হোম কবিতা শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি
শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি

শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি

428
0

মৃদুল দাশগুপ্ত

দুটি কবিতা


ঘড়ির দুইটি কাঁটা, ছোট বড়ো, দুজনে অবাক।
ভেবেছে ভোরের রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে
                                        ঢুকবো কি? থাক।
থেমে গিয়েছিলো হাওয়া, ঘুরছে আবার।
জল ঢাকা, চাপা দেওয়া রয়েছে খাবার।

কা কা কা কা ডাকাডাকি এইবার শত শত কাক।

এবার জলের শব্দ শুরু হলো, হতে পারে
                                    রাতে ছিলো খোলা
দরজায় লেজ নাড়ে ভোলা।

এরপর লোকজন যাতায়াত অলিগলি দিয়ে
দুপুর গড়ালো ধীরে, নাওয়া খাওয়া ভুলে আমি
                                             কেন যে ঘুমিয়ে


চিন্তায় নেবো না কোনও জটিলতা, কাটাবো না রাত
কেবল অবাক চোখে ক্ষণকাল বাতাসে সাক্ষাৎ
পাওয়ার কাতর লোভে জেগে জেগে থাকবো না আমি।
                        সোজা যাবো গুটি গুটি নিকট অঞ্চলে
ভারী কিছু কখনো নেবো না আর, তুমি ক্রমে ডুবে যাবে
                                                          মনের অতলে

তবে কিনা এও খে্লা, হয়তো দৈবাৎ
ভুলে সূর্যে দিয়ে দেবো হাত

 

 

গৌতম বসু

পিঠে যে বাদ্যযন্ত্রটি বাঁধা রয়েছে


অতর্কিতে, শতখণ্ডে ভেঙে পড়েছে কিসের অন্তরাল,
কে জানে কেন, মৃদু ঝড় উঠেছে, ঘণ্টাধ্বনি শুনছি,
এত দুর্ভাবনার স্তর কেন দেখি, আকাশপরিবারে ॥


সত্য এই, বাহিরে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে। সত্য এই, অলক্ষ্যে
যা ঘটে তা সূক্ষ্ম ও অধরা; তোমার ভিখারীর বেশ,
ওই ফাঁকা রাস্তা, এদের কোনও বিবরণ লেখা যায় না ॥


আত্মগ্লানির নদীতীরে ঘুরি। এইখানে সে এসেছিল,
হত্যার মতো অভ্রান্ত, মাটি পুড়ে গেছে কোথাও-কোথাও;
মাটি পুড়ছে, এ-ছাড়া বলার মতো কোনও বিষয় নেই ॥


পশুর শরীর আর গন্ধর্বের মন নিয়ে বেঁচে উঠি,
পিঠে যে বাদ্যযন্ত্রটি বাঁধা রয়েছে সেটি আমার নয়;
দেহমনও নয়, কেবল তোমার উপহাসটি আমার ॥

 

 

হোসেন দেলওয়ার

মায়াঝিল

.
যমুনা!
যমুনা!!
কেউ বলে বাসনার ঢেউ…

এই দেহ জলের মন্দির—অর্ধেক ডুবে থাকা হিজল ফুলের পাশে লিখে রাখে ডাকনাম—পেতে রাখে ছায়াছিপ—ভুলে যায় ফেউ—

ফাৎনা তার ভেসে যায় ঢেউয়ে…

কলাপাতা, ছেঁড়া তাঁবু—যাতনাজারুল

এই তবে জলের ঝরোকা—মেঘশীর্ষে ঝুলে থাকা রোদে জলের বুদ্বুদ মাখে হাওয়াই-ফড়িঙ। এই ঝিল পেরোলেই হলুদের বন—শেষ বাঁকে তার নবজাতক এক সাপকে পাহাড়া দেয় সহস্র ময়ূর—মমতা-উল্লাসে কোথাও নাচমহল জেগে ওঠে—হাওয়ায় হাওয়ায় নাগিনীর শিস শোনা যায়…

হারানো নথের খোঁজে এই ঝিলে কেউ কেউ আসে—ফিরে আসা বালিকারা কোনখানে খুলে রাখে পায়ের নূপুর?

 

 

সরকার আমিন

সঙ্গমস্নান…

.
ডানচোখে যখন ঘুম,… বামচোখে অনিদ্রা !
শীত আর গ্রীষ্ম এক সাথে বাস করে মনে!
চাষ করে উষ্ণতা নীরব শীতলতা
বলো, জাহান্নাম বা জান্নাতে কি আসে যায় অামার?

বহুদূর থেকে কান্নার শব্দরা আসে
কার দুঃখ? কেন দুঃখ? হে আমার রোহিঙ্গা-মন
জল থেকে উৎপন্ন আগুন কেন হাসে; গভীর উল্লাসে!

