হোম কবিতা বাছাই বারো : ‘রক্তমেমোরেন্ডাম’ থেকে

বাছাই বারো : ‘রক্তমেমোরেন্ডাম’ থেকে

বাছাই বারো : ‘রক্তমেমোরেন্ডাম’ থেকে
965
0

পরস্পরের অন্যতম সম্পাদক এবং অবধারিতভাবে নাটের গুরু সোহেল হাসান গালিব।  নিজের সাইটে কবিতা লেখায় তার জুবুথুবু সংকোচ। ‘বাছাই বারো’ সিরিজের বেলাতেও একই অবস্থা। কিন্তু অনেক কবিতামোদীর মতো আমি মনে করি তার রক্তমেমোরেন্ডাম কাব্যগ্রন্থটি একটা ব্রেক থ্রু। এটা যেমন গালিবের পূর্ববর্তী কাব্যকৌশল ভেঙে নতুন স্বরের পরিস্ফুটন তেমনি শূন্যদশকের কবিমানসের একটি প্রস্তরফলকও বটে। এই গ্রন্থের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় শূন্যের কবিতা কত নিরীক্ষা ও সম্ভাবনার আধার হয়ে উঠতে পারে। সে কারণেই ‘বাছাই বারো’-তে এবারে তুলে দেয়া হলো রক্তমেমোরেন্ডাম-এর অত্যুজ্জ্বল ১২টি কবিতা। রক্তমেমোরেন্ডাম গালিবের ৩য় কাব্যগ্রন্থ, বের হয় ২০১১ সালে এবং যথারীতি বইটি ‘আউট অফ প্রিন্ট’।  – মাজুল হাসান, পরস্পর

 


দেহযান


ক’মাইল পর ভালোবাসার রঙ পাল্টায়, মানুষের স্বেদ ও স্বস্তি কি তা জানে! বীজের দিকে লক্ষ করি, পাখির নীলচে ডিমের দিকে—

জন্ম ও বিকাশ : একটি অলস হাসি-বিনিময় থেকে ছাড়া পাওয়া। নীড়ের সম্পর্ক থেকে দূরে এই অলসতা, আনন্দসেতু—পারাপারহীন, জলকল্লোলে রচিত।

তারই ওপর দিয়ে দেহযান—ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে তরঙ্গ, হাওয়া, প্রত্যাশা, প্রশ্ন ও ক্ষুধা। দুলছে কাশবন। প্রসন্ন প্রচ্ছদপট। অবসাদ-গন্ধে ভরা।

ভাবনা-ভূগোল তাতে চোট পায় বলে ঘোরে। ঘূর্ণি, জানি না কোন সৌর-সংকেতে তমসা তল্লাশ করে কেবলই দূরে সরে যায়…

 


পাঠ


উপন্যাস উল্টো দিক থেকে পাঠ করি। চরিত্রেরা ফিরে আসে ঘটনার আরম্ভবিন্দুতে। অতএব এখনই সতর্ক হও। তোমার অবগাহন এইখানে ফেলে রেখে, এই সমুদ্রসংগম থেকে উঠে যাই সেই পাহাড়-চূড়ায়, উল্টাধারা নদীটির মতো, যেখান থেকে শুরু হয় গতি ও পতন—বিস্ফোরণ—জীবনের—

সমস্তই এবার খোলাশা হবে—যাকে বলে গ্রন্থিমোচন। গিলে-খাওয়া ডালপালা সব উগরে ফেলে, ভুঞ্জিত কুঞ্জের পাশে এসে ডাইনোসরও ধরা দেবে তার গর্জনগানে। পঞ্চবটী বনের ভেতর গিয়ে রামায়ণ-পাঠে এই সত্য বুঝে যাই।

দেখা হয় নগর-বাহিরে ডোমনির সাথে, কাঙ্গুচিনা ফুল কুড়াতে কুড়াতে। সোমপুর বিহারে কখন জ্বলে ওঠে দীপ সন্ধ্যাবেলা—মনে হয় গুরুগৃহে ফেরার সময় হলো।

 


