হোম কবিতা মলাট খুলে দেখা : আগন্তুকের পাঠশালা

মলাট খুলে দেখা : আগন্তুকের পাঠশালা

মলাট খুলে দেখা : আগন্তুকের পাঠশালা
453
0

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

বসে আছি তিন সূর্যঅলা গ্রহের খয়েরি গাছের তলায়। তিন সূর্যের আগুনে
হাসে কাঠ, পোড়ে ফুল।

নভোমণ্ডলের দারোয়ান ছোঁয় সাঁতার না জানা সামুদ্রিক মাছ, উড়তে না পারা
নিঃসঙ্গ সারস আর মায়াবী ময়ুর।

নক্ষত্র-রাস্তায় নক্ষত্র-ট্রাফিক দাঁড়ায় উড়ন্ত সসারের ছাদে। শোঁ-শোঁ শব্দে কাঁপে
নীল নভোযান।

হারানো বোতামের খোঁজে এক সূর্য ওঠে দুই সূর্য অস্ত যায়। এখানে কোনো রাত
নেই, সারাক্ষণ অতি অতি দিন।

বছরে একবার তিন সূর্য এক সাথে অস্ত যায়, আর সেদিনই চারখানা চাঁদ ওঠে।

চারটি চাঁদের জ্যোৎস্নায় সারা গ্রহে ঝড় ওঠে, উড়ে যায় নভোচারীর পা,
উড়ে যায় মহাকাশচারীর শান্ত মাথা।

এ আজব গ্রহে ১ জনেরই বাস, তার কোনো জন্মদাতা নেই, জন্মদাত্রী নেই।
তিনি কবিতা লেখেন।

 

লঞ্চ জার্নি

ওই তো নীল একটা লঞ্চ যায় তোমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে।

বন্ধুরা নদীর বিপরীত বাতাসে সিগারেট জ্বালায়। আমি লঞ্চের রেলিংয়ে
হেলান দিয়ে আগুন জ্বালাতে পারি না। চিরুনি চালানো চুল এলোমেলো
হয়ে যায়। লঞ্চ বুড়িগঙ্গা ব্রিজের তলায় পৌঁছালে নাক চেপে ধরে ঢাকা
শহরকে বিদায় জানাই। চাঁদপুরে এলেই শুনি ‘রুডি-রুডি—কলারুডি’।

জেলে নৌকোর মৃদু মৃদু আলো নদীতে ক্যারাম খেলে। পানিতে কলার মোচা
ভাসে আর পাড়ে আঘাত হানে মহাকালের ঢেউ। আহা, লঞ্চের ছাদে শুয়ে
রাশিফলের বই ছেঁড়ার মজাই আলাদা।

এবারের শীতে লঞ্চ ভ্রমণে যাব, সঙ্গে থাকবে দারুচিনি দ্বীপের ম্যাপ।

 

শবেবরাত

এবারের শবেবরাতে কলোনির ছেলেদের সাথে
মোল্লাপাড়ার ছেলেদের মারামারি হলো।

সারা রাত আমি তারাবাতি জ্বালালাম,
নিজ হাতে বানানো মরিচা বোম ফুটালাম।
ভিখিরিদের দিলাম ৫০ টাকা। নামাজ পড়লাম ১২ রাকাত।

আমার একটি তারাবাতি উড়ে গেল চাঁদের দেশে, তিনটা মরিচা হারাল
গোপালদের বাড়ির উঠোনে। গোপাল আর আমি পেট ভরে খেলাম
সুজি-গাজরের হালুয়া, গরুর মাংস, চালের রুটি।

এবারের শবেবরাতে হারিয়ে গেল আমার গোল টুপি,
পাঞ্জাবিতে লাগল মাংসের ঝোল। তবু ওই পাঞ্জাবি পরে
পরদিন কিনলাম বউবাজারের পাঙ্গাস। নিজের কণ্ঠস্বরকে
মনে হলো অন্যের কণ্ঠস্বর।

আগামী শবেবরাতে চাঁদে যাব খুঁজতে উড়ে যাওয়া তারাবাতি।

 

বিজ্ঞাপন

তোমাদের শহরে এসেছি মৃগী রোগ বিষয়ে বক্তৃতা দিতে।

শোনো, সক্রেটিস— এরিস্টোটল মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, তুমি দার্শনিক হতে পারবে না।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, মোনালিসার হাসি তোমার জন্য নয়।

মিকেলাঞ্জেলো মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, তুমি পাথরে প্রাণ দিতে পারবে না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মৃগীরোগী ছিলেন
তুমি মৃগীরোগী নও, তোমার ঘোড়া কথাসাহিত্যের মাঠে দৌড়াবে না।

মৃগীরোগ খুব ভালো!!!

