হোম কবিতা রফিক আজাদের কয়েকটি কবিতা

রফিক আজাদের কয়েকটি কবিতা

রফিক আজাদের কয়েকটি কবিতা
1.04K
0

ষাটের দশকের জনপ্রিয় কবি রফিক আজাদ ৭৫ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
শোক-বিহ্বল এই মুহূর্তে কবির বহুলপঠিত কবিতাগুলো থেকে ২০টি কবিতা
পরস্পরের পাঠকদের জন্য মুদ্রিত হলো।

উৎস:  রফিক আজাদের কবিতাসমগ্র  (অনন্যা, ১৯৯৯) ও প্রেমের কবিতাসমগ্র  (রোদেলা, ২০১০)।

কবিতাগুলি বাছাই ও সংগ্রহে কবি শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন।
তাঁকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ।


দুঃখ/কষ্ট


পাখি উড়ে চ’লে গেলে পাখির পালক প’ড়ে থাকে ।

পাখি উড়ে গেলে তার নরম পালক
কঠিন মাটিতে প’ড়ে থাকা ঠিক নয়—
এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলে;

তুমি চ’লে গেলে দূরে
নিঃস্ব, রিক্ত পাখির পালকসম একা প’ড়ে থাকি।

পরিত্যক্ত পালকের প্রতি মমতাবশত
একদিন, কোনো-এক কালে, তুমি কষ্ট পেয়েছিলে;
নাকি খুব সাধারণভাবে বলেছিলে—
‘পাখির পালক খ’সে গেলে কষ্ট পাই’?
দুঃখ নয়, সাধারণ কষ্টের কথাই বলেছিলে?
দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে পার্থক্য অনেক:
বহু রক্তক্ষরণের পর শব্দ-দু’টির যাথার্থ্য বোঝা যায়!
আমার তো অর্ধেক জীবন চ’লে গেল
নেহাত মামুলি দু’টি শব্দ আর তার মানে খুঁজে পেতে।

বুকের গোপনে আজো খুব দুঃখ পাই,
পনেরো বছর আগে তুমি খুব সাধারণ ‘কষ্ট’ পেয়েছিলে?
উচ্চারিত তোমার শব্দের বড় ভুল মানে ক’রে
আজো আমি ‘দুঃখ’—এই দুঃখজনক শব্দের সাথে
ভাগ করে নিই রাতে আমার বালিশ।।
.

(চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, ১৯৭৭)

 


তুমি: বিশ বছর আগে ও পরে


তুমি যে-সব ভুল করতে সেগুলো খুবই মারাত্মক ছিল। তোমার কথায় ছিল গেঁয়ো টান, অনেকগুলো শব্দের করতে ভুল উচ্চারণ: ‘প্রমথ চৌধুরী’ কে তুমি বলতে ‘প্রথম চৌধুরী’;  ‘জনৈক’ উচ্চারণ করতে গিয়ে সর্বদাই ‘জৈনিক’ বলে ফেলতে। এমনি বহুতর ভয়াবহ ভুলে-ভরা ছিল তোমার ব্যক্তিগত অভিধান। কিন্তু সে-সময়, সেই সুদূর কৈশোরে ঐ মারাত্মক ভুলগুলো তোমার বড়-বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলুম।

তোমার পরীক্ষার খাতায় সর্বদাই সাধু ও চলতির দূষণীয় মিশ্রণ ঘটাতে। ভাষা-ব্যবহারে তুমি বরাবরই খুব অমনোযোগী ছিলে। বেশ হাবাগোবা গোছের লাজুক ও অবনতমুখী মেয়ে ছিলে তুমি। ‘শোকাভিভূত’ বলতে গিয়ে ব’লে ফেলতে ‘শোকাভূত’। তোমার উচ্চারণের ত্রুটি, বাক্যমধ্যস্থিত শব্দের ভুল ব্যবহারে আমি তখন এক ধরনের মজাই পেতুম।

২০-বছর পর আজ তোমার বক্তৃতা শুনলুম। বিষয়: ‘নারী-স্বাধীনতা’! এত সুন্দর, স্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণে তোমার বক্তব্য রাখলে যে, দেখে অবাক ও ব্যথিত হলুম।

আমার বুকের মধ্যে জেঁকে-বসা একটি পাথর বিশ বছর পর নিঃশব্দে নেমে গেল।
.

(চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, ১৯৭৭)

 


নারী: আমার অভিধান


আমার নিকট তুমি এক মূর্তিমান অভিধান;
খুচরো অথবা খুব দরকারি ভারী শব্দাবলি
টেবিলে ঈষৎ ঝুঁকে নিষ্ঠাভাবে যে-রকমভাবে
দেখে নিতে হয়, প্রয়োজনে তোমাকে তেমনি পড়ি।
তুমিই আমার হও বিশ্বাস-স্থাপনযোগ্য সেই
বিশুদ্ধ মৌলিক গ্রন্থ: তোমাকে পড়েই শিখে নিই
শব্দের সঠিক অর্থ, মূল ধাতু, নির্ভুল বানান।
তোমাকে দেখেই জেনে নিই কোন ঠিকানায় আছে
সুন্দরের ঘরদোর,—বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের বিরুদ্ধে
কী-কী অস্ত্র প্রয়োগের প্রয়োজন, তাও জানা হয়।

তোমার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মুহূর্তেই শেখা হয়
কবিতায় ব্যবহার্য সমস্ত ছন্দের মূলসূত্র।
এজন্য আমাকে কোনো প্রবোধচন্দ্রের গ্রন্থাবলি
কোনোদিন পড়তে হয় নি—এবং একথা সত্য,
পড়ব না—যতদিন নৃত্যপর নারীর শরীর
আমার চোখের সামনে প্রকৃতির মতো রয়ে যাবে।

হরিচরণের কাছে, আপাতত, কোনো ঋণ নেই:
যতদিন পৃথিবীতে তোমরা রয়েছ, ততদিন
প্রয়োজন নেই কোনো ব্যাকরণ কিংবা অভিধানে;
সত্যি কথা বলতে গেলে, এমনকি, দরকার নেই
কোনো ফুলে। কেননা, নারীর নগ্ন শরীরের মতো
ঘ্রাণময়ফুল আমি এ জীবনে কখনো শুঁকি নি।
যে সৌগন্ধ্য রয়েছে নারীর, সেরকম গন্ধবহ
ফুলের সাক্ষাৎ আমি এখনো পাই নি কোনো ফুলে।

আমার হাতের কাছে সর্বদা সরল শব্দকোষ,
হয়ে আছ, আজীবন। যদিবা দৈবাৎ পড়ে যাই
দুর্বোধ্য, রুক্ষ, অপরিচিত শব্দাবলির সম্মুখে
স্বভাবত, তোমাকে দেখেই সাহস সঞ্চয় করি।

সুন্দরের দিকে রয় আমার প্রধান প্রবণতা;
তোমার শরীর হয় কবিতার পবিত্র পুরাণ,

গরীবের কানাকড়ি, বিধবার শেষ সাদা শাড়ি।
.

(চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, ১৯৭৭)

 


স্মৃতি, চাঁদের মতো ঘড়ি


ঘড়ির কাঁটায় স্থির, সমর্পিত, হে আমার অন্তরঙ্গ অবিচ্ছিন্ন চাঁদ,
তোমার যাদুতে মুগ্ধ এই আমি শতচ্ছিন্ন কাঁথার একায়
হিরন্ময় নক্ষত্রের মেলা এক বসিয়েছি অবাস্তব স্বপ্নের বিন্যাসে:
একটা বয়স আছে অবোধ শিশুর দল শতাধিক পুতুলে যখন
জননীর মতো সোহাগ বিলোতে চায়,—
ন্যাকড়ার টুকরোয় তারা কী উজ্জ্বল জামা তৈরি করে,
চুমোয় আচ্ছন্ন করে সারি-সারি পুতুলের নির্বিকার মুখ!
শিশুদের মতো আমি,— মুখাবয়বসর্বস্ব,—ভাঙা এই একটি পুতুলে
আমারও আজন্ম খেলা, সারাবেলা—দুপুরে-রাত্রিতে।

ঘড়ির কাঁটায় স্থির, সমর্পিত, হে আমার অন্তরঙ্গ অলীক লন্ঠন,
সর্বক্ষণ জ্ব’লে যাও তুমি, তোমার মুখশ্রীখানি
কী মসৃণ আলো ফ্যালে দুর্গন্ধে আমার!
অবাস্তব উটপাখি, তোমার পিঠের ‘পরে চ’ড়ে
জরায়ুতে চ’লে যাই, ভবিষ্যতে যাই…
খটখটে মৃত্তিকায় শিকড় চারিয়ে দিই, কিংবা
আইয়ো-র শিঙয়ের মতো বাঁকানো শৈশব ঘুরে আসি!
শিখাহীন অলৌকিক তোমার আগুনে পুড়ে যায়—
পরিত্যক্ত বাঁশঝাড়, গাছপালা, গোপন বাগান!

ঘড়ির কাঁটায় স্থির, সমর্পিত, হে আমার অন্তরঙ্গ জীবনদেবতা,
তালের শাঁসের মতো রাতে আনো অপার বেদনা;
সাবানের মতো তুমি পিছলিয়ে যাও
ব্যক্তিগত বাথরুম থেকে কোথা কোন্ স্বর্গলোকে!
আমার বাস্তব-স্বপ্নে কখনো আসো না আর ফিরে।
তবে অশ্রুজল ছাড়া ঐ-পদপল্লবে
আর কী দেবার আছে? …কেবল চোখের জলে ভ’রে দিতে পারি
একটু অদৃশ্য, শুষ্ক বঙ্গোপসাগর।।
.

(অসম্ভবের পায়ে, ১৯৭৩)

 


নিজিন্স্কি


মৃত্যুর মতন বাজে রক্ত-মাংসে করুণ সানাই,
অন্তহীন বেদনায়; শিরা-উপশিরা ব্যেপে ওঠে
অস্থির রক্তের কণা,—অস্থিরতা, শুধু অস্থিরতা!

