হোম কবিতা মহ্‌সীন চৌধুরী জয়ের কবিতা

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়ের কবিতা

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়ের কবিতা
1.16K
0

মৃত্যু

সমুদ্র ঘুমাচ্ছে
যেন শিশুর গভীর ঘুমের ভেতর শুয়ে থাকা
থেমে গেল প্রবাহ
পৃথিবীর শেষ কণ্ঠস্বরের মতো

গতকালও ছিল মিলন-অভিসার—জীবন
সূর্যে প্রলুব্ধ হয়েছিল ভেজা মাটির শরীর
গাছের কল্পনাতে পাখিকে ডালে বসিয়ে উড়ে যাবার গল্প
শিশুর মনোজগতে যেমন গল্পে গল্পে আগামীর বীর হয়ে ওঠা

তোমার শেষ পদক্ষেপে ছিল রাস্তার অসীম দূরত্ব
অথচ—
অজ্ঞাত এক ঘুম আমাকে জাগিয়ে তুলবে।


সমাপ্তি

জোয়ারের শেষ ঢেউয়ের সময় সন্ধ্যার গাঢ়-রূপ দখল নেয় পারে শুয়ে থাকা পাথরের ধ্যান। জল-শরীরের স্পর্শে পাথর বুঝে, রাতের গায়ে এসে ধাক্কা দিচ্ছে বাতাসের শীতল অবয়ব।

নদী-পারের এই রাত—শেষ ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস—মৃদু আলোর চাঁদের শরীর—আকাশের ছায়ায় অন্ধকারের রাজত্ব—সবই প্রকৃতির হালকা মেজাজের গল্প…

হে প্রকৃতি, তুমি কি জানো শেষ পদক্ষেপের গল্প? শীঘ্রই তো লাগবে তোমার জলে আগুন!


প্রকৃতি

দুরন্ত বাতাসের শিস মুনিয়ার কান ঘেঁষে ছুটে যায় পাহাড়ের দিকে। রক্তিম সূর্যের দৃশ্যপট দেখে হাসতে হাসতে শেষ বিকেল মিশে পাহাড়ের বুকে। বিকেলের ম্লান আলোয় মুনিয়ার চোখে নীড়ে ফেরার তাড়না। বিক্ষিপ্ত কালোর স্তূপ সহজ যাত্রা মেনে জড়ো হয় পাহাড় কোণে কোণে। রাত আসে শীত আর কুয়াশার আচ্ছন্নতা নিয়ে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে। পাহাড়, পাহাড়ের ছায়া ঢেকে যায় রাত-গভীরতায়।


সূত্র

হাঁসের পাখায় ভর করে যে হাওয়া, সেও স্নানে যায়। কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে চলে পানির লুকোচুরি—সেখানেও খেলে হাওয়া, দোলে। ডুবন্ত মাছের শরীরে সূর্য পৌঁছায় জলে ভেসে। নদীর পরিকল্পিত জীবনে হাওয়ায় ভাসে ঢেউ—বুঝে নেয় বহমান জীবনের সূত্র।


মৃত্যুর ঘুম

নিষুপ্ত কোনো রাত
জেগে ওঠে স্বপ্নের ভেতর

হিম হিম বৃষ্টি আছড়ে পড়ে
গভীর খাদ, শরীরজুড়ে

বাতাসের প্ররোচনায় খণ্ড খণ্ড সুর
আহত অথচ বেঁচে থাকার জীবনে গাছের অন্বয় লিরিক

একটি বিস্তৃত রাত
            উচ্ছল বৃষ্টি
যৌন-কাতর ম্লান হাসি
      অনুকল্প
            বিভ্রান্ত
                  অস্থির
                        ভয়ঙ্কর প্রহর
                              প্রকাশ্য সংগম
অতঃপর মৃত্যুর ঘুম।


বটতল

মৃতের গোসল শেষে বোধশূন্য পানি গড়ায় বটতলে
একটা নিরাপদ আশ্রয় আর প্রশ্রয়ে রোদ ও বাতাস ছিল বিশ্রামে
শ্মশানযাত্রীর দাহ শেষে পোড়া কাঠের দহনও মিলিত হয়

চাঁদও আলো বিছিয়ে বসে সাঁঝবেলায়

রাতে অন্ধকার ঘুমিয়ে পড়ে মায়ায়

পাতাদের কথোপকথন চলে মাটির সাথে—ভোরের শিশিরে হেসে

জীবিতদের কোলাহলে অতিষ্ট বাতাস বেরিয়ে পড়ে মৃতদের সন্ধানে
যারা কোলাহল করেছিল গতকাল…