আমার ফতুয়া


সমস্ত অপমানের পর একটা হাম্বারব ভেসে আসে মাঠের ওপার থেকে। আত্মগ্লানি কাকে বলে, পোকাধরা কুমড়ো ফুলের কাছে জিজ্ঞেস করি। আজ জানতে চাই, জ্যেষ্ঠের অধিকার কেন হলুদ বর্ণ হলো? কিভাবে বনানীর ভেতর একটি সরিৎ-সাপের ক্ষীণ, ঝাপশা জলচক্ষুর আড়ালে স্পিনিং মিল গড়ে ওঠে? কখন কাটা পড়ে শাল-পিয়ালের ঋজু বৈভব?

অবসাদের ভেতর যে কুড়েঘর, তার থেকে বেরিয়ে এসে এই বিকেলবেলা যত উটকো প্রশ্ন মনে জাগে। যেমন—লাঙ্গলবন্ধ্ কতদূর? পৃথিবীতে পুণ্যতিথি কোন পথ দিয়ে আসে? পুণ্যস্নান শেষ হলে আমাদের খেয়াঘাটে কেরোসিন কাঠের কোনো নৌকা এসে ভেড়ে কি না, জলদস্যুদের গুপ্ত কলরবসহ? সংকেতের যে ভাষা লেখা থাকে সেই ঘাটের সোপানে, তার জন্য খোকশা গাছের পাতায় বসে টুনটুনি পাখিটি কতটুকু আতঙ্ক পোহায়?

দূরে, সেগুনের আগায় লটকে থাকা ঘুড়ি আরও উঁচু টাওয়ারের দিকে চেয়ে ভাবে, হৃদয়ে দীনতা ছাড়া আর কোনো মেঘ নাই। তখনই ঐ ছিন্ন অবকাশের ফাঁক দিয়ে আসা এক ঝলক বাতাসে আমার ফতুয়া ডানা ঝাপটায়, ধড়হীন—গোধূলিমলাটে।

 


রোহিণী


সকল প্রেমের উৎস রোহিণী নদীর জল—সকল হিংসার। শাক্যমুনি এসে বলে গেছে এক বৈশাখী পূর্ণিমায়। এই প্রেম এই হিংসা বয়ে চলে গঙ্গায়-পদ্মায় চিরদিন। কতদিন আমি যষ্টিমধুর খোঁজে লোকালয় ছেড়ে দূরে গিয়ে জেনেছি রোহিণী একটি নক্ষত্রের নাম।

মরুপ্রদেশের জঙ্গিরাও এসেছে। তরমুজখেত ও খাড়ি পার হয়ে জংলাফুলের ধারে। ছিল কি তাদের জোনাকি-আলোয় বসে জেহাদি বই পড়া? পড়া শেষ না হতেই বলেছে আমায় চুপিচুপি: জল দাও—মধুমিশ্রিত জল।

পঞ্চতপা এক সন্ন্যাসিনীর ধ্যানের গভীরে নেমে দেখলাম, কলতান বলে কিছু নেই আর পৃথিবীতে।

অথচ রোহিণী, অরুণ ও বরুণ দুই হাতে তোমার।
আর পদপ্রান্তে আমি।

 


মিলিন্দপঞ্‌হো


ঈশ, অক্ষ, রজ্জু, চক্র—এর মধ্যে কোনটি রথ? এই জিজ্ঞাসার সামনে দ্যাখো রথারোহী যোদ্ধাও কেমন ভূমিসাৎ! হস্ত, পদ, স্কন্ধ, মাথা—আছ তবে কোনখানে? এ প্রশ্ন থাক আস্তিনে গোটানো।

একটি দেহের মধ্যে ক্রমাগত প্রবেশ- ও প্রস্থান-চিহ্ন রেখে যেতে যেতে একদিন সকলেই গেয়ে উঠি, প্রায় সমস্বরে, কোথায় পাব তারে! এমনকি যখন স্তম্ভিত হয়ে পড়ে মূর্ত আর বিমূর্ত, চুম্বন ও চিৎকারধ্বনির দাঁড়িয়াবান্ধায়, তখনও, তখনও মনে হয় শুধু, পাব কি তারে!