দেহের নিগড়ে বন্দি মুমূর্ষু আত্মার ক্রন্দনেই
চঞ্চল শরীর, হায়, জেগে ওঠে নৃত্যের মুদ্রায়, —
ক্লান্তিহীন নৃত্যে আমি সাড়া দিই শূন্যতার ডাকে;
কে আমাকে ডাকে অহর্নিশ : পূর্ণতা, না দ্রাক্ষালতা?

শুধু রক্ত ক্ষেপে-ক্ষেপে ওঠে, শুধু দেহ জেগে ওঠে:
শরীরকে ভেঙে-চুরে নানান মুদ্রায়, নানা ঢঙে
অমৃত-সাধনা চলে, অবিরাম—দিবস-রজনী।

কী দুর্বহ বেদনায় প্রতিদিন প্রতিদিন নীল মসজিদে
আমার অনন্ত উপাসনা!—নিজেকেই ডাকি শুধু—
আমার ডাকেই আমি নিয়ত জাগিয়ে তুলি দেহ
ব্যালে-নৃত্যে, নিপুণ মুদ্রায়; নিরন্তর বেদনায়
জেগে থাকি নীলকণ্ঠ,—নিবেদিত—জেগে থাকি, একা—
শরীর জাগিয়ে রেখে নিজে জেগে থাকি, জেগে থাকি…
.

(অসম্ভবের পায়ে, ১৯৭৩)

 


বালক ভুল করে নেমেছে ভুল জলে


বালক জানে না তো পুষবে অনুরাগ
হৃদয়ে কতদিন, কার বা চলা-পথে
ছড়াবে মুঠো-মুঠো বকুল ফুলগুলো;
কোথায় যেতে হবে, যাবে না কোন দিকে,
ব্যাপক হাঁটাহাঁটি করবে কোন পথে!

বালক জানলো না—মানুষ ম্লানমুখে
কেন যে তারা গোনে; পায়ের নীচে কার
কেন যে ফুল ঝরে, কতটা ফুল ঝরে!
মানুষ ভুল পথে গিয়েছে কত দূর,
বেপথু কাকে বলে বালক জানে না তা!

বালক জানে না তো কতটা হেঁটে এলে
ফেরার পথ নেই—থাকে না, নিরুপায়—
যে আসে সে-ই জানে—ভুলের দামে কিনে
আনে সে প্রিয় ম্যাপ—পথিক ম্রিয়মাণ,
উল্টোরথে চ’ড়ে চলেছে মূল পথ!

বালক জানে না তো অর্থনীতি আর
মৌল রাজনীতি—উল্টো ক’রে ধরে
সঠিক পতাকাটি—পতাকা দশদিশে
যেনবা কম্পাস স্বদেশ ঠিক রাখে।

বালক জানে না সে বানানে ভুল ক’রে
উল্টাসিধা বোঝে : সঠিক পথজুড়ে
পথের সবখানে কাঁটার ব্যাপকতা!
বালক ভুল ক’রে পড়েছে ভুল বই,
পড়ে নি ব্যাকরণ, পড়ে নি মূল বই!
বালক জানে না তো সময় প্রতিকূল,
সাঁতার না শিখে সে সাগরে ঝাঁপ দ্যায়,
জলের চোরাস্রোত গোপনে ব’য়ে যায়,
বালক ভুল ক’রে নেমেছে ভুল জলে!

বালক জানে না তো জীবন থেকে তার
কতটা অপচয় শিল্পে প্রয়োজন।

পাথর বেশ ভারী, বহনে অপারগ
বালক বোঝে না তা—বালক সিসিফাস
পাহাড়ে উঠে যাবে, পাথর নেমে যাবে
পাথুরে পাদদেশে!—বিমূঢ়, বিস্মিত
বালক হতাশায় অর্তনাদ ক’রে
গড়িয়ে প’ড়ে যাবে অন্ধকার খাদে।
বালক জানে না তো সময় প্রতিকূল,
ফুলের নামে কত কাঁটারা জেগে থাকে
পুরোটা পথজুড়ে, দীর্ঘ পথজুড়ে—
বালক জানে না তা, বালক জানে না তো!
বালক জানে না তো কতটা হেঁটে এলে
ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।
.

(পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ, ১৯৮৫)

 


যদি ভালোবাসা পাই


যদি ভালোবাসা পাই……….. আবার শুধরে নেব
………………… জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালোবাসা পাই……….. ব্যাপক দীর্ঘপথে
………………… তুলে নেব ঝোলাঝুলি
যদি ভালোবাসা পাই……….. শীতের রাতের শেষে
………………… মখমল দিন পাবো
যদি ভালোবাসা পাই……….. পাহাড় ডিঙাবো আর
………………… সমুদ্র সাঁতরাবো
যদি ভালোবাসা পাই……….. আমার আকাশ হবে
………………… দ্রুত শরতের নীল
যদি ভালোবাসা পাই……….. জীবনে আমিও পাব
………………… মধ্য- অন্তমিল।
যদি ভালোবাসা পাই……….. আবার শুধরে নেব
………………… জীবনের ভুলগুলি
যদি ভালোবাসা পাই……….. শিল্পদীর্ঘপথে
………………… বয়ে যাবো কাঁথাগুলি…

.

(চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, ১৯৭৭)

 

12821568_10207152604188313_3981586231917970144_n
রফিক আজাদ (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১—১২ মার্চ ২০১৬)

 


যাও, পত্রদূত


যাও পত্রদূত, বোলো তার কানে-কানে মৃদু স্বরে
সলজ্জ ভাষায় এই বার্তা: “কোমল পাথর, তুমি
সুর্যাস্তের লাল আভা জড়িয়ে রয়েছ বরতনু;
প্রকৃতি জানে না নিজে কতটা সুন্দর বনভূমি।”
যাও, বোলো তার কানে ভ্রমরসদৃশ গুঞ্জরনে,
চোখের প্রশংসা কোরো, বোলো সুঠাম সুন্দর
শরীরের প্রতি বাঁকে তার মরণ লুকিয়ে আছে,
অন্য কেউ নয়, সে আমার আকণ্ঠ তৃষ্ণার জল:
চুলের প্রশংসা কোরো, তার গুরু নিতম্ব ও বুক
সবকিছু খুব ভালো, উপরন্তু, হাসিটি মধুর!

যাও পত্রদূত, বোলো “হে মাধবী, কোমল পাথর,
দাঁড়াও সহাস্য মুখে সুদূর মধুর মফস্বলে!
বিনম্র ভাষায় বোলো, “উপস্থিতি খুবই তো উজ্জ্বল,
যুক্তিহীন অন্ধ এক আবেগের মধ্যে, বেড়াজালে,
আবদ্ধ হয়েছ উভয়েই, পরস্পর নুয়ে আছ
একটি নদীর দিকে—বোলো তাকে, “অচ্ছেদ্য বন্ধন
ছিঁড়ে ফেলা সহজ তো নয় মোটে, কোমল পাথর!”
যাও পত্রদূত, বোলো—ভালোবাসা গ্রীষ্মের দুপুর?
নীরব দৃষ্টির ভাষা-বিনিময়—দিগন্ত সুদূর?

 


মাধবী এসেই বলে: ‘যাই’


খণ্ডিত ব্রিজের মতো নত মুখে তোমার প্রতিই
নীরবে দাঁড়িয়ে আছি: আমার অন্ধতা ছাড়া আর
কিছুই পারি নি দিতে ভীষণ তোমার প্রয়োজনে;
উপেক্ষা করো না তবু, রানী—তোমার অনুপস্থিতি
করুণ বেদনাময়—বড় বেশি মারাত্মক বাজে
বুকের ভিতরে কী যে ক্রন্দনের মত্ত কলরোলে।

দালি-র দুঃস্বপ্নে তুমি, আর্তো-র উন্মাদ মনোভূমে,
সবুজ মৎস্যের মতো অবচেতনের অবতলে
রঙিন শ্যাওলা-ঝাড়ে সুজাতার মতো সরলতা।

মুহূর্তের নীলিমায় তরুণ ধ্যানীর মনে হয়
তুমি হও ছলাকলাহীন, রূপশালী ধান-ভানা
জীবনানন্দের মনোবাঙলার এক শাদাসিধে
নেহাৎ রূপসী। তবু কেন প্রাণপাত পরিশ্রমে
তোমাকে যায় না পাওয়া?—তুমি নেই মস্তিষ্কে, হৃদয়ে।

কখনো জ্যুরিখে তুমি, কিয়োটোতে, বাম-তীরে,
গ্রীনিচ পল্লীতে কিংবা রোমে পড়ে থাকো; কখনোবা
যোগ দাও পোর্ট-সৈয়দের নোংরা বেলাল্লাপনায়।

তোমার স্বভাব নয় স্থিরতায়—অস্থির, অধীর
তুমি আছ অনুভবে, তুমি আছ শিশুর স্বভাবে।

ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পরিশ্রমে গড়ে-ওঠা রম্য-
অট্টালিকা, স্বভাবের ডালপালা—বিশ্ব-চরাচর।
যেনবা কোথাও গর্জে ওঠে ভয়াবহ অগ্নিগিরি
সোনালি লাভার স্রোতে ভরে দিল গ্রাম ও নগর।
যেন গর্ভগৃহ থেকে নেমে ডিনামাইটের মতো
অসম্ভব তোলপাড় তুলে দিল একটি শৈশব।

অবিশ্বাস্য উষ্ণতায়, চাপে দ্রুত গলে যেতে থাকে
ঘড়ির ডায়াল আর তোমার নিটোল অবয়ব।

তুমি সেই লোকশ্রুত পুরাতন অবাস্তব পাখি,
সোনালি নিবিড় ডানা ঝাপটালে ঝরে পড়ে যার
চতুর্দিকে আনন্দ, টাকার থলি, ভীষণ সৌরভ!

রোমশ বালুকা-বেলা খেলা করে রৌদ্রদগ্ধ তটে
অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে
কেবল তোমার জন্যে বসে আছি উন্মুখ আগ্রহে—

সুন্দর সাম্পানে চড়ে মাধবী এসেই বলে—‘যাই’।

.

