হোম কবিতা মলাট খুলে দেখা : ‘তিয়াসার তৃণলিপি’

মলাট খুলে দেখা : ‘তিয়াসার তৃণলিপি’

মলাট খুলে দেখা : ‘তিয়াসার তৃণলিপি’
508
0

ভ্রম


যে পথে দেখেছ তুমি ধূলিরেখা; ভ্রামণিক ভাঁটফুল, তিয়াসার তৃণলিপি—
হরিৎ চিরল বাঁশপাতা চিরে ভেসে আসে যে পথে অলীক বনঘুঘু’র গান—
রক্তপাথরের ঘুম থেকে ময়ূর যে পথে জেগে ওঠে পাথুরে ডেরায়—নগ্ন
বনদেবী যে পথে গাইতে থাকে আত্মরতিগান, পদ্মভাসা সরোবরে—
স্নানঘর থেকে ঠিক যেখানে সটান বেয়ে পড়ে শুদ্ধ জলধারা, কৌমুদিনী
স্বরে—সেই পথে, ঠিক সেই পথে, লুকোনো রয়েছে সব মোহ, মায়া,
ভ্রম—বিষাদের দাহগাথা, মর্মচেরা দুঃখক্রম!

 


ভগ্ন


সৈকতের তীর ঘেঁষা এই
তাঁবু ও বাতিঘর—
বিকেলের ধূলিরেখা ধরে হেঁটে গিয়ে
আমি খুঁজে পাই
শুধু এক বুকঝিম ঝাড়বাতি
আমলকী পাতার বিছানা
ভগ্নপ্রায় মৃদুশিখা এক রক্তাভ লন্ঠন—

সরোবর থেকে উপচে পড়ছে
রক্তফেনা—কোরকের ঘুম—
জানি এই পথে হেঁটে গিয়েছিল
সব দিকশূন্য নাবিকের দল
আর প্রেমশূন্য গণিকার সারি—

স্বরময় সরাইখানার খোঁজে
তারা কড়া নেড়েছিল প্রত্ন কুঠুরিতে—
চেরাকাঠ খসে পড়া ডেরা ধরে
তারা খুঁজেছিল প্রণয়ী প্যাঁচার ছাপচিত্র
সমুদ্রের সান্ধ্যগীতি
আর ভেসে আসা শঙ্খস্বর—

মর্মচেরা মার্মেইড—আমি খুঁজে যাচ্ছি
তোমারই ভগ্নগাথা—স্রোতকান্না—
তাঁবু ও বাতিঘরে দ্যাখো খুঁজে যাচ্ছি
সূর্যাস্তের জলছাপ—ঝিনুকের অনুষ্টুপ—
আর ভাঙা বেহালার ছড়!

 


কামিনী


ছেঁড়া ভাঁটফুল, ভ্রমরের পাখা আর মুঠোভরা রঙিন টিকিট হাতে ছুটে যাই সেই নদীতীরে—যার চারিধারে শুধু হারানো ছড়ানো কাশবন—শঙ্খশাদা বালুতট—আর উড়ে আসা রতির পালক!

বিকেলের সাইকেলে পার হই রোঁয়াওঠা ধূধূ মাঠ—কলাই ক্ষেতের ঘ্রাণ, জংশনের হুইসেল আর হুলস্থুল উলুধ্বনি পার হয়ে পৌঁছে যাই ঘুমচেরা শরৎ কোটর।

কামিনীর ধূপজ্বলা রাতে—তোমাকে খুঁজেছি খুব ধীরগামী দিঘির কিনারে! জলের মন্দিরা জ্বেলে দুই চোখে দেখেছি কেবলি আঁটসাঁট জরির কাঁচুলি—চকমকি কাচফড়িং—আর জারুলের নরোম কোরক।

শারদীয়া রাধা—তোমারই কুমুদ ঝংকারে বেজে ওঠে এ শরতে নটীর নাটাই—অপেরার ব্যান্ডবাক্স—আর ধ্বনিচেরা শারদ-সরোদ!

 


শীতঘুম


শীতের কোরক খোলো—তোরঙ্গের নিচে আছে ওম
আরো আছে খড়কুটো; দেশলাই জ্বেলে দাও রাতে
কুঠুরির স্বর শোনো—বজরায় নিভে যায় মোম
বাঈজির ভাঁজ খোলে, জ্বলে ওঠে কুমুদ মৌতাতে।

পুরনো পিয়ন হাঁটে ধূলিখামে কিশোরীর ঘুম
চিঠির গহিনে আছে অক্ষরের স্বাতীতারা স্বর—
কিছুটা তোমার কথা আরো শোনো জলের মাতম
তবে কেন হেঁটে যাই হাতে নিয়ে হরিৎ মর্মর?