তারই কাঁধে ভর দিয়ে ঐ নাচে রৌদ্র। কেঁপে ওঠে বারবার ফড়িঙের পাখনার ছায়া…

শূন্যে মিলায় ইতিবৃত্ত, সময়েরও দেহ, দীর্ঘশ্বাস। তুমিও হে নাগসেন। দিগভোলা এই মিলিন্দের পথে, কে তবু গান গায়, কে এসে ফিরে যায়? রয়ে গেল ডুমুর পাতায় বৃষ্টিবিন্দু, বর্ষণের নিঃশব্দ হাইফেন।

 


বিশ্বাস


যেভাবে নিঃশব্দে চলে বাক্যালাপ পাতা ও ঋতুর সঙ্গে, যে ভাষায় জন্তুতে বন্ধুত্ব হয়, পথে ছোটে পঙ্গুত্বের প্রেম—শুধু তাই যদিবা আয়ত্ত হতো, যেতাম না মালিনীর কাছে, দরজায় কড়া নেড়ে বলতাম না, ফুল দাও।

গৃহস্থের চেতনা কি গৃহ-আসবাব? আজ ভাবি। কাঠের ওপরে ঘুণ লিখে রাখে যে অক্ষর, যেন সে ব্রেইল, যেন এই আবিষ্কার অতর্কিতে। তাই মনে হয় কিছু হবে। ঘুঘুদেশে ফিঙেদের ঘুম—ওয়ালনাট অন্ধকারে। আমি কাউকেই ডাকব না ইশারায়। ঘুমন্তকে এভাবে কে ডাকে বাকলখশানো গাছের সতেজ ডালপালা নিয়ে? জীবিতের কাছে মৃতের সুবাস পেলে যদি ভয় হয়! যদি কবরে করবী ফুটলে চিরশয়ানেও নড়ে ওঠে স্বপ্নে!

তা’বলে পাতালে যাত্রাগান! তবে তো বিশ্বাস। কে ছড়ালো দেহমধ্যে আস্থাচূর্ণ—হাড় ও পাঁজর গুঁড়ো করে? যদি না উত্তর আসে, মাটি কামড়ে যারা পড়েছিল মীমাংসাকাতর, চাকার চক্করে ফেলে ঠিক চলে যাবে হাসি আর হাহাকার—হাত ধরে…

 


অনাস্থাসেতুর ধারে


অনাস্থাসেতুর এই জংধরা রেলিঙে হাত রেখে বলছি। উপবাসে দীর্ণ ঘাসের গালিচা, পথ। কত-না তৃষ্ণার্ত, তবু জল আর আঙুরলতার ছায়াঘন চোখ এড়িয়ে সারাটা দিন, সন্ধ্যায় এসেছি ফিরে। সত্যি বলি, কোনো দুয়ারেই প্রবেশ করি নি আমি। খোলা পেয়েও না। মাতৃ-আজ্ঞা মাথা পেতে নিয়েছি কবেই। সেই উদ্দাম লাবণ্যঢেউ আজ এই জীর্ণ পেয়ালায় তুলে নিতে চাই, যার স্পর্শে চূর্ণ হয়ে পড়ে অন্ধের ঝাড়বাতি, আলো—কণায় কণায়।

আমাকেও চূর্ণ করে পথে পথে ছড়াবে কি তুমি? সে পথেও হেঁটে যাবে অসংখ্য পুরুষ। ক্ষত-বিক্ষত করে সব পায়ের তলায় রক্তপুষ্প ফোটাব একদিন। ফোটাবই। কার্নিশের ধার থেকে চেয়ে দেখবে শুধু কার্নেশিয়া—কিছু তার পড়েছে মাটিতে, কিছু মিশেছে ধুলায়।

ধুলায় ধূসর ইতিহাসে চাবুকের শব্দ কি শুনতে পাও? হাতি ও ঘোড়ার ডাক? যদিও এখানে প্রেরক ও প্রাপকের কোনো দ্বৈতগান নেই। হয়তো বেদনা আছে। লা-ওয়ারিশ। আছে আর্তনাদ। না-মঞ্জুর। চলে গেছে হাওয়া—নীলকুঠি যতদূর।

