হোম কবিতা বাছাই বারো : ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ বই থেকে

বাছাই বারো : ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ বই থেকে

বাছাই বারো : ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ বই থেকে
1.03K
0
দশকী পরিচয়ে জাকির জাফরান প্রথম দশকের কবি।
তাঁর কবিতার বই তিনটি। প্রথম বই সমুদ্রপৃষ্ঠা বেরিয়েছিল ২০০৭ সালে।
সেখান থেকে কবি-নির্বাচিত ১২টি কবিতা…

চিঠি


আজ বাবা অঙ্ক শেখাচ্ছিলেন
বললেন, ধরো, ডালে-বসা দুটি পাখি থেকে
শিকারীর গুলিতে একটি পাখি মরে গেল,
তবে বেঁচে থাকল কয়টি পাখি?

অঙ্কের বদলে এই মন চলে গেল
বেঁচে থাকা নিঃসঙ্গ সে-পাখিটির দিকে
আর মনে এল তুমি আজ স্কুলেই আসো নি।

 


দুঃখ


আগে গেলে বাঘে খায়
পিছে গেলে সোনা পায়

 

প্রেমিকের রক্তের রঙ অত্যধিক লাল।
তোমার ভাষার
অন্য কোনো দেশ আছে নাকি?
নিষ্ঠুর শ্লোকের মতো—
মানুষ বা পাখিদের ভাষা থেকে
সম্পূর্ণ পৃথক।
আমার দুঃখের গল্পে দ্যাখো
কেবলি বাঘের ছড়াছড়ি।
এই রক্তমোচনের রাতেও
তোমার নিষ্ঠুর শ্লোক ভেঙে
সত্যি সত্যি নেমে আসে বাঘ।
তখনই দুঃখকে লুকিয়ে রাখি আমি
রক্তের ভিতর,
আর বলে ফেলি, মামা!
আমাদের ঘরে কোনো হরিণ ঢোকে নি।

 


স্টেথো


নিজেরই নাভিতে যে এত ঘ্রাণ
হরিণ তা জানে না।
ক্লাস শেষে তোমার ত্রস্ত ছোটাছুটি—
আরজুটা কি চলে গেল!
এস বি স্যার কি রুমে আছে!
অথচ আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, স্টেথো,
তুমি তা দেখেও দেখলে না।
তারপর চলে গেলে তুমি
তোমার সে অ্যাবসেন্স-পোড়া ছাই থেকে
জন্ম  নিল পাখি।


কতদিন তোমাকে দেখি না! স্টেথো, এতদিন
পরে তুমি এলে! মিথ্যে এ চাঁদের নিচে
তুমি ছাড়া কেউ নেই, কেউ নেই,
একটি শালিকে ডুবে আছে দেহ—
আজ ফার্ন উদ্ভিদ সেজে বসে থাকা ভালো।
ব্যথিত বাকপুঞ্জের দেশে
পঞ্চমী-চাঁদের রক্তে দেখা হলো ফের।
এস তবে, নিশীথের নিচে,
কিছুক্ষণ পা বাঁচিয়ে খেলি। তারপর একটু একটু করে
পরস্পরকে ঘৃণা করতে শিখি।

মনে পড়ে? তোমাকে স্পর্শের আলো
একদা ছড়িয়ে পড়েছিল জলে,
ফার্ন উদ্ভিদে আর থানকুনি পাতার সমাজে। মনে পড়ে?
আজও দেখ, কোনোদিন চিঠি-না-আসা দ্বীপের মতো
জেগে আছে চোখ।

নিষ্ঠুর সূর্যাস্তে বুঝি মুখ বদলেছ তুমি।

 


পায়ে বাধা দুটি সর্বনাম


নিচু এ কৌতুকে আজ মজে গেছে মন।

বিস্তৃত অনাগ্রহের প্রতি উড়ে আসে মেঘ
তোমাকে জড়িয়ে ধরে মনে হলো ধান
মনে হলো উৎসব
জন্ম ভেঙে
দূর দূর অন্ধ দ্রাঘিমায়