(অসম্ভবের পায়ে, ১৯৭৩)

 


অন্তরঙ্গে সবুজ সংসার


এটম বোমার থেকে দু’বছর বড় এই-আমি
ধ্বংস ও শান্তির মধ্যে মেরু-দূর প্রভেদ মানি না।
ক্ষীয়মাণ মূল্যবোধ, সভ্যতার সমূহ সংকটে
আমি কি উদ্বিগ্ন খুব?—উদ্বিগ্নতা আমাকে সাজে কি?

রাষ্ট্র, রাষ্ট্রনীতি, নেতা, নানাবিধ আইন-কানুন
নিয়ন্ত্রিত করে যাচ্ছে যথারীতি প্রকাশ্য জীবন
ভিতর-মহল জেঁকে বসে আছে লাল বর্ণমালা।
সদরে-অন্দরে—অনিবার্য সংঘর্ষের ফলে—গড়ে
সবুজ সংসার।—স্বভাবত সদর-বিমুখ আমি
ভিতর-সন্ধানী আলো ফেলি সান্ধ্য-শামুকের সুখে।
আমার জীবনে স্থায়ী কোনো সকাল-দুপুর নেই,
সারাক্ষণ ব্যেপে থাকে—অপরাহ্ণ—মনোধিমণ্ডলে।

সম্পূর্ণ বর্জন নয়, গ্রহণে-বর্জনে গড়ে নিই
মানুষের বসবাসযোগ্য চিরস্থায়ী ঘর-বাড়ি,
বহিরঙ্গে নাগরিক—অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক;
স্থান-কাল পরিপার্শ্বে নিজ হাতে চাষাবাদ করি
সামান্য আপন জমি, বর্গা-জমি চষি না কখনো।
বিস্তীর্ণ প্রেইরী নয়—আপনার সীমিত সবুজে
পরম নিশ্চিন্তে চরে নীল-গাই, যূথবদ্ধ মেষ,
নিরীহ হরিণগুচ্ছ, নৃত্যপর জেব্রা ও জিরাফ।
.

(সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে, ১৯৭৪)

 


নগর ধ্বংসের আগে


নগর বিধ্বস্ত হ’লে, ভেঙে গেলে শেষতম ঘড়ি
উলঙ্গ ও মৃতদের সুখে শুধু ঈর্ষা করা চলে।
‘জাহাজ, জাহাজ’—ব’লে আর্তনাদ সকলেই করি—
তবুও জাহাজ কোনো ভাসবে না এই পচা জলে।
সমুদ্র অনেক দূর, নগরের ধারে-কাছে নেই:
চারপাশে অগভীর অস্বচ্ছ মলিন জলরাশি।
রক্ত-পুঁজে মাখামাখি আমাদের ভালোবাসাবাসি;
এখন পাবো না আর সুস্থতার আকাঙ্ক্ষার খেই।
যেখানে রয়েছো স্থির—মূল্যবান আসবাব, বাড়ি;
কিছুতে প্রশান্তি তুমি এ-জীবনে কখনো পাবে না।
শব্দহীন চ’লে যাবে জীবনের দরকারি গাড়ি—
কেননা, ধ্বংসের আগে সাইরেন কেউ বাজাবে না।
প্রোথিত বৃক্ষের মতো বদ্ধমূল আমার প্রতিভা—
সাধ ছিল বেঁচে থেকে দেখে যাবো জিরাফের গ্রীবা।

.

(অসম্ভবের পায়ে, ১৯৭৩)

 


ভাত দে হারামজাদা


ভীষণ ক্ষুধার্ত আছি: উদরে, শরীরবৃত্ত ব্যেপে
অনুভূত হতে থাকে—প্রতিপলে—সর্বগ্রাসী ক্ষুধা!
অনাবৃষ্টি—যেমন চৈত্রের শস্যক্ষেত্রে—জ্বেলে দ্যায়
প্রভূত দাহন—তেমনি ক্ষুধার জ্বালা, জ্বলে দেহ।

দু’বেলা দু’মুঠো পেলে মোটে নেই অন্য কোনো দাবী,
অনেকে অনেক কিছু চেয়ে নিচ্ছে, সকলেই চায়:
বাড়ি, গাড়ি, টাকা কড়ি—কারো বা খ্যাতির লোভ আছে;
আমার সামান্য দাবী: পুড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর—
ভাত চাই—এই চাওয়া সরাসরি—ঠান্ডা বা গরম,
সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চালে হ’লে
কোনো ক্ষতি নেই—মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাই;
দু’বেলা দু’মুঠো পেলে ছেড়ে দেবো অন্য-সব দাবী।

অযৌক্তিক লোভ নেই, এমনকি, নেই যৌনক্ষুধা—
চাই নি তো: নাভিনিম্নে-পরা শাড়ি, শাড়ির মালিক;
যে চায় সে নিয়ে যাক—যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে দাও—
জেনে রাখো: আমার ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই।
যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘ’টে যাবে;
ক্ষুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন কানুন—
সম্মুখে যা কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে:
থাকবে না কিছু বাকি—চলে যাবে হা-ভাতের গ্রাসে।
যদি বা দৈবাৎ সম্মুখে তোমাকে, ধরো, পেয়ে যাই—
রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার হবে।

সর্বপরিবেশগ্রাসী হ’লে সামান্য ভাতের ক্ষুধা
ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ ক’রে।

দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে খাবো: গাছপালা, নদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত,
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী—
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি—
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।

ভাত দে হারামজাদা, তা না-হ’লে মানচিত্র খাবো।
.

(সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে, ১৯৭৪)

 

কবির কণ্ঠে ‘ভাত দে হারামজাদা’


মালপানি জিন্দাবাদ


আজ রাতে সে তার চুলের গুচ্ছ
……… ছড়িয়েছে ঐ লোকটার
……………… বিছানো বালিশে;
ব্যাটাচ্ছেলে ওকে কালো-টাকায় কিনেছে!
একদিন ঐ মালাকে আমি দেখে নেব।
ঐ শুয়োরের বাচ্চাকে আমি ঠিক দেখে নেব।

আজ থেকে মালপানি জিন্দাবাদ,
আজ থেকে আর ভালোমানুষ থাকব না;
আমি শালা সব কাজ ছেড়েছুড়ে টাকাই কামাবো,
দিলটা পাথর করে দিনরাত শুধু মালপানিই কামাবো,
ঐ শুয়োরের বাচ্চাকে একদিন
দেখে নেব, ঠিক দেখে নেব।

 


আমাকে খুঁজো না বৃথা


আমাকে খুঁজো না বৃথা কাশ্মীরের স্বচ্ছ ডাল হ্রদে,
সুইৎজারল্যান্ডের নয়নলোভন কোনো পর্যটন স্পটে,
গ্রান্ড ক্যানালের গন্ডোলায়ও নয়,
খুঁজো না ফরাসি দেশে পারীর কাফেতে, মধ্যরাতে;
রাইন বা মাইনের তীরে, সুবিস্তীর্ণ ফলের বাগানে…

আমাকে খুঁজো না জাম্বো জেটে,
দ্রুতগামী যাত্রীবাহী জাহাজের কিংবা কোনো
বৃহৎ সমুদ্রগামী যাত্রীবাহী জাহাজের ডেকে…

ভুল করে অন্ধ গলি-ঘুঁজি পার হয়ে, যদি এই
আঁধার প্রকোষ্ঠে আসো
দেখবে উবুড় হয়ে বাংলার এই মানচিত্রে
মুখ থুবড়ে প’ড়ে আছে চল্লিশ বছর…
আমার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ঠেকে আছে
পদ্মার ওপর
এবং আমার দু’চোখের অবিরল ধারা বয়ে গিয়ে
কানায়-কানায় ভ’রে দিচ্ছে সব ক’টি শুষ্ক নদী,
এবং দেখতে পাবে
শ্যামল শস্যের মাঠ
আমার বুকের নিচে আগলে রেখেছি…

 


কোনো এক নারীর জন্য


চৈত্রের এক মধ্যরাতে
বুকের কপাট খুলে দু’বাহু বাড়িয়ে
আমি অপেক্ষা করছিলাম
কোনো এক নারীর জন্যে…
কৃষিজমিতে দাঁড়িয়ে
যে রকম অপেক্ষা করে উন্মুখ কৃষক
ফসল-ফলানো বৃষ্টির জন্যে—

আমি অপেক্ষা করছিলাম
একজন নারীর জন্যে, সম্পূর্ণ রমণী—
যার স্পর্শে এই পাথর সোনা হয়ে উঠবে
ব্রোঞ্জ, তামা আর দস্তার সমারোহময় এই দেশে;

আমি অপেক্ষা করছিলাম
চৈত্রের নির্জন মধ্যরাতে
দু’হাত পাখির মতো মেলে ধরে
হৃদয়ে মধ্যযুগ-উৎসারিত সমস্ত আবেগ সঞ্চারিত করে
নিছক এক নারীর আকাঙ্ক্ষায়…

কী এক অচেনা আবেগের ভরে
আমি অপেক্ষা করছিলাম
মেঘহীন গুমোট গরমে
খরাপীড়িত বাংলায়
চৈত্রের কোনো এক মধ্যরাতে
দু’বাহু মেলে ধরে, বুকে টনটনে ব্যথা নিয়ে
এক পরিপূর্ণ নারীর জন্যে—