 


সিদ্ধান্ত


প্রজাপতি বিষয়ে পাখিদের কী সিদ্ধান্ত, আমরা জানি না। জানি না কী করে স্রোতে বয় কথা ও গুজব, নদীর সম্মতি ছাড়া।

ছিপছিপে নদীটাকে তবু ডেকে আনতেই হয় যে কোনো সিদ্ধান্তের আগে। মেঘের গুনটানা এক নৌকা ভেসে চলে দ্বিধার দাঁড় বেয়ে সারাদিন। এক-ফুঁটো আকাশ উঁকি দেয় তার গালফোলা পালে। তারই ভিতর দিয়ে ছুটে যায় তীব্র বাতাস, কিন্তু সেই কালো ফড়িঙটি নয়।

ইচ্ছের থেকে বড় কোনো জটিলতা নিয়ে দুপুরবেলার সাঁকো পেরুতে নেই। মন্থর মটর-মেকানিক এইসব বলেছিল। নিরুত্তর সেসব শোনার চেয়ে এইটুকু যোগ করা ভালো: কুহকের কেয়াবন ঘিরে থাকে আমাদের চলার পথ। অথচ একটা কেয়াফুলও দেখে নি জীবনে, এমন যুবককেও দেখেছি ক্রসফায়ারে মরে যেতে। জেনেছি অন্তর্ঘাত স্বপ্নভঙ্গের চেয়ে কত নিঃশব্দে ঘটে। যেন পূর্ণতা আশা করে চূর্ণ হয় সভ্যতার সুমেরুশিখর। গামবুটের নিচে যখন কঁকিয়ে ওঠে বিপ্লবীর ভাবমূর্তি। শুকনো পাতার মতো। মচমচে। পরিত্যক্ত ও নির্জন বনপথে।

এই আমঝুপী থেকে আম্রকানন কতদূর? ততদূর গহন প্রশ্নকণ্টকের বেড়া ডিঙিয়ে এসেও আমাদের অকিঞ্চিৎকরতা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবা যায়—কাশিমবাজার ও মুজিবনগরের মাঝখানে শেয়ালের সতর্ক আনাগোনায় ‘আকিঞ্চন’ শব্দটাকে ফেলে।

 


দিঙ্‌মূঢ়


সেনাছাউনির বাইরে ওরা কোথায়, এখনই হদিস নেয়া যাক। ডাকো ওদের, বলো : যুদ্ধ শেষ। ঋতুহীন প্রান্তরের হাওয়ায় যেন ভারাক্রান্ত এ পৃথিবী। বড় অবসন্ন পড়ে আছে মুকুট ও সিংহাসন। অস্ত্র, অজুহাত তবু ক্লান্তিহীন। পরস্পরে কথা কয়। আড়েঠারে চায়।

সমুদ্রের তস্তরিতে অস্তাচল। তরঙ্গ বলছে, নৈকট্য মানে অবিরাম আঘাত। প্রতিধ্বনি তুলছে অন্ধকূপ, যে কিনা হাসতে হাসতে একদিন ‘মুক্তি’, ‘মোক্ষ’, ‘ক্ষমা’—এইসব হ্যান্ডবিল ধরিয়ে দিয়ে এসেছিল আটকে-পড়া খনিশ্রমিকের হাতে। তখন বিস্মৃতি-সরণির শেষে দুলে উঠেছে জবাফুল। ইভটিজিঙে রাঙা এক গোধূলিতে। যেন স্বপ্নের ভেতর পেয়েছে এই রঙের ইশারা।

ইশারা নয়, চৌম্বকত্বই বাধা, চুম্বনের—সমমেরু, সমধর্ম আর সমতার। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসদিনে এসব তত্ত্ব বাতাসে ছড়ায়। পড়েছি তাই আমি বিধর্মীর প্রেমে। পাপের পরিখা পার হয়ে যেতে যেতে কেন যে বারবার ফিরে তাকায় মানুষ, কুকুর ও কাছিমের সঙ্গে থেকে না হয় এবার জেনে নেব। এতদূর অনুসরণ করে শুধু ওরাই এসেছে প্রাণে। এসেছে অনাহূত, অনভিপ্রেতের ভেতর থেকে। কাকে ডেকে আর কথা বলা তেমন আবশ্যক?

