হোম কবিতা শংকর লাহিড়ীর অগ্রন্থিত কবিতাগুচ্ছ ‘অনন্ত সূত্রধর’

শংকর লাহিড়ীর অগ্রন্থিত কবিতাগুচ্ছ ‘অনন্ত সূত্রধর’

শংকর লাহিড়ীর অগ্রন্থিত কবিতাগুচ্ছ ‘অনন্ত সূত্রধর’
843
0

১.
তারপর অনন্ত তুমি সাথে সাথে এতদূর এসে

অস্ফুটে আমারই সম্মুখে

দাঁড়িয়েছ! যখন সম্মুখ ব’লে কিছু নেই
ঊর্ধ্ব অধঃ নেই, শুধু পূর্বাপর

আলো-জ্যামিতির গায়ে তমিস্রা নাম্নী এক নদী
রয়েছে জড়িয়ে

স্মৃতির কুহক নাকি উদ্ভ্রান্ত অবিরল কণা
এতদূর চলে আসে বিকিরণ ভস্মদল

যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে মহাবিশ্বে প্রত্যেক গহ্বরে

বালিয়াড়ি শস্য মরুভূমি জলের প্রত্যাশে কেঁপে ওঠে।

তুমি সেই আদিম সারস

দীর্ঘ ডানার পাখি,
শবদেহ জাগাতে এসেছিলে;

পরিত্যক্ত রানওয়ে… উড়ে যাচ্ছে লাল মাইক্রোলাইট
নাকি এক লাল অন্তর্বাস?

আমরা তো কবিতাকে জলোচ্ছ্বাসের মতো অন্তর্বাসের মতো
বাজুকার মতো

কর্তৃত্বময় দেখতে চেয়েছি; অনন্ত নক্ষত্রলোক

আমাদের শস্যবীমা আছে।

 

২.
তবুও অনন্ত  তুমি
এতদূর এসেও জানালে না—উত্তাল সমুদ্র

নাকি ভাসমান দ্বীপপুঞ্জ তুমি
কোথায় অধিক তেরিয়ান

রৌদ্র-ফসফরাস জানে তপ্ত বালু কচ্ছপের ডিম

ভাঙা নৌকায় শব
ঘর্মাক্ত সানট্যান্ড বিকিনি তরুণী

পদচিহ্ন মুছে মুছে চলে গেছে অজস্র জীবন।

আমি সেই দৃশ্যপট নির্মিত দেখেছি

ভিটে বদলের দৃশ্য, গেরামথান পার হয়ে চলে যাওয়া
ভাঙা আর্শি ময়ূর পালক

কাজলের দাগ ছিল মাটির দেওয়ালে—

লবণাক্ত জল নামে ধীরে ধীরে মাটির গভীরে

পাণ্ডুলিপি রৌপ্যমুদ্রা কাদামাখা তোরঙ্গ চাবুক

দড়ি ও হারপুন

হ্রদের অতলে ঘোরে অন্ধ মাছেরা।

 

৩.
তুমিও অন্ধ ছিলে, নিজ বর্ণমালার আশ্রয়ে
অন্ধ অশরীরী

ক্রমে ব্যবহৃত ব্যবহৃত বহু ব্যবহৃত
ব্যবহৃত হয়ে

অনন্তকাল তুমি সত্যিই এমনই
চিহ্নবোধহীন?

ছবি ভাসমান ছিন্নভিন্ন বহুমাত্রিক

সমুদ্রপৃষ্ঠাগুলো

নীলাকাশ ভেসে যায় সৌরমূর্ছনায়
দিনের কলড্রন ভরে ওঠে

শবদেহ মেঘ বাষ্প রডোডেনড্রন

আহ্নিক গতিও ক্রমে ক্ষীণ; ক্রমশ স্তিমিত আলো
গোলাপি আলোরা—

শব্দহীন বৃষ্টিবন
টুপ টুপ শিশির পড়েছে

ঘূর্ণি হাওয়ায় ঘোরে ঝরাপাতা মাটি উড়ছে
পত্রমোচী বন

এই বৃত্তপরিধির মাঝে
কে তবে জাগিয়ে রাখে সারারাত তোমাকে আমাকে?

