হোম কবিতা মুক্তস্নান

মুক্তস্নান

মুক্তস্নান
816
0

এগিয়ে চলেছি দ্রুত সমুদ্রের দিকে, রূপকল্প অপরূপ;
শুনতে পাই, গর্জন শাসানি দূর থেকে যেন এই কাছে,
রাতচরা পাখি ছুঁয়ে উড়ে যায় শীর্ণশুভ্র কেশের কুণ্ডলী
মিলায় মিলায় ওই কাশ-শিউলি ঝোপের আড়ালে মেঘে-মেঘে;

যুগান্তর শতাব্দীর জরামুখী আশীর্বাদ হাড়জিরজিরে ভোর
কপোলে শরত-বর্ষা সেই কবে এঁকে গেছে চন্দনের উল্কি রক্ত রাঙা
সন্ন্যাসের মালা কণ্ঠে এক ধূর্ত নগর-বণিক কাল থেকে কালে
মুখে ভুরভুর মহুয়ার ঘ্রাণে উন্মাতাল ভ্রমরেরা সাটে মুক্ত পাখা;

পেরিয়ে চলেছি বলেশ্বর-পশুরের তুমুল সঙ্গম, গঞ্জ, বিদর্ভ, শ্রাবস্তী
পত্রপুষ্পে আহ্লাদিত বাঁকে বাঁকে নগর-নটীরা আধখোলা বুক
উন্মোচিত আসক্ত আহ্বান দাঁত ঠিকরে দেহাতি জ্যোৎস্নার আলিম্পন
যেন কোনো আলক্ত শয্যার পাশে এলিয়ে শরীর ক্লান্ত মোহান্ধ বেবান;

নূপুর নিক্বণ তবলায় চাটি বাঁশরির সুর তাল লয় যেন
সাপ-সাপিনীর স্বর্গোদ্যান জড়িয়ে গিয়েছে পায়ে-পায়ে ঋতুমতী
সন্ধ্যা থেকে ভোর গায়ে-গায়ে স্তরে স্তরে রাঙা বালু
সাত-পাহাড়ের ধুলো ডাইনির প্রাসাদ ভাঙনে ইট-টুকরো গেঁথে আছে;

হাড় পাঁজরের মাংস ফুঁড়ে, নিবেদিত উপহার সেইসব মহান যজ্ঞের
ধ্বংসস্তূপ মস্তকের ধার উপচে সাবলীল অনুতাপে বঞ্চনায় ক্ষোভে
ত্বকে উলকি ফেটি বাঁধা, হাতে কমণ্ডলু গৃহস্থের দিনরাত্রি যাপনের ভার
ফেরি করে করে কবেকার ফেরারি আসামি দীর্ণকণ্ঠ চিরে বলি, ক্ষমা চাই;

যেন দেখতে পাই, এক বলগা ভিটেমাটি খেয়ে নিল তীব্র স্রোত,
পৌঁছে গেছি, ওই বঙ্গোপসাগরে আঁতকে উঠি, সহসাই মুদে আসে চোখ,
ফের খুলে মেলে ধরি উৎসাহে অধীর ব্যঞ্জনায়, তবে কি সময় হলো অতঃপর
সময়, সময় সময়ের ঢেউশীর্ষে ছায়া ঘিরে আসে ছায়ার আঁধার গাঢ় দুর্ভেদ্য প্রগাঢ়;

তবে কি এখন সন্ধ্যা না ভোর, কী বলবে এখন এই জলজ মাতাল ভস্মশব
এবার না ভেসে যাবে পুনর্জন্ম পূর্বজন্ম পেরিয়ে কোন সে গুহা অতল গহ্বরে,
কিংবা চরাচর ছিঁড়ে খুঁড়ে এক ঝাঁক শঙ্খচিল ডেকে ওঠে সমস্বরে আর্তনাদে
যেখানে আকাশ স্নান সেরে নেয় জলে লবণাক্ত ফেনিল গভীর নিরুদ্বেগ;