তুমি আসবেই এই আশায় বসেই থাকি কাম-বৃক্ষের তলে
হৃদয় জানে দেহ খেলায় স্নানটা হয়েই যায় জমজম জলে!

 

 

মজনু শাহ

মৃগয়া

.
অনেক মেঘসঞ্চার হলো।
এমন দিনে তোমার ইচ্ছে হলো মৃগয়ার।
পথে অনেক গুলির খোসা আর ঝুটো অলঙ্কার।
ফরিদউদ্দিন আত্তারের মতো দেখতে একজন লোক
কথা বলছেন পাখিদের সঙ্গে। তুমি জিপ থেকে নেমে
কী ভেবে নদীর দিকে ছুটলে, হেসে জানালে,
                 ‘বাহাদুরি কাঠ ভেসে চলে যায়…

তোমার কাণ্ডকীর্তি বুঝতে না-পারাটুকু আমায়
বিদ্রূপ করে। উদ্দেশ্যহীনতায় মোড়া তোমার মৃগয়া!
অবশ্য এই যে ঘাসের মধ্যে পান্নাসবুজ রঙের
পাথরখণ্ড জ্বলছে, বুঝব না কখনো
তারই কী-বা উদ্দেশ্য আছে জগতে।

 

 

সাখাওয়াত টিপু

আকাশ তোমার প্রেমের উঠান

.
একটা শহর তোমার ভেতর
চুন সুড়কি পলেস্তরার
অসংখ্য ঘর তোমার ভেতর
মন যেনবা আলাদা পর

পাখি পাল সুখের সময়
দুখ পেলে অচিন সাগর
শহর তোমার বিচ্ছেদের গান
আকাশ তোমার প্রেমের উঠান

মর্ম তোমার উদাসপুরে
করছে ধারণ জোতির্ময় সাঁই
প্রেম মানে কি শহর ভেদে
ঘরের ভেতর গ্রাম ঢুকে যায়!

 

 

সৈকত হাবিব

সৈকত হাবিবকে

.
এ কি তোমার নাম
   নাকি ছদ্মবেশ
জড়িয়ে আছো গোপন আবেশ?

তুমি কি আসলে তুমি
ছড়ানো হৃদয় যার আভূমি
যে ছুঁতে চায় নক্ষত্রের নদী

   নাকি তুমি এক নগর-ইতর
   অশ্রাব্য কোলাহল যার ভিতর

   হতে তো চাও নৈঃশব্দ্যের সুর
   অথচ তুমিও এক মানব-অসুর

নিজের জীবন কি যাপন করো তুমি
নাকি কেবলই মুখোশ, ছদ্ম-মাতলামি?

আসলেই কি সৈকত হাবিব তোমার নাম
কবি যিনি, আয়নায় ধরেন জীবনের ছবি
প্রণাম তোমাকে তবে, মহাকাব্যিক সালাম।

 

 

কৌশিক বাজারী

ঘর

.
ঘর তৈরি হচ্ছে তোমার!
বুবু বলছে, এইটা আমার ঘর,
এইখানে তাকের উপরে থাকবে বই
বলছে, এইখানে হারমোনিয়াম
আমি রান্নাঘর সাজাচ্ছি মিস্তিরির হাতে—
ওইখানে জানালার কাচ, স্লাইডিং হবে কিনা বলো?
বাঁহাতে তোমার মশলার তাক থেকে সুগন্ধ এসে পড়ল যেন!
জানো, মায়ের সময়ের সেই পুরনো কুলুঙ্গিটুকু তেমনই রেখেছি!
আর, ডান হাতে জলের আওয়াজ।
রড আর ইট আর সিমেন্টের অন্ধকারে সয়লাব হয়ে আছে ঘর
উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিমের কোন দিকে তোমাকে মানাবে!
ভাবতে ভাবতে ফটোফ্রেম ভেঙে ফেলে বেরিয়ে পড়েছ আনমনে
পুবদিকে কিছুদুর সিঁড়ি উঠে গেছে, দ্যাখো—
              হঠাৎ মোচড় মেরে শেষপ্রান্ত, অসমাপ্ত
                                                             শূন্যে ঝুলে আছে…

 

 

শুভাশিস সিনহা

শরৎকুমার

.
আমাকে দেখলাম, অবশেষে, ফুটে উঠছি কাশের ডগায়, শাদা
দিগন্তে লালিমা, রক্তচক্ষু অভিমান, ধূলি, ভস্ম, চক্রপথ
এ-পার্বণে, শয্যায় নতুন চাদর বিছিয়ে রুপালি রাত্তির
মেলেছিল ছাতি, চোখে আজন্মপিঁচুটি নিয়ে তড়পালো শুধু
অভাগা জন্মান্ধ একা, ঝড়ো হাওয়া, বজ্রের শাসন, শিলারাশি
পলে পলে লুটে নিল সাধ, স্বপ্ন, সবুজ তৃণের মৃদু গান
অস্তরীক্ষময় ছলনার শান্ত হাহাকার, চাবুকের ক্ষত,
এইসব ঘোরলাগানো দিন, অট্টহাসি, ধুঁকে মরা পরিচয়

দারুণ দেখলাম, আমাকেই, শুভ্রসম্ভাবনা, কাশে কাশে, মেঘে
খানিক পরেই চরাচরে রক্তভেজা হৃদিসারসেরা ডানা
মেলবে, মৃত্যুপুরী থেকে ফেরা প্রাণ-ময়ূরীর পেখমের গান
লজ্জাতুর বাতাসের ওষ্ঠ ছুঁয়ে দেশ দেশান্তরে যাবে, কথা
রাষ্ট্র হবে, চৌদিকে রূপের মেলা সোনালি দর্পণ, দেখি মুখ,
দিগন্ত মেলায়, নিরাকার নীলাভ বসন অঙ্গে জড়ালাম।

 

 

মুয়িন পারভেজ

দেবযানীর প্রতি

.
আমি আসছি, মন্ত্রহীন কমণ্ডলুহীন পথিক, আমি আসছি
ও দেবযানী, ফিরিয়ে নাও তোমার অভিশাপ

ফুল আনতে গিয়েছিলাম গহিন বনে, পথ হারিয়ে আবার যেন
ফিরে আসছি, কোথাও আর নেই মনস্তাপ

এই আমার হাত, আমার অনন্তের হাওড়ে ভেসে যাওয়া চোখ
এই আমার জন্মদাগ, ভীরুতা, সংশয়

তবু কি আজ পারো না হিম স্মৃতিভস্ম থেকে আবার বাঁচিয়ে দিতে
শপথহীন পথের কোনও সহজ পরিচয়?

যুদ্ধ থেমে যায় নি আজও, সঞ্জীবনী তুচ্ছ করে আমি আসছি
তোমার কাছে; চিরজয়ের নেই বিরোধী চাপ

কণ্ঠে নেই সুরবাহার, ভুলেও গেছি নৃত্যকলা, তবু আসছি
ও দেবযানী, ফিরিয়ে নাও তোমার অভিশাপ

 

 

সমিধ বরণ জানা

সাক্ষাৎ

.
নজরে নজর মিলে যেতে
তিরিতিরি কাঁপা থেমে গেল
জলের মন্থর ঢেউ যদিও প্রবহমান আছে,
কাঠের বিড়াল বলে মনে হয় তাকে
অবয়ব স্পষ্ট নয় তবু
জোনাকির সন্ধানের আলো
ঢেউখেলা পশমের মতো
সুঠাম শরীরে তার ঘুরে ঘুরে যায়।
আমি কি শ্বাপদ ভেবে নিজেকে এগিয়ে দেবো, নাকি
ডালিম গাছের স্তন থেকে ঝরে পড়া
মধু-র অঞ্জলি
তার পায়ে নিবেদন দেবো?

 

 

ফয়সাল আদনান

রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যন্ত্রের ভাষা ও প্রেমের কবিতা


অথচ তুমি এক ধূর্ত বৈমানিক, পাখির খাঁচার নিচে যার সমূহ গোত্তার কাছে আমি রেখে গেছি প্রায়ান্ধ মেশিনের চুম্বন। রক্তের চেয়ে বেশি মবিল ও ডিজেল নিয়ে তোমার এই ফুলে ফেঁপে ওঠা। ধূলি-কালি ঝেড়ে একেকটা দেশলাই—যেভাবে জ্বালে নক্ষত্রের মতো তুমিও তার ভেতর পুরে দাও সহস্র আলোকবর্ষ, অয়োক্লান্ত বাঘিনী আমার। দ্যাখো পৃথিবীর সব প্রেম গাঢ় হলে, এতটা সর জেগে ওঠে, অবিকল ডায়নামোর মতো এ মেশিন তার উপস্থিতি জানায়—পৃথিবীর প্রচুর ছায়াঘেরা সবুজ বনের নিচে।


হাত থেকে খসে পড়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্লেটোর ধারণা। মনে হয় তোমাকেও বিচার-বহির্ভূত লুকিয়ে রাখি কাঠবাদামের ছায়ায়। দারুচিনির যে রঙ তার চেয়ে গাঢ় হবে সকাল, আর গতরাতের লাশেরা সব জেগে উঠবে আমাদের টিভিস্ক্রিনে। তোমার খসে পড়া আঙুলগুলো দেখি, দেখি কি ফুল ফুটিল (ঝরিল) গোপন অন্ধকারে। হাত থেকে খসে পড়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আর তোমাকে অন্ধ করে, তোমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে—আমি ঝুলিয়ে রাখব ভাবি—কাঠবাদামের ছায়ায়।