নিচু ক্লাসে পড়! আহা!
চুলে এত রৌদ্র-কুমকুম, চোখ যেন সমুদ্রপৃষ্ঠা
টেনে নাও আমাকে তোমার ছত্রে ও ছায়ায়

পায়ে বাঁধা দুটি সর্বনাম, পাখি উড়ে যায়

 


খেলা


সকলেই বল মারে গোলপোস্টে।
আমি দেয়ালের গায়ে বল ছুঁড়ে দিয়ে
তার ফিরে আসবার দিকে চেয়ে থাকি।

এ দৃশ্যান্তরের খেলায় কোনও হর্ষধ্বনি নেই।

 


একদিন আমি আর মফিজ


এমনভাবে তাকাল মফিজ যেন প্রস্তরযুগ
ফিরে এল পৃথিবীতে,
যেন তার যুদ্ধ-দেখা চোখ মানুষ চেনে না।
আমি বললাম ভালো করে চিন্তা করো তো মফিজ,
ভাবো তো মশারির ভিতর মশা ও মানুষ।
সঙ্গে সঙ্গে মুখ বদলালো মফিজ
তার মুখে ফুটে উঠল চিন্তার রেখা
ভাবতে লাগল সে—মশারির ভিতর মশা ও মানুষ,
মশাটি মুখ রাখছে শরীরে, আর প্রতিটি
রক্তাক্ত চুম্বনের পর জেগে উঠছে মানুষটি।
কিন্তু একি! আজও দেখি সেই রক্ত মোছে নি ভালোবাসা।

 


দ্বিরালাপ


রাত্রি গভীর হলে
তোমার শরীর নিয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করি
আর বলি, তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে রাত
চুল খোলো রাত্রি-সহোদরা
যুদ্ধক্ষেত্র প্রসারিত হোক।

পরে তুমি ডানা মেলে দিলে
আমি তাতে মুখ গুঁজে থাকি
যেন মেঘের ভিতর ঢুকে গিয়েছে বিমান বাংলাদেশ।

 


অস্তিত্ব বিষয়ক


এসেছি শিরস্ত্রাণ পরে, দু’টি চোখে পাখি,
চেনা যায়?
—কে তুমি?
আমি জাফরান, তোমার পশ্চাদ্‌ভূমি।
—কেন এলে?
আয়ুর কৌটায় দাঁত বসাতে এসেছি।
—কিন্তু দাঁত তো ফেলে এসেছ বেদেনীর ঘরে…

 


বিয়ে, প্রীতিধারা


মেঘে মেঘে সংঘর্ষের কালে, কোথা ছিলে?
কোথা ছিলে! সব ধান খেয়ে গেল বরিষণ।
দূরের মহিলা এসে দেখে গেছে—
ছেলে ভালো, প্রভাষক,
মনে শুধু ব্যথার কঙ্কণ।

 


সংবেদনা


দল বাঁধিয়াছি কালো চোখের অক্ষরে।

পরিচয় দিবসের ঘ্রাণে
সংবেদনার রক্তে আমি জবুথবু, মহাকাল!
লাজুক ধানের মতো ছাত্রী ভেসে আসে।

বই খাতা হাতে
রুল-করা আকাশের দিকে চোখ
আর
একটি মাছ ভালোবাসে একটি পাখিকে।

 


জল


আয় পাখি, পাখি আয় যুদ্ধংদেহী,
হৃদয়-চূর্ণের প্রতি আয়।
বলেছি সমুদ্রে সমর্পিত আমি
তবু সুদূরের জল সংগোপনে আমাকেই খায়।

মিথ্যে এ চাঁদের দেশে, চন্দ্রঘুঘু জানে
কতটা হৃদয় মরে গেছে, কতটা বা অবিনাশী।
তোর চোখে কোনো অক্ষর নেই
রক্তে নেই কোনো নিঃসঙ্গ ঘটনা
তবু বারবার, অকারণে, আমি তোকে ভালোবাসি।

 