এ সব অচল কথা শীতের রসদে জমে ভ্রম
ঘোড়ার কেশরে দ্যাখো জমে থাকে শীতের লিরিক
কোরকের ওম জাগে—খড়ের গাদায় জাগে প্রেম
সহিসের হাত কাঁপে; কেঁপে ওঠে ঝিনুক ঝিলিক।

হারিকেনে নেভে আলো খুলে যায় রাতের অপেরা
শ্রীকৃষ্ণও মজে আছে—ভাঁটফুলে রাধার পিরিতে
তবে কি শীতের কাছে জমা আছে কুহক স্বপ্নেরা?
ব্যথা জাগে—কেবলই ব্যথা জেগে ওঠে এই শীতে।

 


রক্তচিহ্ন


অইখানে পড়ে আছে যত রক্তচিহ্ন,
ছায়াভ্রম, জেগে ওঠা দুঃখক্রম—
আর প্রাচীরের শিলালিপি!

প্রান্তরের হাওয়ায়
শাদা ঘোড়া এক উড়িয়ে দ্যায়
তার বন্য কেশর,
চোয়ালে ফেনার দাগে
উঠে আসে তার হর্ষ—হ্রেষা,
দূর থেকে দেখা যায় অই
দিগন্তের মনুমেন্ট—

দ্যাখো ঘাসের ওপর ঘাস,
তিয়াসার তৃণলিপি—
তার আরো কিছু দূরে পড়ে আছে
যত রক্তাভ কোরক!

সহিসের হাড়ে জমে থাকে বুনো শীতে
শব্দশিকারিরা সব হেঁটে যায়
স্বরময় সরাইখানায়—

জুয়াড়ির ফেনাপাত্রে উড়ে বসে প্রজাপতি;
ভ্রমরের রাতচেরা সুরে
বেজে ওঠে ভগ্ন ভায়োলিন—

রক্তচিহ্ন আছে এই বুকে—
এসো এই ঘুমঘোর কুঠুরির পাশে
হে শীতাভ শ্বেতাভ ঘোড়া।

 


রেস্তোরাঁ


এখানে পাবে না তুমি প্রান্তরের হরিৎ হাওয়া—আঙুরের বন—তৃণময় তক্ষশিলা—যোগিনীর পাতাঘেরা ঠান্ডা ডেরা।

দিনরাত প্রার্থনা সঙ্গীতে বুঁদ হয়ে আর বিড়বিড় করে জপেও খুঁজে পাবে না কোনো পদ্মভাসা সরোবর—আমলকী ঠাসা ডিঙি নৌকা—বনঘুঘু’র ডাগর পালক।

তোমার রিস্টওয়াচ থেকে গড়িয়ে পড়ছে কান্না—রেস্তোরাঁর সেরেনাদ কে আজ বাজিয়ে চলে ঘুমের কোটরে?

জলের সেতার হাতে বসে আছি রেস্তোরাঁর তরল আঁধারে—ডুমুরের ঘুমপথে যারা জেগে আছে মদ, মেহ আর মধুর আশায়—তাদের বলছি আজ :

রেস্তোরাঁয় পাবে শুধু হারানো রিস্টওয়াচের কান্না—যদি চাও পেতে মেঘের পয়ার; তবে হেঁটে যাও প্রান্তরের শেষ পথে—বিকেলের তাঁবুতীর্থ—বাগ্‌দেবীর পাতায় মোড়ানো কোনো আরাধ্য আশ্রমে!

 


রক্তবীজ


তুমি সেই কবে থেকে শুনে যাচ্ছ ডাকিনীর স্বরলিপি—আর তলকুঠুরির গান!

দেখি মাটির মর্মর থেকে জেগে ওঠে চেরাকাঠ ফসিলের কান্না! কবিতার রক্তবীজ বুকে নিয়ে তুমি দেখে নিচ্ছ নৈঃশব্দ্য প্রপাত, আততায়ী আগুনের আভা, দূরাগত ভ্রূণের সঙ্গীত!

নভোনীল জ্যোতিষ্কের পিণ্ড চিরে আচমকা তোমার উঠোনে আজ ঝরে পড়ে এক প্রিজমের কণা—যার দ্যুতি ঠিকরে বেরিয়ে যাচ্ছে মোহ, মায়া, ভ্রম, ব্যথা, আর্তি, হাহাকার আর রক্তবীজ জেগে ওঠা কবিতার সারাৎসার!

