হোম কবিতা সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী পঙ্‌ক্তিমালা

সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী পঙ্‌ক্তিমালা

সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী পঙ্‌ক্তিমালা
1.18K
0

দেশে একের পর এক সাম্প্রদায়িক ও  ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর হামলার ঘটনায় পরস্পর উদ্বিগ্ন। কোনো রকম যদি-কিন্তু ছাড়া এইসব ঘটনার নিন্দা জানাই আমরা। দাবি জানাই, এর পেছনের ক্ষমতালিপ্সু ও বৈষয়িক ফন্দিফিকিররত স্বার্থান্বেষী মহলকে অবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক। এই লক্ষ্যে পরস্পর-এর স্বর সদা উচ্চকিত থাকবে, অস্ত্র-গুলি-ঘৃণার বিপরীতে আমদের অস্ত্র প্রতিবাদী পঙ্‌ক্তিমালা।

 


মাসুদ খান
অসাম্প্রদায়িক 

 

পাঁচটি আঙুল পাঁচ রকমের
পাঁচ ধরনের কৃতি
পাঁচ প্রকারের ধর্ম তাদের
পাঁচটি সংস্কৃতি।

মিলে-মিশে ফুটে থাকে
হাতের পাঞ্জাদেশে
কাজের সময় ঐক্যবদ্ধ
ধর্ম নির্বিশেষে।

হোক না আঙুল নানা রকম
কেউ পিছে কেউ আগে
ভাতটা খেতে গেলে কিন্তু
পাঁচ আঙুলই লাগে।

 


কুমার চক্রবর্তী
মেমেন্তো মউরি

 

‘মনে রেখো, মৃত্যুই নিয়তি,’ দিয়োনিসুস,
শীতকাল জুড়ে জমা হওয়া মদ শেষ হলে
মনে রেখো, যা তোমাকে ঘিরে ধরে রাখে—
তার অর্ধেক বিস্ময় আর বাকিটা  নৈঃশব্দ্য।
হাহাকার ফুটেছিল তোমার আয়নায়; লীলা, লাস্য,
চিরবিশ্রামের পথে ক্ষীণ ছিল সমগ্রের ছায়া, ছিল
মারাত্মক বেসুভিয়ুস, আর শৈল্যবিদের গান
তোমার স্মৃতির হাত ধরে—যে চেয়েছে
স্পর্শের সৌন্দর্য, কোনোকিছু বাড়াবাড়ি নয়
তোমাকে তো ঘিরে আছে শুকনো কাঠের ঋজুরেখ।

ঘোড়াগুলো উচ্চৈঃস্বরে করে গেল আত্মপ্রতারণা
কেবল তারাই পারে চিনে নিতে পথের নির্লিপ্তি
চরিতার্থতার কথা তুমি জানো, দিয়োনিসুস,
কেননা তুমিই বলো পুনরুদ্ধারের কথা: অমরত্ব
আর অন্ধবিশ্বাস, মানুষ নিজের কাছে নিজেই অচেনা
আরও সে অচেনা তার সর্বস্বের কাছে
তারা তো জানে না, নিষ্পন্ন বাস্তব আজ এইদিকে
রেখে গেছে হত্যা, আর বিপর্যস্ত যাপনের সিগনেট,
জেনো দিয়োনিসুস, জীবন  অস্পষ্ট এক স্মৃতিশাস্ত্র
রাত শেষ হলে তার নিঃশব্দ করোটি, একা,
অন্তর্মুখে গেয়ে ওঠে  হননের গান।

 


সরকার আমিন
মালউয়ান

 

প্লিজ মনে রেখো না কী বলে না বলে হাউয়ান
শোন জৈয়ন্তী রানী; তুমি মালউয়ান হলে
আমিও মালউয়ান।

 


মুজিব মেহদী
প্রত্যাদেশ

 

যখন আঘাত করো রজনীগন্ধায়
ব্যথায় ককায় দূরে সূর্যমুখীও
যখন কৃপাণ হানো আমার ঈশ্বরে
মারা যান যুগপৎ তোমার তিনিও

 


শামীম রেজা
বানিশান্তা হয়ে সোনাগাছি

 

ভেজানো দরজার নিচে চাপচাপ দীর্ঘশ্বাস
কতটা প্রলয়ঙ্কারী ঝড় এলে ধ্বংস হবে দরজার পাট;
          জানে না মহর্ষি মন…
এত বছরে দরজা ভেঙেছে শতবার… দীর্ঘশ্বাসের ক্ষয়
হয় নি এতটুকু… বেড়েছে বরং
ঝুমুরদলের ঝুলন্ত মেয়ে সরলা বিশ্বাস
এখন তার নীল মাছিদের সাথে গৃহস্থালি
           নিয়ত বাসর;
ফিরে গেছে বানিশান্তা হয়ে সোনাগাছি
এপারে রেখে গেছে শুধু সরলতা চোখের অন্তর