তোমারই হাতের নম্রতা

ঝিঁঝিঁর শব্দ ওঠে বনে বনে

অনন্ত এই রাত এত শব্দহীন।

 

৪.
অনন্ত, কোথায় গেলে সেই মানুষের স্পর্শ পাব
সৌরপৃথিবীর কোন শাঁসের গভীরে

এতদিন অরণ্যবাসী এতদূর অরণ্যবিনাশী

ইরেক্টাস, স্যাপিয়েন স্যাপিয়েন,
নিয়ান্ডারথাল
ঘনজ্যামিতির মতো ঘাসে

যৌনচেতনায় নাকি মৃত্যুভয়ে কেঁপে উঠেছিল!

রান্নাঘর সরু চাল নিকোনো উঠোনে কলরোল
ভিয়েন বসেছে

খেজুর রসের মতো রক্ত ঝরছে নিঃশব্দ প্রাণে

নিঃশব্দ রক্ত ঝরে আক্রান্ত বাতাসে—

দৃষ্টিহীন হয়ে আছি

ক্রমে ওঠে ক্লান্ত হিম পাতাপোড়া রাতের হিল্লোল।

 

৫.
অনন্ত বৃত্তের মাঝে রয়েছে অনন্ত

দুটি রেখা;

সাগর ও সৈকতের মতো
সমান্তরাল

আলো অন্ধকার

উল্লম্ব বাতিস্তম্ভ, যে আলোতে সঞ্চিত জলের
দেখা যায় পূর্বাপর।

এই পথ দিয়ে যেতে যেতে আমরা তো

কতবার

অনন্ত অনন্ত অনন্ত ব’লে
চেঁচিয়ে ডেকেছি

আমাদের হাত ছিল পিছমোড়া,
চোখ বাঁধা ছিল, কষে

শুকনো রক্তের দাগ

তপ্ত সৈকতবালি পদচিহ্ন ছিল কি আমাদের?

শঙ্খচিলের ডাক সমুদ্র গর্জন
কতবার অনন্ত অনন্ত ব’লে চেঁচিয়ে উঠেছি।

 

৬.*
অনন্ত শ্যাম বলছে কথা বলো, হে অনন্ত শ্যাম

অমূলসম্ভব রাত্রি
পাড় ভাঙছে গভীর অচেতনে

ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে ঘুমিয়ে আছে চেতন-ভ্রমর।

হে বনমর্মর, জলপ্রপাত, হে সন্তানসম্ভবা—
হে একটি সম্বোধন তোমাকেই

কথা বলো, হে অনন্ত শ্যাম

কথা পুরুষম বলো,
বলো কী কী আবিষ্কার পেরিয়ে এসেছ এতদূর

একমাত্র নোঙর জানে নাবিক জন্মের ভবিষ্য—

গাছে গাছে বিষফল পেকেছে এখন।

বিরল গন্ধ থেকে উঠে এসে ধীরে
নিজের আয়ুর মতো শ্যামবর্ণ একজন কবি

সৈকত বালুতে তার পদচিহ্ন
দেখেছে কখনো—

রঞ্জনরশ্মি জানে শরীরের অন্তর্বর্তী
চিহ্ন ভাষা ইয়েরোগ্লিফিক

কবি জানে শুয়ে আছি ঝরনার পাশে—
সমুদ্রশৃগাল জানে হাঁসের মাংস সুস্বাদু।

সুনামির এক বছর পরে যারা ফিরে এসে ছিল
নামানো রুকস্যাক, চোখে
আলোর হাঁসুয়া

নিখিলের নীল গ্রামোফোনে ছররা গুলির শব্দ

বনে আজ কনচের্তো বেজেছে।

সুখের কালক্রম ও সমুজ্জ্বল দুঃখ পার ক’রে
ঐসব ছায়ানৌকোগুলো—

ক্রমে বিস্মরণ তাকে নিয়ে যাবে পরম আদরে

চিতাবাঘ শহরের চিত্ররূপময় এক
অন্য ব্যাপারে।

মাটিতে প্রোথিত আছে প্রিয় কবিতার বইগুলো—
আকর্ষণ বল আছে,

রক্তে আছে আদিম লবণ।

 

[*এই লেখাটির নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে আঠারোটি কবিতার বইয়ের নাম। কবিদের কাছে আমার ঋণ স্বীকার।]

 