 


মধুবালা হেয়ার ড্রেসার


হেমন্ত এলেই আমি ছুটে যাই মধুবালা হেয়ার ড্রেসারে! বাইরে কাচের পর যেখানে লাগানো আছে ভুবনমোহিনী মধুবালা’র আত্মারাম খাঁচা ছাড়া করা উঁচু বুক সাদাকালো হাসি। হাওয়ায় হারানো সুরের শ্রুতিভ্রমে আমি ছুটে যাই সেই দৃশ্যপটে—আদিগন্ত ভেড়ার অরণ্যে—শাটিনের পাতলা শাড়িতে আর তিরতিরে ঠোঁটে—নিশিগন্ধা বুক আর মধুক্ষরা ঠোঁটে। হেমন্ত এলেই আমার প্রমত্ত চুলগুলো নড়ে ওঠে পয়মন্ত হাওয়ায়! কে যেন গ্রীবার নিচ থেকে চুলগুলো মুঠো করে ধরে বলে ওঠে এই অবাধ্য উন্মত্ত কেশরাশি ছেঁটে ফেলে হয়ে যাও হেমন্তের সুবোধ সজারু। হেমন্ত আমাকে শুধু শুনিয়ে যায় মক্ষিকার গুঞ্জনের শব্দ—সেলুনে কাঁচির ছাঁট—নরসুন্দরের মিহি হাসি—তক্ষকের ক্ষৌরবিভা—আর মধুবালার উত্তালছন্দা হাসি!


প্রাচীরের শিলালিপি


তবে তুমি আমাকেই খুঁড়ে নাও
শব্দের অলীক বাতিঘরে—
ছিঁড়ে নাও আমার সমূহ কথা

যার ভাঁজে ভাঁজে জমা আছে
যতো গোপন পয়ার—
প্রাচীরের মন্দ্রিত আখ্যান!

দিগন্তের শেষ রেখা ধরে গিয়ে দ্যাখো;
জানি শূন্যতার পরে জমা আছে
আরো কিছু শূন্যতা—
প্রাচীরের শিলালিপি
অজন্তার মন্দ্রিত সংলাপ!

শিলালিপি খুঁড়ে দ্যাখো;
পাথরের ভাঁজে ভাঁজে গাঁথা আছে
আমার সমস্ত শব্দ—মনোবীজ—রক্তস্বর!

 


সৈকতে তাঁবুর নিচে


অই রৌদ্রছায়া পার হয়ে পেয়ে যাই দীর্ঘ নারিকেল সারি, তিয়াসার তরুবীথি, জানি এখানে জমানো আছে যতো বুকঝিম্ ঘুমের কিন্নরী—আর তুমুল আছ্ড়ে পড়া ঢেউ! এ সমুদ্রতীরে আছে কিছু প্রত্নপ্রায় প্যাঁচা—চোখের কোটর বেয়ে নেমে যায় তাদের গহিন জলধারা, মর্মচেরা মার্মেইড তার ঝাঁপি খুলে কেবলি শুনিয়ে যায় বীণাবাদকের কান্না! অই লাল টালিঘর পার হয়ে অবলুপ্ত মঠের কিনারে পর্তুগিজ এক পর্যটক হেঁটে যায়; চকচকে বালির ভেতর জবুথবু শুয়ে থাকে জেলিমাছ—ঝাউয়ের ঝাড় পার হয়ে কেউ যেন শুনতে থাকে অবিশ্রান্ত সমুদ্র সংলাপ, ভগ্ন বালিয়াড়ি ছেড়ে সূর্যাস্তের জলছাপে উড়ে যায় এক সারসের গ্রীবা। অই দূর বাতিঘর থেকে দেখা যায় জোয়ারের স্রোতকান্না—গাঙচিল মেলে দেয় তার সুবিশাল ডানা—নক্ষত্রেরা উঁকি দেয় জলস্রোতে—এ দৃশ্যবিভ্রমে ঘুরপাক খেতে থাকে মনোভূমি—দেখি সৈকতে তাঁবুর নিচে বসে!

তুষার কবির

তুষার কবির

জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬। এম.বি.এ. (মেজর ইন মার্কেটিং), সম্মানসহ স্নাতকোত্তর (ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কাব্যগ্রন্থ :
বাগ্দেবী আমার দরজায় (২০০৬)
মেঘের পিয়ানো (২০০৭)
ছাপচিত্রে প্রজাপতি (২০০৮)
যোগিনীর ডেরা (২০০৯)
উড়ে যাচ্ছে প্রেমপাণ্ডুলিপি (২০১০)
কুহক বেহালা (২০১২)
রক্তকোরকের ওম (২০১৪)
ঘুঙুর ছড়ানো ঘুম (২০১৫)

কবিতা-বিষয়ক প্রবন্ধ : কুঠুরির স্বর (২০১৬)

ই-মেইল : tusharkabir100@gmail.com
তুষার কবির

Latest posts by তুষার কবির (see all)