হোম কবিতা বৃষ্টি আসছে, তুমি কোথায়

বৃষ্টি আসছে, তুমি কোথায়

বৃষ্টি আসছে, তুমি কোথায়
535
0

রহিম ব্যাপারির ঘাট। বধ্যভূমির ওপারে আকাশ কালো বুড়ি। বইগুলো, গানগুলো কোঠাঘরে হাঁপায়। বাঘের আগে আগে আসে ফেউ। তোমার আসবার পথে ধূলি-কুয়াশার ঢেউ! তুমি কি আসছ আজ?

জানালার বাইরে এখন কোন যুগ পেরুচ্ছে ইতিহাস? মাটি কি কাঁপছে খুব?

বৃষ্টি আসছে, তুমি কোথায়? কোন সময়ের তীরে নামব আমি বলো? সেখানেও কি আছে দুর্গ ও দেয়াল?

শিশুটিকে পুকুর থেকে উঠে আসতে বলো। ডাকো তাকে, ‘আয়রে আমার বাঁশরিয়া’।

জলতল থেকে উত্থিত মাছের দেখা মুহূর্ত-পৃথিবীতে বৃষ্টি আসছে। পতাকার তলে পড়ে থাকা মেয়েটিকে কেউ তুলে দিয়ে আসুক বাড়িতে, মা তার বুজে দিক জরায়ু‍—এই বলে চেঁচাচ্ছে শয়তান। বলছে, ‘তুই কি মানুষ, রহম কোথায় তোর?’

সন্ধ্যার আগেই ফুলছড়ি ঘাটে পৌঁছে যাবে ট্রেন। সেতুর ওপর উড়ালের অপেক্ষায় সহস্র প্রেতযোনী—নদীভরা দীপালি সাহা, রাউফুন বসুনিয়া।

ঝড়ে ছত্রখান আজান, কোথাকার ডাক কাকে যে পাঠায়! রোদে শুকাতে দেওয়া বইগুলো, গানগুলো—শতরঞ্জির কোনাটা কেমন ফাঁড়া। মাছের চোখে জমে আছে বরফ—মেঘের কিছু ছবি। যিশুও ছিল এমন ঊর্ধ্বনেত্র কোনোদিন। ক্রুশ ছুঁয়ে তার এ পায়ে মেরি, ও পায়ে ম্যাগদালেন:

‘তোমার পা মুছে দিতে দাও আমার চুলে; তুমি আমার শুষে নাও পাপ’, বলেছিল কেউ।

বৃষ্টি আসছে, তুমি তবু আসছ না। দিগন্তে উড়ছে কালশীর পোড়া ছাই। ধেয়ে আনছে রোহিঙ্গা জীবনের স্মৃতি। কিছু ছন্নছাড়া বিহ্বল থতমত শীর্ণ কবুতর। কেউ স্বামী ছাড়া, কেউবা তনয়, কেউ কারো ভাই; কেউ তাই কারো কিছু নয়—সীমান্ত উজিয়ে জুটেছে সাবধানে, দলে। দরিয়ার কারবালায় উড়ছে তিরবেঁধা দুলদুল। এ ওকে ডাকছে, ঝাঁকাচ্ছে কাঁধ ধরে, ‘বলো কী আমার নাম, কীবা পরিচয়?’

পাতালের দোর খুলে জাগছে কার তরণি। শক্তির ডাকিনীরা শব ঘিরে বাজাচ্ছে আলোবাদ্য। তাদের উদরের খোল ভরা খিদা—মানুষ মানুষ মানুষ! যিশুর কণ্ঠেও দ্বিধা: এলি এলি লামা সাবাখথানি।

বৃষ্টি আসছে। সুপারিবনের ভেতর দিয়ে লোকটা ফিরছে। প্রতিটা বাঁকের মুখে প্রেতচ্ছায়া, প্রতিটি খালের বুকে মরাকোটালের শিরা। লোকটা ফিরছে বাড়ি, যেখানে বহুকাল সব কিছু স্থির; শুধু কাগজের ঘূর্ণিটা হাওয়ার সঙ্গে করে যায় অযথা কাজিয়া। যেতে যেতে লোকটা আজ এক অচল রুপার কাঠি। কেউ এসে ছোঁয়াও তাকে সোনা। বুকের দোহিত দুধে ধুয়ে দাও মুখ। জানতে চেয়ো না সে কথা, যে কথা সেও জানে না!

