হোম কবিতা সারাজাত সৌম-র দশটি কবিতা

সারাজাত সৌম-র দশটি কবিতা

সারাজাত সৌম-র দশটি কবিতা
1.75K
0

পাখি ও গ্রন্থের মলাট
❑❑

প্রতিটি সম্পর্কের সেঁতু পার হতেই দেখি আমার কালো শার্ট ঝুলে আছে চাঁদের হ্যাঙারে আর বোতামগুলো কী বিষণ্ন তারাদের মতো ফুটে আছে পথের উপর!

যেন তিন ঠ্যাংঅলা একটি কুকুরের বেদনার মতো কখনোবা আমার দিকে বিদ্রূপের হাসি দিয়ে টাল খাওয়া মানুষ—কিছু বিশ্রুত বেদনা নিয়ে ঢুকে পরে তড়িঘড়ি ঝোপঝাড়ে।

আর সে মহল—পাখি ও গ্রন্থের মলাট খুলে হৃদয় মার্বেল হয়ে যায় এই চরাচর, যেন পৃথিবীতে প্রতিটি বিকেল নিষ্ঠুর নিরেট পাথর, অথচ এই বনে ধ্যানও একটি সমবায় ঋতু!

আঠারোটি পাখির নাচের মুদ্রা থেকে পাওয়া একটিমাত্র অনঙ্গফুল—আঙুল থেকে ছিটকে পরা আতশবাজির মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে অনাম্নী ঘ্রাণ!

 

 

প্ররোচনা
❑❑

বহুদূরে সতেজ পাতার মতো বিছানা জুড়ে নেমে এল এক জীবন্ত অথচ কী বেদনার ফল!—জন্মাবার আগে কে জানতো আমি তাকে গলায় নিয়ে ঘুরে বেড়াব এ ঘর থেকে ও ঘরে কিংবা রাস্তায় রাস্তায়।

যেন একটু আগেই সে তার মায়ের মুখের উপর খেলছিল পাশা খেলা! কী দারুণ শৈলী তার আঙুলে—নখে আর ঠোঁটে ময়ূর-নর্তকী।

চারদিকে বনজ দেয়াল আর জীব-জন্তুর পাশেই রাখা আমার ছবি,—যেন বাবারা দেখতে ডাকাতের মতো হয়।

অথচ এ আমার কী হলো?—সকল নারীমুখের উপর আমি কেবল আমার মেয়েকেই দেখছি নূপুর পায়ে এক ধূলিঝড় বা তারও অধিক প্ররোচনা…

 

 

 

আম্মা
❑❑

কী হলো এটা—যেন স্মৃতিভ্রষ্ট সুপারবিস্কুট! তুমি চাইলে সে দোকান থেকে লাফিয়ে ডুব দেবে জলে তারপর ওই জিহ্বা, ঠোঁট জলাতঙ্ক রোগীর মতো বিষণ্ন মাথাটাকে বিগড়ে হেঁটে যাবে আকাশ-কুসুমে।

অথচ আমি জানি পৃথিবীতে কুসুম নামে একমাত্র আমার আম্মাই আছেন আর কেউ নেই থাকবেও না কোনোদিন…

 

 

পরম কথা
❑❑

পরম কথাটি নিয়ে ভাবতে ভাবতে তুমি যে কোনো মহাসড়ক ধরে হেঁটে গেলেই হয়ে উঠতে পারো একটি সুপার ল্যাম্পপোস্টের নিচে এইমাত্র জন্ম নেয়া শিশুটির মতো এক হাস্যোজ্জ্বল জীব যার সঙ্গে এই মুহূর্তে খেলা করছে রাত্রি ও অসংখ্য তারার ঘোড়াগুলি!

সঙ্গে নিতে পারো একটি নীল বিড়াল—সাদা ইঁদুর যাদের চোখ ভর্তি মাছ আর পাকা ধানের কল্পনার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদী ও ফসলের মাঠ,—আর যে ঘোড়াগুলি আকাশে ডিগবাজি খেতে খেতে তাদের ডানা তোমার দিকে ছুড়ে দিচ্ছে তুমি তাদের সঙ্গেও যেতে পারো আরো দূরে এবং বহুদূরে।

এমনকি হাতের আঙুল দিয়ে বাজাতে পারো অদ্ভুত সব সুর—গড়তে পারো হাজারো আকার-আকৃতি এবং মুহূর্তেই হতে পারে সে এক সোনালি ব্যাঙের জগৎ! যারা হাসলে ঝরে পড়ে হিরার বৃষ্টি কিংবা শিশুতোষ আইসক্রিম

আর আম্মার গর্ভের মতো অন্ধকার থেকে হাজারো নক্ষত্রের তোড়া হাতে তুমি হাঁটতে হাঁটতে হয়ে উঠতে পারো বিস্মৃত…বিস্মৃত…বিস্মৃত…

 

 

অর্ধমৃত সত্য
❑❑

জানি আমার মাথাটা সন্ধ্যার দিকে হেলে পরেছে স্বপ্নের মতো এখন। ভাঙা ব্রিজ থেকে যেভাবে শিশুশয়তানরা একদিন লাফিয়ে পড়েছিল ফুল হাতে, সে ছিল আগুন—ঈশ্বরের! সেই থেকে অন্ধকারও একটা ছবি।

বাবা বলতেন, পাখি ও পাপ হঠাৎ করেই আসে—ভাসে হাতের কাছে আর জলের কাছে আসে প্রেম! মানুষে মানুষে যা হয় তা হলো ভবিতব্য। এই কথা শুনে আমি অরণ্যে মুখ লুকাই—দেখি হাতের রেখা থেকে সোনালি সাপগুলো ডুবে যাচ্ছে তোমার নাভিতে!