যে নারী আমার ছোট এক কামরার
গুহাতুল্য বায়ুচলাচলহীন ম্রিয়মাণ ঘরে
শতাব্দীর সুবাতাস বয়ে চলে আসবে অকাতরে;
তার গৃহপ্রবেশের সঙ্গে-সঙ্গে হঠাৎ আলোর
ঝলকানি লেগে ঝলমল করে উঠবে
ঘরময় সকল আসবাব, যার প্রতি পদপাতে
সুরভিত রক্তপদ্ম ফুটে উঠবে, আমার বিছানার
প্রান্তে বসার সঙ্গে-সঙ্গে তার নিতম্বের নিচে
একরাশ রজনীগন্ধা হেসে উঠবে—
দীর্ঘদিন অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকা
আমার ক’টি তুচ্ছ কবিতার বই
সে স্পর্শ করামাত্র প্রতিটি পৃষ্ঠা থেকে
বসরাই গোলাপের গন্ধ বেরুতে থাকবে!
অবশেষে, এই চুম্বনরহিত ঠোঁটে
সে তার ঠোঁট মেলাতেই সৌগন্ধ্যমণ্ডিত
আমার ওষ্ঠ থেকে অবিরল ধারায়
নিঃসরিত হতে থাকবে গালিবের গজলের মতো
কালজয়ী অনিঃশেষ পঙ্‌ক্তিসমূহ…

 


প্রতীক্ষা


এমন অনেক দিন গেছে
আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থেকেছি,
হেমন্তে পাতা-ঝরার শব্দ শুনব ব’লে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছি বনভূমিতে—
কোনো বন্ধুর জন্যে
কিংবা অন্য অনেকের জন্যে
হয়তোবা ভবিষ্যতেও অপেক্ষা করব…

এমন অনেক দিনই তো গেছে
কারো অপেক্ষায় বাড়ি ব’সে আছি—
হয়তো কেউ বলেছিল, “অপেক্ষা ক’রো
একসঙ্গে বেরুব।”
এক শনিবার রাতে খুব ক্যাজুয়ালি
কোনো বন্ধু ঘোরের মধ্যে গোঙানির মতো
উচ্চারণ করেছিল, “বাড়ি থেকো
ভোরবেলা তোমাকে তুলে নেব।”
হয়তো বা ওর মনের মধ্যে ছিল
চুনিয়া অথবা শ্রীপুর ফরেস্ট বাংলো;
—আমি অপেক্ষায় থেকেছি।

যুদ্ধের অনেক আগে
একবার আমার প্রিয়বন্ধু অলোক মিত্র
ঠাট্টা ক’রে বলেছিল,
“জীবনে তো কিছুই দেখলি না
ন্যুব্জপীঠ পানশালা ছাড়া। চল, তোকে
দিনাজপুরে নিয়ে যাব
কান্তজীর মন্দির ও রামসাগর দেখবি,
বিরাট গোলাকার চাঁদ মস্ত খোলা আকাশ
দেখবি,
পলা ও আধিয়ারদের জীবন দেখবি,
গল্প-টল্প লেখার ব্যাপারে কিছু উপাদান
পেয়ে যেতেও পারিস,
তৈরি থাকিস—আমি আসবো”
—আমি অপেক্ষায় থেকেছি;
আমি বন্ধু, পরিচিত-জন, এমনকি—
শত্রুর জন্যেও অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছি—

কিন্তু তোমার জন্য আমি অপেক্ষায়
থাকব না,
—প্রতীক্ষা করব।
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই
জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই—
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,
‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ—
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন, ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের
অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের
জন্যে প্রতীক্ষা করব না?
আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বত্থের
মতো
দাঁড়িয়ে থাকবো—
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধ’রে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমান,
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকব অনড় বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে
আমার পায়ে শিকড় গজাবে…
আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না…
.

(সশস্ত্র সুন্দর, ১৯৮২)

 


এই রাতে


এই রাতে
অন্যকিছু নয়
বাতাসের শব্দ শোনো,
শুধুমাত্র বাতাসের শব্দ—
এই দীর্ঘ দীর্ঘায়িত রাতে
অন্য কিছু নয়;
নয় কোনো নিদ্রারোগী
বৃদ্ধের কাশির শব্দ,
কিংবা নয় কোনো সৈনিকের
ভারী বুট, ট্যাঙ্কের ঘর্ঘর;
নিদ্রাভিভূতেরও চলাফেরা নয়—
শুধু বাতাসের শব্দ—অন্য কিছু নয়;
আমলকি-পাতা ঝরার শব্দ-ও নয়,
আশশ্যাওড়ার ঝোপ থেকে উঠে-আসা
অবাঞ্ছিত কান্না নয় কোনো—
এমনকি, নবজাতকের কান্না নয়;
শুধু বাতাসের শব্দ, শুধুই বাতাস
দীর্ঘশ্বাসময়, আর কিছু নয়—
এই রাতে।।
.

(চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, ১৯৭৭)

 


সৌন্দর্যতত্ত্ব


দেখি:
মধ্যরাতে
জ্যোত্স্নায় জ্বলছে ক’টি ঘোড়া,
তাদের শরীর থেকে ঝরছে বিদ্যুৎ—
গর্বিত গ্রীবায় নয় সারা দেহে ঝরে স্নিগ্ধ নান্দনিক দ্যুতি!
মধু ও সেগুনকাঠে
তৈরি হ’লে যা দাঁড়াতো
চোখ জুড়ে
তেমন গায়ের রঙ—পেলব, মসৃণ !
পা ঠুকছে ঘোড়াগুলি
চৈত্রেফাটা শস্যহীন মাঠে
—অনিন্দ্য, সুন্দর!।
.