 


শুভাশিস সিনহা
ভোর

 

ভোর হল, নামো অবসাদ, ঘুমের শ্যাওলা মুছে, ঘোরে লাল
রোদ, ছায়া বোনে ছলনায় দূরে গাছের তলায় যেন তুমি
ধীরে যাবে বগলে লুকিয়ে ঘাম, বুকে তাপ, বিছাবে শয়ন
তোমার প্রাণের জন এসে পিঠে রেখে হাত দোলাবে খোয়াব
গহন নয়নে, তুমি অালগোছে প’লে প’লে জড়াবে, ছড়াবে
অাকুল ব্যাকুল পরশন, নিদানের হিম চুমু গ’লে পাওয়া
মধু, ওমশ্বাস, জাগর নিশীথ, চাঁদোয়া অাকাশ, মেঘমায়া

নাই হলো পরিণয়, অগণন প্রজনন, খোজা হয়ে দিন।
গুজরান, অালুথালু পুরুষাপুরুষ রমণী অ-রমণীয়
সংবেদনের ঘোর, তবু হলো ভোর, ছুঁয়ে যাবে রোদ
শীতল চেতনা, রাতে খেয়ে গেছে কালচাঁদ, বুকে ক্ষত এঁকে
কলংক রটিয়ে গোপন, নখে নখে শত বানানো জবাব
অবসাদ, দেহ থেকে নাভি থেকে যোনি থেকে প্রকাশ প্রসারো…

 


সোহেল হাসান গালিব
চিহ্ন

 

বুড়িগঙ্গা নদীতীরে পাগলনাথের মন্দির। মন্দিরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাজার। নাম পাগলা বাজার।

কতদিন আগে? ঝাঁ ঝাঁ দুপুরবেলা বাসে যেতে যেতে ভাবি। সময় কি তবে স্তব্ধ হয়ে থাকে ইতিহাসের পাতার বাইরে কোথাও? হতে পারে?

অশথ-পাতার আড়ালে মন্দিরটিকে দেখি। সে প্রায় চোখেই পড়ে না। বাজারের কোনায় যেন কাঁচুমাচু বসে আছে এক বুড়ি। মুখে তার ভাঁজ,  সহস্ররেখা—শতাব্দীমলিন।

‘অসহায়’ শব্দটি—এই প্রথম মনে হলো, ঘাপটি মেরে থাকে ভিড়ের মধ্যেই। দাফন শব্দের মধ্যে যেমন লুকিয়ে থাকে কফিন। যেমন দেশভাগ মানেই দেশত্যাগের প্রসঙ্গ।

প্রসঙ্গ বদলের আগে আরও একবার তাকিয়ে দেখি। নিজেরই দিকে নাকি? কখন ছুটন্ত গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে মন!

এই পাগলায়, পাগলনাথের চিহ্ন মিশে যাচ্ছে দ্রুত—খটখটে এক দুপুরের দীর্ঘশ্বাসের ভেতর।

 


ইমতিয়াজ মাহমুদ
কিছু কথা

 

পৃথিবীর যিনি স্রষ্টা তিনি চাইলে সব মানুষরে মুসলমান বা হিন্দু বা খৃষ্টান বা বৌদ্ধ বা ইহুদি বা ধর্মহীন করে পাঠাইতে পারতেন। তিনি তো তা করেনই নাই বরং মানুষগুলোরে বিভিন্ন কালারে আর ভাষায় আর পরিচয়ে বিভক্ত করে একটা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিছেন। এই গোষ্ঠীগুলো স্বপ্ন দেখে যে পৃথিবীর সব মানুষ একদিন তাদের মতো হবে। এমনকি যারা ধর্মহীন তারাও এমন আশা করে। আরো তুমুলভাবে। নাস্তিকতা পৃথিবীতে নতুন কিছু না। জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে যে এটার বিকাশ হয়েছে তেমন না। পৃথিবীতে চিরকাল নাস্তিকতা ছিল। হোমারের যুগে ছিল। বেদে আছে। গৌতম বুদ্ধে আছে। ইহুদি ধর্মেও একরকম আছে। এবং বিশ্বাসের এই ব্রাঞ্চটা চিরকাল একইরকম সংখ্যালঘু হয়েই আছে। তো আমি লক্ষ করছি এক ধর্মের অধার্মিক মানুষেরা অন্যধর্মের মানুষদের যতটা অবজ্ঞা আর ঘৃণার চোখে দেখে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ঘৃণা নিয়ে দেখে নাস্তিকদের। আবার নাস্তিকদেরও একটা অংশ ঐ ঐ ধর্মের মানুষদের ততোধিক ঘৃণা আর অবজ্ঞার সাথে ট্রিট করে। আর তারাও ভাবে যে পৃথিবীর সব মানুষ একদিন তাদের মতো হয়ে যাবে। ভাই, তেমন হবে না। পৃথিবীর সব মানুষ কোনোদিন একরকম হবে না। এক বিশ্বাসের হবে না। এক কালারের হবে না। এমনকি এক ভাষারও হবে না। নিজের মতো দেখতে মানুষকে ভালোবাসার মধ্যে কোনো বিশেষত্ব নাই। ঐটা নিজেকেই ভালোবাসা। আপনি স্রষ্টার (বা অবিশ্বাসী হলে প্রকৃতির) দেয়া চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে আপনার উল্টো বিশ্বাসের, উল্টো ভাষার আর উল্টো কালারের মানুষকে ভালোবেসে দেখেন, আপনি কতটা মানুষ? অথবা ঘৃণা চর্চা অব্যাহত রেখে দেখেন, আপনি কতটা শয়তান?


