হোম কবিতা শাদা পরচুল অন্ধকার

শাদা পরচুল অন্ধকার

শাদা পরচুল অন্ধকার
902
0

এক.
একটি লাস্যময়ী বানমাছ আমার স্বপ্নের ঘোরে ঢোকে শাদা পরচুল পরে। ওকে ধরতে গেলেই পিছলে যেতে থাকে সকাল, প্যাপিরাসে পেখম মেলে ঔপনিবেশিক অজাচার। ঘরোয়া অন্ধকারের কাছে রংধনু দাবি করে বোকা চাঁদ, যার জ্যোৎস্না জৌলুশ ফুরিয়েছে দিন পনের আগে। রাত পোড়ানোর গানে প্রাণ আনতে আজকাল তারাদের পাশাপাশি রঙধনুবিলাসও প্রয়োজন হয়। যদিও আমন্ত্রণ ভাষ্যে কণ্ঠস্বরের রক্তাল্পতা স্পষ্ট, তবু তা গোপনের অযাচিত প্রচেষ্টা ক্ষুব্ধ করে রাত-বাতাসের প্রবাহকে। জলের মৌচাকে মুখ গুঁজে পরে থাকা রঙধনুটার আর আসা হয় না তাই চাঁদবিলাসীর সাহায্যার্থে। অন্ধকার, রাতের কোল জুড়ে বসে থাকে বিবর্ণতায়; ওদিকে আমার ঘরে ঢোকা বান মাছটার শাদা পরচুল খুলে বেরিয়ে পড়ে অনাহূত বিষাদ।

 

দুই.
যে হাত ডালিমের দানা থেকে তুলে আনে সর্বনাশ, তার নাম প্রেম। সর্বনাশ ভেঙে সেই তৈরি করে পাথরের পথ, যদিও তার কোলে ঘুমোয় না নির্ভাবনার পুতুলঘোড়া। অহর্নিশ পাড় জুড়ে বুনে যায় অবিশ্বাস, ফণা তোলা রক্তের অসুখগুলো। সম্ভবত একারণেই ভেতর থেকে উঠে আসতে থাকে নিঃস্বতম ক্রোধ, যাকে সহজেই নাম দেয়া যায় অভিযোজিত নীল রাজহাঁস। রাতের জন্মপ্রহরে যার নিঃশ্বাস সমুদ্র থেকে বিষ খুঁজে নেয়, সে তো মুহূর্তেই অগ্রন্থিত বেদনার জন্মকথা লিখতে পারে আবির উৎসবে। জোনাকি জানে, আঠারো শতকের বোতামে আটকে আছে আমার সর্বনাশের সন্ধ্যাটুকু, যার কোলে চড়ে বসেছে ব্যক্তিগত সূর্যোদয়। বিকট রাতগুলো কালো দাঁত খুলে বিশ্রী একটা হাসি দেয়; এতে করুণার উদ্রেক হয় ঈশ্বরের, উটকো ঝামেলা হিশেবে। অনিঃশেষ উপকথার দানপাত্র থেকে জোটে কয়েক টুকরো বিষাদী বানমাছ ও পুরোনো অবিশ্বাস। ওদের ঠোটে ছাইরঙ লিপস্টিক, আমাকে মনে করিয়ে দেয় কালকে মাথা থেকে খসে পড়েছে শাদা পরচুল, যা আসলে আগুনের সন্তান।

 

তিন.
পৃথিবীর নিঃস্বতম শালিক ঘুরে বেড়ায় একা একা আপেলের বনে। ছিঁড়তে গেলে চোখে পড়ে সারি সারি মৃত বানমাছ, ফলের বদলে ঝুলে আছে বিধ্বস্ত বাদামি শাখায়। বলে গেছে মায়ামৃগ, দুঃসময়ের কোমরে বাঁধা খদ্দরের কাপড়! পায়ে অন্ধকারের ঘুঙুর পেঁচিয়ে উড়ে বেড়ায় পরিযায়ী অসুখ। ঠোঁটে উপেক্ষার কদম নিয়ে উড়ে যায় সোনালি রোদ্দুর, কোলে তার শাদা পরচুল অন্ধকার। বিপরীতমুখী আচরণে রাতের বুকে আলোর ঢল নামায়, ফলার মতো ঝলকে ধাঁধিয়ে দেয় দুটো বুনোহাঁস চোখ। ওদিকে নেচে বেড়ায় আপেলের বন, কানে কানে বিবাগী জলের ধ্রুপদ নৃত্য সঙ্গত! ঝুলন্ত বানমাছগুলোর কাছে গেলেই শব্দরা অন্ধকারের কাছে আসে, নৃত্যের শেষ মুদ্রা আহ্লাদিত করে শুকিয়ে যাওয়া লাল পিঁপড়াকে। অবিশ্বাসের প্রভু! মরে নি রেশম মথ, এখনো জীবন তার পাতায় ও পতঙ্গ নামে।