প্রিয়ঝু সিরিজ



প্রিয়ঝুর প্রস্থানের শব্দ মনে নেই।

তোমার জামার মধ্যে শীত, অর্থহীন হারজিত, আরো কত কি! বন্ধু, তুমি ফিরে এলে আমি অন্তরদ্বীপ ছুঁয়ে মেঘমায়াদের জন্মে যাব। মেঘে মেঘে জড়িয়েছি বসবাস। তোমাকে দেখাব আজ রাত্রির নাভির নিচে ভাসমান ভোর। ভোরের আলোতে নেশাগ্রস্ত চড়ৃই পাখির বসে থাকা। দীর্ঘদেহ নেমেছে রাত্রিদূর।


গোধূলিতে পা রেখে দাঁড়াই।

লাকসামে ট্রেনটা এলেই হাত কাঁপে। এমন কম্পন যাতে মোহপাশ খুলে খুলে যায়। এখানে দুঃখবিলাস ঘটেছিল বুঝি কোনোকালে। তুমি নাকি ঝরাসোনা। তাহলে দাও না এনে ঝরাকোড। যাতে পাতা সেজে প্রীতিলতা হল ঘুরে আসা যায়।


তোমাতে অবগাহনের রীতি জানা নেই।

কাল ছিল দুঃখের দুপুর। তুমি কোনো দেহবাস। তুমি কোনো হৃদি যেন অযথাই নেমেছ পাথরে। সৃষ্টিছাড়া। নেই জানা দুঃখ বিনে শ্রাবণবেলা। মেঘে মেঘে শতাশ্রু যে আমি। প্রত্যাগমনের পথে দাঁড়িয়ে রয়েছি একা।

১২
উপরে আল্লাহ নিচে তুমি হিজল তমাল জারুলের বন।

নিচে ঘনঘোর আঁধিয়ার। সন্দেহ বেঁধেছে বাসা নয়ানে তোমার। ভাসছি খাদ্যের মতো আজ বিষাদপ্রাপ্ত জলে। তুমি নাকি স্বপ্ন ছিলে ব্যথাতুর রাতে। আজ দুঃখ করি, অশ্রুপাত করি, উদয়-অস্তে গমন করি। তবু কোনো সুখস্বপ্ন জোটে না নসিবে। উপরে আল্লাহ নিচে তুমি আকাশ পাখি নক্ষত্রের দল। বিরহ কি অনিবার্য ছিল বৈশাখে বরষায়? প্রিয়ঝু! প্রিয়ঝু! এ বড় ব্যথাতুর দিনে তোমার জাফরান বৃথা যায়।

১৮
আর কভু দক্ষিণে যাব না আমি।

আর নয় করুণ এ সমুদ্র স্নান। দক্ষিণে মনের কবর। দক্ষিণে বেদনা জাগে। তাই দেখ উত্তরাস্য তোমার জাফরান। উত্তরে প্রেমের পাহাড়। উত্তরে রোদস্য পাখি—এই আজ ভালো। এবেলা বিনয় করি, কাঁধ থেকে নামো তুমি হৃদয়ের উচু থেকে নামো। উচুতে রাধিকা থাকে। উচুতে মন-সরলা। উচুতে বন্ধু আমার জীবন অন্তপ্রাণ। উত্তরে প্রেমের নদী সুরমা বহমান। এই আজ ভালো—কাঁধ থেকে নামো তুমি হৃদয়ের উচু থেকে নামো।

Zakir Zafran

জাকির জাফরান

জন্ম ৪ আগস্ট ১৯৭৫, সিলেট।
ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : বিসিএস (প্রশাসন)।

প্রকাশিত বই :
সমুদ্রপৃষ্ঠা [কবিতা, ২০০৭, গদ্য পদ্য]
নদী এক জন্মান্ধ আয়না [কবিতা, ২০১৪, গদ্য পদ্য]
অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী [কবিতা, ২০১৫, চৈতন্য]

ই-মেইল : zzafranbd@gmail.com
Zakir Zafran