হোম কবিতা মোস্তফা হামেদীর কবিতা

মোস্তফা হামেদীর কবিতা

মোস্তফা হামেদীর কবিতা
676
0

খসড়া


বহুদিকে প্রসারিত শিকড়কে সন্দেহ করি
একা দাঁড়িয়ে থাকাকে ঘন করে দিতে খসে পড়ে
হলুদ পাতা
সন্ধ্যার নিঃসঙ্গতা জুড়ে না ফেরা পাখি
ভারি হওয়া পরিবেশে
অশ্রুর ক্রিস্টাল
অনুযোগের পারদ বেয়ে বেড়ে যায় জরা
গোচরহীন ঋতুর ফল
ঝরে পড়ে
হেতু বোঝার আগেই বিলয়ের বায়ু
খসিয়ে দেয় বোঁটা
খসড়া প্রস্তাব থেকে পূর্ণ রূপে ফোঁটার আগেই
কুঁড়িতে কুঁকড়ে যাওয়া
শুরু ও শেষ—বৃত্তাকার পথে
পরস্পরকে ধাওয়া করে করে
আধখানা দৌড় কখনো পৌঁছাচ্ছে না
সমাপ্তি রেখায়।

 


ঝরাও


হায়! ঝরাও পাতা,
জল
চোখের কোনায় যথার্থ শীতের রাত
নামে
পাথর বৃষ্টি
দুর্বহ ভরের আঘাত
উপপাদ্যের জটিল জটাজালে
আঁকো বক্ররেখা
আর পৃথিবীকে
কম্বলের ওম ভেবে
ঘুমিয়ে পড়ার আগে
পরে নাও অক্সিজেন-মাস্ক
চেপে বসা নরম রূঢ়তা থেকে
যে বাষ্প বেরোয়
তার তিতা স্বাদে অভ্যস্ত হতে
প্রতিদিন একটু একটু করে চিবোয়
নিশিন্দার কাঁচা ডাল
আঘাতের ব্যঞ্জন নিয়ে
স্মিত কিছু হাসি
ও উপাদেয় চেহারার
কাঠ ঠোকরারা
উড়ে আসে
ঠোঁটে
স্নায়ুর সংবেদী পটে
কেবলই বিক্ষত ডাল।

 


ধল প্রহরের গান


রাত্রি খোদাই করে শেয়ালের ডাক
বনকাঁটা পুঁতে রেখে লুকায় ও কারা
শীতের গরিমা ভেঙে জেগে থাকে একা
এক ভুঁইচাঁপা গাছ, কুয়াশায় ভিজা
তার বিষণ্ন হৃদয়—ছাল ও বাকল
জঙ্গলের কাছ ঘেঁষে মন্দা জোছনা
নামে ঘুম ঘুম চোখে জলের ভিতর
তলিয়ে যায় রাত্রি আব্রুসমেত
যেন ঘোমটার আড়ে নিমীলিত মুখ
ভেঙে ভেঙে পড়ে কার হাল্কা টোকায়
যেন দুলে দুলে ওঠে দুল কানের লতায়
টুকটুকে বুনো ফুলে কাঁপছে হাওয়া
তিরতির বয়ে চলে পাতার দঙ্গলে
শয্যা ছেড়ে যাওয়া সরীসৃপ চোখ
ঢুকে পড়ে অনাহূত কার সীমানায়
রুয়ে দেয় দানাদার বিষাক্ত রোখ।

 


শ্রোতা


রাত হলো শ্রেষ্ঠ শ্রোতা

আমার অপাঙ্‌ক্তেয় কথাগুলি পূর্ণ মনোযোগে কে শোনে আর?

আত্মরতিপরায়ণ পৃথিবীতে এই রকম এক কালো নারী

ভয়ের কামিজ পরিয়ে
ত্রাসরূপে যাকে পুরে দেওয়া হলো মগজে

ঘর কল্পনায় ভেসে যেতে যেতে
বাহিরের উপদ্রুবের ভিতর তাকে ছুড়ে ফেলে আসি

সেই তবু উৎকর্ণ
অধমের যত অনুযোগ
অশ্রু ও বিলাপ
ধারণ করছে
প্রভুর প্রতিনিধিরূপে

 


বিভ্রম


শুয়ে থাকা লম্বাটে ছায়ার নামই শেষ দুপুর
সবগুলো জংলিগাছ এখনও পাতা ঝরায় নি
ভিটেবাড়ি থেকে নেমে পড়ছে লাল সূর্য
ঘরগুলো ঝিমায় রোগাক্রান্ত মোরগের মতো
একেকটি দিন আসে বিষণ্ন তার ঝুঁটি উঁচিয়ে
সদর দরজা দিয়ে কেউ কখনও যেতে দেখে নি
পার্শ্বচরিত্রসমূহকে, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যেদিকেই
যায় না কেন, ক্যাটাগরি বদল হয় না
পিতলের থালায় এখনও কেউ লিখে যাচ্ছে কতিপয়
রোগের নাম, কাঠের ঘ্রাণ শুঁকে
তুমি বলে দিতে পারো জাহাজের মাস্তুলে কী কী কথা
বলেছিল নাবিকেরা—আর ক’ নটিক্যাল পরে মিঠা
পানির কল চাপছে ক্ষীণাঙ্গী তরুণী
তার বাহু বেয়ে লতিয়ে ওঠা কাল্পনাগুলি কতটা
স্বাস্থ্যসম্মত, ভরদুপুর থেকে একটু একটু সরে এসে
ভাবতে পারি দিন কখনো একই রকম পোশাক পরে
না, অনেকগুলো জামা থেকে সে বেছে নেয়
মানানসই এক আব্রু যা দেখে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে
পড়ি, ব্যাখ্যা-যোগ্য কোনো শপথের তোয়াক্কা না করে
ক্রমশ তার ভিতরে জন্ম নেয় অজস্র বিভ্রম, সেগুলো
প্রক্ষিপ্ত হয় আমাদের অন্তঃকরণে—পাথরের জীবনকে
নাড়িয়ে দিয়ে
সঞ্চরণশীল উপত্যকার খাঁজে উপনীত হয়।

মোস্তফা হামেদী

২৭ আগস্ট, ১৯৮৫; ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সরকারি মুজিব কলেজ, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

প্রকাশিত বই :
মেঘ ও ভবঘুরে খরগোশ [কবিতা; কা বুকস, ২০১৫]

ই-মেইল : mostafahamedchd@gmail.com

Latest posts by মোস্তফা হামেদী (see all)