 

চার.
শহরে অবিশ্বাসের রোদ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুশো বছরের পুরোনো শকুন। পোড় খাওয়া নাগরিক বালুকণার গায়ে লেপ্টে আছে সম্ভ্রমহানির চিহ্ন। অস্থির হাওয়া কেউটের মতো ফণা তুলে ঘোষণা করে, কুমিরের পেটে এখন শাদা পরচুল। পুরাণের অ্যাপোলো, বিষের বীণ বাজিয়ে তুমি চুষে নাও গোখরোর স্রাব; ভেবেছ কি কখনো, বেটে ময়ূর আয়নায় দেখে না পেখমের উচ্ছ্বাস? অন্ধ বালকের পায়ে ভুল পথের শেকল, শেকড় ভুলে গেছে অসময়ের জাদুকর। স্টেজ পারফরম্যান্সে ভুল হয় তাসের জাদু, অবিশ্বাস পতিত হয় কালাজ্বরে। আলেয়ার কোলে হাত রেখে বেঁকে বসে বুটিকের দর্জি, আর বুনবে না জলের নীলানলে পাক খাওয়া এক দল বানমাছের ছবিযুক্ত ওয়ালেট। গতরাতে বাতাস নামে নি শহরে, দেখে যাও জলের কৌটাগুলো কী আশ্চর্যরকম নিরুত্তাপ! ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে পাপের বোঝা, পিছু লেগেছে সেই পূর্বজন্ম থেকে; ভোর হতেই দূষিত করে ফেলতে চায়, আমার দৈনন্দিন পাটিগণিতের শহরটাকে।

 

পাঁচ.
টপলেস সূর্য তৃষাতুর সারমেয় বুকে চাবুক চালায়, জলাধারে জীবন খুঁজতে নামলেই কেন তেড়ে আসে মহাশোল? জানে না পলিমাটি মন। বলতে পারে না কেউ, কেন কখনো কখনো নিরাশ্রয়ের সকালে আশাতুর বাবুইয়ের ঠোঁটে আধার তুলে দেয় সোনালি বানমাছ। মনে পড়ে যায়, দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের চিকিৎসায় ফল আসে নি এক বিপ্লবে। আরো কয়েকটি বিপ্লব বিষয়ক কর্মশালা আশু প্রয়োজন, পেলব কবিতা লেখবার স্বার্থে। উষ্ণতর হিংসায় পুড়তে থাকা পৃথিবীর মুখ, জমে যায় স্নেহহীন বরফকুঁচির বুকে গ্লেসিয়ার আর্ট হিশেবে। সবশেষে নীরবতা। প্রিয়ন্তিকার খয়েরি চুলে এখন গুজবের ঘরকন্না, একটু আগে ত্রিমুখী ক্রসফায়ার চালিয়েছে শাদা পরচুল। কেউ কেউ ঘুম যায় লাবণ্যের কবরে, দুগ্ধস্নান শেষ করে নেমে পড়ে কাদাজলে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই একে জলহস্তীদের চারিত্রিক প্রবণতা হিশেবেই মনে করে বালুঘড়িতে মাপা আপেক্ষিক সময়।

 