মৃত্যুর জন্যই জন্মের প্রয়োজন ছিল

শুয়েছিলাম বাতাস আর ধুলোর মধ্যে
অন্ধকারের পোশাক পরে দেখি ছায়ার নৃত্য

পৃথিবীকে কাছ থেকে দেখে বুঝলাম—রাত কখনোই ঘুমায় না…
আকাশের গভীরে
      তারার গভীরে
            আশ্রয় নেয় অনন্তশান্তরূপ

ভেতরে অনুভব করি রাতের আশ্রয়
      চোখের তারায়
            শিহরন
                  বিভ্রম

মৃত পাথরের পাশে ছুটে আসে সাগরের গান, অর্ধমীমাংসিত সুর আর স্বর নিয়ে—সেখানেও চলে রাতের বিশ্রাম…

রাত—রাতও গাঢ় প্রলেপ এঁটে ছুটে যাবে মৃত্যুর দিকে
মৃত্যুর জন্যই জন্মের প্রয়োজন ছিল।


প্রার্থনা

প্রতিদিন দেখি, রাস্তা ধীর অথচ ক্লান্তিহীন পথ-পরিক্রমা শেষে পরিব্রাজক-বাতাস, অদৃশ্য গোলাকার ঢোলক—নহবত বেশে—হেঁটে যায় তোমার বাড়ির দিকে। অনন্ত নির্জন বনের মতো তোমার উঠোনে এসে দেখে নেয় নীরক্ত অথচ প্রাঞ্জল অবয়বে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে—সূর্যের দেখা পেলেই যারা হেসে ওঠে। তুমি পাশের হাওরে দেখো মাছ আর পানির সম্পর্ক—দীর্ঘদীনের—তবুও হেসে নাও দুঠোঁটের আদরে—চোখের কোণ থেকে পানিতে দরদ ঢেলে। স্নানে গেলে ঢেউ কথা বলে তোমার সাথে। বিগ্রহসাজ তোমার শরীরে—প্রকোষ্ঠে—গহ্বরে। তখনই সূর্য ডুব দেয় তোমার নাভির গভীরে।

বিজন দুপুর—আমি এসে দাঁড়াই তোমার শরীর ঘেঁষে। আলোর পরিসর—ধ্বনি-সুর-ব্যঞ্জনা—নিশ্বাস-প্রশ্বাসের দূরত্ব—তবুও শরীর অচেনা। অলৌকিক নীরবতা আমাদের দেহে খেলা করে। ভেতরে আওয়াজ তুলে শীৎকারের শব্দ। উদ্যত কাম নীরবে হাসে আর দেখে নেয় শরীরের আঁকু-পাঁকু ভঙ্গিমা। চিন্তার ভেতর সঙ্গমের বিশ্রুত ভঙ্গিমাপ্রকাশ আমাকে বারবার জানান দেয় তুই পুরুষ।

আমি মানুষ হয়ে প্রিয়’র চোখে চোখে কথা বলি আর প্রার্থনায় বিনম্র হই—ফুটফুটে ভোর কিংবা উজ্জ্বল শিশিরের মতো।


কবিতা

মিথুন প্রশ্রয়ে উৎসাহী পঙ্‌ক্তিমালা—তোমার দেহে সুর। তুমি আছ, কবিতা আছে—জঘনেই ফুটে কথামুকুল…


আদ্যোপান্ত

১. কান্না
চোখের ভেতর মেলে জীবনের ফলাফল
তোমার স্পর্শেই কান্নার জন্ম

২. নারী
নারীকে সাথে নিয়ে ভালোবাসা কিনতে যাই
নারী দাম দেয় শরীরে—আমি দাম দেই শরীরের

৩. শরীর
কাম শেষে শরীর হেসে ওঠে যৌবনে
বার্ধক্যে যেতে কোনো রাস্তা খুঁজতে হয় না

৪. কুকুর
আমি কুকুরকে পছন্দ করি
কুকুর আমাকে পছন্দ করে না

৫. সাফল্য
প্রতিটি সাফল্যের পর আমি ব্যর্থ হয়ে যাই
ভেতরে সময়ের কাঁটা খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে আমাকে

৬. আয়না
আয়নার সামনে নিজেকে খুঁজি
ভাবনাকে বিশ্বাস হয় না—আয়নাকে বিশ্বাস করি

৭. ক্লান্তি
ভেতরে বসবাস করে আদিম ক্লান্তির ঘুম
বাইরে ক্লান্তির বিভ্রম-রূপ

৮. মৃত্যু
জীবন আর মৃত্যুর মাঝে বসে আছি
কবর বসে আছে সর্বগ্রাসী হাঁ নিয়ে

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

কবি ও কথাসাহিত্যিক।

মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর।

পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
সমাপ্তির যতিচিহ্ন [উপন্যাস, ইমন প্রকাশনা, ২০১৩]

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)