ। 

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

জন্ম ০৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫; কিশোরগঞ্জ। পৈর্তৃক নিবাস: রায়পুরা, নরসিংদী। ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স), এমএ।

পেশা: ইংরেজির শিক্ষক, নাভিটাস ইংলিশ ফেয়ারফিল্ড কলেজ, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সিজদা ও অন্যান্য ইসরা [চৈতন্য, ২০১৬]
ক্রমশ আপেলপাতা বেয়ে [চৈতন্য, ২০১৫]
নো ম্যানস জোন পেরিয়ে [শুদ্ধস্বর, ২০১২]
জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি [নিসর্গ, ২০১২]
শাদা সন্ত মেঘদল [নিসর্গ, ২০১১]
গানের বাহিরে কবিতাগুচ্ছ [নিসর্গ, ২০১০]
পলাশী ও পানিপথ [নিসর্গ, ২০০৯]
বাল্মীকির মৌনকথন [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৬]
শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ [জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৯৫]

গদ্য—
কবিতার ভাষা [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : abusayeedobaidullah@gamail.com

Latest posts by আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ (see all)