ছয়.
শুয়ে আছে ক্লান্ত পাইথন, স্ফীত উদরে যার অন্নের ভাঁড়ার! এবার ঘুমাও তুমি ঠান্ডা পাইথনের সাথে, প্রথম দিনের সূর্য। অহঙ্কারের একটা বাদামি খরগোশ কেমন করে যেন বেড়ে উঠছে আমার পেটে, লৌকিকতার কালবেলায়। তুমি না এলেই সে জেনে যাবে গত শতাব্দীতে আঙুলহারা প্রগল্‌ভ বালকটি, কেন এখনো বকে যাচ্ছে গোপন ব্যভিচারের দণ্ড। সুগন্ধি ভেষজ পুড়িয়ে সামনে থেকে হেঁটে গেলে দেবী ইশতার, উড়তে থাকা পাপড়িগুলো মরণচুমু খেতে শুরু করে। উর্বরতার চোখে চোখ রাখলেই নেমে আসে সর্বনাশের সিংহ, বলে গেছে শাদা পরচুলে লুকোনো অ্যাসিরীয় অন্ধকার। তাকে খুঁজতে শহরে নেমেছে প্রশিক্ষিত বানমাছের দল। ধর্ষিত মাটির দোমড়ানো স্তূপ কিংবা পাতালে ঢুকে ওরা বের করে আনে শাদা ঘুঘুগুলো। উল্লাসে ফেটে পড়ে মাঝবয়সী মেঘেরা, শূন্যতায় কেউ ডানা ঝাপটালে, আকাশ কেমন করে যেন হয়ে ওঠে ঈশ্বর।

 

সাত.
বিস্মরণের ঘুম থেকে জেগে পোষা মাছরাঙাটা হঠাৎ বলে ওঠে, সর্বনাশের পাথর-দেহে পাঁচটি শ্লোক লিখে রেখে গেছে অনির্দিষ্ট পৌরাণিক সময়। শ্লোকপাঠ শেষে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ-জনিত বেদনার বিষ, গায়ে ওঠে পাখিটার। বালির পুরোহিত বলে না, কবে নাগাদ পিঁপড়ের দল হয়ে ওঠবে উচ্ছৃঙ্খল? মর্গের মানুষগুলো জাবর কাটছে, কখন শুয়ে থাকা শাদা পরচুলটা পচে নীল হবে, পাখিটার মতন। গত বৈশাখে মহামতি সিজার পা ডুবিয়ে উদ্বোধন করেন রেড ওয়াইনের পুকুর। মুখে স্মিত হাস্য ছিল, কাঁধে ছিল অ্যাটলাসের চেয়ে কিছু বেশি বোঝা। রোজ সেখানে নিয়ম করে পা ডুবান তিনি, অথচ কেমন করে তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন বাহ্যিক অন্তঃসারশূন্যতায়, বানমাছগুলো বারবার বলে গেলেও কানে তোলেন নি। সহজবোধ্য উজ্জ্বল রোদে নেয়ে পশ্চিমের নদীরা তৃষ্ণাকাতর হয়, টেনে নেয় ঘূর্ণিপাকে বেহায়া উচ্ছ্বাসকে। জানি না কেন, আজকাল তাবৎ অসুখ সংরক্ষিত থাকে চিবুকের যানজটে, হাপর জাগিয়ে তোলে ঘুমিয়ে পড়া ঘাসের কার্পেট।

 

আট.
দুঃসময়ের নগ্ন কপালে সিঁদুর টেনে দিয়ে, কুসুম গরম রক্ত ও দুধের মিশ্রণে গোসল সেরে এসে ঔপনিবেশিক ঘুম দেয় আগুনপাখি। একশ নব্বই বছরের ঘুম ভেঙে দেখতে পায় হারিয়ে গেছে ফারাওয়ের সিংহাসন। আঙুলের ডগায় জমে আছে বিষণ্নতা, লোভের মুকুটগুলো মমি হয়ে থাকা বেড়ালের শোভাবর্ধক। আয়নায় বিম্বিত রক্ত ও ক্লেদ, প্রেসক্রাইব করে নির্ভাবনার ঘুমকে, ঘুমেরা শাদা মাস্তুলে সবুজের পেইন্টিং করে না রাতদুপুরে আর…। চুমুক দিয়ে পান করে যৌবন, রক্তপায়ী অ্যারিস; অবিশ্বাসের বানমাছ চেয়ে চেয়ে দেখে। অসুস্থতার অমীমাংসিত চিহ্নবিজ্ঞান মেলাতে এসে নিজেকে বিক্রি করে দেয় শাদা পরচুলের কাছে, একটা রাংরাং পাখি। যার সাঁতরে বেড়ানোর কথা আকাশসমুদ্রে, সে ফন্দি আঁটছে কী করে মাছগুলোকে শীতঘুমে পাঠানো যায়। পাখিটা জানে বানমাছের পিঠেই এখন শুধু প্রাণের স্পন্দন।

 

