হোম কবিতা মলাটের ভেতর থেকে : ব্যাকবেঞ্চারের ট্র্যাভেলগ

মলাটের ভেতর থেকে : ব্যাকবেঞ্চারের ট্র্যাভেলগ

মলাটের ভেতর থেকে : ব্যাকবেঞ্চারের ট্র্যাভেলগ
702
0

ব্যাকবেঞ্চারের ট্র্যাভেলগ  শঙ্কর বসুর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশক ‘রাবণ’। প্রথম প্রকাশ ২০১৬, কোলকাতা বইমেলা। বই থেকে নয়টি কবিতা পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


যখ

এই কি কসমিক! মাঝে, কুড়িটা বছর গেছে কেটে!
কিছুই আগের মতো নেই তবু এই গেইন্সভিল
ফিরে দিচ্ছে হাইওয়ের ঢেউয়ে ঢেউয়ে বাঁকে বাঁকে মিল!
ওমরপুরের বাস থামলে রিক্সা, বাকিটুকু হেঁটে…

টাচস্টোন, সে বয়েস―আকাশে গোক্ষুর-ধুলো-মাঠ…
আর এই বয়েস জানে মগ্নতার দু’ফোঁটা না পেলে
কাল যুদ্ধ-হরতাল! ছেড়ে দেয় তাই এ সাইকেলে
নিজেকে, সন্ধ্যার কাছে… ঘণ্টা দুই অস্তিত্ব-লোপাট!

মদ, মাগীবাড়ি পথে পড়েও পড়ে না, গাছে গাছে
এর-ওর নিস্পন্দ লম্বা ভূত-ছায়া পড়ে অবাস্তব
নিচু কিছু আলো পড়ে… ঠান্ডা চাঁদ, ঝাপসা-ঘষা কাচে
মানুষের আব্রু টানা একাকিত্ব, আবছা যূথ-রব…

হঠাৎ ভণ্ডুল হয় দিনক্ষণ… জুটেছিল কবে
মানুষেরই উষ্ণ-সঙ্গ! চলো ফিরি, চা চড়াতে হবে…

 

ব্যালাড

গথিক দিগন্ত, দূরে ছোট ছোট আলো উঠছে জ্বলে
পায়ের ছোঁয়ায় ফুটছে ঘাসফুল, দেখে নিচ্ছে হাওয়া
দু’হাতে গাউন অল্প তুলে তার মৃদু হেঁটে যাওয়া…
উদাসী ওয়েভ এঁকে—আবছা মুখ ঢেকে প্যারাসলে
নিথর বিস্ময়ে দেখি আমিও আড়াল থেকে, থাকো
চোখের আরাম হ’য়ে থেকে যাও, অধরা অশ্রুত…
তোমাকে গুনগুন করি রাত্রিদিন, সন্ধ্যা নামে দ্রুত
উত্তরের দেশে আজ; বুনো কাঠ জড়ো ক’রে রাখো

জীবনে নির্মম শীত… জন্মে জন্মে জড়ো করা পাতা
কে জ্বালবে চকমকি! এই ব্যথার ঐশ্বর্যে, কাছে-দূরে
শিসমহল চূর্ণ কোন সারেঙ্গিতে বাগেশ্রীর সুরে
কোন অরগ্যানের রিডে ঢেউ তুলছে উন্মত্ত সোনাটা!
চোখে ভাসছে সুখোল্লাশে থরোথরো আরক্ত মৈথুন
গলছে মোম! কবেকার তীক্ষ্ণ হাওয়া পাঠাচ্ছে ফাল্গুন!

 

লঙডিস্টেন্স

বহুজন্ম দূর থেকে ভেসে আসে কণ্ঠ মেয়েটির
সদ্য নেয়ে আসা ভেজা চুল, নিংড়ে গাইছে আনমনে
শাড়ি শালু মেলতে মেলতে, ‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে…’
বহুজন্ম পথ চেয়ে মরদের নাবিক চিঠির―

বাণিজ্য বাতাস ছিল সেকালেও, ছিল সপ্তডিঙা
কালনাগিনের বিষ তুচ্ছ ক’রে ভেসেছে মান্দাসে
নো-ম্যান’স-ল্যান্ডে আজ শেকড়ের মাটি ক্ষ’য়ে আসে…
প্রবাসী জানলার কাচে আছড়ে পড়ে পাথর-প্রতিমা