কাকে বলে দিঙ্‌মূঢ়, ভুল করে তাই নিজেরেই জিজ্ঞাসা করি। প্রত্যাবর্তনের পথ কত-না দীর্ঘ! কে বলতে পারে কতগুলি আবর্তন শেষ হলো মাঘী পূর্ণিমার? পঞ্জিকা তোমারও আছে, তোমাদের দেশে। সেও যদি ভেসে যায়, যদি ঐ জোনাকমাস্তুলে দুলে ওঠে সব, অন্ধকারে, তবু, শীৎকার ও শ্বাসাঘাতে রচিত রাত্রির কিনারে ঠিক ঠিক পৌঁছে যাবে তুমি। অগস্ত্যযাত্রার দিকে আমিও, বলতে বলতে: বিদায় হে অরুণাচল…

 


ভ্রমণপথ


নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে পায়ের খড়ম এসেছি পাহাড়ে উঠে। সেই কবে ফ্লাইং সসার-মুখে উড়ে চলে গেছে ইগল, ইকারুস, শূন্য ইথারে। এখানে প্রাচীন শিলা ও জীবাশ্মের গায়ে শুনেছি নক্ষত্রের গতিবেগ লেখা আছে। আছে পৃথিবীর প্রথম ভূকম্পন-মাত্রাটিও। কী আশ্চর্য! এতদিন জানাই ছিল না, রাতের আকাশে কালো কার্বনের ভাঁজ খুলে বের হয় মৃত সব মনীষীর শ্বেতপত্র; মেঘ নয়—সে এক পবিত্র পাপের ইশতেহার—সাবিত্রীদির। রূপের আরশ তাই হেলে পড়ে।

‘ওভাবে উপরে তাকিয়ো না, চোখে এসে পড়বে উল্কারেণু। মুখ নামাও বরং আর অপেক্ষায় থাকো, কখন মায়াহরিণের পিঠে চড়ে কানা-খরগোশ এক, বাদাম খেতে আসে!’

সরোবরের মাছ যে-সব আলাপ আগেই সেরে নিয়েছে, তা নিয়ে ফের তর্ক করা বৃথা। সে-সব গুইসাপও রেখে এসেছে নির্জন ও বোবা নাগলিঙ্গমের কাছে। এখন পায়চারিমাত্রই পুনরুক্তিময়।

অতএব স্থির হয়ে বসা যাক নাঙা সন্ন্যাসীর মতো সিংহের মুখোমুখি। ত্রিশূলের ডগায় নিয়ে নতুন সফটঅয়্যার।

‘শোনো, লওহে মাহফুজের পাশেই আছে রিসাইকেলবিন। অভ্রচূর্ণ তার গায়ে মাখা। এই মৃত্তিকায় শুধু ফুটে ওঠা আর ঝরে পড়া—মাঝখানে বসন্তসেনার সুগন্ধবাতাস, নষ্ট হাপরের শব্দ তুলে কোথাওবা জেগে ওঠে দীর্ঘশ্বাস…’

পড়ে ছিল কার ভাঙা ল্যাপটপ। আশশ্যাওড়াবনে। তার কাছে ল্যাংড়া কুকুরের বুঝি শেষ হলো প্রশিক্ষণ। ফিরে আসবার পথে দেখলাম বিদ্যুৎ-তারের মতো অসাড় লেজ গুটিয়ে পাহাড়খেকো এক ড্রাগনের আত্মঘাতী বসে থাকা—ভুলে যাওয়া ভ্রমণপথের দিকে চেয়ে—

 