সজল সমুদ্র
দূরত্ব

 

মোনেল হয়ে জন্মাই নি; ইনকোনেল হলেও চলে যেত—
চুপচাপ, এইসব দিন, প্রতিবাদহীন। এখন যায় না তাই, শীতার্ত
এই বহু ভয়ের ঠান্ডা রাত। হেলে পড়ি, ক্রমে ক্ষয়ে যাই।

তোমার ধর্মতাপে অন্য কোনো ধর্ম যদি চলে যায়
বনবাসে, দীপান্তরে; তবে হে কিঞ্চিৎ মৌলভী,
এবার ভাবো—হায়েনার নখ, হাতির দাঁতের পাশে
তুমি আজ কতটুকু আশরাফুল মাখলুকাত?

 


মাজুল হাসান
ধর্মভাই

 

বহ্নিউৎসব দেখছি বাংলার আকাশ। লুটছে। যদিও বনির ভেতর
পাশাপাশি কাশগুচ্ছের দূরত্ব অনেক, তবু খুব কাছে অতলান্ত
সূর্য তুমি এখনও তীব্রগুলি। ৪৭ থেকে ১৬। ১৬ থেকে পাল্টা ৪৭
শিখা-বিশাখা—এখনও গান গায় পাড়াত দুইবোন
এখনও গান ভেঙে শ্যামল হেমব্রম, মরা পাখি, মদ, উন্মত্ত…
খবরে শুনলুম আরও। গোয়ালা গেল, সখা-বাপ, সখা-মা
৩ ব্যাটারি ক্যাসেটের খোড়লে জমিজরাত বেচা টাকা,
                                        গেদাবাচ্চা, সম্ভ্রান্ত পুটলি!
কিভাবে যেন টিকে গেল রায় সাব’ বাড়ি
শুধু নাম। আর দীর্ঘদিন পাশাপাশি দুই অবিবেচক ও অবিশ্বাসী
                                                       ধর্মভাইয়ের ঘরগেরস্তি…

 


মুনিরা চৌধুরী
মালাউন-মঙ্গল

 

বাজার থেকে কয়েকটা দেশালাই কিনলাম
এখন একটার পর একটা পোড়াচ্ছি
কিছুতেই আগুন ধরছে না

কৃষ্ণদাগ ঘন হচ্ছে
স্বাধীন বাংলার কপালে খা খা করছে…

আর
আমার ঠাকুরমা’র সিঁদুরের কৌটা হতে
একদা লাল লাল বসন্ত ঋতু বেরিয়ে আসত
এখন বেরিয়ে আসে পোড়া মানুষের হাড়ের গুঁড়ো।

আমি বাঙালি এবং মালাউন
শঙ্খধ্বনি ছাড়া আমার রক্তে আগুন ধরে না।

 


সারাজাত সৌম
বৌদির গান

 

বাতাস তাড়া করে বৈশাখ—বৌদির গান
গেয়ে ওঠে কী সারল্য প্রতিবেশী। মেঘের
দিকে রাজহাঁস তাকিয়ে বলে, তুমি বায়স
দেখেছো কখনো? এরা করতাল বাজায়!

মেলা শেষে কেউ ঘোড়া কিনে—পুতুল কিংবা
টিনের মাছ। খোঁপায় ফুল—বকুল তারার
মতো ফুটে এই নিরালায়!

শ্যাম জানে—খুব সকালে কুয়োর আকুতি।
নিজের চেহারায় ভেসে যায় ক্লান্ত কেতকীর
মুখ। আর আমরা ভাবি—বৌদি রোজ সকালে
ছিটিয়ে দেন চোখের আহার।