হোম কবিতা মোমঘর : মলাটের ভেতর থেকে

মোমঘর : মলাটের ভেতর থেকে

মোমঘর : মলাটের ভেতর থেকে
368
0

কবি ত্রিশাখ জলদাসের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলো এবার, একুশের বইমেলায়।
স্বেচ্ছা-নির্বাসন থেকে কবিতায় ফিরেছেন তিনি।
তাঁঁকে পরস্পরের অভিনন্দন…


 

সাঁকো 

মুখের উপর বন্ধ করে দিয়েছ কপাটএকখণ্ড কাঠ
আর্তনাদ করে উঠলে হাওয়া এসে ফিরে যাচ্ছে হাওয়ায়,
অগ্নিদগ্ধ স্মৃতিচিহ্ন, ক্লেদ আর পাখিদের
শঙ্কিত পালকে জমে যাচ্ছে ভয়। 

ফিরে যাব না বলেই একটি শব্দ-বন্দুক নিয়ে ছুটে এসেছি
করতলে তুলে নিয়েছি ঋতুমতী নারী, পুষ্পমাল্যঈশ্বর কণিকা,
অনন্তের স্রোত থেকে নেমে আসা কুয়াশা, ছায়ামগ্নতা। 

ফিরে যাব না বলেই হিম রাতে একা একা
সাঁকোর উপর দিয়ে ফিরে যাচ্ছে সাঁকো

 

বিস্মৃতি

স্মৃতিঘর থেকে ফিরে যাচ্ছে নদী,
আমরা বসে আছি প্রাচীন পাহাড়ের খাঁজে।
আমাদের আঙুলে ফুটে আছে রাত্রি
ছুড়ে দেয়া মায়াজল, সুগন্ধি সকাল।

আমরা মায়া-তাস খেলি…
ছুঁয়ে দেই লতাগুল্ম, মায়াফুল,
তুমি রাজকন্যা আমি কালো বাজ।

আমরা ধরেছি বাজি তিনটি লাল শালুক…

স্মৃতিঘর থেকে চুঁয়ে পড়ছে জল
আমরা খুঁটে খাচ্ছি কালো মোহরের দানা।

 

স্বাদ

একটি হাফহাতা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিল আমাকে
তাই আমি তোমাকে পরিপূর্ণভাবে
ভালোবাসতে পারছি না।

মনে হচ্ছে অর্ধ-সিদ্ধ একখণ্ড মাংস জমে আছে জিভে।

বস্তুত জিভে স্বাদের পূর্ণতা জেগে উঠলে
আমরা পরিতৃপ্ত হই,
আবার ভোগেও আমরা কুশলী।

ফলে আমি ক্রমাগত উত্তাপ বাড়াচ্ছি এবং
মাংসখণ্ডের পুরোটাই সেদ্ধ করে নিচ্ছি।

 

ফাঁদ

সড়ক থেকে নেমে এসেছি জলে, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে
একটি পরিত্যক্ত আপেলের মতো ভেসে যাচ্ছি শূন্যে।

জড়তা কখনো জ্যোতির্ময় নয়…
আড়মোড়া ভেঙে শালিকের ঠোঁটে ধরা দিচ্ছে মাছ।

মাছরাঙাদের ফাঁকি দেওয়ার আনন্দ সাময়িক এবং
পাখিদের ঠোঁটের স্বভাবে কোনো ভিন্নতা নেই…
অন্ধকার নেমে এলে অবশিষ্ট কিছুই থাকে না জীবনের।

পুনর্বার আনন্দবঞ্চিত হলে, অতি তুচ্ছ একটি মাছের
জীবনের যতিচিহ্ন পড়ে থাকে পাখিদের তীক্ষ্ণ ঠোঁটের গভীরে।

 

ছায়া চিত্র

গলে যাচ্ছে সময়, তার ভেতর থেকে উঠে আসছে হাওয়া।

একটি মরা আরশোলা, আট দশটি পিঁপড়ে,
কয়েক বিন্দু জল, আধ খাওয়া সিগারেট
দুটি উল্টানো গেলাশ…

একটি অপূর্ণ কবিতা রাফখাতা থেকে উঠে এসেছে,
আর কয়েকটি অক্ষর টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

দ্বিতীয় সংগীত

মৃত্যুর ভেতর একটি দেবদারু গাছ একা
ভেতর থেকে ক্রমাগত উপচে পড়ছে রক্ত…

জ্যোতির্ময় এক অন্ধ বালক
হেঁটে যাচ্ছে দিগভ্রান্ত শূন্যতার দিকে

আমরা পর্যাপ্ত বারুদ থেকেও কোনো শিক্ষা নেই নি।

আকাশ থেকে নেমে আসছে অগ্নিগোলক
আমরা ঈশ্বরের অভিশাপ ভেবে মৌন থাকি।

মৌনতার ভেতর প্রচুর কোলাহল জমে থাকে,
তার মধ্যে রক্তপাত— চিৎকার—
অথচ আমরা কোনো শব্দই শুনতে পাই না।

বস্তুত আমাদের আর্তনাদগুলো মস্তিষ্কের হিমঘরে খেলা করে…

 

জলরঙ

আমি তাকে নগ্ন করি শূন্যে
একটি রক্তাক্ত বিন্দু
প্রার্থনার ভঙ্গিতে নুয়ে পড়ছে বৃষ্টিতে।

আমি তাকে নগ্ন করি জলে
একটি বিচূর্ণ রাত্রি
প্রচ্ছন্ন নীরবতায় ডুবে যাচ্ছে ক্লেদে।

আমি তাকে নগ্ন করি ঠোঁটে
একটি সর্পিল ছায়া
পরিত্যক্ত মৈথুনে গলে যাচ্ছে স্বপ্নে ।

ত্রিশাখ জলদাস

ত্রিশাখ জলদাস

জন্ম ৭ মে ১৯৫৯, ময়মনসিংহ। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত কবিতায় নিমগ্ন থেকে অকস্মাৎ নির্বাসনে। তিন দশক পর প্রত্যাবর্তন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : জড়তুল্য পাথর (২০১২), মোমঘর (২০১৬) ।

সম্পাদিত কবিতার কাগজ : জলসিঁড়ি (১৯৭৬-১৯৭৭), অরুণের হাতে একটি ধারালো ছুরি (১৯৮০)।

ই-মেইল : trishakh.jalodas@gmail.com
ত্রিশাখ জলদাস

Latest posts by ত্রিশাখ জলদাস (see all)