হোম কবিতা লাল ঝরনাধারা

লাল ঝরনাধারা

লাল ঝরনাধারা
931
0

ঢেঁকি

(জয়ন্ত জিল্লু স্নেহভাজনেষু)

কিছু ঢেঁকি ঘরে থেকে যায়; স্বর্গ দেখে না,
এখনও ভানছে ধান, গাইছে শিবের গীত পার দিয়ে।
গ্রামবধূর হল্লায় শীত নামে
উড়েছে ধানের কুরা, ভাপের পিঠার সাথে নেমে আসে খেজুরের রস।

কিছু ঢেঁকি চ্যালা কাঠ হয়
কিছু তো ঘরের খুঁটি, কেউ জ্বলে চুলোর উনোনে।
আমিও দেখি না স্বর্গ; জ্বলে যাচ্ছি তোমার অনলে;
কখনো বাজারে পুড়ি কখনো আঁস্তাকুড়ে।

কিছু ঢেঁকি ঘরে থেকে যায়; সকলেই স্বর্গ দেখে না…


জীববিদ্যা

তারপর বৃক্ষেরা গেড়ে গেল মাটির গভীরে, শেকড়ের দীর্ঘ বাহু প্রসারিত হলো—প্রোথিত হলো গভীর অন্ধকারে, রসের সন্ধানে—ঊর্ধ্বে প্রশাখার মেলে ধরা হাঁ-করা ক্লোরোফিল টেনে নিল বায়ু। বৃক্ষেরা আর কোনোদিন ডিঙি বাইতে পারল না—মাছ ধরতে পারল না—বৃক্ষরা আরো আরো বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া ছড়ায়ে দিল পৃথিবীর বুকে।

জিরাফেরা পাতার খোঁজে গলা বাড়াতে বাড়াতে একদিন নিজেরাই দীর্ঘকাণ্ড হয়ে গেল। হরিণেরা বিচিত্র বুটির চামড়া নিয়ে দৌড়াল প্রাণভয়ে—স্থিরতার বড় সখ—বৃক্ষের নকল করতে করতে একদিন মাথার উপরে ডালপালা গজিয়ে আরো আরো আকর্ষণীয় করে তুলল নিজেদের।

যারা বানরতুল্য—ক্ষুদ্র, হৃদয়ে সবুজ নেই—বাঘের মোষের শক্তি—হরিণের ক্ষিপ্রতা নেই—বৃক্ষের আড়ালে ছুঁড়েছে পাথর—পাথরের অস্ত্র কোনোদিন—কোনোদিন তামাকে লোহাকে চোখা করে হেনেছে আঘাত—গাছ-পশু-জলাধার-ভোরের বাতাস শিথানে শায়িত—একদিন হৃৎপিণ্ড খুঁটে খুঁটে মঙ্গলের কী শনির স্বপ্ন ভেসে আসে…


লাল ঝরনাধারা

পথ, ফিরে যাও ঘরে—জরায়ু জঠরে; মহাসড়কের দিকে চলে যাবে রক্তস্রোত—জলোচ্ছ্বাসের বেশে দালানে খিলানে বয়ে যাচ্ছে লোহিত সাগর।

গুয়ের্নিকার তুলির আঁচড়ে—ঘোড়ার-ষাঁড়ের চোখগুলো কোয়েলের ডিম হয়ে বন্ধ করে নেবে পাতা—কেবল নেত্রকোণা জমা দেবে এক একটি রক্তাভ অশ্রুফোঁটা।

নদী, জোয়ারের ঢলের বেগে ফিরে যাও—লুসাই গহ্বরে—আমাদের মেয়েরা আজ নিজেরাই নদী—আশরীর লাল ঝরনাধারা …


কাকতাডুয়া

খড়ের গাদার বপু সামলে নাও সামলে নাও
নেমে আসছে চিল ও শকুন পৃথিবীর বুকে

মাঠের ফসল যেন নড়েচড়ে ওঠে
উত্তরের হাওয়া বড় শীতল
মগজবিহীন ঠান্ডা হাঁড়ির মুখে বেশ করে মাখো চুন কালি ঝুল

যদি আচম্বিতে শিখে নাও চলৎশক্তি কিছু
বাতাসে দুলিয়ে হাওয়াসমস্ত ভুবন জুড়ে তোলো আস্ফালন

অশিশ্ন জীবন যত জড়তায় ভরা ফাঁপা আলখাল্লার ভূত


বিকেলের ম্লান রোদ

বিকেলের ম্লান রোদে হাতখানা টেনে নিয়ে ভাগ্যরেখায় যে আঁচড় টেনে দিলে, তারপর থেকে আমার তো আর ভাগ্য নেই, সবতাতেই দূর দূর করে তেড়ে আসে লাল মেঘ। আয়ুরেখা বুদ্ধি করে বাঁচিয়েছি তসবিদানার ছায়ায়; এখনো সূর্য আসে দক্ষিণের জানালায়। ছায়াকে শরীর মনে হলে এখনো যে নড়ে ওঠে তোমার চিবুক। কাকের আওয়াজ শুনে ঘুম নামে চিতার উনুনে…

জিললুর রহমান

জন্ম ১৬ নভেম্বর, ১৯৬৬; চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, উত্তর আধুনিক নন্দনতত্ত্ব চিন্তক জিললুর রহমান। আশির দশকের শেষার্ধ থেকে লেখালেখি করেন।
পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী।

শিক্ষা : এমবিবিএস, এমফিল (প্যাথলজি), পিএইচডি।

পেশা : সহযোগী অধ্যাপক, প্যাথলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

প্রকাশিত বই :

অন্যমন্ত্র [কাবিতা, লিরিক, ১৯৯৫]
শাদা অন্ধকার [কবিতা, লিরিক, ২০১০]
উত্তর আধুনিকতা : এ সবুজ করুণ ডাঙায় [প্রবন্ধ, লিরিক, ২০০১]
অমৃত কথা [প্রবন্ধ, লিরিক, ২০১০]
আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্ব : কয়েকটি অনুবাদ [অনুবাদ, লিরিক, ২০১০]

সম্পাদনা :

তরঙ্গ (১৯৯০, ১৯৯১)
‘লিরিক’ বুলেটিন (১৯৯৫)
জুলাই ২০১৭ থেকে কবি জিললুর রহমান-এর সম্পাদনার যাত্রা শুরু হবে সাহিত্যের নতুন ছোটকাগজ 'যদিও উত্তরমেঘ'।

সম্পাদনা পরিষদ সদস্য—
‘লিরিক’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা
‘লিরিক’ উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা ১,২,৩,৪

ই-মেইল : drzillur@gmail.com