 

জন্মান্ধের সনেট

এক গুচ্ছ হাঁসের ভেতর বোকা বক যেন তুমি
নদী আর নদী সিল্কের ফিতার মত বের হয়
দেখে আসো একা মৃতদের শীতল গণিকালয়,
খাঁচার ভেতর বাঁচার আকুতি নিয়ে কাঁপে ভূমি।
সূর্য ডোবে সমুদ্রের পেটে, মৃত্তিকায় নামে সন্ধ্যা
নিজ বাড়ি ভেবে কড়া নাড়ো দূরে অন্যের বাড়িতে
জারুল বনের প্রজাপতি ওড়ে যাদুর গাড়িতে
তোমার জন্মদিনের কেক কিনে আনে মুষ্টিযোদ্ধা।
দিন শেষে হাতে তুলে নাও ঝরে যাওয়া চালতা ফুল
ভাবো, জমজ বোনের মধ্যে কার দাঁত ওঠে আগে?
ময়ূরের নাচ, জাহাজের বাঁশি কার ভালো লাগে?
ভুল থেকে ফুল নিয়ে তৈরি করো মিশনারি স্কুল।
শরীরে তোমার সাঁতার শেষের ক্লান্ত মৎস্যগন্ধ
জন্মের সময় কাঁদলেও বোঝনি আমরা জন্মান্ধ।

 

জীবনানন্দের এরোপ্লেন

আমাদের ফ্লাটের ওপর দিয়ে রোজ সন্ধ্যায় এরোপ্লেন উড়ে যায় দূর বিদেশে।
আমি বলি, ওই এরোপ্লেন জীবনানন্দের। এ কথাতে আমাকে স্যালুট দ্যায়
অন্ধকারে দাঁড়ানো ভুঁড়িঅলা নিমগাছ। এরোপ্লেনের আলো লাগে সন্ধ্যার
উড়ন্ত বলাকাদের গায়। ভাবি, ওই এরোপ্লেন-যাত্রীদের কেউই কি আমার
পরিচিতজন নয়! আহা, পৃথিবীর কত মানুষেরেই না চিনে না জেনে
১ দিন ঘুমিয়ে যাব, হারিয়ে যাব শূন্যতায়। এরোপ্লেন যাত্রীরা
কখনোই করবে না আলাপ আমাকে লয়ে। কখনই বলবে না—
আমিও একদিন ভেবেছিলাম বিষণ্ন ফ্লাটের বারান্দায় তাদেরই বিষয়ে!
প্রশ্ন করেছিলাম নিজ সত্তারে, শূন্যতা কতটা উপরে উঠলে তাকে
আকাশ বলা যায়?

 

পেট্রোলপাম্প

পেট্রোলপাম্পের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রোজ সোনালি লাইটার
জ্বালাতে ইচ্ছে করে।
ম্যাচবাক্সের ভেতর আমি কদমফুলের গন্ধ আটকে রাখি।
আমার প্রিয় সুপারম্যান এবার শীত আসতেই উড়ে গেল
কৃত্রিম চাঁদের দেশে।
জেনে গেছি, আগামী বসন্তে ৭০০ বিখ্যাত লোকের
মৃত্যু হবে যৌন রোগে।
আমি আর বিখ্যাত লোকেদের অটোগ্রাফ নেব না।

পেট্রোলপাম্পের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেও না।

 

ম্যাডনেস

এবার ১৪ এপ্রিল এলে লাল চক দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে
ইলিশ মাছ আঁকব,
তারপর মাছগুলোকে বলব মেঘনা নদীতে চলে যেতে।

মেঘনা প্রতি বর্ষাতে আমার গ্রাম ভাঙে, আমরা শহরে চলে আসি।

শহরে প্রতি তিন মাসে একবার ভূমিকম্প হয়, আমরা নিজেদের বাদ
দিয়ে কেবল অন্যের মৃত্যুযন্ত্রণার কথা ভাবি। আমাকে ভ্যাক্সিন দিতে আসা
নার্স ভূমিকম্পের সময় শাদা হাসপাতালের ফ্লোরে ডিগবাজি খায়।

ইনজেকশান দেওয়ার সময় ভূমিকম্প হলে শরীরে চলে টিয়া পাখির নৃত্য!

 

মঙ্গলকাব্য

দুরবিন পেতেছি সন্ধ্যা শেষের ছাদে।

সকল নক্ষত্রের নামকরণ করা হয়নি এটা বুঝে
বহু নক্ষত্রের নামকরণ করি নিজে।

আমার বাড়িতে
নক্ষত্র দেখতে আসে কালকেতু আর ফুল্লরা।

কাঠকুড়ুনির বনে
আগুন লাগিয়ে আসা বনিক হাততালি দেয়।

আমাকে ডাকে
মহাকালের ঠোঁটকাটা নদী আর ছোট্ট টঙ ঘর।

নক্ষত্র চেনার বই আমার হারিয়ে গেছে খেজুরতলার হাটে!

ফেরদৌস মাহমুদ

ফেরদৌস মাহমুদ

জন্ম ২৩ অক্টোবর, ১৯৭৭, মুলাদী, বরিশাল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :
কবিতা: সাতশো ট্রেন এক যাত্রী[২০০৬], নীল পাগলীর শিস [২০০৯],
ছাতিম গাছের গান [২০১২], আগন্তুকের পাঠশালা [২০১৬]।

জীবনীগ্রন্থ: সত্যজিৎ রায় [২০০৯]।

ছোটদের বই: সন্ধ্যা তারার ঝি (ছড়া ও কবিতা) ২০১৬, রোদসীর পাখি উৎসব (গল্প) ২০১৬।

ইতিহাস: বিশ্বযুদ্ধ [২০১৬]।

ই-মেইল : ferdous.mahmud77@gmail.com
ফেরদৌস মাহমুদ