দ্বগ্ধ কারবালায় তবু বৃষ্টি এনে দেয় ফোঁটা ফোঁটা
সারারাত ধ’রে অতিদূর আধো-কণ্ঠ তার, ফোনে
বাগবাজারের ঘাট-ছলাৎছল শুনতে শুনতে, মনে
চাঁদে-জলে তীব্র টান… ভাবি, একটা লালগোলাপ, বোঁটা-
উপড়ে এনে দিই! সেও, গাইতে গাইতে, ফোন গেলে কেটে
জ্বেলে দেয় তারাদের, রাতের দালানে হেঁটে হেঁটে…

 

পোস্ট-ডারউইন

ছুটতে ছুটতে আমরা উটপাখি হ’য়ে যাচ্ছি ক্রমশ… অথবা উটের মতো বেদম গজাচ্ছে কুঁজ শিড়দাঁড়ায়… ছুটতে ছুটতে আমাদের অতিরিক্ত চর্বি সব অক্সিডাইজড হয়ে যাচ্ছে রোজ… জলের যোগান দিচ্ছে মাঝপথে, দুর্দিনে… একটা গোটা জেনারেশান ‘উট ইউনিয়ন উটপাখি’ হয়ে যাচ্ছে… কমপ্লিমেন্টারি সেটখানা একা একা প’ড়ে থাকছে ‘নাল’…
সেনাপতি হাঁক পারছেন, ‘উট উঠো…’ বর্ফির বড়ি গিলে হাল্লার রাজার দাড়ি ততক্ষণে চোখা… ফাঁকা মাঠে তিনিও ছুটছেন বেজায় বল্লম হাতে…

এই স্পেকট্রামের অপরার্ধে লিভিং ফসিল কিছু সাধুপুরুষ, প্রাক-প্রজন্মের, পিতৃদত্ত একেকখানা আইভরি টাওয়ারে ব’সে ডাক ছাড়ছেন, ‘অ্যাইসে নেহি… ইস তরফসে চলো… ‘ বাতলাচ্ছেন সনাতন পথ… বাজখাঁয়ী গলায় তাদের, গেরোবাজ পায়রা উড়ে যায়… কাঁধের জমাট মোম গলে প’ড়ে রোদে, মানুষী চামড়ার ভাঁজে তবু পালকের দেখা নেই…

অথচ পালক ছিল এককালে… হাওয়াকল, মেঘের মিনার দেখে, রাতপ্যাঁচা, শঙ্খচিল… আদরে নরম নাম ‘সুদর্শন’ রেখেছিল কেউ কেউ, কবি প্রকৃতির…
পক্ষীরাজ কিম্বা এক লিভিংস্টোন সিগালের গল্পে শোঁ শোঁ শব্দ ছিল ডানা ঝাপটানোর… কালবৈশাখীর দিনে গুটিসুটি গাছতলায় খ’সে পড়া কৃষ্ণচূড়া ছিল… তারপর অঝোরধারে শ্যামলসুন্দর মেখে কাঁপতে কাঁপতে এর-ওর গায়ের ওমে শীত যখন শুধুই বাড়তির দিকে, ঠোঁটে ঠোঁটে কথা হ’ত ভেজা পালকের…

অর্থাৎ দু’হাত দিয়ে বাতাস কাটার নক্সা কিছুটা রপ্ত ছিল দুএকজন পুরনো বন্ধুর… ধুলোমাখা, কুড়োনো সঞ্চয় কিছু রঙচঙে সাদা পালকের; হিরুডাকাতের আর মনোহর ফাঁসিরার, ঠাকুরমার ঝুলির বুকমার্ক…

 

অস্তিত্ব

ধুলোগড়ের বিকেলে পিট্টু খেলতে আজও ওরা ভিড় করছে, আর আমি সেসব ছেড়ে কদ্দুর কোথায় এসে পড়লাম ভাবতে ভাবতেই কানের পাশ দিয়ে টাইম মেশিনটা ধাঁ করে বেরিয়ে গেল… তিন মিনিটের জন্যে মিস! সেই থেকে পলকে পেরিয়ে যাওয়া বছরগুলোর বিষ আমি বুকের স্পঞ্জ নিংড়ে ফেলে দিচ্ছি আর নীলে নীল মাঝসমুদ্রে বেঁধে যাচ্ছে দেবাসুরে মহাহট্টগোল… আমার বেহেস্ত-প্রাপ্তি কে আটকায়? কে আটকায় জাহান্নাম? আপাতত, বিলকুল হারিয়ে গেছি ধরাধামে… জন্ম দেশ নাম ঠিকানা কিচ্ছু, কিছুই মনে পড়ছে না ! শুধু ভার্সিটির এই করিডোর ধ’রে হাঁটতে হাঁটতে ফসিলের চেনা সোঁদা গন্ধ পাই রোজ… বিশ-ফুট কার্নিশ থেকে ছোঁ মারতে উড়ে আসে আস্ত একটা টেরোড্যাক্টাইল… লুপ্ত হবার আগে যে আমার নীলরক্তে ট্রান্সফার করে গেছে দু’দুটো মোক্ষম জৈব প্রবৃত্তির জিন… ভয় আর জেদ… বাতাসে একটানে আঁকা ঘূর্ণি লোকাস তার… ইয়েতির মুখ অব্দি সাক্ষাৎ মনে পড়ে যায়… সেই স্নো-এজ থেকেই সাইনকার্ভগুলো বুকে বুক মিশতে মিশতে একেকটা পর্দা দুলিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে মহাশূন্যে… এন্ট্রপি বেড়ে চলেছে হু হু ক’রে… একটা রেস্টোরিং ফোর্স এইবার না হলেই নয়…

 

তেলে-জলে

সত্য সেলু দাদা, বড় বিচিত্র এ দেশের দস্তানা
হাত গলালেই পায়ে রনপা গজায়, কাঁধে ডানা
কি দিন কি রাত! বাচ্চা-বুড়ো, ভাই রে, ছুটছে সকলেই…
ওকের জঙ্গলে ছুটছে, নদী ঘেঁষে, মাঠে মফস্বলে
ইয়ারফোনে স্টেরয়েড, সেক ইয়োর বাডি’তে ‘ভেরি বিজি!’
সত্য সেলু দাদা, বড় বিচিত্র এ দেশের স্ট্রাটিজি…
আমারও শাইনেশ পাখি খাঁচা খুলতে পেরেই ফুরুত!
কত আর দানা খুঁটবে! চিলে নীলে মন উড়ু উড়ু
হঠাৎ পাকরাও করা টোয়াইলাইটে সুইট ইয়ং লেডি…
‘কার পিছু ধাইছ ম্যাম? নামটা বললে নোটসে রেখে দি…
বন্ধুদের গপ্প ক’রে বলতে পারব কী কেস জন্ডিস!
আমরা যা দেখি না, এঁরা দেখতে পান, বাৎলে যান, প্লিজ—’
শুনে সে তাজ্জব! গোল্লা গোল্লা চোখে এমন তাকালো!
যেন সিধে তর্জনীতে, ফাঁকা মাঠে ‘গেট আউট’ দ্যাখালো
একটা ইউ-এফ-ও’ও যেন জ্বলে উঠল আকাশের বুকে!

সন্ধ্যাতারা নাম তার? বাড়ি তার বাংলা মুলুকে?

 

সঙ্গতি

রোজ রাতে ফিরে, ভাত ফোটাতে ফোটাতে ভাবনা আসে—
এই অন্ন,
যদি আর-কারুর মুখে তুলে দেওয়া যেত…
পরিজনহীন বুক হু হু করে ওঠে

ঘাঙ্ঘরিয়ার গুরুদ্দুয়ারার লঙ্গরখানায়
পায়ে পায়ে কাদা কাদা পিচ্ছিল মেঝেয় ফের থেবড়ে ব’সে পড়ি, সাধ যায়—
মোটা দানা, সুমিষ্ট ছ্যাঁচড়ার সাথে বেড়ে দিচ্ছে একেকজন, সাচ্চা বান্দা, সদগুরুর নামে…
একান্নবর্তী এক কাঠের উনুন ঘিরে, আমরা সেঁকে নিচ্ছি
জবজবে জিনস আর খাদির পাঞ্জাবি—
নেহাতই আগস্ট মাসে শৌখিন, ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির, দলবদ্ধ, ট্রেক করতে আসা…

মনে হয়, বেনিয়ম, জীবনের আদ্দেকটা খেল এভাবেই।
বাকি আদ্দেক জুড়ে দাঁতে দাঁত একটু তো লাগবেই
কান দিই না ওতে, শুধু
একেকটা গ্রাস মুখে তোলবার সময় মাঝে-মাঝে
কান বাজে!
ছমছমে লোডশেডিঙে ভুসো-কালি লম্ফ থেকে আগুন লাফায়!
কলঘরে, জলের শব্দে, মায়ের অধৈর্য, ঢেকে যায়—
‘তাড়াতাড়ি নাও, কী গো! খেটেখুটে ফিরে, পেট, বেশীক্ষণ খালি রাখতে নেই… ‘

 

কিমহং

এই যে অলীক হ’য়ে রয়েছে চারপাশ
এই যে দুধের ফোঁটা চুঁয়ে জমে চুন
কাঠি ছোঁয়ানোর দীর্ঘ সরল অপেক্ষা বুকে নিয়ে
জন্ম জন্ম হিম …
এই যে বসন্ত ফের ঝলমল করে উঠছে
শরীরে ব্যথার তা’য়ে ফুটে উঠছে ডুমো ডুমো ডিম
কাঁধ ফুঁড়ে উড়ে যাচ্ছে ছোট ছোট পাখি
ভূস্বর্গে যখের মতো তীব্র একা…
এভাবেই দিন যাবে নাকি!
এই যে বাজার করতে
বেরিয়ে বেবাক ব’নে গিয়ে
কিনে আনছি এক ব্যাগ নিথর নিসর্গ
আমি… কী হবে এ দিয়ে!
যদি না খোলস ছেড়ে সে এসে দাঁড়ায়
আর
বুকে বুক জাপটে ধরা কাঁচে-আঁচে তীব্র টের পায়
সব থেকে কিছু না থাকার এই শীত…

 

প্ল্যাসিবো

খুব হালকা একটা বাঁশির আলাপ ভেসে আসছে, পান্নালালের, রাগ দেশি… দিনে দিনে অনেকটা তেজি হ’য়ে এসছে আবার জানলা বেয়ে রোদ; ক্ষয়ে আসা আয়ু আর অক্ষয় যাত্রার প্রতি প্রণতি জানিয়ে, ফের, ঠান্ডা হাড়ে ক’ষে ক’ষে ড’লে দিচ্ছে ঝাঁঝালো সরষের তেলে জিইয়ে রাখা তাপ… মহাঅগ্নি পিতা যেন রথ ছেড়ে নেমে এসেছেন, অদূরেই চক্রব্যূহ… সাংখ্যের কৃপার পর অর্জুনও চক্ষুষ্মান, মৃদু আলিঙ্গনে ডেকে নিচ্ছেন পুত্রকে, এই শেষবারের মতো… চোখের কোনায় ফোঁটা ঘাম ও কি? ঠোঁটের কোণায় স্মিত হাসি… এক মনে শুনতে শুনতে মাথায় ব্যাকআপ নিচ্ছি ডাইনিং স্পেস জুড়ে চেনা প্রিয় চরণবিক্ষেপগুলো… যা থাকে কপালে, শুধু সময়ে সময়ে একটা হোমলি ফিল যাতে আসে… এইসব সাত-পাঁচ বোঝাতে বোঝাতে তবু বুকটা টনটন ক’রে উঠতে ছাড়ছে না…

শঙ্কর বসু

শঙ্কর বসু

জন্ম ২২ শে ডিসেম্বর, ১৯৮৩, কোলকাতা। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (বায়োকেমিস্ট্রি) থেকে ডক্টরেট (বিষয়: প্রোটিন ফোল্ডিং)।

পেশা : গবেষণা (তাত্ত্বিক জীববিদ্যা, পোষ্ট-ডক্টরাল স্তর),
অধুনা, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগাধীন।

প্রকাশিত বই :
শুধু সুর জেগে আছে [কবিতা, কবিয়াল, ২০১০]
এ বাসনা, এ নির্বাসন [কবিতা, ছোঁয়া, ২০১৩]
ব্যাকবেঞ্চারের ট্র্যাভেলগ [কবিতা, রাবণ, ২০১৬]
গজদন্ত ও শিলাবতী [কবিতা, ভাষালিপি, ২০১৬]

ই-মেইল : nemo8130@gmail.com
শঙ্কর বসু