হোম কবিতা শৌভ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

শৌভ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

শৌভ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
615
0

নিঃশব্দে অতিক্রম করি

১.

কবে যেন, পাহাড়ের পরিচ্ছন্ন আকাশের নিচে
দাঁড়াতে খেয়াল হলো—
দশহাজার বছর (আনু.) আগেকার তারার আলোটি
এখন আমারই চুলে লেগে আছে। বোঝা গেল,
মানুষের সভ্যতার সে কিছুই জানে না তেমন
সবেমাত্র, শিখেছে কৃষির কাজ, নদীমাতৃকতা,
দু-একটি সহজ যন্ত্র, পাথরের…
টলেমি বা আরিস্ততলের নাম জীবনে শোনে নি

আমি তার সারল্যে আশ্চর্য হই, আরো দেখি
কিভাবে সে, আমার চোখের সামনে, ধীরে ধীরে
পুড়ে যায়, ছোট হয়ে আসে। সে কি তবে
আমাদেরও চিনবে না? শুধুই অবাক আর
ভারি হতে হতে, একদিন আচমকা বিস্ফারিত হবে?

ততক্ষণাৎ স্থির করি, আমি তাকে
আমার জন্মের কথা, আমার দুঃখের কথা
                       সবই এক সবিস্তার চিঠিতে জানাব

 

২.

সীসেকে কিভাবে সোনা করা যায়, এ-প্রশ্নের
আজও কোনো মীমাংসা হোল না!
অথচ, দারুণ বিষে আমাদের হাতের আঙুল
ধীরে ধীরে বেঁকে যায়, কালো হয়ে আসে
মনে আছে, সেইদিন রাতে—খুরি গ্রামে—
বাদল সিং-এর বাড়ি আমাদের থাকার ব্যবস্থা
উঠোনের কোণে পাতা খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে দেখি—
লুব্ধক আচমকা নেমে এসে, রান্নাঘরে ঢুকে
হাঁড়ি খায়। তারপর, ছায়ার মতো, নিঃশব্দে মিলিয়ে যেতেই
গ্রামের কুকুরগুলি ডেকে উঠল

অরূপের মুখে শোনা—ক্রমশ হাওয়ার টানে,
বালিয়াড়িগুলি নাকি সারাক্ষণ পশ্চিমের দিকে
সরে যাচ্ছে। একদিন পুনরায়, এইখানে, মরুভূমি জুড়ে
বসতি স্থাপিত হবে—বাড়িঘর, গ্রামগঞ্জ, দু-ফসলি জমি…

ভয়ংকর শাদা পাতা
আমাকেও টেনে নিয়ে চলে যাবে বালির আড়ালে

 

৩.

অরূপ, সামান্য দূরে, ঝুঁকে আছে

সমস্ত দুপুর জুড়ে, ময়ূরের ডাকে
বিপর্যস্ত হয়ে থাকে হাওয়া
কপালে তোমার চুল উড়ে এসে পড়ে
শিশুটি ঘুমায়, যেন শঙ্কা নেই
যেন, প্রতিদিন অনন্ত ছুটির

ভিতরে বিলীন হয়ে থাকা
ছায়াটুকু, আমি তার
কাঁধ ধরে নাড়া দিই, বলি—ঢের হলো
উঠবে না? সোয়া পাঁচটা বাজে

বিব্রত পথিক, সে-ও
কেবল সূর্যাস্ত দেখতে এ-দেশে এসেছে

 

৪.

কেল্লার বুরুজ থেকে চোখে পড়ে, নিচে
ছোটখাটো বাড়িঘর, মানুষের
            অগোছালো জীবন রয়েছে
আরো কি রয়েছে কিছু?
শীতকাতর শূন্যতায়, আলোকিত নভে
ঘুরে ঘুরে, অবশেষে, কবুতর নেমেছে এখন
তামাটে ধুলোর মধ্যে, চতুষ্কোণ ছাদে

শুনি,
অচেনা ভাষার গান—থেকে থেকে—
মৃদু ও মর্মস্পর্শী। মানুষের আন্তরিক শ্রম
কোনদিনই বিফলে যাবে না, শুধু
পড়ন্ত আলোয় তাকে বড় বেশি রোগা আর
                              ব্যথিত দেখায়

 

৫.

ফেরনান্দো পেসোয়া (বা, আলবেরতো কায়েইরো)-কে
.

যে-গান আগুন জ্বালে, বা নেভায়
তুমুল বৃষ্টির স্নানে,
তা কি আগে কোথাও শুনেছি?
কখনও তেমন ক’রে, এই হাতে, ছুঁয়েছি ভুবন?

মুহূর্তের জল-হাওয়া, মাটি ও পাথর
অনুবাদযোগ্য নয়। তবু ভাষা, সুকৌশলে,
আমাকে ভজায়। বলে, এরও না কি ধর্ম আছে,
স্বাভাবিক রূপান্তর আছে। বঙ্গীয় শব্দকোষ খুলে
আমাকে বোঝাতে চায় কোমলতা,
                          কাঠিন্যের অবিচল মানে
যত বলি, কিছুতেই স্বীকার করে না,
বাগানে কোথাও কোনো ফুল নেই, পুষ্প নেই
            টগর, দোপাটি কিছু নীরবে ফুটেছে

 

৬.

যা-কিছু রয়েছে, সব এখানেই আছে
যা-কিছু কোথাও নেই, তারও একটা না-থাকা রয়েছে

এ-দুয়ের মাঝখানে, ঘাসে-ঢাকা পথের রেখাটি
ক্ষীণ হতে হতে, শেষে, মিশে গেছে ঘাসের শরীরে

শুধু তার সম্ভাবনা, দূরত্বকে কিছুদূর আন্তরিক করে

 

৭.

বিপুল দূরত্ব হেঁটে, অবশেষে, চৌকাঠ থেকে
খাটের পায়ার কাছে পৌঁছল পিঁপড়ের সারি—
এই দৃশ্য দেখে, আনন্দ অপূর্ব হয়। মনে পড়ে,
মরুভূমি থেকে দেখা রাতের আকাশ—ছায়াপথ
                        নক্ষত্রে অবিশ্বাস্য ঘন হয়ে ছিল!

ভাবি, তাহলে কি
অনেকটা দূরে গেলে, দূরত্বও
                         ধীরে ধীরে, ক্ষীণ হয়ে আসে?

অথবা দূরত্ব এক ভাষাহীন মাঠ,
                    চরণে কুসুমচিহ্ন লেগে যায়, দেখি—

শৌভ চট্টোপাধ্যায়

জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৩; হাওড়া, ভারত। ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার, এম বি এ। পেশা : ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
অনন্ত-র ঘরবাড়ি, হাতিঘোড়া ও অন্যান্য [ডি কোং, ২০০৯]
মুনিয়া ও অন্যান্য ব্যূহ [নতুন কবিতা, ২০১৩]
মায়াকানন [সৃষ্টিসুখ, ২০১৭]

ই-মেইল : souva.chattopadhyay@gmail.com