পাহাড় ডিঙোতে হয় বরফের শীতল চুম্বন আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত
থর-গোবি সাহারার লু-হাওয়া, মণিতে তীক্ষ্ণ চাকু মাটি-পাথরের ধস
পাথর পাথর জমে কামক্রোধলোভে অন্ধ কুয়োর বিষাক্ত জলপানে জ্বলে
ভূ-ভাগ ভূ-তল যেন বজ্রবিদ্যুতের শিখা হানে তির খানখান অচেতন স্মৃতি-অভীপ্সায় ;

পা ডুবিয়ে বসে আছি, টের পাই হয়ে গেছি জল, নিরাকার দূরবর্তী অসীম-নিঃসীম
সব ক্লান্তি ধুয়ে গেছে, আমি মুক্ত অধীশ্বর, মিলায় মিলিয়ে যায় একটি বিন্দু
দিগন্তের ওপার পেরিয়ে কোন পারে পারাপারে, বিদায়, বিদায়, আমি যাই
আছি বা ছিলাম, অঙ্গীকার, হয়তো তাও নয়, অস্বীকার নয়, কাল হবে ভোর, বাঁশি বাজে কালের করাল…

মোহাম্মদ রফিক

মোহাম্মদ রফিক

কবি ও গদ্যকার

জন্ম ২৩ অক্টোবর; ১৯৪৩, বাগেরহাট। পড়াশোনা করেছেন পিরোজপুর, বরিশাল, খুলনা, বগুড়া, রাজশাহী ও ঢাকায়। কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন বাজিতপুর কলেজ, চট্রগ্রাম সরকারি মহসিন কলেজ, ঢাকা কলেজ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—

বৈশাখী পূর্ণিমা [১৯৭০]
ধুলোর সংসারে এই মাটি [১৯৭৬]
কীর্তিনাশা [১৯৭৯]
খোলা কবিতা [১৯৮৩]
কপিলা [১৯৮৩]
গাওদিয়া [১৯৮৬]
স্বদেশী নিঃশ্বাস তুমিময় [১৯৮৮]
মেঘ এবং কাদায় [১৯৯১]
রূপকথা কিংবদন্তি [১৯৯৮]
মৎস্যগন্ধ্যা [১৯৯৯]
মাতি কিসকু [২০০০]
বিষখালি সন্ধ্যা [২০০৩]
কালাপানি [২০০৬]
নির্বাচিত কবিতা [২০০৭]
নোনাঝাউ [২০০৮]
দোমাটির মুখ [২০০৯]
অশ্রুময়ীর শব [২০১১]
কালের মান্দাস [২০১৩]
কবিতা সমগ্র-১ [২০১৩]
বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবলোয় [২০১৫]
পূর্বাহ্নে সামগান [২০১৬]
দুটি গাথা কাব্য [২০১৭]
মানব পদাবলি [২০১৭]
এই স্বপ্ন এই ভোর প্রভাতের আলো [প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ]
কবিতা সমগ্র-২ [প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ]

প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ—

আত্মরক্ষার প্রতিবেদন, দুই খণ্ড [২০০১ ও ২০১৫]
জীবনানন্দ [২০০৩]
স্মৃতি বিস্মৃতি অন্তরাল [২০০২]
দূরের দেশ নয় আয়ওয়া [২০০৩]
খুচরো গদ্য ছেঁড়া কথা [২০০৭]
গল্প সংগ্রহ [২০১০]
ওগো বন্ধু ওগো পরবাসী [২০১৫]

পুরস্কার ও সম্মাননা—

আলাওল পুরস্কার [১৯৮১]
বাংলা একাডেমি পুরস্কার [১৯৮৬]
জেবুন্নেসা-মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট পদক [১৯৯১]
আহসান হাবীব পুরস্কার [১৯৯৬]
একুশে পদক [২০১০]
এবং আরও...

ই-মেইল : rafiq80@gmail.com
মোহাম্মদ রফিক

Latest posts by মোহাম্মদ রফিক (see all)