ইশারালিখন


শনশন বাঁশবনের ধারে জন্ম আমাদের। সাক্ষী আজও সেই বিলের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া স্রোতস্বিনী। তন্দ্রাচ্ছন্ন অন্ধকার তাকে গুম করে রাখে, স্মৃতির ভেতর যে কুলকুল উলুধ্বনি শোনা যায়, ঢেকে রাখে পাঁচালির পায়চারি-পাশে। এখনও ঘুম মানে শত্রুর আঘাত ও আক্রমণ থেকে দূরে, বাঁশের কেল্লায় শুয়ে থাকা। কুয়াশাকবর ফুঁড়ে বার হয়ে এসে, রাতভর তিমির ও তিতুমীর ফিশফিশ কথা কয়।

কতকিছু ঘটে, কতকিছু শেষ হয়ে যায়—নিস্তব্ধতার কালোয়াতি যেখানটায় ছেদ টানে কৈবর্ত-কলরবে। সেখানে পাণ্ডুরাজার ঢিবি পার হয়ে আসে হাওয়া। জেতবন থেকে জামবিথি। বাদুড়ের ডানা লেগে বুঝি ভেঙে পড়ে টেরাকোটা। কুতুব-মিনার থেকে তুমি সব লক্ষ করো। দেখতে কি পাও, কালো পিঁপড়ের চলাচল, জ্যোৎস্নায়? সতর্কতা, হায়, যেন কোন পাহাড়ের ঝুলন্ত সেতু—প্রাণে যার নিঃসঙ্গ উচ্চতা! উচ্চতা মানেই কিন্তু দরপতনের ভীরু শব্দ। উল্লাসরঙে বেজে ওঠা গোঙানির শিঙা। দিল্লীশ্বর জানে। জানে সব ফেরারি ও ফিরিঙ্গি।

এ মরজগৎ এক ইশারালিখন। হরকত ও নোক্তার বেলোয়ারি ঝাড়। তবু দ্যাখো, কেমন নিষ্ঠুর সে জীবন—অব্যক্তই রেখে গেল আমাদের। যা-কিছু অনুক্ত রয়ে যায়, তার স্বরলিপি শুনেছি কেবল মাছেদের ফুলকাই টেনে চলে। আড়িয়াল খাঁ-র ধার ঘেঁশে চলেছি তাই। চলেছি তোমার আত্মগোপনের দিকে। উয়ারী বটেশ্বর।

 


রক্তমেমোরেন্ডাম


আমার অন্তরে যে অনুবাদের মেশিন তাতে নুইয়ে পড়েছে তোমার বাড়ির ঝুমকোলতা। সব কথা অর্থাতীত, অবোধগম্য। আ মরি বাংলা ভাষা! বিকল যন্ত্রের গায়ে লিখে রাখছে আঙুল কেটে—পরাস্তপুরাণ, দহনচিহ্ন যত—পাহাড়ি বালক উঁচু ঢাল বেয়ে নেমে এসে। মরচে নয়, জমছে রক্তশ্বাস বুনো প্রজাপতির।

যেন অবলোকনেই অবসান। বাসনার অন্তর্বাস খুলে এই মনে হয়। পরমায়ুর ভেতর ঘাপটি-মেরে-থাকা ইচ্ছাগুলো হুলোর চেলা হয়ে ফেরে—ফেউশার ফেউ—কখনোবা জলে, স্রোতের মোচড়ে হয় রঙের আস্কারা—বোবা ময়ূরের নাচ। নাচের এ পৃথিবীতে এক বিভাস-মুহূর্তের পারে জেগে উঠি বর্ণান্ধের মতো, শেষরাতের ঘুমন্ত প্রহরীর পাশ ঠেলে।

আমাকে ঘিরেই তবু জোনাকির ক্যানভাস, স্তব্ধতার আরতি, আর্তি।

বার্তাবহ বাতাসের গভীরে, রৌদ্র থেকে উড়ালখশা পায়রাপালক মাথায় গুঁজে কেবলই যে অপরাহ্ণের দিকে সরে যায়, বলি তারে, হে অপস্রিয়মাণ, পেয়েছো কি ফাল্গুনে পাঠানো শিমুলের রক্ত-মেমোরেন্ডাম বিদীর্ণ ডালিম গাছের নিচে!

পাঠে অনিচ্ছা, এসেছি তাই সব বুঝে নিতে। এসেছি পথে অনুবাদের মেশিন ফেলে দিয়ে।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব