হোম কবিতা মলাটের ভেতর থেকে : আত্মখুনের স্কেচ

মলাটের ভেতর থেকে : আত্মখুনের স্কেচ

মলাটের ভেতর থেকে : আত্মখুনের স্কেচ
713
0

সৌম্য সালেকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ আত্মখুনের স্কেচ। বেরিয়েছি ২০১৬-র বইমেলায়, প্রকৃতি প্রকাশন থেকে।
তাঁর কয়েকটি কবিতা পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


অভিঘাত

মহার্ঘ বাসভূমি ছেড়ে সারা জীবন তোমার মনটা পরিযায়ী পাখির মতো যেখানে অবিরাম পাখা ঝাপটায়, আমার বিশুষ্ক আত্মার অগ্নিপাত সেখানে এক মারাত্মক লুটতরাজে মেতে উঠবে; এই অশ্বখুরধ্বনি তোমাকে জাগাবে না জেনো—আর সেখানে জলের হাহাকার নগ্ন গোধূলিতে মরে পড়ে আছে আর সেখানে মধুমাছি ফুলের বদলে একেকটা স্তন ফুটে আছে, তবু দামাল বাতাসের বুকে অমূল্য আস্বাদ ভালোবেসে পাখিরা কি কোনোদিন উড়ে যাবে না…

এই অভিঘাত, এই অশ্রু-নিরোধ বুকের হেরেম খুলে লুপ্ত-প্রণালি পথে ফিরে যাবে শীর্ণ-চরায় আর তুমি পাথরে পাথরে ফেলে যাবে দীর্ঘশ্বাস আর তুমি বেভুল-গ্রন্থি ছিঁড়ে ঝরে যাবে গোলাপ শবরী

খুনসুখী, তুমি কত বিপুল মেনেছ হার; রক্তচর্মনীল—গুচ্ছপালক এঁটে…

 

অস্তিত্বের আপ্তবাক্য

জানি খোয়া যাবে যৌনতার ঘর, ব্যর্থতায় পড়ে যাবে দেহ
কেন রোজ রোজ নেশা করি ক্লান্তিহীন কামনাবীজ…

যেন আলোকের ফুল হয়ে ফুটি—মৌতাতে
যেন অস্তিত্বের নভোনীল ব্যেপে—শিশুদের অনাবিল স্বর

যেন আচ্ছন্ন আমালিক রাত—ঘোরঘুমে স্বপ্ন হয় খুব।

 

বীক্ষণ

অবিরাম ধান কেটেছি গত ঘুমে—কাস্তে ছিল ঘামের জোয়ার
অবিরাম মাছ ধরেছি গত ঘুমে—জাল ছিল নিশ্ছিদ্র তৃষার

অবিরাম পুড়েছে জীবন গত ঘুমে—অসহ রাতের শরম
অবিরাম বীজ বুনেছি গত ঘুমে—মাটি ছিল নারীর নরম

অবিরাম হেঁটেছি শ্রমণ গত ঘুমে—মন ছিল মত্ত শ্রবণে
অবিরাম গেয়েছি গান গত ঘুমে—বেহুলার অশ্রু শ্রাবণে

আরও অবিরাম কেটেছে প্রহর কত, অনুভবে জেনে যাই আমি
তবু গানে ও গমনে বুঝি না জীবনে—চাষ করি কার জমি…

 

আত্মখুনের স্কেচ

ছিঁড়ে গেছে গাঁথনি, খিলান
চাক ভেঙে মধু—নখে পিঠে বৃন্তে ধূলিতে
রোদ ও রাগিণীর জ্বরে পাথর ছুঁয়েছে বুক
দুলতে লাগে হাওয়াই ভেসেল…

তারও ছিল স্বপ্নমেঘ, ডানাপর্ব, অনন্ত তারাবিথি
তীর্থফুলে পাপড়ির গন্ধচেতনা

দীর্ঘ দেহবাস ভুলে—রক্তজবা চোখ
পার্শ্বপৃথিবী কাঁপে গমগম
ইথারে ইথারে ধোঁয়া, পাপ ও অনুতাপ

ছেঁকে-ছেনে ঘন সবুজ মিলে
মিলে যদি রাগমুক্তি—

উষার নৌকাপালে
আরো নীল গুচ্ছগোলাপ…

 

আক্রান্ত শব্দগুচ্ছ

একগুচ্ছ লাভের আগুন বয়ে ট্রেনটা লোকসুদ্ধ সড়সড়
ঢুকে যাচ্ছে রাতের গহ্বরে—দগ্ধ তৃষ্ণার কোনো অন্ধপথ ছুটে।
আঁধারের বাঁধ কেটে বিধি ও বিশ্বাস মতো জোনাকি খুলতে লাগে
ফাঁদ—আধো আধো অরণ্যকিনারে। আমিরুল, তবে কি স্বপ্নই
সারাৎসার বিগত ভ্রমণব্যাপী মহামূল্য পাথর পাহাড় আর
পুরাতন হাড়ে হাড়ে! ঈশানের সিক্ত আলোকে তবে কি
ভাসবে না বঙ্কিম নদী, ফসলের মাঠ, ঘাসের শরীর
দিন কি এগুবে রাত সয়ে সয়ে!

হেমন্ত বুনে গেছে শীত, কিছু শীত নিজেই মেনেছি
আমিরুল, ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বালো—একচাল, ঊর্ধ্বমুখী…

 

মেঘ দেখে

এখন ফেটে যাক নদী কূলপ্লাবী—দিক্হারা বর্ষণের ঘাতে
আমি দ্বিধার অনার্য হাতে রুয়ে যাব মৌসুমি শাঁস
যদি ফল হয় অর্বাচীন মুখে মুখে…

আরেকটু রহম হলে শস্যের প্রভু
বড়ই করুণা হয় অস্থির লোকালয়ে, শ্রান্ত ক্যারাভান জুড়ে
বুকের বহরে কথা আর গানে
যেন ইহারা নম্র হয়—চলতিপথ
ঈশান নৈঋতে…

সৌম্য সালেক

সৌম্য সালেক

জন্ম ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭, চাঁদপুর। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে জেলা কালচারাল অফিসার, জেলা শিল্পকলা একাডেমী, চাঁদপুর।

প্রকাশিত কবিতার বই : আত্মখুনের স্কেচ (প্রকৃতি, ২০১৬)

সম্পাদিত ছোটকাগজ : চাষারু

ই-মেইল :abuctg_bd@yahoo.com
সৌম্য সালেক

Latest posts by সৌম্য সালেক (see all)