আর তখন তুমি বিস্তৃর্ণ পথ বিছিয়ে রেখেছ পালক ও পালঙ্কে, যেন পথিকেরা ক্লান্ত হয়ে তোমার কাছে এসে বসে। কিন্তু সে পাথরের মূর্তি—যখন তোমার ঠোঁটের কাছে আনত অর্ধমৃত সত্য!

আমি আসলেই কেউ না!

 

 

একাই হাঁটছি পাগল
❑❑

একাই হাঁটছি পাগল অথচ কেউ যেন চাঁদের আড়াল থেকে ছুড়ে দিচ্ছে গভীর ঘুম—কৃষ্ণচূড়া—যে শুয়ে আছে আমার স্ত্রীর উপর—পরিশ্রান্ত হাওয়া—রুপালি রিক্সা এক!

আহা! জীবন—জ্যামিতি—গণিত ও কম্পাস—দীর্ঘশ্বাস থেকে দৌড়ে পালানো সেই ভীরু বিড়ালটির মতো, যেন বাচ্চাদের ছড়ার ভেতর উঁকি দিয়ে চাঁদটাকে গিলে খাচ্ছে একাই।

আর তার পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে কতগুলো ইঁদুরবাহী যান ছোড়া ওই ঈশ্বরের খেলনা! আমি তাকে একবার দেখি কিংবা একাধিকবার এই শীতের রাত্রিশেষে মাংসের ভেতর দোলনচাঁপার ঘোর ও জ্যোৎস্নাফুলের ঘ্রাণ।

 

 

কেন তোমাকে চাই
❑❑

কেন তোমাকে চাই এই ভাবনার ভেতর ডুবে গেলে পাঁচটি কোকিল মুচকি হেসে লুটিয়ে পড়ে সন্ধ্যায়, এমনকি মন ও মগজে অস্থির সে নাম ঝর্নার মতো বয়ে যায় আঠারোটি নদীর উপর!

শরীরের ভেতর বন—বসন্তের হলুদ পাখিগুলো যেন অবিরাম অমিয় ফল খেয়ে বাঁচে আর মাতাল মানুষের মতো যত পোশাক সে তার নিজেরই বিভ্রম।

অথচ তোমাকে চাই অন্তত একজন প্রসিদ্ধ হাতসাফাই কারিগরের মতো, যেন এই রাত্রি চাঁদ থেকে তুলে আনা আলোর পুতুল কিংবা সকল কিছুর আড়ালে নিঃসঙ্গ পানির পাইপ থেকে উড়ে যাওয়া একটি ক্রিস্টালের পাখি—যে হৃদয় জলীয়বাস্প আকাশে উড়ে পরীদের অহম ডানা নিয়ে।

আর তার রঙ জানি আমাদের রেস্তোরাঁয় এখনো—আমাদের চোখে ঘুমের মতো আধেক স্বাপ্নিক—আধেক শিহরত…

 

 

শয়তান
❑❑

আমি সেই ছোট্ট শিশু মায়ের উলঙ্গ স্তন মুখে নিয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকি আর খেলা করি নিজের সঙ্গে—মাকে ঈশ্বর মনে হয়।

কিন্তু যে লোকটি আমার মাকে প্রায়ই অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায় সে তো আমারই ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা—অলক্ষেই দাঁড়িয়ে থাকা প্ররোচনার প্রখর শয়তান।

 

 

মহাকাশ
❑❑

লেবু গাছটাই পারে একমাত্র আমাদের ম্যাজিক দেখাতে! তবে কি লেবু গাছ কোনো স্কুল কিংবা ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা উলঙ্গ অসংখ্য স্তনের বাহারি মাঠ, যার ভেতর দিয়ে যে কেউ হেঁটে গেলেই বারবার হারিয়ে যায় সেই গলা ফাটা টুনটুনির মতো দুঃখের সুর তুলে কোনো এক বিকলাঙ্গ গ্রামের দিকে।

যেখানে আমি এক মুখোশপরা মোরগ—কিশোরীর আঙুল খুঁটে খুঁটে নিদ্রা যাই অথচ আমার মাথার পেছনেই তার জগৎ—হাঁসুলি আর কোমরের বিছা—উজ্জ্বল হাসি যার শব্দে একদিন লেবু গাছাটি খুলে দিয়েছিল তার অন্তহীন বেদনার ফল

এমনকি অসংখ্য সাদা ফুলের এক মহাকাশ!

 

 

বিকার বিউগল
❑❑

ঈশ্বর এই পথে গেছেন বলেই আজও দর্শনের কালো বিড়ালটি আমার আঙুল ধরে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীতে!

তুমি তার সেই চোখ—যেন বিকাল একটি ঘোড়া—বিকিনি পরে নাচছে আমার বুকের উপর আর সমুদ্র তার লেজ উড়িয়ে চাঁদের সাথে ভ্রমণে বের হলেই কখনো কখনো নারীরাও পাখা পায় অথচ পুরুষেরা পোকার দল—দঙ্গল।

স্মৃতি বলতে মায়ের জীবনটুকুই—বয়স যা লুকিয়ে রাখা ছিল তার কলা ও কদমে। আর এখন বৃষ্টি হলেই আমি একান্ত নিজের কাছে যাই—ডুবে যাই মানুষ ও মেশিন!

অথচ কিছু শব্দ এখনো স্তনের পাশে পড়ে থাকলে বেজে ওঠে বিকার বিউগল!

 

সারাজাত সৌম

সারাজাত সৌম

জন্ম ২৫ এপ্রিল ১৯৮৪, ময়মনসিংহ।
পেশা : চাকুরি।

ই-মেইল : showmo.sarajat@gmail.com
সারাজাত সৌম