৭.
অনন্তের পাশে ব’সে নির্বিকার আমিও দেখেছি

কিভাবে আলোর বেগে ছুটে যেতে যেতে
প্রতি ক্ষণে
বর্তমান ঝ’রে পড়ে অতীতের অনন্ত গহ্বরে।

পিয়ানো অর্গান থেকে সুর ওঠে
থির থির কাঁপে কুয়াশা জড়ানো রাত

শত খণ্ড টুকরো টুকরো
পয়ার ছন্দে লেখা আবহমান রাত্রিযামিনী।

একদিন অনন্ত রায় টিনশেডে ভূতগ্রস্ত সেলাই মেশিনে
তখন গ্রীষ্মের ফল

একদিন অনন্ত মুর্মু ইটের ভাটির পাশে হোগলার আধো অন্ধকারে
তখন বসন্ত পাখি

সেগুন অরণ্যজুড়ে সন্ত্রাসে ভয়ে সারারাত সেই
পাখি ডেকেছিল

শহরের রাজপথে ঘর্ঘর শব্দ তুলেছিল

অনন্ত হাঁসদা-র  হাওয়াগাড়ি।

 

৮.
অনন্তের কথা আমি কবিদের কাছেই শুনেছি

এবং গঞ্জের ঘাটে মাঝিদের কাছেও।

আলিপুর দায়রা আদালতে

মহামান্য আদালতও সখেদে জানতে চেয়েছিলেন
অনন্তকাল কেন এইসব মামলা চলেছে

দৃশ্যত গতিহীন
রাতের আকাশে ছিল স্বাতী তারা,  অবিচল নক্ষত্রমণ্ডলী!

একদিন কবিতার আনন্দবাসরে গ্রিনরুমে,
নাকি এক টাট্টুর বাজারে

দেখেছি দেওয়ালে লেখা :
‘মাত্রাহীন অসীম আবার কিসের বিষয়’

—এই প্রশ্নের মুখে একাকী বিস্ময়ে আমি বালকের মতো

কত রাত ঝিঁক চোখে কাটিয়ে দিয়েছি।

একান্ত বালক জানে অক্ষরে মাত্রা দেওয়া ভালো;

একান্তে বালিকা জানে মাত্রাহীনতার রাত কিরকম
সঙ্গোপনে বেড়ে

ঢ’লে পড়ে অনন্তের দিকে।

 

৯.
নাম অনন্ত হেমব্রম, গ্রাম তুইলাডুংরী, জিলা

পূর্বী সিংভূম,—ঝাড়খণ্ড।

কদ্‌ পাঁচফুট দুইঞ্চি, বাঁ-পকেটে গেটপাশ ছিল

রঙ গেহুঁয়া, উমর পঁচাশ

খৈনির ডিব্বা ছিল, বিড়ির বান্ডিল
সাইকিল বিল্লা ছিল চাবির গোছায়

ফুটন্ত লোহার নদী অনন্ত অনন্ত ব’লে ডাক দিয়েছিল—

আংরা হ’য়ে পড়ে ছিল
শোনা গেল—থার্ড ডিগ্রি বার্ন।

লাল মাটি, পাহাড়ি ডুলুং
ব্রাজিলের জার্সি পরা সর্ষেক্ষেত

উঠোনে দোলনা বাঁধা, হাঁড়িতে কিছুটা মদ ছিল

মাটির দেওয়ালে আঁকা ছিল

মালা হাতে সীতা, পাশে অতিকায় ধনুর্ধারী রাম।

 

১০.
সমস্তই নির্ধারিত হয়ে আছে!—আজ জঙ্গলের
মধ্য দিয়ে যেতে যেতে জিঞ্জিরাম নদীর কিনারে
গাছের মগডাল থেকে ক্রেস্টেড ঈগল দেখেছিল
আমাকে, আমিও তাকে। অর্থাৎ এই দেখাশোনা
এই উত্তরের হাওয়া নির্ধারিত ছিল নাকি
আমার জন্মেরও আগে, অনন্ত সময়-গভীরে!