নয়.
অথচ উদ্বাস্তু ভোরবেলায় নেমে আসে অসুখের ঝাঁক, নিৎসের দর্শন চর্চা করে করে ওরা হাত পাকিয়েছে। লক্ষ্যভ্রষ্ট রোদ হাঁচি দেয়, দাঁতের ফাঁকে নস্যি নিয়ে ঘোরে পাপযজ্ঞের একচক্ষু বেশ্যারা! ওখানে মৃত্যুরা হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় পরিচ্ছন্নদের পলায়ন দরজায়। সুগন্ধ ভেসে আসে মশলার জাহাজ থেকে, শোকাচ্ছন্ন অ্যাম্বুলেন্সে হেসে ওঠেন ক্ষণপূর্বে মৃত ঘোষিত রবীন্দ্রনাথ! তৃষ্ণার কাছে নৈঃশব্দ্যের গল্প শুনে কেঁদে ওঠে সম্ভাবনার ডাকপিয়ন। বিদায়ের কিছু আগে শহরের বানমাছেরা এক বাজার বসিয়েছে প্রতিবেশী সময়ের কাছে। সেখানে কেজি দরে বিক্রি হয় শাদা পরচুল, যার গায়ে মাখানো ভাবমূর্তি, সমবেদনা ও আরো কয়েকটি ইতিবাচক মানবিক অনুভূতির পরশ। ওখানকার বিক্রেতারা মধুময় বাচ্যে বিক্রি করতে থাকে মানবিক আত্মাদের। ওদের নিজস্ব চেতনা বন্ধক দিয়ে রেখেছে অন্ধকারের কাছে; যাতে প্রচ্ছদহীন সকালের অনুভূতি ফালি ফালি করে কাটা হাতগুলোকে ছুঁতে না পারে।

 

দশ.
বদলাতে এসেছে সে; আপেক্ষিক দুপুর, মুদ্রাঙ্কিত রাত, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের তুলনামূলক পটচিত্রে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র সকাল! হিংসার খাঁচা ভেঙে নেমে আসা বোকা বানমাছেরা জানে না পতিত পিশাচেরা অসুর, শকুনের পিঠে বসে খুঁজতে থাকে অনুকূল পরিবেশ। সিঁদুরে জীবন লেপ্টে বেহুলারা মৃত্যুকে অস্বীকার করে, অশোকতলায় বেঁধে রাখা পানকৌড়ির রক্তে হাসি ছড়াতে। পরাজিত ঈশ্বর আভিজাত্য নিয়ে ভেঙে পড়বার সময় হলে মুখ লুকান কিছুক্ষণ আগে অন্ধকারে দাফন হওয়া শাদা পরচুলে। ক্যালেন্ডারে পতনচিহ্ন আকা শাদা পেন্সিলটা, ভেঙে দেয় অনিয়ন্ত্রিত ধ্যান! মৃত্যুহীন সর্পিল গণিত বলে যায় প্রত্যাখ্যাত আশাবাদের গল্প-হলুদ কাগজে যত নীল পতঙ্গের বাস, ওরা সব খেয়েছে এতকাল নিরাশ্রয়ের শাদা পরচুলে মোড়া কালো কালো বানমাছ। অবাক হতে থাকে আহত ঘুড়ি, লাল হচ্ছে হঠাৎ জলাশয়ে নাচতে থাকা বেদুইন রাজহাঁসের শাদা শাদা পালক!

রেজওয়ান তানিম

রেজওয়ান তানিম

জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭, বরিশাল। বুয়েট থেকে পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়েছেন। বর্তমানে জার্মানির টি ইউ ফ্রাইবার্গ-এ অধ্যয়নরত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
শাদা পরচুল অন্ধকার [অনুপ্রাণন, ২০১৪]
মৌনমুখর বেলায় [জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০১২]

গল্প—
অবন্তি [ভাষাচিত্র, ২০১২]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শাহবাগের সাথে সংহতি [ই-বুক, ২০১৩]
আন্তর্জাতিক কবিতা সংকলন ‘In Praise-In Memory-In Ink’‘In Our Own Words’ ‘Heavens above, poetry below’, [Blurb Publication, Canada, ২০১৩, ২০১৪]

সম্পাদিত পত্রিকা—
লিপি (২য় ও ৩য় সংখ্যা), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্রিকা 'অনুপ্রাণন'

ই-মেইল : rezwan.tanim@gmail.com
রেজওয়ান তানিম