(খুব বেশি দূরে নয়, ১৯৮৯)

নর্তকী


মৃত নর্তকীর পদশব্দগুলো আমি বুনে যাই
আমার নূপুর-শব্দে; আদিম গুহার মধ্যে শুরু
হয়েছিল যেই নৃত্য—তাকেই সযত্নে
সম্মুখের দিকে নিয়ে যাওয়া;—আমার যেটুকু সাধ্য,
করি সেইটুকু—এইভাবে সমস্ত জীবনব্যাপী
একটি নাচের মুদ্রা তৈরি ক’রে ফেলি।
প্রতিটি নাচের শেষে কোনো তৃপ্তি নেই,
…………………….—সর্বশেষ ব’লে আর কোনো কথা নেই!
আমার যেখানে শেষ অন্য কারু শুরু সেইখানে।
পরবর্তী স্পন্দিত পায়ের কাছে নিজের সযত্ন
…………………….শিল্প তুলে দিয়ে পাই ক্ষণিক বিশ্রাম।
অবিচ্ছিন্ন নৃত্যধারা;
উদয়েরও পরে ঘটে নব-নব নিত্য অভ্যুদয়।
উদয়েই শেষ নয়—
কৃষকের হাতের লাঙল উত্তরাধিকারসূত্রে
পায় তার প্রিয় সন্তানেরা;
এইভাবে ক্রমাগত ধারাবাহিকতা:
আমাকেও চ’লে যেতে হবে ঘুঙুর ও ঘাঘরা ফেলে,
শিল্পিত চঞ্চল ক্ষিপ্র অন্য কারু পায়ে তুলে দিয়ে…
.

(চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, ১৯৭৭)

 


চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া


স্পর্শকাতরতাময় এই নাম
উচ্চারণমাত্র যেন ভেঙে যাবে,
অন্তর্হিত হবে তার প্রকৃত মহিমা,—
চুনিয়া একটি গ্রাম, ছোট্ট কিন্তু ভেতরে-ভেতরে
খুব শক্তিশালী
মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

মধ্যরাতে চুনিয়া নীরব।
চুনিয়া তো ভালোবাসে শান্তস্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ,
চুনিয়া প্রকৃত বৌদ্ধ-স্বভাবের নিরিবিলি সবুজ প্রকৃতি;
চুনিয়া যোজনব্যাপী মনোরম আদিবাসী ভূমি।
চুনিয়া কখনো কোনো হিংস্রতা দ্যাখে নি।
চুনিয়া গুলির শব্দে আঁতকে উঠে কি?
প্রতিটি গাছের পাতা মনুষ্যপশুর হিংস্রতা দেখে না-না ক’রে ওঠে?
—চুনিয়া মানুষ ভালোবাসে।

বৃক্ষদের সাহচার্যে চুনিয়াবাসীরা প্রকৃত প্রস্তাবে খুব সুখে আছে।
চুনিয়া এখনো আছে এই সভ্যসমাজের
কারু-কারু মনে,
কেউ-কেউ এখনো তো পোষে
বুকের নিভৃতে এক নিবিড় চুনিয়া।

চুনিয়া শুশ্রূষা জানে,
চুনিয়া ব্যান্ডেজ জানে, চুনিয়া সান্ত্বনা শুধু—
চুনিয়া কখনো জানি কারুকেই আঘাত করে না;
চুনিয়া সবুজ খুব, শান্তিপ্রিয়—শান্তি ভালোবাসে,
কাঠুরের প্রতি তাই স্পষ্টতই তীব্র ঘৃণা হানে।
চুনিয়া গুলির শব্দ পছন্দ করে না।

রক্তপাত, সিংহাসন প্রভৃতি বিষয়ে
চুনিয়া ভীষণ অজ্ঞ;
চুনিয়া তো সর্বদাই মানুষের আবিষ্কৃত
মারণাস্ত্রগুলো
ভূমধ্যসাগরে ফেলে দিতে বলে।
চুনিয়া তো চায় মানুষের তিনভাগ জলে
রক্তমাখা হাত ধুয়ে তার দীক্ষা নিক।
চুনিয়া সর্বদা বলে পৃথিবীর কুরুক্ষেত্রগুলি
সুগন্ধি ফুলের চাষে ভ’রে তোলা হোক।

চুনিয়ারও অভিমান আছে,
শিশু ও নারীর প্রতি চুনিয়ার পক্ষপাত আছে;
শিশুহত্যা, নারীহত্যা দেখে-দেখে সেও
মানবিক সভ্যতার প্রতি খুব বিরূপ হয়েছে।

চুনিয়া নৈরাশ্যবাদী নয়, চুনিয়া তো মনেপ্রাণে
নিশিদিন আশার পিদ্দিম জ্বেলে রাখে।
চুনিয়া বিশ্বাস করে:
শেষাবধি মানুষেরা হিংসা-দ্বেষ ভুলে
পরস্পর সৎপ্রতিবেশী হবে।
.

(চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, ১৯৭৭)

 


পড়ুন : কবি রফিক আজাদের সাক্ষাৎকার