অনন্ত, সত্যি তুমি শক্তিমান এত—নাকি এক গভীর দুষ্টুমি?
কাল জঙ্গলের
মধ্য দিয়ে যেতে যেতে জিঞ্জিরাম নদীর কিনারে
গাছের মগডালে সেই ঈগল কি থাকবে আবারও?
যদিও উত্তরে হাওয়া বয়ে যাবে
আন্দোলিত হবে সেই গাছ
তবু সে থাকবে না, আমি জেনে গেছি একান্ত অনুভবে—
আমারও ভেতরে আছে অনন্তের একটি প্রতিভূ।

 

১১.
কংসাবতী নদীটির মধ্যে আমি তাকেই খুঁজেছি
‘পরাণকথা’ শব্দটির ছিলকার ভেতরে
যেখানে মৃদঙ্গ বাজে অনন্তের মতো দ্রিম দ্রিম

আমারও চোখের মধ্যে তার দুচোখের স্পষ্ট নীল
ছায়া পড়ে
এই হাত এ আঙুল এই শুকনো ত্বকের খশখশ
জমিজরিপের কাজে বেলা হয়
সবুজ টিয়ার ঝাঁকে উতরোল ওঁরাও যুবতী
কংসাবতী বয়ে যায় অনন্তের দিকে ঢাল বেয়ে।

 

১২.
সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, পায়ে গামবুট
মাথার টুপিতে আলো—শ্বাসরোধকারী অন্ধকারে
তিরতির জল পড়ে পাথরের গভীর ফাটলে

যেখানে দুপুর কালো, রাত্রি কালো, চিন্তা যুক্তি বিবেচনা কালো
শুধু কফনের রঙ সাদা—
আমি সেই সাদা কালো ছবির ক্যানভাসে
আমি তার অনন্ত রতির আশ্লেষে
আমি তার পাতায় পাতায় ফের জেগে ওঠা আলোর সংশ্লেষে
আমি লাল পিঁপড়ে ও পিরানহা মাছের সন্ত্রাসে—

স্ট্রেচার বাহিত হয়ে চলে যাচ্ছি সবুজ অ্যাপ্রন।
গ্যালারির সবুজ আঁধারে
অনন্ত সূত্রধর ব্ল্যাক বোর্ডে পাই-য়ের মান
লিখে চলে একা নির্বিকার :

তিন দশমিক এক চার এক পাঁচ নয় দুই ছয় পাঁচ তিন পাঁচ
আট নয় সাত নয় তিন দুই তিন আট চার ছয় দুই ছয় চার…

শংকর লাহিড়ী

জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫০, জামশেদপুর। তৎকালীন বিহার, এখন ঝাড়খন্ড।

শিক্ষা : শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়, কলকাতা। রিজিওনাল এঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, দুর্গাপুর।

পেশা : পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। জামশেদপুরে টাটা স্টীল ইস্পাতপ্রকল্পে ৩৭-বছর কর্মজীবনের শেষে অবসরজীবনে এখন কলকাতায়।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
শরীরী কবিতা (১৯৯০, কৌরব প্রকাশনী)
মুখার্জী কুসুম (১৯৯৪, কৌরব)
উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ (১৯৯৬, কৌরব)
বন্ধু রুমাল (২০০৪, কৌরব)
কালো কেটলি (নির্বাচিত কবিতা, ২০১২, ৯’য়া দশক প্রকাশনী)
সমুদ্রপৃষ্ঠাগুলো (কবিতাসমগ্র, ২০১৪, কৌরব)

গদ্য—
মোটরহোম (২০০৩, কৌরব)
কোরাল আলোর সিল্যুয়েট (নির্বাচিত গদ্য, ২০১২, কৌরব)

তথ্যচিত্র (রচনা, প্রযোজনা ও পরিচালনা) :

১. ‘রাখা হয়েছে কমলালেবু’
–কবি স্বদেশ সেনের সময়, জীবন ও কাব্যভাবনা নিয়ে ২০১৫ সালে নির্মিত ১২৭ মিনিটের তথ্যচিত্র।

২. দ্বিতীয় ছবি ‘উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ’। কবিতাকে আশ্রয় করে, কবিদের নিয়ে, কবিদের জন্য ২০১৬ সালে নির্মিত ১৩২ মিনিটের তথ্যচিত্র। এতে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলা ভাষার নয়জন নবীন ও প্রবীণ কবি, যাঁদের মধ্যে আছেন কবি মণীন্দ্র গুপ্ত, সমীর রায়চৌধুরী ও আলোক সরকার।

ই-মেইল : slahiri4u@gmail.com