বৃষ্টি আসছে…

ফাটলে শিস তুলে ইহলোক পেরুচ্ছে বায়ু। দেয়াল বেয়ে নামা পানির রেখার দিকে তাকিয়ে আমি তোমার কথা ভাবছি, ও বৃষ্টি ও মরণ! বিড়ালটা ভিজে একশা হয়ে কাঁপছে বারান্দায়। আজ আমার অসুখ আর আমি গাইছি, বিধি রে তোর অপার দানের গান।

বৃষ্টি আসছে…

মেঘের প্রথম ফোঁটায় কেঁপে উঠছে মেয়েটির পিঠ। এ জল তার দুপুরের দিঘি থেকে উবানো মেঘের চিঠি। আখক্ষেতে চিতলশয়ান, লঞ্চঘাটে উপুড় ভাসমান, মহাসড়কে দু’পা ফাঁক করে রাখা—মাঝ দিয়ে বইছে পুরুষযান।

মা, আমি আর আসব না। অশ্রুলেপা মাটিতে তবু ক্যান লিখ নাম? আমি তো তোমার জমানো আতর, উবে গেছি যেন কার বেখেয়ালে। আমি তোমার পাথরে ঠুকে ভাঙা শিশি; আমার বুকের পরে দাঁত ঘষছে সময়।

কত কত ইশারাপতনের শব্দ শুনি পেছনে। কুশিয়ারা বাঁকের দিকে ছায়া পড়ে দুর্বাসার। কিছু মানুষ কেন যে তবু বাজপড়া মাঠে গিয়ে দাঁড়ায়!

বৃষ্টি আসছে ধানকল মাড়িয়ে। তুমি কোথায়? তারাবাজির মতো নিভে গেছ কি প্রথম জাগরণে? নিশি পাওয়া উল্কার মতো জ্বলে গেছ পৃথিবীর প্রথম চুম্বনে?

আজও আমি শহরের দিকে যাই, মাটিডালির টিলায় তো দাঁড়াই। বাঘের আগে আগে আসে ফেউ। শোকের আগে জাগে স্মৃতি। আমার ঘুমে যে মাতমের ডাক, তার নাম বিষাণ। ফেরারি ঘোড়াদের দুঃস্বপ্ন পাঠ করে বিকালটা যায় আমার। তারপর রোজ শহরের দিকে যাই, মাটিডালির টিলায় তো দাঁড়াই।

তুমি কি কাছেই আছ? এত এত কাগজের পাখি কে তবে ওড়ালো? কে লিখে পাঠালো গাছেদের বাকলঝরা চিঠি? কে তাতে পুরে দিল আমারই হারানো সুর:

‘আজ আবার বৃষ্টি হবে দেখো। আর দেয়াল চুঁইয়ে নামা পানির রেখার দিকে তাকিয়ে আমি তোমার কথা ভাবব। ও বৃষ্টি, ও মরণ!’

মেরুতে মেরুতে সূর্য ডুবে যায়। কর্কটরেখার তলে নদীরা থতমত। বৃষ্টি আসছে, দরজায় নখের আঁচড় তুলে যে কাঁদছে, শ্বাসাঘাতে চিরে ফেলছে বাতাস—সে কি তুমি? সে কি তুমি?

ফারুক ওয়াসিফ

ফারুক ওয়াসিফ

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়া। পেশায় সাংবাদিক।
বুদ্ধিবৃত্তিক নানা তৎপরতার সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জল জবা জয়তুন [আগামী, ২০১৫]

প্রবন্ধ—
জরুরি অবস্থার আমলনামা [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা [আগামী, ২০১৬]

অনুবাদ—
সাদ্দামের জবানবন্দি [প্রথমা, ২০১৩]

ই-মেইল : bagharu@gmail.com
ফারুক ওয়াসিফ